সুদীপ ঘোষাল


ভারত মাতা

সুদীপ ঘোষাল

চারদিকে মহা সমারোহ প্রকৃতির বুকে। পুজো আসছে কিনা। তাই তাদের সময় নেই থমকে থাকার। পুজোর পাঁচটা দিন নদীর তীরে বসে থাকতে ভালোলাগে। কতকগুলো ঝুপড়ি বাসা জুড়ে অবহেলিত মানুষের বাস। পুজোর দিনে নগ্ন দেহমনে খিদের ছাপ। বসে আছি পুজোর প্রথম দিনে। আমার পরিধানে নতুন জামা দেখে আদুুল গায়ের দুটি শিশু কাশফুল চিবোচ্ছে আর অবাক চোখে নতুনের গন্ধ খুঁজছে জামার ভাঁজে ভাঁজে। আমার বমি আসছে। চিকেন পকোরা পেটের মধ্যে বিরোধ শুরু করেছে। হাল্কা হয়ে শিশু দুটিকে বসিয়ে গল্প শুরু করলাম। দূর থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে। শিশু দুটি মাথা দোলাচ্ছে। কাশ ফুলের গোড়া থেকে তখনও খাদ্যপ্রাণ শুষে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে দুজনেই। থাকতে না পেরে বললাম, তোদের বাড়ি কোনটা? চল আমাকে নিয়ে চল।

শিশু দুটির বাড়ি গিয়ে মাটির বারান্দায় বসলাম। তাদের মা বেরিয়ে এলো। গামছা জড়ানো গায়ে। কারণ শাড়িটি শতচ্ছিন্ন। আমি বললাম, ওদের বাবা কোথায়? মুখে কথা না বলে ঈশারায় দেখিয়ে দিলো। দেখলাম সকাল থেকে নেশা করে পরে থাকা মাতালের মতো ওর অবস্থা। একবার মুখ তুলে দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে শুয়ে পরলো। চোখে ঘুম নিয়ে ওদের জন্ম। না দেখাই ভালো।ওরা চোখ চেয়ে থাকলে বিপ্লব ঘটে যাবে রাতারাতি। ঘুম ওদের ভুলিয়ে রাখুক খিদের জ্বালা।
তারপর পাঁচশো টাকা দিয়ে মাকে বললাম, মা তুমি চাল ডাল মাছ এনে রান্না করো। আমিও তোমাদের সাথে বসে খাবো।
আমার মা ডাকে গামছা দিয়ে চোখ মুছে সে দোকানের দিকে পা বাড়ালো।
পিছন থেকে আমি দেখলাম আমার দেশের মা তার শিশুদের আহারের ব্যবস্থা করার জন্য দৃপ্ত দুই পায়ে এগিয়ে চলেছে...





পশুপ্রেমী


নীরেনবাবু স্কুলে কাজ করেন। মাইনেও ভাল পান। বাড়িতে বুড়ি মা আছেন। নীরেনবাবু অকৃতদার। করোনার সময় মানুষ সবাই ঘরবন্দি। তাই পথের কুকুরগুলোকে ধরে বাড়িতে রাখেন,খেতে দেন।

কুকুরগুলোই তার ছেলেমেয়ে। তাদের খেতে দেন। চিকিৎসা করান। কিন্তু কাজের চাপে কুকুরগুলোকে দেখশোনার সময় পান না বেশি। এখন স্কুল বন্ধ। তাই সময় আছে।

মা বলেন, কুকুর তো প্রায় একশো ছাড়িয়ে গেল। আর কত আনবি।
নীরেনবাবু বলেন, মা তুমি আমার কাছে আছ বলে ভরসা পাই। কুকুরগুলোর কেউ নেই। কেউ লেজে পটকা বেঁধে আগুন দিত। কেউ আবার গরম ফ্যান ঢেলে দিত তাদের গায়ে। বড় নিষ্ঠুর তারা।
নীরেনের কথা শুনে তার মায়ের চোখে জল চিকচিক করে।

মা বলেন, আমিও দেখব তোর পোষ্যদের। তুই বস গিয়ে যা।
নীরেনবাবু বললেন, মা আমি স্কুল এখন যাচ্ছি না,করোনার কারণে।সরকার বন্ধ রেখেছে স্কুলগুলি।

এদের দেখব আর খেতে দেব বলে, আমিই এখন থেকে রান্না করব। তোমার তো বয়স হয়েছে। তুমি বিশ্রাম নাও আর আমার সঙ্গে থাক।

তার মা বলেন তোর মত পাগলের খুব প্রয়োজন সমাজে...


খোলা হাওয়া
সুদীপ ঘোষাল


শান্তিনিকেতন যাচ্ছি বাসে। জানালার ধারে বসতে পেলেই আমি জিতে যাই পুরষ্কার। ভারি ভাল লাগে। আদিগন্ত সবুজে সবুজে আমার হৃদয় সবুজ হয়ে ওঠে মরচে পড়া জীবনে। হঠাৎ দেখলাম জল নিয়ে খেলা করছে কিছু শিশু। বালির গাদায় গর্ত হয়ে জল জমে আছে। শিশুরা খেলা করছে। আমি ভাবলাম, সিজন চেঞ্জের সময় এটা। ফাগুনের ফালতু হাওয়ার নাচ। শুধু মন নাচায় রোগ বাধায়। শিশুদের বললাম, বেটা জল ঘেঁটো না। ঠাণ্ডা লাগবে বাবু। বাসটা থেমে আছে ট্রাফিক জ্যামে। শিশুদুটি ভিজে পোশাকে মুখ তুলে চাইল। আবার মেতে গেল বালির ঘর তৈরির নেশায়।

বৃষ্টি হয়েছে খুব গতরাতে।

আর বালিগাদাতে গর্ত হয়ে জল প্রায় এক হাত জমেছে। জলের সঙ্গে সন্ধি করে সই পাতিয়ে পিছলে এই বালি নিয়ে ছেলেরা খেলা করছে।

আমি জানলা দিয়ে আবার বললাম ঠান্ডা লেগে যাবে।
জলে নেমো না। উঠে যাও তোমরা। এখন গিয়ে পড়াশোনা করো। ছেলেগুলো তবু বালি নিয়ে জলে খেলা করলো। সিজন চেঞ্জের সময় ঠান্ডা লেগে যাবে এই ভয়ে আমি আবার ওদের বললাম তোমরা আমার কথা শুনছো না কেন?

জল ঘেটনা, যাও সরে যাও। তোমাদের ঠান্ডা লেগে যাবে। বাবা মায়ের কষ্ট হবে। তবুও তারা পালিয়ে পালিয়ে আনন্দে বালির ঘর বানাতে লাগল। আমার কথা শুনল না। ইতিমধ্যে বাস ছেড়ে দিয়েছে।

আমি হেরে গিয়েও শান্তি পেলাম। তারা আমার পানে চেয়ে হাসল আমার শিশুবেলার হারিয়ে যাওয়া খোলা হাওয়ায়।

কি করে হাসি আমি।তবু আমিও হেসে উঠলাম হেরে গিয়ে।


সুদীপ ঘোষাল নন্দনপাড়া খাজুরডিহি কাটোয়া ২০ পূর্ববর্ধমান ৭১৩১৫০ মো ৮৩৯১৮৩৫৯০০