কবিতার বাঁক ও নতুন কবিতার অন্বেষা - তৈমুর খান

 

story and article



সাহিত্যের ক্ষেত্রে কবিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। শুধু বক্তব্য প্রকাশ করা, কিংবা মাত্রা গণনা করে ছন্দে ভাব ব্যক্ত করাই প্রকৃত কবিতা নয়। কবিতার বাঁক ও রহস্য, না বলা বা শূন্যতা, ইঙ্গিত অথবা রূপকাশ্রয় দরকার হয়। তাই কবিতায় সব কথা পরিপূর্ণভাবে ব্যক্ত করা অন্তত আজকের দিনে আর গ্রহণযোগ্য নয়।

যাঁরা কবিতায় সব কথা বলতে চান, কিংবা কবিতাকে নীতি-নৈতিকতার আদর্শ হিসেবে মনে করেন, কিংবা কবিতাকে কোনো উদ্দেশ্যের পথে চালিত করতে চান এবং বক্তব্যপ্রধান বা বিবৃতিমূলক আখ্যান অথবা নিবন্ধাকারে প্রকাশ করতে চান, সেক্ষেত্রে কবিতার মূল ধর্ম বিচ্যুত হয়।

কবিতা অল্পকথায় বহুকথা ব্যক্ত করতে পারে। কবিতা পাঠককে ভাবায়। কবিতা এক রহস্যময় জগতের ঠিকানা অন্বেষণ করে। পাঠককেও সেখানে পৌঁছে দিতে পারে। অনেক সময় কবিতার ব্যাখ্যা করা যায় না। কবি কী বলেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

অথচ এক উপলব্ধিময় জগৎ আবিষ্ট করে রাখে। হৃদয়ের মাঝে এক পুলক-স্পন্দন উপলব্ধ হয়। কী সেই স্পন্দন, কী সেই উপলব্ধ তা বোঝানো যায় না। অথচ মনে হয়, এরকম কবিতা আগে তো লেখা হয়নি!
চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যরা যে পদ রচনা করেছেন গুরুবাদী সাধনপদ্ধতি শিক্ষা দেওয়ার পদ।

সেখানেও রহস্য ছিল। নিঃশ্বাস বায়ুকে শরীরে ধারণ করে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তাদের ক্রিয়াকৌশল শিক্ষা দিতেন। কী করে মহাসুখ লাভ করা যায় বা মহাসুখ চক্রে পৌঁছানো যায় তারই পদ্ধতি শেখাতেন। একমাত্র দীক্ষিত শিষ্যরাই তা বুঝতে পারতেন। কিন্তু সেই রূপকাশ্রিত কবিতাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম কবিতা হিসেবে গণ্য হয়।

সাধনপদ্ধতির কথা লিখতে গিয়ে উপমা বা রূপকে সমাজ তথা মানবজীবনের কথা চলে আসে। বৈষ্ণব যুগেও রচিত হয় বৈষ্ণব পদাবলী। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার সাধনপর্বে প্রবেশ করে মানবজীবনের প্রেম ও বিরহ যাপনের নানা মুহূর্ত। আখ্যান এর মধ্য দিয়ে তা রচিত হলেও আধ্যাত্মিক বোধের মর্মটি তাতে নিহিত থাকে। মঙ্গলকাব্যের যুগেও দেব-দেবীর মাহাত্ম্যের অন্তরালে মানুষের ক্রন্দনই মুখ্য হয়ে ওঠে।

নিরন্ন জীবনের কথা লেখেন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। ফুল্লরার বারোমাস্যায় অন্ত্যজ মানুষের হাহাকার ফুটে ওঠে। কবিতা বিষয়ের মধ্যে থেকেও অনন্তমানবের যুগচেতনার ব্যাপ্তি নিয়ে উপস্থিত হয়। ক্রমশ বাঁক পরিবর্তনের পর্যায় অতিক্রম করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিহারীলাল চক্রবর্তী এবং রবীন্দ্রনাথে এসে হাজির হয়। পৌরাণিক মিথ মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। বাস্তবচেতনায় ফিরে আসতে শুরু করে ‘কল্লোল’-‘কালিকলম’ এর হাত ধরে। উঠে আসেন জীবনানন্দ দাশ। কবিতার দর্শন পাল্টে যায়।

যে বর্ণনাত্মক পথে আমরা হেঁটে এসেছি তার পরিবর্তন ঘটে। কবিতা প্রবেশ করে বিস্ময় বিমূঢ় এক যুগে। সময় চেতনার সঙ্গে অস্তিত্ব চেতনার সংযোজন ঘটে। নিজেকে খুঁজতে থাকি নিজের ভিতরেই। আত্ম-অন্বেষণের এই অনির্বৃত্ত আত্মকেন্দ্রিক পর্যায় থেকেই কবিরা রহস্য উন্মোচন করতে চান। কিন্তু আদিম অন্ধকারাচ্ছন্ন অপ্রকাশ্য অদৃশ্য এই জটিল আত্মরসায়নের প্রকাশ সম্ভব নয়।

যেখানে বিজ্ঞান ও যুক্তি, আবেগ ও মানবিকতা শেষ কথা নয়। আরও কথা আছে বলে মনে করলেন কবিরা। ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে তার ব্যাখ্যা কিছুটা উঠে এলো। কিন্তু সম্পূর্ণটা পাওয়া গেল না। বহুমুখী আচরণ এবং বহুমুখী শূন্যতা নিয়ে মানবজীবনের অনিয়ন্ত্রিত এক রূপ ধরা পড়ল কবিতায়। সামাজিকতা এবং নৈতিকতার কারণে যা বলা যায় না, কিন্তু তাকে অস্বীকারও করা যায় না। এই বোধের দ্বারা চালিত হয়ে কবিরা নিজেকে চিনতে চাইলেন। নিজের মধ্য দিয়েই অন্যদের বুঝতে চাইলেন।

স্বাভাবিকভাবেই কবিতা আবেগ থেকে সরে এলো। অথবা কবিরা আবেগেরও বিশ্লেষণ চাইলেন। তাঁরা প্রশ্ন করলেন, কোথায় আবেগের উৎস? কেনইবা আবেগের এইরূপ? তাঁরা উত্তরও পেলেন।

সেই উত্তর দিলেন কবিতায়। আর সেই উত্তর হল মেধাবী উত্তর। চিরাচরিত ধারায় সনাতন কবিতা পাঠকের কাছে তখন তা দুর্বোধ্য মনে হল। তাঁরা অভিযোগ করলেন কবিদের বিরুদ্ধে।

আর এখনো সেই অভিযোগ চলে আসছে। এখনও যদি আমরা জীবনানন্দ দাশের ‘নগ্ন নির্জন হাত’ এর সামনে দাঁড়াই তাহলে কি বুঝতে পারব এই হাত কী?
“আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে:
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।
যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি,
সেই নারীর মতো
ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠেছে।

মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা
সেই নগরীর এক ধূসর প্রাসাদের রূপ জাগে হৃদয়ে।”
প্রত্ন বিশ্বাসের এক প্রত্নবোধে কবির মননসঞ্চার ঘটেছে বলেই বহু জনমের বহু পথ অতিক্রম করেছেন তিনি। নগ্ন নির্জন হাত এর কাছে দাঁড়িয়েছেন আর তার বিস্ময়কে উপলব্ধি করেছেন। ইতিহাস সমাজ রাষ্ট্র রাজপ্রাসাদ নীল সন্ধ্যাতারা রৌদ্র পাখি গান মৌমাছি সভ্যতার সব আয়োজনেই কবির বোধের বিস্তার ঘটেছে।

এই ‘নগ্ন নির্জন হাত’ এক প্রেমেরই প্রতীক, যার ইশারায় জন্মান্তরের পর্বগুলি অন্তরীক্ষে প্রদৃশ্যমান। যার ক্রিয়াগুলি স্বয়ংক্রিয় অভিব্যক্তির আশ্চর্য কৌশলে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিখ্যাত আমেরিকান লেখক এডগার অ্যালান পো বলেছেন:
“Those who dream by day are cognizant of many things which escape those who dream only by night. In their gray visions they obtain glimpses of eternity, and thrill, in waking, to find that they have been upon the verge of the great secret. In snatches, they learn something of the wisdom which is of good, and more of the mere knowledge which is of evil.”
(Edgar Allan Poe, Complete Tales and Poems)
অর্থাৎ যারা দিনের বেলায় স্বপ্ন দেখে তারা অনেক কিছু সম্পর্কে অবগত থাকে যা কেবল রাতে স্বপ্ন দেখায়। তাদের ধূসর দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা অনন্তকালের ঝলক পায়, এবং রোমাঞ্চ করে, জেগে ওঠে, যাতে তারা জানতে পারে যে তারা মহান রহস্যের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।ছিনতাইয়ের সময়, তারা এমন কিছু জ্ঞান অর্জন করে যা ভাল এবং কিছু জ্ঞান যা মন্দ।

এই ভালো-মন্দের অভিজ্ঞতা যা হবে হোক শুধুমাত্র অনন্তকালের ঝলকটিই আসল পাওয়া। দিনরাতের স্বপ্নের ভেতর দিয়ে কবির যাত্রা হলেও তাঁর আত্মঅনুজ্ঞাই প্রখর হয়ে ওঠে, আর তাই ফিরে আসে অবচেতনের ভেতর। তখনই কবি স্বয়ংক্রিয়।

এই সময়ের কবি সৈয়দ হাসমত জালাল ‘একটি ছায়া’ নামক কবিতায় শ্রাবণ দিনের ঘোরের ভেতর যখন ‘মৃদু ভালবাসার মতো ছোট্ট একটি সাঁকো’ দেখতে পান, তখন বিশ্বময় অনন্ত শ্রাবণের সঙ্গে প্রেমিক হৃদয়ের সংযোগ ঘটে যায়। ক্ষণিক সময় অনন্তযাপনের মুহূর্ত হয়ে ওঠে। কবিতার শেষ অংশে লেখেন:
পাহাড় থেকে নামছে বেলা, রক্তআলোর নীচে ঘন
শান্ত শ্রাবণ মাস
বৃষ্টিবিধুর দূরের চরাচর;বিরহ, তুমি এই অসীমে থাকো
ছোট্ট একটি সাঁকোর মতো একটি আশ্বাস”
বিরহের ব্যাপ্তি এবং মানবিক আশ্বাস এই ছোট্ট একটি সাঁকোর প্রতীকে উঠে আসে। ‘সাঁকো’ ছোট্ট শব্দ হলেও সম্পর্কের গভীর ব্যঞ্জনা দান করে, যার আবেদন কালসীমাহীন প্রজ্ঞার কাছেই নিহিত। মনে পড়ে যায় জেসুইট পুরোহিত এবং মার্কিনী লেখক জন জোসেফ পাওয়েল এই মানবিক আশ্বাসকেই তুলে ধরেছিলেন তাঁর একটি লেখায়:
“It is an absolute human certainty that no one can know his own beauty or perceive a sense of his own worth until it has been reflected back to him in the mirror of another loving, caring human being.”
(John Joseph Powell, The Secret of Staying in Love)
অর্থাৎ এটি একটি সম্পূর্ণ মানবিক নিশ্চিততা যে কেউ তার নিজের সৌন্দর্য জানতে পারে না বা তার নিজের মূল্যবোধ উপলব্ধি করতে পারে না, যতক্ষণ না এটি অন্য প্রেমময়, যত্নশীল মানুষের আয়নায় প্রতিফলিত হয়। এই প্রেমময় উপলব্ধিকেই কবিতার মর্মে সঞ্চারিত করেছেন। বহু কথা না বলেও বহু কথা বলেছেন।
এই সময়ের আর এক কবি বিদিশা সরকার ‘তুষারপাতের পর’ নামক একটি কবিতায় ‘তুমি হাসলে স্বপ্নের মত’ উপলব্ধিকে মূল বিভাবের ক্রিয়ায় রেখে পরিস্থিতির প্রতিকূলতাকেও জয় করতে চেয়েছেন। কবিতার শেষ অংশে বলেছেন:
“টাইম লাইনে বসে তোমার কথাই শুধু
বজ্রগর্ভ মেঘ
শীতের জিনিয়া
তুষারপাতের পর রোদের অপেক্ষা নিয়ে
অবিকল রঙ
মেজেন্ডা হলুদে”
সময়ের মেরুদণ্ড হাতড়ানো একজীবন সীমানার উপমায় আমাদের আত্মক্ষরণের ঘোর জেগে উঠে। অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যেও স্বাভাবিক আচরণে এক স্বয়ংক্রিয়তা দেখা দেয়।

কবিতাটি আগাগোড়া সেই বোধেই চালিত। ভিক্টর এমিল ফ্র্যাঙ্কল নামে একজন অস্ট্রিয়ান নিউরোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, দার্শনিক, লেখক এবং হলোকাস্ট লোগোথেরাপির প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য: “An abnormal reaction to an abnormal situation is normal behavior.”
(Victor Frankl, Man’s Search for Meaning) অর্থাৎ একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির একটি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হল স্বাভাবিক আচরণ। কবির প্রজ্ঞায় সেই প্রতিক্রিয়ারই একটা প্রতিফলন ঘটেছে। যা ভেতর থেকে অনুধাবন করলে অথবা কবিকে পাঠ করলে সহজেই বোধগম্য হবে।
এই সময়ের আর এক কবি নিয়াজুল হক ‘জল ও নৌকা’ নামের ছোট্ট একটি কবিতায় সমূহ যুগচেতনার ভেতর প্রবেশ করেছেন। সহজ সরল দুটি শব্দ আর একটি সংযোজক অব্যয় দিয়েই তাঁর ক্রিয়ার অভিমুখ:
“জল আর নৌকা
নৌকা আর জল
এভাবেই চলে এসেছে
চাপান-উতোর”
‘জল’ যদি সময় প্রবাহের ধারা হয় তাহলে ‘নৌকা’ চেতনা। চেতনাকে আশ্রয় করেই যুগের যাত্রাপথ। অর্থাৎ জীবন চারণার প্রবাহ। প্রতীকায়নের এমন রূপকোচ্ছল ব্যবহারে মার্জিত এক সমন্বয় এনেছেন কবি যা খুব তীক্ষ্ণ এবং অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
“একবার জল খেয়ে ফেলছে নৌকা
এবার নৌকা খেয়ে ফেলছে জল”
আর শেষ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে “জলই রক্ত”। মেটাফোর প্রয়োগ করে কবিতাটিকে যে উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা অনেক গভীর সংকেতবহ। অদ্ভুত একটা বিক্রিয়া হৃদয়কে আন্দোলিত করে।
আমেরিকান তরুণ উপন্যাসিক
আইজ্যাক মেরিয়ন(জন্ম: ৩০ ডিসেম্বর, ১৯৮১)৩৯ বছর বয়সী
যিনি “জম্বি রোম্যান্স” উপন্যাস “উষ্ণদেহ” এবং এর সিরিজের খ্যাতিমান লেখক। নিজের সম্পর্কে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন:
“I want to change my punctuation. I long for exclamation marks, but I’m drowning in ellipses.”
Isaac Marion, Warm Bodies (Warm Bodies, #1) অর্থাৎ আমি আমার বিরামচিহ্ন পরিবর্তন করতে চাই। আমি বিস্ময়কর চিহ্নের জন্য আকুল, কিন্তু আমি উপবৃত্তে ডুবে যাচ্ছি।
এই বোধের সঙ্গে কবি নিয়াজুল হক এর বোধও মিলে যায়। তিনি সেই বিরামচিহ্ন মুছে দিয়ে ‘নৌকা’ ও ‘জলে’র সংকেতে জীবন প্রবাহের গতিকে এক দর্শনে সঞ্চারিত করেছেন। এরকম উচ্চপর্যায়ের কবিতাও লিখছেন আজকের কবিরা।

সেলিম মণ্ডল বয়সে তরুণ হলেও কবিতায় এক সাংকেতিক ভাষা এবং উপলব্ধির সূক্ষ্ম আলো ফেলতে পারেন।
তাই তাঁর কবিতা আপাত নিরীহ হলেও তীব্রতর শোষণ ক্ষমতায় ভাস্বর। মাত্র কয়েকটি কবিতায় উপলব্ধি করলাম তাঁর আসক্তি ও বোধের ঘনত্বকে।
আমাদের মধ্যে যে চেতনার জন্ম হয় তাতে পূর্ণতা কখনোই আসে না। তাই আমরা বৈপরীত্যের দ্রাঘিমায় দাঁড়াই:
একদিন বিচ্ছিন্নতার ভেতরে
একদিন বিচ্ছিন্নতার বাইরে
এই দ্বান্দ্বিক সত্তা নিয়েই জীবন রসের পরিক্রমা করি।

তেমনি আমাদের আত্মিক মৃত্যুও বোঝাতে পারি না। ‘আমি’ এবং ‘তুমি’ সর্বনাম দুটিতে সমস্ত মানবসভ্যতাকেই ধারণ করে আছে। আর এই দুটি সর্বনাম এর মধ্যেই অবিশ্বাসের দোলাচল জীবন-নৌকা দোলাতে থাকে। কখনো কচুরিপানার দিকে ফিরে যায়, কখনো হাহাকারের মধ্যে বাড়ি তৈরি করে। অথচ সবই ভ্রম। কবির কাছে স্মৃতির প্রতারণা। ‘গাছ’ ও ‘পাখি’ ‘আমি’ ও ‘তুমি’তে রূপান্তরিত হয়।

পারস্পরিক জীবন পাল্টালেও পারস্পরিক দূরত্ব কখনো দূর হয় না। সেই জীবনেও দোলাচল জেগে ওঠে। শিল্পের যেমন সিদ্ধি নেই, জীবনের সিদ্ধি নেই। হাতকাটা ছেলের জং ধরা বঁড়শিতে মাছ নয়, মাছের কানকোর মতো প্রেমিকার লাল ফিতে উঠে আসে। তখন হাতকাটা ছেলেটি তা পায়ে করেই গলায় জড়িয়ে নেয়। কবির বর্ণনা:
“তার জংধরা ছিপে
উঠে আসে মাছের কানকোর মতো
প্রেমিকার লাল ফিতে”
জীবনকে এভাবেই সে সান্তনা দেয়। কিটস তাঁর প্রেমিকা ফেনী ব্রণের কাছ থেকে শুভরাত্রি লেখা একখণ্ড কাগজ চেয়েছিলেন মৃত্যুশয্যায় বালিশের তলায় রাখার জন্য। হাতকাটা ছেলেটি কাগজ নয়, পেয়েছে লাল ফিতে। এই ‘হাতকাটা’ পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিকের প্রতীক handless lover. এক করুণ অসহায়তা এবং বিচ্ছিন্নতাকে সাংকেতিক ভাষার রূপ দিয়েছেন সেলিম।

আর সেই প্রেমই endless love হয়ে উঠেছে। মানবসভ্যতার সমূহ প্রেমিকেরই হাত নেই। তাই তারা লাল ফাঁসে আটকে থাকে। আত্মহত্যা আর যন্ত্রণার ভেতর তাদের পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। নিজের মূল্যবোধ যাচাই করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে আমেরিকার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক এলিজাবেথ বার্গের একটি কথা:
“There is love in holding and there is love in letting go.”
(Elizabeth Berg, The Year of Pleasures) অর্থাৎ ধরে রাখার মধ্যে প্রেম আছে, ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে ভালোবাসা আছে। সুতরাং ধরে রাখা এবং ছেড়ে দেওয়াও দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

এই বোধ থেকেই প্রেমময় সংবেদনশীল এক হৃদয়ের উপলব্ধি এসেছে। যার সাংকেতিক ভাষা আছে, আলোড়ন তোলার তরঙ্গ আছে এবং সর্বোপরি যার হৃদয়ে প্রেম আছে। সেলিম মণ্ডলের কবিতা তাই মেধাবী হয়েও হৃদয়সংবাদী এক স্বয়ংক্রিয় অভিযাপন।

এইসব কবিতার পাশাপাশি আর একদল কবিও কবিতা চর্চা করে চলেছেন। তাঁদের দাবি : ‘কবিতাতো কবিতাই, কবিতার আবার বাঁক পরিবর্তন কী? যে কবিতা লিখে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছেন, আমরাও সেই কবিতা লিখে বিখ্যাত হতে চাই। যদি আমাদের কবিতা কবিতা না হয়, তাহলে রবীন্দ্রনাথের কবিতাও কবিতা হয়নি।’ তাঁদের আরও বক্তব্য: ‘কবিতায় বিষয় থাকবে, কবির লক্ষ্য থাকবে, কবিতার মধ্য দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের ডাক দেবেন কবি। কখনো বিদ্রোহ জানাবেন।

কবিতা হবে প্রতিবাদের ভাষা।’ তাদের আরও বক্তব্য: ‘কবিতা হোক বা না হোক, কারও কিছু বলার নেই, সময় একদিন বিচার করবে।’ প্রাচীনপন্থী সময়-জ্ঞানহীন এইসব কবিরা যে প্রকৃত কবিতাচর্চা থেকে বহুদূরে তা বলাই বাহুল্য। শিক্ষাগত ডিগ্রী কিংবা সামাজিক পদমর্যাদা এঁদের থাকতে পারে, কিংবা প্রশাসনিক কোনো উচ্চপদেও আসীন থাকতে পারেন; কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে তাঁদের সৃষ্টি নিয়ে কিছুই বলার থাকে না।

কবিতা নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এঁরা কেউই পছন্দ করেন না । সবার কাছেই তাঁর রচিত কবিতাটি শ্রেষ্ঠ কবিতা । নিজের সন্তানের মতো । এমনকী বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী রচনা বলেও মনে করেন । কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখছি সুন্দরী রমণীর ছবির সঙ্গে কবিতা জুড়ে দিচ্ছেন । আবার নগ্ন রমণীর ছবির সঙ্গেও । সেসব কবিতায় লাইক কমেন্টের অভাব নেই ।

চটুল পাঁচালি বক্তব্য আর বিবৃতি বর্ণনায় ছন্দরসিক কবিকে দেখতে পাচ্ছি । দুনিয়ার হাল-হকিকত নিয়ে কত সুন্দর অন্ত্যমিল যুক্ত কবিতা তিনি উপহার দিচ্ছেন ।
এরকম কবিতার সুনাম না করলে কবি কি সহজে ছেড়ে দেবেন ?
একবার বলেছিলাম, এসব কবিতা আমার ভালো লাগে না।
কবি সঙ্গে সঙ্গে ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি কবিতার কী বোঝেন?’
পরে আনফ্রেন্ডও করেছিলেন ।

কবিতা নিয়ে তাই কত আর মতামত দেবো? কিছু কিছু কবির কবিতা না পড়ে থাকতে পারি না । মতামত না জানিয়েও পারি না । আসলে ওরা আমাকে দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিখিয়ে নেন । সেরকম হলে আপনিই মতামত দেবো । জোর জবরদস্তির কারণ নেই । মতামত খুব ব্যক্তিগত ব্যাপার । আমি আপনার কবিতায় মতামত দিচ্ছি, আপনি আমার কবিতায় দেবেন, আমি আপনার সুনাম করছি, আপনি আমার সুনাম করুন — এরকম give and take policy আমার নেই । আমি কারও কবিতায় যখন মতামত দিচ্ছি না, তখন ইচ্ছে করলে আপনারা আমাকে বর্জন করতে পারেন।
আজকাল প্রচুর কবিতা লিখছে সবাই। তা লিখুক। কিন্তু সবার আগে বেশি পড়া দরকার। একটি ভালো কবিতা লেখা হয়, যখন দশটি ভালো কবিতা পাঠ করা হয়।

আবেগকে মেধাবী আলোয় শাণিত করলে শব্দ প্রয়োগেও যথার্থতা আসে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। শুধু আবেগ থাকলেই বা শুধু হৃদয় থাকলেই কবিতার মতো শিল্পকে সিদ্ধির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়। তাই মেধাবী অভিক্ষেপ দরকার। উপলব্ধি বাচ্যার্থকে ছাড়িয়ে যাবে। ব্যক্তি অনন্তব্যক্তির প্রজ্ঞায় মিশে যাবে। এর জন্যও কঠোর কঠিন পথে সংযম দরকার।

যাঁরা কবিতা লেখাকে সহজ কাজ মনে করেন, তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এই কঠোর কঠিন সংযম বলতে আবেগের পরিশীলিত ব্যবহারকেই বোঝাতে চাইছি। কাজী নজরুল ইসলাম বা কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যে আবেগদীপ্ত কণ্ঠস্বরে কবিতায় আলোড়ন তুলেছিলেন, সাম্প্রতিককালে তা শান্ত আত্মমগ্ন অভিনিবেশে পর্যবসিত হয়েছে। অর্থাৎ কবিতায় আর সরব পাঠের পরিবেশ নেই। যার ফলে আজকের কবিতা আবৃত্তিযোগ্যও নয়।

নীরব পাঠের মধ্য দিয়েই কবিতার প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করা সম্ভব। কবির একান্ত ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস যা অন্তরঙ্গ কথোপকথনের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন প্রলাপ মাত্র কবিতা। তাকে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করার জন্য নয়। একান্ত নিভৃতে উপলব্ধি করার বিষয়।

সুতরাং মানবিক আবেগ থাকলেও তার পরিমিতিবোধ এবং প্রয়োগবোধ প্রত্যেক কবির জানা দরকার। ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহৎ এর আবেদন, এবং ব্যক্তির মধ্যে নৈর্ব্যক্তিক অভিক্ষেপ, এবং সাময়িকতাকে শাশ্বতীর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়াই প্রকৃত কবির কাজ।