Rana Zaman

 



কেমন কেমন লাগে

রানা জামান

অংকের শিক্ষক মহিবুল হাসান খুশি কী অখুশি বুঝা যাচ্ছে না। কখনোই বুঝা যায় না। উনি হাসেন কিনা স্কুলের কেউ বলতে পারবে না। বাড়িতে হাসেন কিনা তা অবশ্য কেউ যাচাই করে দেখে নি!

চার শ পঞ্চাশ দিন পর স্কুল খুলতে যাচ্ছে আজ। পুরা স্কুল খুশি থাকলেও মহিবুল হাসান একই রকম। চক-ডাস্টার হাতে নিয়ে রওয়ানা দিলেন ক্লাসরুমের দিকে। এতোদিন পরে স্কুলটাকে একদম নতুন লাগছে। তাহলে করোনার মধ্যেও সরকারের উন্নয়ন কাজ থেমে থাকে নি। আগে অফিস ও ক্লাশরুমগুলো ছিলো একই ভবনে। এখন অফিস ভবনটা আলাদা হয়ে গেছে।স্কুলভবন বহুতল বিশিষ্ট। বেশ ভালো লাগছে মহিবুল হাসানের; কিন্তু হাসি আসছে না।

মহিবুল হাসান ক্লাসরুমটা খুঁজে পাচ্ছেন না। এ-তো দিন বন্ধ থাকায় ক্লাশরুমের নামগুলি মুছে গেছে! দুই বার চক্কর দেবার পরেও ক্লাশরুম খুঁজে না পেয়ে এক দপ্তরিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেন সপ্তম শ্রেনীর ক্লাশরুমটা দোতলায় দ্বিতীয়টা।

দোতলায় এসে ক্লাসরুমের সামনে দাঁড়ালেন। তাকালেন বারান্দা বরাবর-কেউ নেই। দেড় বছরে ছাত্রছাত্রীরা শান্ত হয়ে গেছে! ক্লাশে ঢুকে থমকে গেলেন মহিবুল হাসান। ছাত্র-ছাত্রীদের কাউকেই চিনতে পারছেন না। তিনি সব ক্লাশেই ক্লাশ নিয়েছেন। তাহলে এদের অচেনা লাগছে কেনো? দেড় বছরে ছেলেমেয়েরা এতো বড় হয়ে গেছে! ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাও বেড়ে গেছে মনে হচ্ছে।

দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পরে প্রথম ক্লাশ। একটু সৌজন্য দেখাতেই হয়। মহিবুল হাসান জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেমন আছো ক্লাশ!

আমরা ভালো আছি স্যার। সকলের সমস্বরে উত্তর, যদিও মহিবুল হাসানকে চিনতে পারছে না ক্লাশের কেহই। সবাই মনে করছে এই স্যার হয়তোবা নতুন এসেছেন।

মহিবুল হাসান শুরু করলেন রোলকল-

রোল নম্বর এক.. এক… আকলিমা খাতুন..।

এক ছাত্র দাঁড়িয়ে বললো, নাম শুইন্না ভাবে চইলা গেছিলাম ছার!

কী বলছিস তুই?

ওরে আমি খুব ভালোবাসতাম ছার। কিন্তু দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় হে আমারে ভুইল্যা গার্মেন্টে চাকরি নিছে। ঐখানে প্রেম কইরা বিয়া কইরা অহন দুই বাচ্চার মা!

কী বলিস তুই? এক বছরে দুই বাচ্চা হয় কিভাবে?

জোড়া বাচ্চা ছার!

ঠিকাছে। তুই বস। রোল নম্বর দুই।

ইয়েস সার, প্রেজেন্ট সার!

মুখ তুলে ওকে দেখে চমকে বললেন মহিবুল হাসান, কিরে? তোর মুখে এতো দাড়িগোঁফ গজালো ক্যামনে?

ক্লাশ নাই পড়া নাই। তাই রেজর দিয়া মুখ চাষতে চাষতে দাড়িগোঁফ গজায়া গেছে!

ক্লাশের সবাই হি হি করে হেসে দিলেও মহিবুল হাসান নির্বিকার। ওকে হাত ইশারায় বসতে বলে রোলকল করতে লাগলেন ফের, রোল নম্বর তিন..তিন.. নাঈমা বেগম!

হাজির স্যার!

মহিবুল হাসান তাকিয়ে দেখলেন শিশু কোলে একটি মেয়ে সাড়া দিলো; পাশে এক ভদ্রলোক দাঁড়ালো।

ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মহিবুল হাসান, কী ব্যাপার? দুইবার রোল কল করলেও সাড়া দাওনি কেনো?

রোল নম্বর ভুলে গেছিলাম স্যার! নাম বলায় মনে পড়েছে!

কোলে শিশু কেনো? পাশের লোকটা কে?

নাঈমা একটু লজ্জিত হয়ে বললো, ও আমার হাসব্যান্ড স্যার!

হাসব্যান্ডকে নিয়ে এসেছিস কেনো? ক্লাশ কি কোনো বিনোদনের জায়গা?

লম্বা ছুটির পর প্রথম ক্লাশ। তাই দেখতে এসেছে।

তা ওর স্কুল নাই?

ও লকডাউনের বারবার স্কুল বন্ধ বৃদ্ধির চক্করে না থাইকা শাকসব্জি চাষ শুরু করছে আমার শ্বশুরকে সাথে। এখন মাশাল্লাহ প্রচুর ইনকাম করতাছে।

বস! রোল চার! চার কোথায়? রকিবুল ইসলাম!

মহিবুল হাসান সামনে তাকালে এক ছাত্র দাঁড়িয়ে বললো, হে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়া গেছে!

কী বলিস তুই?

হ স্যার। কওমি মাদ্রাসা কখনো বন্ধ থাকে না। আর কয়দিন স্কুল বন্ধ থাকলে আমিও মাদ্রাসায় ভর্তি হয়া যাইতাম।
রোলকল চলছে মহিবুল হাসানের। রোল নম্বর কুড়ি! হেদায়েত আলম!

একজন দাঁড়িয়ে বললো, ও মনে হয় ভুল কইরা ক্লাশ সিক্সে ঢুইকা গেছে!

ক্লাশ সিক্সে কেনো?

আমাগো যে অটোপ্রমোশন দিছে বোধয় হেইডা হের মনে নাই! আমি ওরে ডাইকা নিয়া আসতাছি।
ছেলেটির নাম জব্বার। ওর হঠাৎ মনে হলো যে ক্লাশ সিক্সে সে ক্লাশ ক্যাপ্টেন ছিলো। তাই তার এই তৎপরতা। জবার ক্লাশ থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটু পরে হেদায়েত আলমকে নিয়ে এলো। এই ভুলের জন্য হেদায়েত আলম বেশ লজ্জা পেয়েছে। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

মহিবুল হাসান জিজ্ঞেস করলেন, কিরে? তোর এতো ভুলোমন হলো কিভাবে?

সরি স্যার!

ঐ ক্লাশে কেউ কিছু বললো না তোকে?

ক্লাশ সিক্সে সবাই নতুন স্যার। তাই কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে নাই আমাকে।

আর ক্লাশটিচার?

স্যার অহনো আসে নাই।

ওকে। বস।… রোল নম্বর আটাশ! আটাশ! নাজির আলী!

নাজির আলী দাঁড়িয়ে হাই তুলতে তুলতে বললো, প্রেজেন্ট সার!

কী সমস্যা তোমার? প্রথমবারে প্রেজেন্ট দাও নাই কেনো?

বাড়িতে এই সময় ঘুমাইছি সার! তাই ক্লাশেও ঘুমায়া পড়ছিলাম।

রাতে ঘুমাও না?

স্কুল খুলে না দেইখ্যা বাবা একটা ঘানি দিছে। আমার ডিউটি পড়ছে রাইতে।

এই লম্বা ছুটিতে তোরা বাড়িতে বই নিয়া বসস নাই?

জব্বার দাঁড়িয়ে বললো, স্যারদের বা পরীক্ষার চাপ না থাকলে বাড়িতে বই নিয়া বসতে মন চায় না স্যার!

অনলাইনে ক্লাশ করিস নাই তোরা?

গ্রামে পল্লীবিদ্যুৎ বারো ঘন্টা থাকে স্যার, ভোল্টেজও থাকে কম। তাছাড়া নেট পায়াম কই স্যার!

গ্রামের স্টুডেন্টরা সত্যই দূর্ভাগা! রোল উনত্রিশ! সায়মা..!

জব্বার ফের দাঁড়িয়ে বললো, একটা কথা বলতে ভুইলা গেছি স্যার!

কী কথা?

বিষন্ন কণ্ঠে জব্বার বললো, সায়মার আত্মার শান্তির জন্য আমাদের দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করতে পারি স্যার।

সো স্যাড! কিভাবে মারা গেলো ও?

অটোপ্রমোশনে ক্লাশ সেভেনে উঠার পরেও স্কুল না খোলায় ওর মা-বাবা ওকে শহরের এক ভালো পরিবারে বিয়া দেয়। কিছুদিন পরে ওর শাশুড়ি করোনায় আক্রান্ত হয়। ভয়ে সায়মা ওর শাশুড়ির কাছে না গেলে একদিন মহিলাটা ওকে জড়িয়ে ধরে সায়মার মুখে কয়েকবার হাঁচি দেয়।

শিউরে ওঠে মহিবুল হাসান বললেন, তারপর?

পরদিন সায়মা করোনায় আক্রান্ত হলো। ওর শাশুড়ি সুস্থ হলেও সায়মা মারা গেলো। জব্বারের গলা ধরে এলো।
মহিবুল হাসান বললেন, এক মিনিট নিরবতা পালন করা ওয়েস্টার্ন কালচার। রোলকল শেষে আমরা সায়মার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করবো।

তখন ক্লাশের সকল ছাত্র-ছাত্রী দাঁড়িয়ে সালাম জানালে বিস্মিত হয়ে মহিবুল হাসান পাশে তাকিয়ে দেখেন একজন লোক ক্লাশে ঢুকছেন। লোকটাকে চেনা চেনা মনে হলেও নাম মনে করতে পারছেন না।

লোকটা ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, সরি স্টুডেন্টস! বরাবরের মতো আজও আমার লেট হয়ে গেলো!

জব্বার বললো, আমরা ভাবছি এই স্যার আমাদের নতুন ক্লাশটিচার।

লোকটা মহিবুল হাসানকে কাছে এসে চিনতে পেরে বললেন, আপনি ভুল করে ফেলেছেন মহিবুল সাহেব?

কী ভুল করে ফেলেছি? তাছাড়া আপনি ভুল ধরার কে?

আমার নাম জয়দুল কবীর। আমি এই স্কুলের ক্লাশ সেভেনের ক্লাশটিচার। আপনি ভুবনপুর স্কুলের টিচার। করোনায় বন্ধ থাকায় অযত্নে দুটো স্কুলই দেখতে একই রকম হয়ে গেছে!

মহিবুল হাসান বিশ্বাস করতে না পেরে বললেন, সত্যি বলছেন আপনি জয়দুল সাহেব?

বাহ! আপনার কাছে আমি মিথ্যে বলতে যাবো কেনো!

কিন্তু আমাদের স্কুলটাও দেখতে হুবুহু এটার মতো।

হবেই তো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একই প্রকল্পের অধীনে দুটো স্কুল নির্মাণ করা হয়েছে যে!দেখতে একই রকম, ভাংচুরও হচ্ছে একইরকমভাবে!