শম্পা_সাহা

 


আমি_ননীবালা_পর্ব_২

শম্পা_সাহা

আমাদের ছিল পৈত্রিক কাপড়ের ব্যবসা। দাদুর বাবা মাথায় একটা ছোট কাপড়ের মোট নিয়ে বাড়ি বাড়ি শাড়ি গামছা ফেরি করত। সেই থেকে পরে বাবাদের তিন ভাইয়ের তিন তিনখানা কাপড়ের দোকান। যদি সব হিসেব দাদুই রাখতো।আমরা বড়লোক না হলেও অবস্থাপন্ন ছিলাম।তিনটে গরু ছিল, বেশ কয়েকটা বলদ, কটা হাঁসও ছিল ।মোটকথা ভাত-কাপড়ের কোন অভাব ছিল না ।
বাড়ির পিছনের বাগানে ছিল ।বড় বড় দুটো আম গাছ, একটা ল্যাংড়া আর একটা হিমসাগর। পরে বাবা শহর থেকে একটা ঝুমকো ফজলি নিয়ে লাগায়।আমগুলো গাছ থেকে ঝুলে থাকতো। আমের সময় ভাই-বোনরা মিলে ওই কাঁচা আম পেরে নুন দিয়ে শেষ করে ফেলতাম ।একটা গাব গাছও ছিল।পাকা গাব খেতে যা লাগতো না! অপূর্ব! টক টক, মিষ্টি মিষ্টি ।একটা রয়্যালের গাছও ছিল। ও তোমরা তো রয়্যাল চিনবে না। জামরুলের মত কিন্তু ছোট ছোট আর টক। আর দুটো কাঁঠাল আমরা বলতাম “কাঁটল”! একটা খাজা আর একটা গালা। আমি অবশ্য গালা কাঁঠাল বেশি পছন্দ করতাম।গালা কাঁঠালের বীজ টা ছাড়িয়ে মুখে দিয়ে কোৎ করে গিলে ফেলতাম। চেবাতেই হতো না ।এক একদিন আবার সকালে পান্তা ভাত দিয়ে কাঁঠাল, আহা! অমৃত!
সারাদিন হৈ হুল্লোড় আর দস্যিপনা! তখন অবশ্য ফ্রক ছিল না। আমরা ঐ আট-দশ বছর বয়স থেকেই শাড়ি পরতাম ।কারণ বাবা পছন্দ করত না অন্য কিছু পরা। কি জানি বাবার শাড়ির দোকান ছিল বলেই কিনা? মেয়েদের শাড়ি পরানোর অত ঝোঁক ছিল। যদিও দু-একজন তখনও স্কার্ট পড়তো কিন্তু আমাদের জন্য বরাদ্দ শাড়িই।
সেই শাড়ি গাছকোমর করে পরে কি না করেছি? গাছে ওঠা, পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া, কোন্দল করা, সব!সব! তবে পড়াশোনা করিনি ।একেবারে যে পড়িনি তা নয়। নামটা লিখতে শিখে ছিলাম । সে অবশ্য শিখিয়েছিল একজন।”ননীবালা দাসী”। তখন আমরা দাসী লিখতাম এখন অবশ্য রেশন কার্ডে নাম ননীবালা পাল। পাল হলেও আমরা কুমোরের কাজ করতাম না। আমার দাদুর বাপ ঠাকুরদারা মাটির মূর্তি গড়ার কাজ ছেড়ে ধরেছিল ব্যবসা।
সকাল সকাল উঠে মা কাকিমারা উঠোন নিকিয়ে, হেঁসেলের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তো।একে একে বাড়ির ছেলেরা উঠে দাঁতন করত। তখন তো এসব বেরাশ টেরাশ ছিল না, টুথপেস্ট ও ছিল না। বাড়ির উঠোনের নিমের ডাল কেটে বানিয়ে রাখা হতো দাঁতন কাঠি। সেই দিয়ে সবাই দাঁতন করত ।আমি অবশ্য পেয়ারা পাতা আর ছাই নিতাম। দাঁতন কাঠি আমার বড্ড তেতো লাগতো।
তারপর সবার বরাদ্দ এক বাটি ভরা দুধ আর মুড়ি। অবশ্য আমরা পেতাম না।ছেলেরা ওই খেয়ে কেউ পড়তে বসতো আর বাবা কাকারা যেত দোকানে। আমরা বাড়ির মেয়েরা আগের দিনের করকরা ভাত বা জল দেয়া ভাত কিছু একটা ভাজা বা বাসি তরকারি দিয়ে খেয়ে নিতাম ।গরমকালে পান্তা কোনদিন পিঁয়াজ লঙ্কা,নুন, একটু কিছু ভাজা আর শীতকালে করকরা ভাত আর কাঁচকি মাছ ভাজা ,করকরে করে ।একটু নুন আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে।রান্নাঘরের ছামা মানে কিছুটা এগিয়ে যাওয়া যে চালটা রান্নাঘরের। তার নীচে জানালার সামনে রোদে পিঠ দিয়ে বসে সারবেঁধে সব বোনেরা ভাত খেতাম। ছোট ছোট ভাই যাদের পড়াশোনা নেই চাইলে তারাও আমাদের সঙ্গে খেতে পারতো। কিন্তু তারপর?
তারপর আর কি? বেরিয়ে পড়তাম টো টো করতে। এ বাগান সে বাগান ঘোরা,মাটির পুতুল বানানো, তাকে শুকানো, সাজানো, পুকুরে মাছ ধরা গামছা পেতে, কত কাজ! তবে তা ঐ শাড়ি পরার পর পর মানে বয়স আমার যখন বছর এগারো হঠাৎই সব বন্ধ ।
যখন সবে একটু একটু করে মেয়ে হয়ে উঠছি, তখন থেকেই মা বকতো, ঠাকুরমা বলতো
-,এটা উচিত নয়,ওটা উচিত নয়, একদম বাড়ীর বাইরে পা দিবি না
নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝতাম আমি বদলাচ্ছি, আমার শরীর বদলাচ্ছে। যেদিন পেয়ারার ডালে বসে সব একটা কষ্টে পেয়ারাতে কামড় দিয়েছি হঠাৎ মনে হল পেটে মোচড় দিয়ে উঠলো। বাবা! সবে কাঁচা পেয়ারা কামড় দিলাম আর অমনি পেটে কামড় উঠলো! এত যন্ত্রণা !লাফ দিয়ে নিচে নামলাম আর গল গল করে কি যেন গরম নামতে লাগল পা বেয়ে। ছোট বোন রানু বলল
-এই দেখ দিদি তোর শাড়ি তে কি লেগেছে। যাব্বাবা! শাড়িটা পেছনদিকে ভিজে ভিজে লাগছে কেন ?কেটে টেটে গেলো নাকি?
চুপিচুপি ঘরে গিয়ে শাড়ি ছেড়ে নতুন শাড়ি পরলাম। পরনেরটা নালাতে গিয়ে কেচে নিয়ে এলাম। তখন তো টিউবওয়েলও ছিলনা,আর টাইম কলও না। পুকুর-নালা আর পাতকুয়ো যাকে ইঁদারা বলে তাই। কিন্তু কিছুতেই কিছু থামছে না, গড়িয়েই যাচ্ছে, গড়িয়েই যাচ্ছে ।বাধ্য হয়ে ঠেলায় পড়ে মাকে বললাম ।মা একটা ছোট্ট খাটো ন্যাকড়ার বালিশ পরে নিতে বলল, সব দেখিয়ে দুখিয়েও দিল আর শোয়ার ব্যবস্থা হল ছোট্ট একটা ঘরে যাকে আমরা খুব বলতাম খোপ ।
ওটা আসলে বেড়ার তৈরি একটা জিনিস পত্র ,হাবিজাবি রাখার ঘর। তবে ভাগ্য ভালো ওখানে একটা চৌকি পাতা ছিল। মা বারবার সাবধান করে দিল ,কোন কিছুতেই যেন হাত না দিই। আর সকালবেলা উঠে সবার আগে পাতা চাদর ,পরনের শাড়ি কেচে,স্নান সেরে শুদ্ধ হয়ে আসতে হবে। সেদিনই জানলাম আমি বড় হয়েছি।
বুকের গড়ন যখন বদলাচ্ছিল তখনই তো ঠাকুমা হাজার বার বলেছে ,
-ধিঙ্গি ধিঙ্গি অ্যাত খানি বুক। তবু ধিঙ্গি পনা কমে না
কিন্তু আমি গায়ে মাখিনি ।মেজো ভাই সতীশের তো সেই ছোটবেলা থেকেই অতখানি বুক ।ওকে তো কেউ বুক ঢেকে রাখতে বলে না, শুধু আমাদের বেলাতেই যত নিয়ম ।
-বুড়ি বড় বদ
ঠাকুমাকে দু- চোখে দেখতে পারতাম না। ছেলেগুলোর বেলায় বুড়ির চোখে যেন ঠুলি আর মেয়েদের বেলা বুড়ি সাক্ষাৎ যম! পান থেকে চুন খসার উপায় নেই । তাহলেই একেবারে পাড়া মাৎ মাৎ করবে। জেঠিমা , কাকিমা,মা তো বুড়ির ভয়ে একেবারে তটস্থ !আবার ওই বুড়ি ঠাকুরদার খরমের ঠকঠকানিতে চুপ !তাই দাদু বাড়ি থাকলে বেশ হতো। অন্তত ওই বুড়ির ঘ্যানঘেনে গলার হাত থেকে তো বাঁচতাম!
ক্রমশ….