পানির নিচে জাদুঘর ! নাম ‘‘কানকুন মেরিন পার্ক’’। - প্রভাষক_একাব্বর_রসায়নবিজ্ঞান

 

story and article


পানির নিচে জাদুঘর। কি অবাক হচ্ছেন! ঘটনা কিন্তু সত্য।চিন্তা করে দেখলে এটি কল্পনার বাইরে হলেও,

এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ভাস্কর জেসন ডিকেয়ার্স টেইলর।

মেক্সিকোর ক্যারিবিয়ান সমুদ্র সৈকতের কাছে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার গভীরে ইসলা মুজেরেস, পুন্টা কানকুন ও পুন্টা নাইজাকের পশ্চিম উপকূলে মিলবে বিস্ময়কর এ যাদুঘরের সন্ধান। এই জাদুঘরের নাম ‘কানকুন মেরিন পার্ক’।

২০০৯ সালে ‘কানকুন ইসলা মুজারেস ন্যাশনাল মেরিন পার্কে’ মানুষের সমাগমে হুমকিতে পড়ে মেক্সিকোর পশ্চিম উপকূলের জলজ প্রাণী ও প্রবালের অস্তিত্ব।এতে সামুদ্রিক জীবন, মাছের বিচরণ ও বংশবৃদ্ধি করে স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরাত কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীর স্থাপনের উদ্যোগ নেন ব্রিটিশ ভাস্কর জেসন ডিকেয়ার্স টেইলর।

ভাস্কর জেসন ডিকেয়ার্স তাঁর ইচ্ছার কথা জানান, মেক্সিকোর দ্য মিউজিও সাব একুয়াটিকো ডি আর্ত নামক একটি সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে। ৩৭ বছর বয়সী জেসন দীর্ঘদিন ভাস্কর তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকায় স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটি রাজি হয় এই পরিকল্পনায়। তাদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই দু’পক্ষের সহযোগিতায় শুরু হয় প্রকল্পটি। যার নাম দেয়া হয় ‘লাইফ কাস্টস’।

বিশ্বের অভিনব ও উচ্চাভিলাষী এ কৃত্রিম ডুবন্ত শিল্পকর্ম তৈরিতে এগিয়ে আসে ‘ন্যাশনাল মেরিন পার্ক’ ও ‘কানকুন নটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’।

এই পার্কে রয়েছে ৪০০টি ভাস্কর্য যার সবই মানুষের প্রতিমূর্তি। এসব মূর্তির কোনোটির ওজন ১২০ টনেরও বেশি। তৈরি হয়েছে প্রবালবান্ধব বিশেষ সিমেন্ট দিয়ে। নানা ভঙ্গিমায় তৈরি করা মূর্তির অবয়ব। হাতে হাত ধরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দল নারী।

আবার কেউ চেয়ারে বসে টেবিলে রাখা টাইপ মেশিনে মনোযোগ দিয়ে টাইপ করে চলেছেন। কেউ একজন সাইকেল চালাচ্ছেন। আবার কোনো একজন বৃদ্ধ হয়তো মন খারাপ করে বসে আছেন। একটি শিশু হয়তো মাথা তুলে তাকিয়ে আছে উপরের দিকে। কোনো কোনো মূর্তি আবার নগ্ন। সঙ্গে সন্তানসম্ভবা নারীর মূর্তিও রয়েছে। এক নারী শুয়ে আছেন কাত হয়ে। এ যেন মানুষের সঙ্গে বসবাসের জন্য মাছেদের এক অপূর্ব সুযোগ।

কানকুন নটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রবার্টো ডিয়াজ বলেন,জেসনের শিল্পকর্ম প্রথম দেখি ইন্টারনেটে। সত্যিই সেগুলো মুগ্ধ করেছিল। নান্দনিক দিক থেকে চিন্তা করলে এটা আসলেই অসাধারণ। কেননা, সমুদ্রের পানির উপরে কখন কতটা আলো পড়ছে তার ওপর নির্ভর করে পানির নিচের ভাস্কর্যের রং বদলে যাচ্ছে। আর এর ধরণও গতানুগতিক ভাস্কর্যের চেয়ে আলাদা।

জেসন এই ভাস্কর্যগুলোর নাম দেন ‘দ্য সাইলেন্ট এভোলিউশন’।লানযারোতের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন কর্মকান্ডের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে ভাস্কর্যগুলো।

এই ভাস্কর্যগুলো তৈরির জন্য জেসন ব্যবহার করেছেন বিশেষ এক ধরনের সিমেন্ট। এই সিমেন্ট সাধারণ সিমেন্টের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ শক্তিশালী ও প্রবাল বান্ধব। এ সিমেন্ট দিয়েই ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে কেননা এগুলোতে খুব সহজেই প্রবাল দানা বাঁধতে পারে।

প্রথম অবস্থায় প্রায় ২০০ ভাস্কর্য স্থাপনের কথা ভেবেছিলেন জেসন। কিছুদিন পর তিনি তার এই ধারণা বাতিল করে দেন। তিনি ভাস্কর্যের সংখ্যা আরো বেশি করার চিন্তা করেন। শেষ পর্যন্ত ৪’শ টি ভাস্কর্য দিয়ে সাজনো হয় কানকুন মেরিন পার্ক এর এই জাদুঘর। সমুদ্রের নিচে বিভিন্ন আঙ্গিকে বসানো হয়েছে ভাস্কর্যগুলো।

বিশেষ এক ধরনের শক্ত ফাইবার গ্লাসের সাহায্যে মূর্তিগুলো পানির নিচে দাঁড় করানো হয়েছে। ভাস্কর্য তৈরিতে এমন কোনো পদার্থ ব্যবহৃত হয়নি যা সমুদ্রের পানি বা জীববৈচিত্রের জন্য ক্ষতিকর।

এগুলো বসানোর জন্য প্রথমে বিশেষ ক্ষমতাধর ড্রিল মেশিন দিয়ে সমুদ্রতল ফুটো করে নেয়া হয়েছিল। তারপর একসঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে ভাস্কর্যগুলোকে। আর এই কাজগুলো করার জন্য নৌকার উপর ক্রেন বসিয়ে নানা যন্ত্রপাতির সাহায্যে বেশ ঝুঁকি সামলেই এই কাজ করতে হয়েছে তাদের।

এই ভাস্কর্যগুলো অন্তত ৩০০ বছর অনায়াসে পানির নিচে টিকে থাকতে পারবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

জেসন এ প্রকল্প নিয়ে বলেন, আমরা চেয়েছি এ প্রকল্পটিকে অন্যরকম, খুব উঁচু দরের রোমাঞ্চকর করতে। আর মূল কাজটি করতে গিয়ে চেষ্টা করেছি মানুষ আর পানির নিচের পরিবেশের মিথস্ক্রিয়া ঘটানোর। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে তা কোনভাবেই বৃথা যায়নি। নিষ্প্রাণ উপকূল যেন আবার সেই পূর্বের মত প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

ভাষ্কর্যগুলোর প্রবালের পাশে সবসময়ই রঙ বেরঙের মাছ দলবেঁধে ঘুরে বেড়াতে থাকে। মাছের বংশবৃদ্ধিও হয়েছে আগের থেকে দ্বিগুণ।

যেকোন দর্শনার্থী বা ডুবুরি মনের সুখে সাঁতার কাটতে কাটতে বেরিয়ে আসতে পারেন পানির নিচের এই বিস্ময়জকর জগতে। তবে সাঁতার না জানলে আপনি হয়তো এটি উপভোগ করার সৌভাগ্য নাও অর্জন করতে পারেন।

তবে মেক্সিকোর প্রাকৃতিক পরিবেশ বা আবহাওয়া ভাস্কর্যগুলোর জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এখানে প্রায়ই হ্যারিকেন ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগ হয়ে থাকে, যা লণ্ডভণ্ড করে দেয় চারদিক।
খুব বড় কোন তাণ্ডব হলে এই জাদুঘরও লন্ডভন্ড হয়ে যাবার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ভাস্কর্যগুলো প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারবে। আর যদি এই ভাস্কর্যগুলো টিকে থাকতে পারে তাহলেই টিকে থাকবে উপকূলের এই প্রাকৃতিক পরিবেশ।

মায়াবি এ জগতের মূর্তিগুলো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা
না থাকলেও প্রতিনিয়ত ঘটছে পরিবর্তন। কখনো নাড়াচ্ছে ঢেউ,কখনো লতা-গুল্ম গজানো মূর্তি ঠুকরে ক্ষয়ে দিচ্ছে মাছ। এতে প্রতিদিন নতুন রূপ পাচ্ছে যাদুঘর। আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে উপকূলীয় পরিবেশ।

ক্যারিবীয় সাগরের নীল জলরাশির তলদেশে নানা ভঙিমায় থাকা ভাস্কর্যগুলোতে অবাধ বিচরণ মাছের। বিস্ময় নিয়ে ঘুরে ফিরে দেখে মূর্তিগুলোকে।

বিরল এমন দৃশ্য উপভোগে প্রতিবছর সেখানে ভিড় জমায় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ পর্যটক।

তথ্যসূত্র :
ডেইলি বাংলাদেশ , দৈনিক যুগান্তর।
rtvonline.com,thedhakatimes.com,dw.com
banglanews.com,jagonews24

#storyandarticle