একমাত্র অবলম্বন — অজান্তা দেব

 

অজান্তা দেব




“শান্তিনিকেতন বৃদ্ধাশ্রম” এর গেইট দিয়ে ভিতরে ঢুকলো একটি গাড়ি। গাড়ি থামতেই আশ্রমে থাকা বৃদ্ধরা এগিয়ে আসলো। গাড়ি থেকে নেমে আসলো ডা.চাঁদনী দে। চাঁদনীকে দেখে সবাই খুব খুশি। তাদের ভালোবাসার ডাক্তার দিদিমনি এসেছে।

“কেমন আছো তোমরা?” হাসিমুখে প্রশ্ন করল চাঁদনি।
“আমরা ভালো আছি দিদিমনি। তুমি কেমন আছ?” সবাই একসাথে বলল।
“আমিও ভালো আছি।” সহাস্যে বলল চাঁদনী।
“তুমি এতদিন পরে কেনো এলে গো?” একজন বৃদ্ধা প্রশ্ন করল‌।
“আর বলো না দিদুন। একটুও সময় পায় নি আসার। ডিউটি করেই সময় চলে যায়।-চাঁদনী
“তুমি না এলে যে আমাদের ভালো লাগে না। তুমি এলে তো কত গল্প করো” মাথায় হাত বুলিয়ে পাশ থেকে বলল আরেক জন বৃদ্ধা।
“আচ্ছা আজ এত্ত এত্ত গল্প করব তোমাদের সাথে’ হাত দেখিয়ে বলল চাঁদনী।
তারপর শুরু হয়ে গেল সবার গল্প। এর মাঝে সবাই একটু আধটু চেকআপ ও করিয়ে নিল। তারপর সবার সাথে ডিনার করে, মিনু মাসিকে (বৃদ্ধাশ্রমের কর্মরত একজন এমপ্লয়ী) সবার খেয়াল রাখতে বলে বাড়ি যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পরল চাঁদনি।
গাড়িতে বসে অতীতে ডুব দিল চাঁদনী,
তখন সবে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে সে। একদিন স্কুল শেষে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল তখনি দেখতে পায় একজন বৃদ্ধা গাছের নিচে বসে কাঁদছে। এগিয়ে গেল বৃদ্ধার দিকে, বৃদ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “ওওও দিদুন তুমি এখানে বসে কাঁদছ কেন?”
“আমার ছেলেটা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে দিদিভাই। বাড়িতে আমার নাতিটার সাথে খেলে সময় কাটাতাম, সেও তোমার মতো স্কুলে পড়ে, তাই এখানে বসে আছি যদি একটি বার তার দেখা পায়” কাঁদতে কাঁদতে বলল বৃদ্ধা।
এর মধ্যে চাঁদনীর বাবা চলে এসেছে ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
“তুমি এখানে কি করছো মামনি” চাঁদনীর কাছে এসে বলল ওর বাবা বিকাশ বাবু।
“দেখো না পাপা দিদুনটা এখানে বসে কাঁদছে, দিদুনকে নাকি বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে” বিকাশ বাবুর হাত ধরে বলল চাঁদনী।
বিকাশ বাবু কিছু টাকা গুজে দিলেন বৃদ্ধার হাতে, তারপর চাঁদনীকে কোলে নিয়ে চলে আসতে থাকে গাড়ির দিকে।
বাবাকে চলে আসতে দেখে চাঁদনী প্রশ্ন করল,
“ঐ দিদুনটা এখন কোথায় থাকবে পাপা?”
“এখানেই বসে থাকবে হয়তো, বাড়ি তো নেই” হাঁটতে হাঁটতেই বলল বিকাশ বাবু।
“ঘুমাবে কোথায়? এখানে তো খাট নেই” আবারও প্রশ্ন করল চাঁদনী।
“কোনো গাছ তলায় ঘুমাবে হয়তো। এখানে খাট কোথায় পাবে মামনি” চাঁদনীর প্রশ্নের উত্তরে বলল বিকাশ বাবু।
“তাহলে তো দিদুনটার কষ্ট হবে পাপা। যদি বৃষ্টি আসে তাহলে তো ভিজে যাবে, ভিজলে তো জ্বর উঠবে’ একটু ভেবে বলল চাঁদনী।
“হ্যাঁ মামনি” ছোট্ট করে উত্তর দিল বিকাশবাবু।
“চল না পাপা দিদুনটাকে আমাদের সাথে বাড়ি নিয়ে যায়, আমাদের বাড়িতে তো অনেক গুলো ঘর একটা ঘর দিদুনকে দিয়ে দেবো, আমি দিদুনের সাথে খেলবো” বিকাশবাবুর গালে হাত রেখে আবদারের সুরে বলল চাঁদনী।
মেয়ের আবদার রাখতে সেদিন বৃদ্ধাকে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন বিকাশবাবু। সেই বৃদ্ধার সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল চাঁদনীর।
তারপর থেকে রাস্তায় যখনি কোনো বৃদ্ধাকে দেখতো তখনি বায়না করতো বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার।
অন্য একদিনের কথা,
চাঁদনী পড়ছে, সেই সময় বিকাশবাবু প্রশ্ন করলেন, “তুমি বড় হয়ে কি করবে মামুনি?”
“একটা বড় বাড়ি বানাবো পাপা” চাঁদনী উত্তর দিল।
“বড় বাড়ি বানিয়ে কি করবে মামনি?” কিছুটা অবাক হয়েই বলল বিকাশবাবু।
“ঐ যে রাস্তায় দাদু দিদুনরা থাকে তাদের জন্য বাড়ি বানাবো, তারপর সব্বাইকে নিয়ে আসবো ঐ বাড়িতে” চাঁদনী উত্তর দিল।
মেয়ের কথায় খুশি হয় বিকাশবাবু। এইটুকু মেয়ে এতটা ভেবেছে এতে উনি অনেক খুশি হন। বৃদ্ধাশ্রম বানাবে সেটা বলতে পারছে না বলছে বাড়ি বানাবে। মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বললেন,
“বাড়ি বানাতে যে অনেক টাকা লাগবে, এত টাকা কোথায় পাবে তুমি?”
“তোমার মত অফিসে কাজ করে টাকা নিয়ে আসব” চাঁদনির সরল উক্তি।
“তার থেকেও বেশি ভালো হবে যদি তুমি ডাক্তার হও” বিকাশ বাবু বললেন।
“ডাক্তার হলে কি আমি বেশি টাকা পাবো?” ভাবুক হয়ে বলল চাঁদনি।
“শুধু যে টাকা পাবে তা না‌। সেই সাথে তুমি ঐ দাদু আর দিদুনগুলোর চিকিৎসাও করতে পারবে” বিকাশবাবু বললেন।
“তাহলে আমি ডাক্তারই হবো পাপা” চাঁদনি বলল।
আজ সে ডাক্তার, সবার ডাক্তার দিদিমনি। সেই ছোট্ট বেলার বৃদ্ধাশ্রম করার ইচ্ছা পূরণ করেছে সে। আজ “শান্তিনিকেতন বৃদ্ধাশ্রম” এর প্রতিটা বৃদ্ধের অবলম্বন সে। তদের “একমাত্র অবলম্বন“!!
চাঁদনী ভাবে,
যে বাবা-মায়ের জন্য আজ “এই আমরা” সেই আমাদের কাছেই আজ অবহেলিত সেই বাবা-মা। আমাদের আরামে ঘুমানোর জন্য যারা বিছানায় না রেখে তাদের বুকে রাখতো, তাদের জন্য আজ আমাদের ঘরে জায়গা নেই, তাদের জায়গা হয় রাস্তায়। যারা না খেয়ে আমাদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে তাদের খাওয়ানোর মতো টাকা নেই আমাদের অথচ কত টাকা খরচ হচ্ছে নিষিদ্ধ পানীয়তে।
আমরা আধুনিক হয়েছি শুধুমাত্র চলাফেরায়, শিক্ষিত হয়েছি শুধুমাত্র কাগজে কলমে। মনুষ্যত্বের ক্ষেত্রে শিক্ষিত হতে পারি নি, তেমনি পারি নি বিবেকের ক্ষেত্রে।।
…সমাপ্ত…
#bangla_sahitya