দুটি অভিনব কাব্য সংকলন

 


দুটি অভিনব কাব্য সংকলন

তৈমুর খান

বাংলা কবিতার দুটি আশ্চর্য সংকলন হাতে এসে পৌঁছেছে। শান্তনু গুড়িয়ার সম্পাদনায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে হাওড়া জেলার ‘সাম্প্রতিক কবিতা'(২০২১) এবং ‘কবির নাম শান্তনু'(২০২১)। আশ্চর্য বলছি এই কারণেই কবিতার ইতিহাসে সাম্প্রতিককালে হাওড়া জেলার অবস্থান, উত্তরণ এবং পর্যবেক্ষণের গভীর অনুসন্ধান মলাটবদ্ধ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। যা একজন পাঠক, গবেষক, কবিতাকর্মী এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখকের পক্ষে খুব সহায়ক হবে।

এই দুরূহ কাজটি শান্তনু গুড়িয়া করে দেখিয়েছেন। দুশো কুড়ি পৃষ্ঠার কাব্যটিতে শতাধিক কবির দুই শতাধিক কবিতা সংকলিত হয়েছে। কবিদের সাজানো হয়েছে নামের অদ্যাক্ষর ধরে।১৯৪০থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জন্মগ্রহণ করা অধিকাংশ জীবিত কবিরাই এই কাব্যে সামিল হয়েছেন। প্রত্যেক কবির দুটি করে কবিতা গ্রন্থভুক্ত। জেলার সমস্ত কবিরাই এখানে উপস্থিত হতে পেরেছেন। একটা সময়-যানে সকলেই হয়েছেন কবিতার যাত্রী। কাব্যখানি হাতে নিলেই বোঝা যায় বাংলা কবিতার গতিপ্রকৃতিতে হাওড়া জেলার কবিরাও কতখানি সমৃদ্ধ এবং শিল্পনৈপুণ্যে ও কাব্যচেতনায় কতখানি অগ্রসর প্রাপ্ত। প্রাজ্ঞ কবি জ্যোতির্ময় দাশের দুটি কবিতার শেষ পঙক্তিটি উদ্ধার করলে সমস্ত কবিরই মর্মকথাটি উঠে আসে:

‘একটা স্বপ্নময় নিজস্ব সিঁড়ির সন্ধানে এই রাজ্যপাট অথবা যাবতীয় সুচতুর খেলার বিন্যাস…'(সিঁড়ি) কবির কাছে ‘সিঁড়ি’ প্রতীক মাত্র। উত্তরণ এবং উত্থানের, আরোহন এবং উচ্চতায় অগ্রসরের সোপানকেই বুঝিয়েছেন। আবার সিঁড়ি থেকে পতনও এক অবনমন এবং বিচ্ছিন্নতা বুঝিয়েছেন।
দ্বিতীয় পঙক্তিটি হল:

‘আপনার জানা না থাকলে জেনে রাখা প্রয়োজন—কোনও না কোনও ভাবে আমরা প্রত্যেকেই আক্রান্ত আজ…'(আক্রমণের নেপথ্যে) এখানে সময় ও ব্যক্তিজীবনের নিরাপত্তাহীন ঘোর বিপন্নতার মর্মবাণীটি উঠে এসেছে। মানবসত্তার বিদীর্ণ হাহাকার যাপনের অভিশাপকেই কবি নির্দেশ করেছেন। ১৯৪০ সালে এই কবির জন্ম। কিন্তু তাঁর কবি চেতনা এখনও শাণিত, সময় নিরীক্ষায় তিনি অস্তিত্ব সন্ধানে ব্যাকুল। তেমনি সংকলনের সবচেয়ে কিশোর কবি সায়ন প্রামানিক। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ২০০০ সালে। তার একটি কবিতার স্তবক এমনই:
‘তুমি সফলতার পেছনের গল্প শোনো
অনুসরণ করো অনুকরণ নয়,
এর মধ্য দিয়েই তুমি পাবে
তোমার নিজের জয়।’ (সফলতা)

বোঝা যায় তিনিও সচেতন, বিশেষ করে নিষ্ঠা, শ্রম, প্রেরণা যা তিনি উত্তরাধিকারে লাভ করেছেন, তাকে তিনি লালন-পালনও করতে পারেন। তাই জয়ের লক্ষ্যে ধাবমান। উল্লেখযোগ্য সব কবিরাই সংকলনে উপস্থিত। কয়েকজনের নাম উল্লেখ না করে পারলাম না: অজিত বাইরী, আবদুস শুকুর খান, অনুপম মাইতি, অলোক বিশ্বাস, অমিত গোলুই, গৌতম হাজরা, গোলাম রসুল, তাপস মহাপাত্র, নীরেন্দু হাজরা, ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, বিজয় মাখাল, নিমাই আদক, পার্থজিৎ চন্দ, সাতকর্ণী ঘোষ, সুজিত সরকার, সুশীল পাঁজা, সুদীপ্ত মাজি, ব্রত চক্রবর্তী, বিকাশ মণ্ডল, দীনেশ সাউ, অংশুমান চক্রবর্তী, অপূর্ব কোলে, অতনু মণ্ডল, অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, অধীরকৃষ্ণ মণ্ডল, অরণি বসু এবং অবশ্যই শান্তনু গুড়িয়া। বারবার চোখ আটকে যায় গোলাম রসুলের কবিতায়:
‘দ্বিধাগ্রস্ত সূর্য
সূক্ষ্ম কুয়াশায় পৃথিবীর ত্বকের ওপর আমাদের আস্তানা
মর্মর মূর্তির নৃশংস বিশ্রাম’

তখনই বাংলা কবিতার উৎকর্ষতা এবং নতুনত্ব নিয়ে আমরা তীব্র কোনো সিঁড়ি পেয়ে যাই। সেই সিঁড়িতেই পৌঁছে যাই সুজিত সরকারের কাব্যতীর্থে যেখানে দর্শনের এক প্রাজ্ঞভূমি বিরাজ করে:
‘মহাসুন্দরের কাছে মহাস্তব্ধতায়
তোমার ভূমিকা শুধু প্রশ্নহীন আত্মসমর্পণ।’

এই মহাসৌন্দর্যের কাছে আমরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হই কাব্যকাননে পুষ্পশোভিত এই বিচক্ষণ বিন্যাস গভীরভাবে তাৎপর্য বহন করবে। কবিতাগুলি পাঠ করতে করতে মনে পড়ে গেল টমাস হার্ডির সেই কথাটি:
‘Poetry is emotion put into measure. The emotion must come by nature, but the measure can be acquired by art.’—(Thomas Hardy, as quoted in The Later Years of Thomas Hardy by Florence Hardy.)
অর্থাৎ কবিতা হলো আবেগকে পরিমাপ করা। আবেগের অবশ্যই প্রকৃতির দ্বারা আসা উচিত, কিন্তু পরিমাপ শিল্প দ্বারা অর্জিত হতে পারে। হাওড়া জেলার কবিরা এই কাজটিরই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন সংকলনটিতে।

😍
দ্বিতীয় সংকলনটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যান্বিত করেছে এই কারণেই যে, নামের পদবী আলাদা হলেও ‘শান্তনু’ নামের ১০ জন কবির এক ফরমা করে অর্থাৎ ১৬ পৃষ্ঠা করে কবিতা নিয়ে ‘কবির নাম শান্তনু’ এই অভিনব সংকলন। প্রত্যেক কবির সংকলনের একটা নামও দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে দশটি কাব্যের সংকলন বলাই যুক্তিযুক্ত। শান্তনু গঙ্গারিডির ‘আহ্নিক গতির আওয়াজ’, শান্তনু পি.জি.-র ‘আলোক সওয়ার’, শান্তনু লাহিড়ীর ‘বৃত্ত ভাঙার খেলা’, শান্তনু দত্তের ‘হৃদয়ের বধ্যভূমি’, শান্তনু রায়চৌধুরীর ‘জাতিস্মরের জন্মদিন’ শান্তনু প্রধানের ‘স্বপ্নবিহীন গন্ধবিহীন উদ্দেশ্যবিহীন’, শান্তনু পাত্রের ‘হৃদয়গড়ের হাসপাতাল’, শান্তনু গুড়িয়ার ‘সংহিতা, তোমাকেই’, শান্তনু চট্টোপাধ্যায়ের ‘জীবন যখন ম্রিয়মাণ’, শান্তনু দে-র ‘জিন্দাবাদ লেখা খাতা’ প্রভৃতি। ‘শান্তনু’দের এভাবে একসঙ্গে করার ধারণা সম্পাদক কোথায় পেয়েছিলেন জানি না, তবে এই অভিনব কাজটির জন্য এটাও একটা ইতিহাস সৃষ্টি হলো। ভূমিকায় সম্পাদক উল্লেখ করেছেন: ‘নিজেদের অবস্থান বোঝা ও পরিপার্শ্বে একটু চোখ বোলানোর জন্যই এই অভিনব প্রয়াস।’

‘শান্তনু’-রা কেমন কবিতা লিখেন, তাঁদের সেই বিচিত্র কবিতাযাপনে আমরা নিমগ্ন হলে এই কাজের পরিমাপ কিছুটা উপলব্ধি করতে পারব। তবে একথা বলাই যায়: শান্তনু-রা খুবই সচেতন কবি। ব্যক্তি এবং সময় চেতনার মধ্য দিয়েই তাঁদের শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় তুলে ধরেছেন:
‘দিনপঞ্জিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতে
অন্যমনস্ক ভাবে জড়িয়ে যাই সৃষ্টির রহস্য বিদ্যায়’

শান্তনু গঙ্গারিডির একথা সব স্রষ্টারই মনের কথা। সৃষ্টি আবহমান কালের, জীবন ও মহাজীবনের। তাই শান্তনু পি.জি লেখেন:
‘কলম যদি সার্থক হয়,
কালের পরিবর্তনে সে রেখে যাবে দাগ;’
আমরা জানি প্রিয়ার কালো চোখ একদিন ঘোলাটে হবে, একদিন মদ-রুটি-মাংস ফুরিয়ে যাবে; কিন্তু কলমের আঁচড় কখনও ম্লান হবে না। শান্তনু লাহিড়ী সেই অমরতারই বাতাবরণে ‘তুমি’ এবং ‘আমি’র সর্বনামে থেকে যেতে চান:
‘তুমি আছো
আমি আছি
মধ্য ধোঁয়াশা—সেও কল্পনার
সরে গেলে কী হবে
কে জানে
হয়তো-বা তুমি থাকবে
অথবা আমি
শূন্যতায় চরাচর।’
কবির বোধে দার্শনিক প্রত্যয় জাগরিত হয়েছে। বিশ্ব চৈতন্যের পথেই মানব চৈতন্যকে সঞ্চারিত করেছেন। জীবনসন্ধানে আত্মজ্ঞানকে পাথেয় করেছেন শান্তনু দত্ত:
‘আমি উড়ন্ত মেঘের কাছে ছুটে গেলাম
এক নিঃসঙ্গ সারসের মতো,
জীবনের সন্ধানে।’
হ্যাঁ যেখানেই জীবনের সন্ধান, সেখানেই অস্তিত্বের প্রশ্ন এসে যায়। আর এই অস্তিত্ব সভ্যতা অনুসারী ইতিহাসের সমীক্ষণ। সেই উপলব্ধিকে ধারণ করেছেন শান্তনু রায়চৌধুরী:
‘লতার পোশাক সব লজ্জা নাও ঢেকে
উদ্ধত বুকে রাখো কচুপাতা
কে গো মেয়ে ছুঁয়ে দিলে জেগে দ্যাখা স্বপ্নকে’

এই স্বপ্নই রচনা করেছে সভ্যতা। আগুন-জ্বালা, ঘর-বাঁধা শিখিয়েছে। পাথর ছুঁড়ে শিকার করাও শিখিয়েছে। শান্তনু প্রধান সেই নিদর্শনই ‘ওই নিষাদে’র ভেতর লক্ষ করেছেন:
‘অথচ আমার শরীর জুড়ে দিব্যি
কেন যে খেলা করে অলীক স্বপ্নের চাদর
সেই ইচ্ছের সুড়ঙ্গে যতদূর খুশি ঢুকে যায়
ব্যাকুল শ্রাবণের নির্ধারিত নিয়তির স্বরলিপি’
এই স্বরলিপি সভ্যতার প্রেমের বন্ধনকেই দৃঢ় করে তুলেছে। কেননা মানুষের ভিতরে এক হৃদয়ের জন্ম হয়েছে। এই হৃদয়ই নির্মাণ করেছে ভালোবাসার নীড়। শান্তনু পাত্র তাই লিখলেন:
‘এসব ভাবতে ভাবতে বিষণ্ণ আমি
পথ খুঁজি আর দেখি
প্রতিটি গলির মুখ স্তব্ধ হয়ে আছে আড়াআড়ি…
প্রতিটি গলির মুখে বাস্তুহারা হৃদয়ের নীল সাদা বাড়ি।’

মানবের বিষণ্ণতা যা ব্যক্তিচৈতন্যে ধরা পড়েছে তাই এক সময় আকাঙ্ক্ষার আশ্রয় হয়ে উঠেছে। বলেই নীল সাদা বাড়ি সভ্যতার প্রেমনিকেতন। যে প্রেম বাঁচতে শেখায়, অপেক্ষা করতে শেখায়, ঘর বাঁধতে শেখায়, সন্তানের জন্ম দিতে শেখায়, এবং কবিতা লিখতেও শেখায়। শান্তনু গুড়িয়া তখন লিখতে পারেন:
‘শুধু অপ্রাকৃত জ্যোৎস্নায় শান্তনু ভিজে যায়
সংহিতা, আজও আমি তোমার প্রতীক্ষায়।’

এই প্রতীক্ষা আছে বলেই এরকম সংকলনের জন্ম হয়। শান্তনু-রা একত্রিত হন কাব্য সংকলনে। প্রেমকে শরীরী করে তোলেন। সেই সাবলীল আবেগকে লালন করে শান্তনু চট্টোপাধ্যায় লেখেন:
‘তোমার সেই বিস্ময়ভরা চোখ
আজও গাঁথা আছে আমার হৃদয়ে’
এই চোখ একদিন আদমও দেখেছিল আদি মানবী ‘হবা’র শরীরে। যৌবনের উচ্ছল ঢেউ উঠেছিল তাঁরও। শান্তনু দে সেই ঠিকানাই খুঁজে পেয়েছেন ‘ভালোবাসার শ্রমিক’ হয়ে:
‘তোমার কথা ভেবে শিমুল-পলাশ,দূর্বাঘাস
শীত শেষে সকলেই কেচে নেয় ছাদের আকাশ।’

এই আকাশ আবহমান আমাদের আয়না। এখানেই আমরা মুখ দেখি। চাঁদ-সূর্য দেখি। কল্পনার সঙ্গে কল্পনার বিবাহ-বাসর বসাই। আমাদের নিসর্গ-ভাষা, আমাদের মরমী ভাষার জন্ম হয়। এরকম সুন্দর একখানা কাব্য সংকলন কোনো ব্রহ্মমুহূর্তেরই উচ্চারণ বলে মনে হয়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় জন কিটসের সেই চিরন্তন বাণীটি:
‘Poetry should surprise by a fine excess and not by singularity—it should strike the reader as a wording of his own highest thoughts, and appear almost a remembrance.’ — (John Keats, from On Axioms and the Surprise of Poetry.)

অর্থাৎ কবিতাকে অতিরিক্ত সৌন্দর্যের দ্বারা বিস্মিত করা উচিত, এককতা দ্বারা নয়—এটি পাঠককে তার নিজের সর্বোচ্চ চিন্তাধারার শব্দ হিসাবে আঘাত করবে, এবং একটি স্মৃতিকে জাগ্রত করবে। শান্তনু নামের কবিগণ এই কাজটি করতে পেরেছেন।
সম্পাদক, কবি এবং প্রচ্ছদ শিল্পী শান্তনু গুড়িয়াকে অশেষ ধন্যবাদ। তাঁর কাজের জন্য বাংলা কবিতার পাঠক তাঁকে বহুদিন মনে রাখবে।

১, হাওড়া জেলার সাম্প্রতিক কবিতা: সম্পাদনা শান্তনু গুড়িয়া, অভিনব উত্তরণ প্রকাশনী, বাগনান, হাওড়া। মূল্য:৩৯৯ টাকা।
২, কবির নাম শান্তনু: সম্পাদনা শান্তনু গুড়িয়া, অভিনব উত্তরণ প্রকাশনী, বাগনান, হাওড়া। মূল্য:২৫০ টাকা।