অদ্ভুতুড়ে

পটলপুরের_পটচিত্র (শেষ পর্ব )
সুব্রত_মজুমদার

কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ শেষ হতেই বিবেকের গান গাইতে গাইতে হাজির হলেন বিশে ওঝা, আর তার পেছনেই পুঁটির মা।
কি ছিল তোর কি বা গেল ?
ও মন গন্ডগোলের গোলে পড়ে যা ছিল তার সবই গেল।
কি ভাবিলি কি করিলি, কি নিয়ে মন ভুলে ছিলি ?
তোর জটিল মনের কুটিল ফাঁদে ভালোর ভালো আটকে গেল।
লুকিয়ে ছিলি সাধুর বেশে, ছিলিস খাসা রসেবসে,
ধরল চিটে সেই সে রসে, চিটের জ্বালায় জীবন গেল।
যা ছিল রে আঁধার ঘরে আনলি কেন তারে ধরে,
সুব্রত কয় তারই তরে তোর সকলকিছু জলে গেল।
এতগুলো মড়া দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল বিশে। দেহ গুলোর উপর হাত বোলাতে বোলাতে চিৎকার করে উঠল, “জয় মা ! এতদিনে আমার আশাপূর্ণ হল। এতগুলো লাশ ! আমার সাধনা সফল হবেই।”
হঠাৎই দু’কানে টান পড়তেই উৎসাহ উত্তেজনা ভয়ে বদলে গেল। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “ভু…. উ… উ…”
আর ঠিক তখনই পুঁটির মায়ের গলা শোনা গেল, “ওরে অনামুখো ভুত নই, ভুত নই, আমি পুঁটির মা। হা রে ড্যাকরা, বলি কতটা গাঁজা খেয়েছিস ? দেখছিস না এরা ভির্মি খেয়ে পড়ে আছে। হি হি… পেছনে আবার ছুঁচ গোঁজা।”
-“তাইতো রে !” দেহ গুলোকে নেড়েচেড়ে দেখে বিশু,”এ কি কান্ড বল্ তো ? শাস্ত্রীজী, জগাই, ডাক্তার সবাই তো রয়েছে।”
বিশের কথার উত্তর দিল জগাই। ঘুমের ইঞ্জেকশনে কিচ্ছু হয়নি ওর। কেবল সবাই মড়ার মতো পড়ে আছে বলে ও নিজেও পড়েছিল।
জগাইয়ের কাছে সব বৃত্তান্ত শুনে বিশের চোখ কপালে ওঠে। ও বিড়বিড় করে বলে, “এরা তো পিশেচেরও বাপ, কি করলাম এতবছর সাধন করে। ঘরের দরজাতেই এত পিশেচ।”
পুঁটির মা খিলখিল করে হেসে ওঠে, নোলক নড়িয়ে বলে, “যাই বল ঠাকুরপো, আমি তোমার ভৈরবী হব।”
-“ধুর পাগলি, এখান থেকে যা, আর মাথা খারাপ করিস না !” বলে ওঠে বিশে।
জগাই একগাল হেসে বলে, “মাথা খারাপ….. একজন সঙ্গী বাড়ল… হে হে… ”
শিবলিঙ্গটি পুঃস্থাপন করে বেরোতেই প্রফেসর আর ডঃ চন্দ্রনাথ দেখলেন বাইরে সার দিয়ে পড়ে আছে যত লোক। আন্দাজে বুঝলেন সব। মনে মনে হাসলেন প্রফেসর।
ভগবান যা করে মঙ্গলের জন্যই করে। মানুষের লোভ যে এত তা না দেখলে বোঝা যেত না। প্রাচীন যুগের মানুষের সযতনে রেখে দেওয়া পারমাণবিক আকরিককে হাতাতে সবাই জড়ো হয়েছে। কি লোভ মানুষের।
-“তোমার খেলা শেষ প্রফেসর” মাথার পেছনে একটা ধাতব স্পর্শ হল। প্রফেসর পেছন ফিরলেন। দেখলেন পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে সমর দত্ত।
-“আপনি ?” অবাক হয়ে বললেন প্রফেসর।
সমর দত্ত ভিলেন এর মতো হেসে বললেন, “হ্যাঁ আমি। আমি। মনোহর ঠাকুর আমারই লোক। এতদিন যে অমূল্য বস্তুর খোঁজ করছিলাম তা আমি পেয়েছি। আর তোমার দরকার নেই প্রফেসর, এখন তুমি আর ওই বিজ্ঞানী দুজনেই আমার পক্ষে ক্ষতিকর। তোমাদের বাঁচিয়ে রাখা চলবে না।”
একটা গুলির আওয়াজ হল। চোখ বুজলেন প্রফেসর। কিন্তু কোনও অনুভূতি হল না। মৃত্যুর সময় কি এরকমই হয় ? ভয়ে ভয়ে চোখ খুলতেই দেখলেন মাটিতে পড়ে আছেন সমর দত্ত, রক্তাক্ত হাতখানা নিয়ে কাতরাচ্ছেন। চারদিকে পুলিশে ছয়লাপ।
ইন্সপেক্টর এগিয়ে এলেন। প্রফেসরের কাছে এসে বললেন, “জোর বাঁচা বেঁচে গেছেন। একটু দেরি হলেই ফিনিশ হয়ে যেতেন। জগাইয়ের মুখে সবই শুনেছি, যে রহস্য চাপা পড়ে আছে কালের গর্ভে তা চাপা পড়েই থাক।”
অজ্ঞান লোকগুলোকে অ্যাম্বুলেন্স এসে নিয়ে গেল। ইন্সপেক্টরের কাছে নিয়মমতো কিছু এজাহার দিয়ে বাড়ি গেলেন প্রফেসর। সঙ্গে ডঃ চন্দ্রনাথ, জগাই, বিশে আর পুঁটির মা।
রাস্তায় একখানা পুরোনো ডায়েরি প্রফেসরের হাতে দিয়ে পুঁটির মা বলল,”গাছ হতে পড়েছে, এসব জিনিস নেকাপড়া লোকের কাছে থাকাই ভালো।”
পেঁচির বাসা হতে পড়ে যাওয়া ডায়েরিটার পাতা ওল্টাতে লাগলেন প্রফেসর। বহুযুগ আগে এই ডায়েরির মালিক এসে জুটেছিল এই গ্রামে। আশ্রয় নিয়েছিল পুরোনো শিবমন্দিরে। তারপর প্রমেথিয়ামের তেজস্ক্রিয়তায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে তার । অমূল্য সম্পদ। থাক সযতনে।
উপসংহার
পটলপুর আবার ফিরে এসেছে তার স্বাভাবিক ছন্দে। প্রফেসর আবার মন দিয়েছেন তার লাবড়ো তৈরির কাজে। সফলও হয়েছেন।
প্রথম যে লাবড়োটা হয়েছে তার ওজন কুইন্টালখানেকের উপর। প্রফেসরের ইচ্ছা গ্রামের সবাইকে তার লাবড়োর লাবড়া (কুমড়োর এক ধরনের পদ ) তৈরি করে খাওয়ান। চরণদাস তো খুবই উৎসাহিত। বারবার গিয়ে দেখে আসছে লাবড়োটাকে।
মনোহর ঠাকুর এখন জেলে। জেলে বসেই গ্রামের কথা ভেবে চোখের জল ফেলেন। কি কুক্ষণেই না ওই ছায়ামূর্তিদের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। আর সবকিছুর পেছনে যে সমর দত্ত, তা জানলে এ পথে পা বাড়াতেন না।
-“খাবার..” একজন নিরাপত্তারক্ষীরা এসে খাবারের থালা দিয়ে গেল। রুটি সব্জি আর ডাল। মনোহর ঠাকুর উদাস নয়নে চেয়ে রইলেন থালার দিকে।
সমর দত্ত আছেন তার ছায়ামূর্তিদের সঙ্গে। ছায়ামূর্তিরা দিব্যি হাতপা টিপে দেয়, জেলের ভেতরেই দাদাগিরি করে, – জেলের সবাই অতিষ্ঠ। জেলের পাঁচজনের খাবার একাই খেয়ে, মাতব্বরি করে দিব্যি আছেন সমর দত্ত । আফসোস একটাই জেলে আসার আগে বকেয়া ঋণগুলো উদ্ধার করা গেল না।
জগাই পাগলা একটা পশুআশ্রম খুলেছে। বিশে ওঝা আর পুঁটির মা সেখানে চব্বিশঘন্টা সেবা দেয়। কুকুরের দল, কাকেরা এবং আশেপাশের সকল পশুপাখী এখানে চব্বিশঘন্টা সেবা পায়। আরামে আছে ওরা।
ভয় শুধু একটাই, মাঝে মাঝে পুঁটির মায়ের মাথায় ভুত চাপলে কেলেঙ্কারি কান্ড হয়। এসময়টা সবাই সাবধানে থাকে। যে কোনও সময় যা কিছু হতে পারে।
পুঁটিরাম আর চুরি করে না, সে এখন ডঃ চন্দ্রকান্তের ঘরে কাজ করে। নির্ঝঞ্ঝাট বিজ্ঞানীর সেই এখন ভরসা। পুঁটিরামের বৌও খুব খুশী, মোটা বেতনের চাকরি করছে স্বামী, তাও আবার হাবাগোবা মিছরিটার ঘরে। ভেবেই হাসি লাগে।
অবিনাশ ডাক্তারের ঘরে জমে উঠেছে মজলিশ, কপাল শাস্ত্রী হতে রণজিৎ ধর, কে নেই সেখানে। এদের পাল্লায় পড়ে রোগীদের অবস্থা কাহিল।
যদু মাষ্টার এসেছিলেন আমাশার ওষুধ নিতে, কপাল শাস্ত্রী তো নিদান দিয়ে দিয়েছেন মাষ্টারকে। রণজিৎ ধরের মতে যদু মাষ্টারের এই লক্ষণ ভালো নয়, – সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস হতে পারে।
অবিনাশ ডাক্তার দেখে বললেন, “প্যারামেডিক্যাল অটোপসি।”
অবিনাশ ডাক্তারের চেম্বার হতে ফিরেই শয্যা নিলেন যদু মাষ্টার। এতগুলো রোগের সাথে কিভাবে মোকাবিলা করবেন সেই চিন্তায় ঘুম আর এল না।
পটলপুর রয়েছে পটলপুরেই। সেই আনন্দ, সেই মজা আর হুল্লোড়। আপনি যদি হঠাৎ গিয়ে পৌঁছে যান তো দেখবেন একদল কুকুরকে নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত জগাই পাগলা, অবিনাশ ডাক্তারের আড্ডাতে হৈহৈ রৈরৈ কান্ড, আর নিজের বাগানে বসে সর্ষে আর ইলিশের নতুন সংকর প্রজাতি সর্ষে-ইলিশ তৈরিতে ব্যস্ত প্রফেসর। বাগানের গাছেই ধরবে এই সর্ষে-ইলিশ, বলা যায় না আপনার পাতেও পৌঁছে যাবে কখন। ততক্ষণের জন্য বিদায়।



– – শুভমস্তু – –