অভিষেক সাহা



 অণুগল্প — পতাকা

গল্পকার — অভিষেক সাহা
লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া বন্দেমাতরম গানটা কানে আসতেই চোখ দুটো মহা অনিচ্ছা সত্ত্বেও খুলে গেল রাজের।
” গানটা একটু আস্তে কর জয়া , কাল অনেক রাতে শুয়েছি, এখনি বিছানা ছাড়ব না !” চোখ দুটো আবার বন্ধ করে, পাশবালিশটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর বৌ জয়াকে বলল রাজ।
” আমাকে নয়, বুবুনকে বল, আস্তে- জোরে সব ওই করতে পারবে !” পাশের ঘর থেকেই উত্তর দিল জয়া।
জয়ার উত্তর শুনে বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে বসল রাজ।চোখ কচলে জিজ্ঞেস করল ” কে বুবুন ?”
” সেকি, তুমি কী নেশা করে ঘুমাও! বুবুনকে চিনতে পারছ না ! আমাদের ফ্ল্যাটের পাশে যে মেগাস্টার ক্লাব আছে তার সেক্রেটারি।” নিজের কাজ করতে করতেই উত্তর দিল জয়া।
আচমকা ঘুম থেকে উঠে মাথাটা শুরুতে কিছুটা গুলিয়ে গেছিল। একটু ধাতস্থ হয়ে রাজ বলল ” চিনবো না কেন? একটা ডেপো ছেলে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না যে, আমার ঘরে গান বাজছে আর আমি বুবুনের সাথে কথা বলব কেনও ?”
” একশ’ দিন বলেছি , ঘুম থেকে উঠে আগে ফ্রেশ হয়ে নেবে, তারপর সব বিষয়ে মাথা দেবে। যাও আগে ফ্রেশ হয়ে এসো।” রাজের ঘরে ঢুকে ওর সামনে দাঁড়িয়ে ধমকের সুরে বলল জয়া।
” যতই চিৎকার কর, আজ বেড-টি না পেলে খাট থেকে নামছি না ।” মজা করে বলল রাজ।
” উফ্, তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না, ঘড়ির দিকে দেখ, সাড়ে সাতটা বাজে, আজকে স্বাধীনতা দিবসের দিনেও তুমি ঘুম নিয়ে পড়ে আছ! আর আমি না, মেগাস্টার ক্লাবের ছেলেরা যে বড় বড় চোঙ লাগিয়েছে, সেই আওয়াজ তোমার ঘুম ভাঙিয়েছে !” একটানা কথাগুলো বলে থামল জয়া।
রাজ কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল।
” যাও দেখ তোমার নাড়ুগোপাল এসেছে, আমি ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে আসছি ।” কথাগুলো বলে রাথরুমে চলে গেল রাজ । জয়া দরজা খুলল।
নাড়ুগোপাল রোজ সকালে খবরের কাগজ, দুধের প্যাকেট, কাঁচা সবজির বাজার এনে দেয়। জয়া সব কিছু দেখে নিচ্ছিল।
” কী রে নাড়ু, ভালো আছিস তো? ” বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল রাজ।
” আমি তো ভাল। তা রাজ দা , তুমি আজ এত লেট! কোনও প্রোগ্রাম নেই ?” রাজকে প্রশ্ন করল নাড়ু।
” যাব তো। অফিসে ফ্ল্যাগ হোস্টিং আছে। সে তো সকাল দশটায়। এখন তো সবে আটটা। তা তোর কী প্ল্যান?” নাড়ুর কাছে জানতে চাইল রাজ।
” সব কাজ সেরে মেগাস্টারে যাব। এগারোটায় পতাকা উঠবে। তারপর ফুটবল টুর্নামেন্ট আছে। আর রাতে দাদা বলেছে খাসির মাংস – ভাত খাওয়াবে।” একগাল হেসে বলল নাড়ু।
” দাদা মানে তো ওই বুবুন বলে ছেলেটা। মাথায় একটুও বুদ্ধি নেই, শুধু জিম করে মাসল ফুলিয়েছে। চুল লাল করে, এক কানে দুল পড়ে সারাদিন বাইক নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়! ওকে বলিস তো আমাকে স্বাধীনতা বানানটা লিখে দেখাতে, ঠিক লিখতে পারলে পাঁচশ’ টাকা দেব, কথা দিলাম।” বিরক্তি ঢালা গলায় বলল রাজ।
” তুমি বুবুন দা-র কথা ছাড়। আমাকে একশ’ টাকা বকশিস দাও, আনন্দ করব !” গদগদ হয়ে বলল নাড়ু।
টেবিলের উপর রাখা মানিব্যাগ থেকে একশ’ টাকার নোট বের করে নাড়ুর হাতে দিয়ে স্নেহ মেশানো গলায় রাজ বলল ” আনন্দ কর, কোনও অসুবিধা নেই, শুধু একটা কথা মনে রাখিস, অনেক অনেক জীবনের বিনিময়ে এই তেরঙ্গা পতাকাটা আমরা উপরে তুলতে পেরেছি, উৎসব শেষে একটাও পতাকা যেন রাস্তায় পড়ে না থাকে।”