মুহাম্মদ সেলিম রেজা

 


বেগম বিভ্রাট

মুহাম্মদ সেলিম রেজা


সন্ধ্যা গড়িয়েছে অনেকক্ষণ। অঞ্চল প্রধান শ্রীধর সেন বৈঠকখানায় কর্মব্যস্ত। আগামী পরশুদিন ডিএম সাহেব জেলার সব প্রধানকে তলব করেছেন। তাই দপ্তরে খুটিনাটি তথ্য পারসোন্যাল ডায়েরীতে লিখে রাখছেন, সাহেব কিছু জানতে চাইলে যেন যথাযথ উত্তর দিতে পারেন।

এমনসময় আফজোল মুন্সি প্রবেশ করল। লোকটা প্রধানের প্রতিবেশি এবং সহপাঠী। তাছাড়াও উভয়ের রাজনৈতিক ব্যানার এক হওয়ায় হৃদ্যতা বেশ গাঢ় ও সুদৃঢ়। প্রতিদিনই সে একবার বৈঠকখানায় ঢু মারে। আসে আরও অনেকে। ঘন্টা দুয়েক রাজনীতি, গ্রামনীতি ইত্যাদি আলোচনায় অতিবাহিত করে যে যার ঘরে ফিরে যায়।
আজ কিন্তু মুন্সি আড্ডার মেজাজে নেই। বৈঠকখানায় পা দিয়েই কর্কশ কন্ঠে বলল, তুমি কী চাও না আমি শান্তিতে থাকি?
প্রধান ডায়েরির পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল, তুমি শান্তি পেতে চাইলে আমি বাধা দেবার কে ভাই?
– সেই কবে থেকে বেগম ভাগাও, বেগম ভাগাও, চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছি। তুমি আমার কথা কানে তুলছো না। কেন বুঝতে চাইছো না বেগমের জ্বালায় আমি তিষ্টোতে পারছি না। বৈঠকখানায় পেতে রাখা সোফার একপাশে বসতে বসতে বলল মুন্সি।
প্রধান কাজ শেষে কাগজপত্র গুছিয়ে আলমারিতে রেখে দিয়ে বললেন, তুমি বললে আর আমি করে দিলাম। কাজটা অতো সোজা নয় মুন্সি। সবকিছু ইচ্ছামতো করা যায় না, সরকারি কাজকর্মের নির্দিষ্ট প্রসেস আছে।
– তোমার আর কী? যার ঘা হয়েছে সেই বোঝে ব্যাথা। শ্লা বজ্জাৎ বেগম আমার জিনা হারাম করে তুলেছে। আর উনি প্রসেস দেখাচ্ছেন।
– মামুলি একটা বিষয় নিয়ে এত হৈ চৈ করার কী আছে বুঝি না বাপু। অনেকেই এমন সমস্যার শিকার, কই তারা তো তোমার মতো লাফালাফি করছে না?
– কে কী করছে জেনে আমার কাজ নেই। তুমি বল বেগম হটাতে পারবে, না অন্য লোক ধরব?
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না প্রধান। মনে মনে হিসাব কষে নিয়ে বললেন, লোকসভা নির্বাচনের আগে তোমার কাজ হয়ে যাবে। কথা দিলাম, আর লাফিও না যাও।
সুনন্দা পাশের ঘর থেকে বৈঠকখানার সব কথা শুনতে পাচ্ছিল। স্বামীকে অনায্য দায়ভার মাথায় নিতে শুনে স্থির থাকতে পারলেন না। দু’লাফে বৈঠকখানায় পৌঁছে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, প্রধান তোমার কী মাথা খারাপ হয়েছে। অন্যের বউ তুমি কীভাবে তাড়াবে শুনি? তারপর মুন্সিকে তুলোধনা শুরু করলেন, তোমাকেও বলিহারি ভায়া! এই বয়সে বউ তাড়ানোর ষড়যন্ত্র করছ লজ্জা করে না? পুরুষ জাতটাই ওরকম, এক সময় ওই মেয়েকে কাছে পেতে কী কাণ্ড না করেছ। এখন সে ছেলেমেয়ের জন্ম দিয়ে পানসে হয়ে গেছে বুঝি! নতুন ঘটির জল খেতে চাচ্ছো?
– বোঝ ঠ্যালা! আর্তনাদ করে উঠল মুন্সি।
– আঃ সুনন্দা! যা বোঝ না তা নিয়ে কথা বলতে এস না। প্রধানের কন্ঠ হতে বিরক্তি ঝরে পড়ল।
সুনন্দা ও সহজে দমবার পাত্রী নয়। ততটাই তেজের সাথে বলল, সাফ কথায় বোঝাবুঝির কি আছে? মেয়েরা কলার খোসা নাকি যে, শাঁস খাওয়া হল অমনি ছুড়ে ফেলে দিবে?
– তুমি যা ভাবছো ঘটনা তা নয় গিন্নি। এখন ভিতরে যাও, পরে সব বলব তোমাকে।
প্রধান ঠেলে স্ত্রীকে ভিতরে পাঠিয়ে দিয়ে ফিরে আসতে মুন্সি অনুযোগের সুরে বলল, দেখলে প্রধান কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াল। এই সংবাদ তার কানে গেলে খবর আছে, জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে আমাকে।
– বেশ করবে! যেমন কর্ম তেমনি ফল পেতে হবেতো নাকি? এ কথা বলে প্রধান ফিক করে হেসে দিলেন।
– শেষপর্যন্ত তুমিও! আফজল মুন্সির গলা বেয়ে এক ছটাক হতাশা নির্গত হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
– এখন ও কথা থাক। দক্ষিণ পাড়ার খবর কি বল। ছেলেদের সাথে কথা হয়েছে?
খবর আছে দক্ষিণ পাড়ার কিছু ছেলে ভিতরে ভিতরে বিরোধী পক্ষে যোগাযোগ রেখে চলেছে। লোকসভা নির্বাচনে তারা দলবদল করতে পারে। এই বিষয়ে ছেলেদের সাথে কথা বলার দায়িত্ব মুন্সিকে দিয়েছে প্রধান। আজ বসার কথা ছিল। সে প্রসঙ্গ তোলাতে মুন্সি খ্যাক করে উঠল, ছাই হয়েছে। পাড়ায় ঢুকতেই পারলাম না। ছোঁড়াগুলো আমাকে দেখেই হাসাহাসি শুরু করে দিল, ঘেন্নায় পালিয়ে এসেছি। যতদিন না বেগমের বিহিত হচ্ছে আমি কোথাও যাচ্ছি না।
– ছেলেরা অন্য কোন কারণেও তো হাসাহাসি করতে পারে। তুমি গায়ে মাখছো কেন? বিরক্তি প্রকাশ করেন প্রধান।
ওদিকে স্বামী বৈঠকখানায় অন্তর্হিত হওয়া মাত্র সুনন্দা মুন্সির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। তাদের বাড়ি থেকে মুন্সির বাড়ির দূরত্ব সামান্য, আট-দশখানা বাড়ি তফাৎ মাত্র। কয়েক মিনেটের মধ্যে সে সেখানে পৌঁছে গেল। বেগম ছেলেমেয়েদের খাইয়ে নিজে খেতে বসেছে সবে। সব শুনে তার মাথা ঘুরে ওঠে, কোনরকমে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সামাল দিল।
– আমার মনে হয় মুন্সি মালপাড়ার কোন মেয়ের প্রেমে মজেছে। বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে ওকে ওদিকেই যেতে দেখলাম। ফিসফিস করে বলল সুনন্দা।
ততক্ষণে মুন্সি গিন্নি প্রাথমিক শক কাটিয়ে উঠেছে। থালাবাটি সরিয়ে রেখে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, ওলাউঠোর এতো সাহস আমাকে তালাক দেবে?
– সেরকমই তো শুনলাম।
– আমার ও নাম পাতানি, বেয়াড়া ষাঁড়কে কীভাবে জব্দ করতে হয় সে আমার ভালো জানা আছে।
ছুটে গিয়ে গোয়ালঘর থেকে মুড়ো ঝাঁটাখানা নিয়ে এসে সুনন্দাকে উদ্দেশ্য করে বলল, বৌদি কিচ্ছু চিন্তা করো না। বাড়ি গিয়ে নিশ্চিতে শুয়ে পড়গে।
অতঃপর ঝাঁটাখানা বুক সমান উঁচুতে তুলে ধরে মুন্সির উদ্দেশ্যে অনল বর্ষণ শুরু করল। – বুড়োভাম, কামচোর আমার বাপের খেয়েপরে আমাকেই….। বাড়ি আয়, ঝেটিয়ে তোর ঘাড় থেকে বে-র ভুত না তাড়াতে পেরেছি তো আমি নেজু হোড়ের বেটি পাতানি নয়।
মুন্সি বাড়ির চৌকাঠ মাড়াল ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর স্পর্শ করে ফেলেছে। স্বাভাবিক ভাবে গিন্নির জেগে থাকার কথা নয়। স্বহস্তে ভাত বেড়ে পেট ভরাতে হবে, মাঝে মাঝেই তাকে এই কাজটি করতে হয়। যথারীতে আজও সে কলতলায় গেল। হাত-পা ধুয়ে হেঁসেলে ঢুকবে। হঠাৎ করে বেগম পিছন থেকে তার টুটি চেপে ধরল, মিনসে একদম কোঁত কোঁত করবা না। বলো এত রাত পযর্ন্ত কোথায় ছিলে?
– দ-দ-দখিনপাড়ায়!
– সেখানে মাঝরাতে কী কাজ থাকে তোমার?
– পা…পা। পার্টির কাজে গিয়েছিলাম। গিন্নির থাবা থেকে নিজেকে মুক্ত করে গলায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল মুন্সি।
– তোমার মুখে ঝাঁটা, পাটির মুখে ঝাঁটা?
– কী মুসকিল!
– বে করবা? রঙ লেগেছে মনে? ঝাঁটা দেখেছো মিনসে! ঝেটিয়ে সব রঙ সাফ করে ছাড়ব আজ।
পাতানি ঝাঁটাখানা তুলে নিয়ে তেড়ে গেল। মুন্সি দু’কদম পিছিয়ে গিয়ে সভয়ে বলল, করো কী! মারবা নাকি? প্রধান।
– কই ওই মিনসে? পাতানি এদিক ওদিক ঘুরে প্রধানকে দেখতে না পেয়ে পুনরায় বলল, ডাক তোমার প্রধানকে। কেমন মরোদ আমাকে তাড়িয়ে দেখাক। নেজু হোড়ের বেটি আমি, ভালুক নাচা নাচাব দুই ষণ্ডকে।
– আল্লার কসম তোমাকে তাড়াব বলিনি। সে অন্য বেগম।
– হায় আল্লাহ্ এ আমি কী শুনলাম। আমার জন্য তোমার বুক ফাটল না। ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর কথা ভাবলে না। ওগো বাপগো দেখে যাও তোমার বেটির কী সর্বনাশ হয়েছে। চিৎকার করতে করতে পাতানি হঠাৎ করে ধরণী তলে চিৎপটাং হল।
– পাতানি। অ পাতানি! কী হল তোমার? মুন্সি ছুটে এসে বেগমের মাথাটা কোলে তুলতে গেলে পাতানি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পাঁচ হাত তফাতে সরে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, খবরদার আমাকে ছোঁবে না। নিমকহারাম, বিশ্বাসঘাতক। বলো কোন সে আবাগী, আমি তার মাথা চিবিয়ে খাব। কলিজা বেটে বড়া দেব।
মুসলিম ঘরের মেয়ে, রাগ-অভিমান যতই হোক না কেন স্বামীর গায়ে হাত তুলতে পারে না। নিস্ফল আক্রোশে দরজার টিনের পাল্লায় ঝাঁটা ঠুকতে লাগল। মুন্সিও সমানতালে চিৎকার করতে থাকে – বাঁচাও। বাঁচাও।
দুইয়ে মিলে হৈ হৈ কাণ্ড, রৈ রৈ ব্যাপার। প্রতিবেশিরা ঘুম থেকে জেগে উঠে, একে একে মুন্সির বাড়িতে এসে জড়ো হতে লাগল।
সংবাদ পেয়ে প্রধান ছুটে এলেন। তাঁকে দেখে পাতানি তেড়ে গেল, মিনসে তুমি যত নষ্টের গোড়া। ভাঙচি দিয়ে দিয়ে ওর মাথাটা খেয়েছ। বলি তোমার কোন বোনের সাথে মুন্সির বে দিবা শুনি? বেরোও আমার বাড়ি থেকে।
রাগ করেন না প্রধান। হো হো করে একচোট হেসে নিলেন। তারপর পাতানির হাতে এক বাণ্ডিল কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার দোষ নেই ভাবী। গণ্ডমুর্খটার উচিত ছিল তোমাকে সবকিছু জানানো।
– কী আছে এতে? খানিকটা নরম হয়ে জিজ্ঞাসা করল পাতানি।
– তোমার সতীন।
– আল্লাহ্ গো! কাগজের বাণ্ডিলটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল পাতানি।
প্রধান বাণ্ডিলটা কুড়িয়ে একটা পাতা খুলে বেগমের চোখের সামনে ধরে ‘এই দেখ তোমার সতীন’ বলে নির্দিষ্ট জায়গাটি দেখালেন। শব্দযুগল পাঠ করে পাতানি চোখ বড় করে প্রধানের দিকে তাকালে তিনি হাসি হাসি মুখ করে আরও বললেন, নতুন ভোটার তালিকায় আফজল মুন্সির জায়গায় ভুলক্রমে আফজল বেগম ছাপা হয়েছে। অনাহূত সেই বেগমকে তাড়াতে মুন্সি….
– ওমা একি কাণ্ড! পাতানির চোখ জোড়া ঠিকরে বেরিয়ে এল।

https://storyandarticle.medium.com/muhammad-salim-reza-4536be1b76ea