Md.Akabbor Ali PK

 



#ধর্ষিতা-“ফুলন দেবী” যেভাবে হয়ে উঠেন “দস্যু রানী ফুলন দেবী” ।

[[যিনি আবার পরে ভারতীয় লোকসভার সদস্যা হন]]


লেখক : #প্রভাষক_একাব্বর।

• আত্মহত্যা মহাপাপ। তাই ধর্ষিত হলেই আত্মহত্যা নয়।- বিকল্প চিন্তা করুন।
• ধর্ষিত হলেই আত্মহত্যা করতে হবে- এটি কোন সমাধান নয়।- বেঁচে থেকেই লড়াই করুন।
• দস‍্যুরাণী ফুলন দেবী হতে হবে -এটিও আইনসিদ্ধ নয়। আইনের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করুন।
• ধর্ষিত নারীদের পক্ষে সমাজে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।- সবাই ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করুন।
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
◆মূল কথা :

ভারতের নিচু বর্ণ মাল্লা বা মাঝি পরিবারে১৯৬৩ সালের ১০ আগস্ট জন্ম নেয় এক নারী যার নাম ফুলন দেবী। কথিত ভদ্র সমাজের চোখে বা সমাজের উচ্চবর্ণের কাছে ‘ম্লেচ্ছ’ আখ্যা পাওয়া ফুলন দেবী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ভদ্র সমাজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন।তিনি একাধিকবার পুরুষের লালসার শিকার হন।এমনকি পুলিশের কাছ থেকেও রেহাই পাননি । উত্তরপ্রদেশের দেহমাই গাও নামক জায়গার কয়েকজন ঠাকুর সম্প্রদায়ের জমিদার ফুলন দেবীকে ২৩ দিন যাবৎ ধর্ষণ করে।
পরবর্তীতে ঘটনাক্রমে ফুলন দেবী হয়ে উঠেন দস্যুরানী ফুলন দেবী ।এরপর ১৯৮১ সালে ফুলন দেবী ডাকাত হয়ে ওঠার পর সেই গ্রামের ২২ জন ঠাকুরকে তিনি ও তার সহযোগীরা হত্যা করেছিলেন।এ হত্যাকাণ্ডে ফুলন দেবীকে অভিযুক্ত করা হয়।
ফুলন দেবীর বেশিরভাগ অপরাধ ছিল ন্যায় প্রদানের জন্য । বিশেষ করে নিম্নশ্রেণির নির্যাতিত মহিলাদের জন্য ২০ বছরের কম বয়সী নিম্নশ্রেণির এক কিশোরী ফুলন দেবী সমগ্র ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন ।পরবর্তীতে তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং ভারতীয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেন।
দস্যু রানী ফুলন দেবী ভারতীয় রাজনীতিতে ১১ তম ও ১৩ তম (১৯৯৯-২০০১) পর্যন্ত মির্জাপুর সংসদীয় এলাকার লোকসভার সংসদ সদস্যা নির্বাচিত হন। শেষে শ্রেণি বর্ণের রোষানলেই গুলিতে নিহত হন তিনি।

◆ফুলন দেবীর ছোটবেলা :

ভারতের উত্তরপ্রদেশের জালৌন জেলার ঘোড়া কা পুরয়া নামক স্থানে নিম্নবর্ণের মাল্লা বা মাঝির সম্প্রদায়ে ফুলন দেবীর জন্ম। মাল্লা বা মাঝিরা নৌকা চালায়। ফুলন দেবীর বাবার ছিল এক একর জমি জুড়ে নিমের বাগান।ফুলন দেবীরা ছিল দুই বোন ও এক ভাই।তাদের বাবার ইচ্ছে ছিল এই মূল্যবান গাছ বিক্রি করে যৌতুক হিসেবে সেই টাকা দিয়ে দুই কন্যাকে পাত্রস্থ করবেন। ফুলনের বয়স যখন ১১ বছর তখন তার ঠাকুরদার মৃত্যু হয়।তার জ্যাঠা বা বাবার বড় ভাইয়ের কুদৃষ্টি ছিল ফুলনের পৈতৃক সম্পত্তির উপর। তার জ্যাঠা উক্ত জমির একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন। তার ছিল মায়াদিন নামক এক ছেলে।মায়াদিন বাগানের গাছগুলো বিক্রি করা শুরু করে,যার ঘোর বিরোধী ছিল ফুলন দেবী। ছোট্ট ফুলন দেবী ও তার বাবার বিরোধিতায় মায়াদিন সুবিধা করতে পারেনি।

◆ফুলন দেবীর বিয়ে :

মায়াদিন কূটচাল চালিয়ে পুট্টি লাল নামক ৩০ বছর বয়সী অসৎ চরিত্রের এক ব্যক্তির সঙ্গে মাত্র ১১ বছর বয়সী ফুলনের বিয়ের সম্বন্ধ এনে বিয়ে দিয়ে দেন।
বিয়ের পর ফুলনের সঙ্গে তার স্বামী বলপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও শারীরিক অত্যাচার শুরু করে। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ফুলন দেবী তার বাবার বাড়ি চলে আসেন। সমাজের লোকভয়ের কারণে পরিবারের সদস্যরা তাকে পুনরায় স্বামীর কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ফুলন দেবী স্বামীর কার্যকলাপের প্রতিবাদ জানিয়ে পুনরায় বাবার কাছে ফিরে আসেন।ভারতীয় গ্রাম্য সমাজে যা ছিল অসৎ নারীর চরিত্রের প্রতিফলন। কিন্তু ফুলন দেবী তবুও তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এরপর ফুলন দেবী পিতার সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করার অভিযোগ এনে ন্যায়ালয়ে নায়াদিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।কিন্তু ফুলন দেবী পরাজিত হন ; তিনি ন‍্যায় বিচার পাননি।

◆রক্ষকই যখন ভক্ষক :
১৯৭৯ সালে তার জ্যাঠাতো ভাই মায়াদিন চুরির অভিযোগ এনে ফুলনকে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করান । ফুলন তিন দিন কারাবাসে থাকেন। কারাবাসে থাকা অবস্থায় আইনরক্ষকের হাতে ধর্ষণের শিকার হন । কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পরিবার ও গ্রামবাসী ফুলনকে মেনে নেয়নি।বর্জন করেছে সবাই।

◆ফুলন দেবীর- “দস্যুরানী” হয়ে ওঠার কাহিনী :

কথিত আছে যে,ডাকাতের দল ফুলন দেবীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।আবার ভিন্নমতে,ফুলন দেবী স্বেচ্ছায় অত‍্যাচারিত হয়ে ডাকাতদলে যোগদান করেন।গুজ্জার সম্প্রদায়ের বাবু গুজ্জার ডাকাত দলের দলনেতা ছিলেন। বাবু গুজ্জার ছিল নিষ্ঠুর ও কামুক স্বভাবের চরিত্রহীন মানুষ।দলনেতা হিসেবে ফুলন দেবীর দেহের উপর তার কুদৃষ্টি পরে।
কিন্তু দ্বিতীয় দলনেতা বিক্রমের জন্য ফুলন দেবী, বাবু গুজ্জারের কামনার শিকার হতে রক্ষা পায়। একদিন রাতে বাবু গুজ্জার ফুলনকে ধর্ষণ করার চেষ্টা চালায়। প্রতিবাদে বিক্রম মাল্লা ,বাবু গুজ্জারকে হত্যা করে ও নিজেকে দলনেতা হিসেবে দাবি করে । বিক্রম দলের নেতা হওয়ার পর ডাকাতি করে লুণ্ঠিত সম্পদ দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার নিয়ম চালু করেন । বিক্রম মাল্লার ব্যক্তিত্ব দেখে ফুলন দেবী বিক্রম মাল্লার প্রতি দুর্বল হয়ে প্রেমে পড়েন। অবশেষে বিক্রম মাল্লা ফুলনকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দেন।

◆ফুলন দেবীর নির্যাতনের প্রথম প্রতিশোধ :

ফুলনের প্রথম স্বামী পুট্টি লালের গ্রাম ফুলন দেবী তার স্বামী ডাকাত সর্দার বিক্রম ও ডাকাতদলকে সঙ্গে নিয়ে লুন্ঠন করে। ফুলন,পুট্টি লালকে ধরে এনে জনসমক্ষে শাস্তি দেয় এবং খচ্চরের পিঠে উল্টো করে বসিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে এসে বন্দুক দিয়ে প্রহার করে।
প্রায় মৃত অবস্থায় পুট্টিলালকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যাওয়ার সময় ফুলন দেবী -“কম বয়সের বালিকা মেয়ে বিয়ে করা পুরুষদের জন্য এমনটাই অবস্থা হবে” – সতর্কবার্তা লেখা একটি পত্র রেখে আসেন।

◆ফুলন দেবীর বন্দুক চালানো প্রশিক্ষণ ও ডাকাতি :

বিক্রম মাল্লার কাছ থেকে ফুলন দেবী প্রথম বন্দুক চালানোর প্রশিক্ষণ নেন।পরে উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে বসবাসকারী উচ্চবর্ণের লোকদের গ্রামে লুন্ঠন,ভূস্বামীদের অপহরণ,রেল ডাকাতি ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেন। প্রত্যেকবার অপরাধ করার পর ফুলন দুর্গাদেবীর মন্দির দর্শন করতেন এবং প্রাণ রক্ষার জন্য দেবীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতেন । চম্বল উপত্যকায় এই ডাকাত দলের আত্মগোপনের গোপন আস্তানা ছিল।

◆ডাকাত দলের বিভক্তি ও ফুলন দেবী অপহরণ :

শ্রী রাম নামক এক ঠাকুর সম্প্রদায়ের ডাকাত ছিলো বিক্রভ মাল্লার অপরাধ জগতের গুরু। শ্রী রাম ও তার ভাই লালারাম কারারুদ্ধ থাকার সময় বিক্রম তাদের ৮০ হাজার টাকা খরচ করে জামিনে মুক্ত করে আনেন। শ্রী রাম মুক্তি পাওয়ার পর বিক্রম তাকে দলের নেতৃত্ব নেওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু এই প্রস্তাবনায় মাল্লা সম্প্রদায়ের অন্য সদস্যরা সম্মত ছিল না, কারণ তাদের ধারণা ছিল শ্রী রাম পুলিশের গুপ্তচর। যে কারণে দলের মধ্যে বিভক্তি আসে। ঠাকুর সম্প্রদায়ের সদস্যরা শ্রী রাম এবং মাল্লা সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিক্রমের প্রতি অনুগামী ছিল। ঠাকুর শ্রী রাম‌ও ছিল নিষ্ঠুর প্রকৃতির ব্যক্তি। শ্রী রাম বিক্রমকে হত্যা করার সুযোগের সন্ধানে ছিল।এক বিবাহ অনুষ্ঠানে বিক্রম যাওয়ার সময় অপরিচিত অজ্ঞাত এক ব্যক্তির গুলিতে বিক্রম আহত হয়। তার কিছুদিন পর বিক্রম সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু এবার শ্রী রাম নিজেই বিক্রমকে হত্যা করে এবং ফুলনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

◆ফুলন দেবীকে প্রকাশ্যে প্রায় বিবস্ত্র করে গণধর্ষণ :

নিষ্ঠুর শ্রী রাম ফুলন দেবীকে প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় গ্রামে নিয়ে আসে এবং ঘোষনা করে যে,ফুলন দেবী বিক্রমকে হত্যা করেছে।ফুলনকে শাস্তি দেওয়ার জন্য গ্রামবাসীদের উত্যক্ত করে ।শাস্তিস্বরূপ প্রথম শ্রীরাম ফুলনকে ধর্ষণ করে। তারপর নিষ্ঠুর এক যৌন নির্যাতন অধ্যায়ের শুরু।
এক এক করে বহু ঠাকুর তার উপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতন করে। শ্রী রাম তাকে অনেকবার “মাল্লা বেশ্যা” নামে গালাগালি করে।তিন সপ্তাহের অধিক সময় ফুলনের উপর অমানুষিক যৌন ও শারীরিক অত্যাচার করা হয় । প্রায় ২৩ দিন পর অচেতন ফুলন নিজেকে ঠাকুর সম্প্রদায়ের গ্রাম বেহমাই- এ আবিষ্কার করেন।

অবশেষে এক ব্রাক্ষণ ব্যক্তির সাহায্যে ফুলন দেবী গরুর গাড়ি করে সেখান থেকে পালিয়ে যান। তবে এই ঘটনার পরই ফুলন দেবী ভয়ঙ্কর দস্যুরানী হিসেবে নিজেকে মনে মনে প্রস্তুত করে তোলেন।কারণ ফুলন দেবীর আত্মজীবনী লেখিকা মালা সেনকে তিনি বলেছিলেন, “ওরা আমার সঙ্গে অনেক অন্যায়-অত্যাচার করেছে।” অথচ ফুলন সরাসরি ধর্ষিত হওয়ার কথা অকপটে বলতে দ্বিধা করেছেন।

◆শুরু হয় অন্য জীবন-দস‍্যুরাণী “ফুলন দেবী”।

নির্যাতিত ফুলনের দুঃখের কাহিনী শুনে বাবা মুস্তাকিন নামক এক মুসলমান ডাকাত নেতা তাকে নতুন একটি ডাকাত দল গঠন করতে সাহায্য করেন । মানসিং নামের একজন ছিল তাঁর দলের দ্বিতীয় নেতা। মানসিং ও তার সহযোগীদের পেয়ে ফুলন দেবী দুূধর্ষ হয়ে উঠেন।সঙ্গে সঙ্গে ফুলন দেবী প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শ্রী রাম ও লালারাম দুই ভাইয়ের সন্ধান আরম্ভ করে।
অবশেষে বেহমাই গ্রামেই তাদের সন্ধান পান।
ফুলন দেবীকে নির্যাতিত করার ১৭ মাস পর ১৯৮১ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে ফুলন শ্রী রাম ভাতৃদ্বয়কে হত্যা করার জন্য সেই গ্রামে প্রবেশ করেন।সেই সময়ে গ্রামবাসীরা বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত ছিল ‌। ফুলন ও তার দলের সদস্যরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দুই ভাইয়ের সন্ধান পাননি। তখন ফুলন দেবী গ্রামবাসীদেরকে আদেশ করেন যে, শ্রীরাম ভাতৃদ্বয় এখনই যেন তার নিকট আত্মসমর্পণ করে। ফুলনের ধারণা, গ্রামবাসীরা ভাতৃদ্বয়কে গোপনে লুকিয়ে রেখেছে।কিন্তু গ্রামবাসীরা তা অস্বীকার করেন। এতে ফুলন দেবী ও ডাকাত দল ক্রোধে ফেটে পড়েন। ফলস্বরূপ তারা গ্রামের ২২ জন ঠাকুরকে সারিবদ্ধ করে গুলি করে হত্যা করে। অবশ্য এর বেশিরভাগই ফুলন দেবীকে ধর্ষণের সাথে জড়িত ছিল কিনা সেটা পরিষ্কার নয়।পরে ফুলন দেবী দাবি করেন,তিনি নিজ হাতে কাউকে গুলি করেননি।এটিই হচ্ছে সেই কুখ্যাত বেহমাই হত্যাকাণ্ড বা গণহত্যা,যে ঘটনায় সেসময় সমগ্র ভারত জুড়ে আলোচনার ঝড় উঠে।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বেশকিছু নিরহ ঠাকুর নিহত হওয়ার জন্য সেই সময়ের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ভিপি সিং পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
অপরপক্ষে ফুলন দেবী জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন দস্যুরানী হিসেবে। যদিও ফুলন দেবী ছিলেন ডাকাত কিন্তু তার মন ছিল মায়া-মমতায় ভরা।
সেই সময়ে উত্তর প্রদেশের শহরগুলিতে দুর্গাদেবীর বেশে ফুলন দেবীর মূর্তি বিক্রয় ছিল চোখে পড়ার মতো।

◆ফুলন দেবীর আত্মসমর্পণ ও বন্দিজীবন :

বেহমাই হত্যাকাণ্ড সমগ্র ভারতবর্ষকে কম্পিত করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়।পুলিশের তথ্য মতে ,ফুলন দেবীর বিরুদ্ধে ৪৮টি অপরাধকর্মের অভিযোগ পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৩০টি ডাকাতি ও অপহরণের অভিযোগ ছিল। এছাড়া প্রায় ২০০০ পুলিশকে বিভিন্ন সময় নাস্তানাবুদ করেছিলেন।
ফুলন দেবীর মস্তকের জন্য পুরষ্কার ঘোষণা করেও পুলিশ সুবিধা করতে পারেনি।পুলিশ ফুলন দেবীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।ফুলনকে গ্রেফতার করতে না পেরে তার উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে,তার পিতা- মাতাকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশের গুলিতে ফুলন দেবীর দলের বহুসংখ্যক সদস্যের মৃত্যুও হয় ।অতঃপর ফুলন দেবী আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে আত্মসমর্পণ করার পূর্বে তিনি ভারত সরকারের নিকট কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেন।

◆সরকারের প্রতি ফুলন দেবীর কয়েকটি শর্ত।

যা ছিল নিম্নরূপঃ
১.ফুলন দেবী ও তার অন্যান্য সঙ্গীরা কেবল মধ্য প্রদেশে আত্মসমর্পণ করবে। বিচারের জন্য তাদের উত্তর প্রদেশে নেওয়া যাবে না।
২ কাউকে ফাঁসি দিতে পারবে না। এমনকি ৮ বছরের অধিক কারাবাস দেওয়া যাবে না।
৩.তার সম্পর্কিত জ্যাঠাতো ভাই মায়াদিন এর অবৈধভাবে দখল করা জমি ফুলন দেবীর বাবাকে ফেরত দিতে হবে।
৪. ফুলন দেবীর পিতা-মাতাকে মধ্যপ্রদেশে অবস্থানের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
৫. সরকার ফুলন দেবীর ভাইকে চাকরি দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

◆ভারত সরকারের সম্মতি :

ফুলন দেবীর শর্তগুলো ভারত সরকার মেনে নেয়। বেহমাই হত্যাকান্ডের প্রায় দুই বছর পর ১৯৮৩ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ৮ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে ফুলন দেবী আত্মসমর্পণ করেন।
ফুলন দেবীর পরিধানে ছিল একটি খাকি পোশাক । শরীরে ছিল একটি লাল চাদর। মাথায় ছিল একটি লাল কাপড়,যা বেহমাই গ্রামে চালানো যৌন অত্যাচার ও নির্যাতনের পর প্রতিশোধের প্রতীক রূপে তিনি মাথায় বেঁধে ছিলেন। কাঁধে ছিল একটি বন্দুক। হাতজোড় করে তিনি জনসাধারণকে নমস্কার জানান।
দেবী দুর্গা ও মহাত্মা গান্ধীর ছবিতে তিনি বন্দুকটি রেখে আত্মসমর্পণ করেন।
কিন্তু সরকার ফুলনের সঙ্গে করা শর্ত মেনে নিলেও একটি শর্ত ভঙ্গ করেছিল। বিনা বিচারে তাকে ১১ বছর কারাভোগ করতে হয়েছিল।
অবশেষে ১৯৯৪ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
মুক্তি পেয়ে-জন্ম হয় এক নতুন ফুলন দেবীর জীবন।

◆এক দস্যুরানী ফুলন দেবীর- রাজনৈতিক জীবন :

ফুলন দেবীর রাজনৈতিক জীবনের গুরু ছিলেন সমাজবাদী পার্টির(এসপি)নেতা মুলায়ম সিং যাদব। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুর সংসদীয় আসনে নিম্নবর্ণের মাল্লা ও জুলাহা সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ভোটার সংখ্যার বিপরীতে ঠাকুর সম্প্রদায়ের ভোটার সংখ্যা ছিল খুবই কম। স্বাভাবিকভাবে এ আসনটি দখল করার জন্য ১৯৯৬ সালে সমাজবাদী পার্টি ফুলন দেবীকে মির্জাপুর আসনের জন্য মনোনয়ন প্রদান করে।
ভারতীয় জনতা পার্টি ও বেহমাই হত্যাকাণ্ডে নিহত হওয়া ঠাকুর-পত্নীরা ঘোর বিরোধী হ‌ওয়া সত্ত্বেও ফুলন দেবী নির্বাচনে বিজয়ী হন।
১৯৯৮ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হলেও ১৯৯৯ সালে মির্জাপুর লোকসভা নির্বাচনে পুনরায় তিনি আসনটি দখল করতে সক্ষম হন।
মধ্যপ্রদেশের জঙ্গল ছেড়ে অশোকা রোডের চকচকে বাড়িতে গড়ে তোলেন তাঁর নতুন ঠিকানা।চলাফেরা করতেন পুলিশি নিরাপত্তা নিয়ে।

◆ফুলন দেবীর জীবনের শেষ অধ্যায় :

২০০১ সালের ২৫ জুলাই তারিখে নয়া দিল্লিতে ফুলন দেবী সংসদ হতে বের হয়ে আসার সময় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয় । তার দেহরক্ষী ও তার সঙ্গে আহত হন। হত্যাকারী শ্বের সিং রাণা, ধীরাজ রাণা ও রাজবীর, ফুলন দেবীকে গুলি করে অটো রিক্সায় উঠে পালিয়ে যায়।
পরে শ্বের সিং রাণা দেরাদুনে আত্মসমর্পণ করেন ।হত্যাকারীরা স্বীকার করে যে, বেহমাই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য‌ই তারা ফুলন দেবীকে হত্যা করেছে ।২০০৪ সালে শ্বের সিং তিহার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান কিন্তু ২০০৬ সালে পুনরায় কলকাতার পুলিশ কর্তৃক আটক হন ।
সেই সময়ে “ক্ষত্রিয় স্বাভিমান আন্দোলন কমিটি” নামক সংগঠন ক্ষত্রিয়দের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা ও বেহমাই হত্যাকাণ্ডের বিধবাদের অশ্রুর মর্যাদা দেওয়ার জন্য শ্বের সিং কে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
কি অদ্ভুত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এ বীরত্বগাথা।
হায়রে ক্ষত্রিয়দের মর্যাদা !

◆আসামি ফুলন দেবী’র মামলার রায় :

ফুলন দেবী গণধর্ষণের শিকার হ‌ওয়ার পর-যারা তাকে রেপ করেছিল,যারা ছিল স্বাক্ষী ১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে – তাদের গুলি করে মেরেছিলেন ফুলন দেবী ও তার সঙ্গীরা। দীর্ঘ ৩৯ বছর বাদে বিগত ০৬ জানুয়ারি ২০২০ ইং রায় হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গিয়ে সম্ভাব্য রায়ের তারিখ নির্ধারণ হয়েছিল ১৮ জানুয়ারি ২০২০ ইং।এ মামলার মূল অভিযুক্ত আসামি ফুলনদেবীসহ মোট আসামী ২৮ জন। যার মধ্যে ১৭ জন‌ই ছিল ইতিমধ্যে মৃত।ফুলন দেবী বেঁচে না থাকায় এই মামলার রায় নিয়ে মানুষের মধ্যে তেমন আগ্রহ নেই।

◆ফুলন দেবীর জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র,নাটক ও বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা :
১৯৯৪ সালে মালা সেনের “ইন্ডিয়াস ব্যান্ডিট কুইন : দ‍্য ট্রু ষ্টোরি অফ ফুলন দেবী” জীবনীমূলক নামক গ্রন্থের চিত্রনাট্যের আলোকে পরিচালক শেখর কাপুর ও চ্যানেল – 4 এর প্রযোজনায় ফুলন দেবীর জীবনের উপর—“ব্যান্ডিট কুইন” নামক চলচ্চিত্র মুক্তি পায।
মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সীমা বিশ্বাস।কিন্তু ফুলন দেবী চলচ্চিত্রটিতে তাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে,অভিযোগ এনে তিনি চলচ্চিত্রটি ভারতে নিষিদ্ধ করার দাবি করেন।
খ্যাতিমান লেখিকা অরুন্ধতী রায়,
“দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান রেপ ট্রিক”- নামক এক লেখায় প্রশ্ন করেন যে,কি অধিকারে এক জীবিত নারীর ধর্ষণের দৃশ্য তার কোনো অনুমতি ছাড়া পুনঃমঞ্চায়ন করা হয় ?
তিনি পরিচালক শেখর কাপুরকে ফুলন দেবী ও এর অর্থ কে ভুলভাবে উপস্থাপনের জন্য দায়ী করেন।

কিন্তু আশ্চর্যের কথা,প্রযোজক ফুলন দেবীকে ৪০ হাজার পাউন্ড প্রদান করায় তিনি তাঁর অভিযোগ তুলে নেন। তবে ছায়াছবিটি ফুলন দেবীকে আন্তঃরাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচিত করে তুলেছিল।
এর আগে 1985 সালে অশোক রায়ের পরিচালনায় বাংলা চলচ্চিত্র ফুলন দেবী প্রকাশ পায়।এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সুরেশ ওবেরয় ,রীতা ভাদুড়ি, জয় মুখার্জী প্রমুখ।
ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার অপ্সরা ফুলনদেবীর আত্মসমর্পণ- এর পর দস্যু রানী ফুলনদেবী মঞ্চনাটক মঞ্চস্থ করে,যা কোন অভিনেতা অভিনেত্রী ছাড়াই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ফুলন দেবী অতি সামান্য লেখাপড়া জানতেন কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি লেখক মেরি থেরেশ কানি ও পল রামবালির সহযোগিতায়–
“আই ফুলন দেবী দা অটোবায়োগ্রাফি অফ ইন্ডিয়া ব্যান্ডিট কুইন” নামক শীর্ষক আত্মজীবনী প্রণয়ন করেন।এই গ্রন্থটি ইংল্যান্ডের লিটল ব্রাউন এন্ড কোম্পানি ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রকাশ করে।
এ ছাড়া তার আরেকটা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম “দা ব্যান্ডিট কুইন অফ ইন্ডিয়া ;এন ওমেন্স এমাজিং জার্নি ফ্রম প্রেজেন্ট টু ইন্টারন‍্যাশনাল লিজেন্ড।”

তথ‍্যসূত্র :
উইকিপিডিয়া, বেঙ্গলি নিউজ18, এবিনিউজ 24.