নিত‍্যনৈমিত্তিক - সোমনাথ চ‍্যাটার্জ্জী

 
story and article

উফফ টিভির ভল‍্যুমটা আস্তে করো। দেখছো তো ফোনে কথা বলছি। শান্তুনু চেঁচিয়ে উঠে সুমনার ওপর। 2BHK ফ্ল‍্যাটে এই অসুবিধা। জায়গার বড় সমস্যা। মেয়ে সায়ন্তনীও বড় হচ্ছে। ক্লাস এইট চলছে। বড় ফ্ল‍্যাটে যাবার এই মুহূর্তে কোনো প্ল্যান নেই , স্বপ্ন হয়তো আছে।

সুমনা সন্ধেবেলা টিভিতে সিরিয়াল দেখছিল। ভল‍্যুম যথেষ্টই কম ছিল। এ্যাডগুলো হঠাৎ জোরে হয়ে যায়। সেই সময়ই বিপত্তি। শান্তুনুর বসের ফোন চলে আসে। খানিকটা বিরক্ত হয়েই সুমনা উত্তর দেয়।
– ভল‍্যুম অনেকটাই কম করে শুনছি। আর কত কম করবো? এরপর নিজেই শুনতে পাবনা।

– দেখছিলেতো বসের ফোন এসেছিল।
– আমি টিভি দেখছি, আর সারাদিন তোমার সত্তরটা ফোন আসে। দুর থেকে আমায় বুঝতে হবে নাকি কোনটা তোমার বসের, কোনটা ক্লায়েন্টের কোনটা ওই ঢলানি অ্যাসিস্টেন্টের। হ‍্যাঁ,ওইটা বুঝতে পারি। তোমার মুখের চারদিক থেকে তখন ঝিলিক মারে।
– এ্যাই বাজে বকবেনা।

– আমার ভাল হয়েছে। এক ঘরে তুমি সারাদিন ল‍্যাপটপ খুলে বসে আছো। কখনো ভিডিও কনফারেন্স চলছে, কখনো ফোনে ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথা বলছো। কিছু বলতে গেলেই আঙুলে চুপ চুপ ইশারা করছো, আর এক ঘরে মেয়ের অনলাইনে স্কুল চলছে পরে আবার টিউশন চলছে। আমি মুখ খুলতে গেলেই খালি চুপ চুপ শুনতে হচ্ছে বাপ আর মেয়ের থেকে।সবাই মুখ বন্ধ করতে চায়। মুখ খুললেই সমস্যা। কাজকম্মের পর একটু টিভিতে সিরিয়াল দেখবো সেখানেও সেন্সর করতে চাইছো। যাই কোথায় রে বাবা। লকডাউনে কি সব উৎপাত। কবে যে সব ঠিক হবে। কতদিন সবিতাদের বাড়ি যাইনি। ওদের কমপ্লেক্সেতো আবার কোভিডে ভরে গেছে।

এদিকে সন্ধে থেকে মেয়ের তলপেটে ব‍্যাথা করছে। অন‍্যরকম ব‍্যাথা। হট ওয়াটার ব‍্যাগ দিয়েছে সুমনা। সিম্পটমস দেখে মনে হচ্ছে প্রথম বার পিরিয়ড হতে চলেছে। সব মায়ের মতোই এ বিষয়ে সুমনা সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে রেখেছে মেয়েকে। যাতে ও ঘাবড়ে না যায়। কিন্তু এখন সুমনার কাছে প‍্যাড শেষ হয়ে গেছে। কদিন আগেই নিজের পিরিয়ড শেষ হয়েছে। আনা হয়নি এখনো।

– শুনছো, ডাক পড়ে শান্তনুর। বলছি একটু ওষুধের দোকানে যেতে হবে।
– এখন এই সন্ধেবেলা ? কি ওষুধ লাগবে ?
– আরে ওষুধ নয়, প‍্যাড লাগবে। একদম শেষ।
– ধ‍্যার বাবা! একটু রিল‍্যাক্স করবো ভাবছিলাম। এক্ষুনি লাগবে ? আজকের দিনটা চালিয়ে নাও, কাল এনে দেব।

– চালিয়ে নাওনা মানে, ন‍্যাকামো হচ্ছে ! এখনি গিয়ে নিয়ে এসো।
গায়ে টিসার্ট গলিয়ে খানিকটা অখুশি হয়েই তিন তলা থেকে নীচে নেমে আসে শান্তুনু। খানিকটা যাবার পরই খেয়াল হয় তাড়াহুড়োতে মাস্ক ছাড়াই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। নাকে ফুরফুরে হাওয়া লাগতেই টের পেয়েছে নাক বস্ত্রহীন, মুখ উদোম। কান টানছেনা ইলাস্টিকের দড়ি। কি ঝামেলা। আবার তিন তলায় উঠতে হবে। ধুর! তার চেয়ে ওষুধের দোকান থেকে একটা কিনে গলিয়ে নেবে। গলির শেষ প্রান্তেই বিশ্বাস মেডিকেল। দোকানে দুজন মহিলা কাস্টমার তখন। 

প‍্যাডের কথা বলবে কি করে। অস্বস্তিকর। কন্ডোম, প‍্যাড এসব কেনার কথা লোকের সামনে বলা যায় ! এই একই কারণে সেই উদীয়মান সূর্যের দেশের নামে বিশেষ জনপ্রিয় তেলটি অবধি কোনোদিনই কিনে উঠতে পারেনি। সাধের অ্যাডভেঞ্চার অপঘাতে শহীদ হয়েছে। আজ এখন বিশেষ করে মহিলার সামনে প‍্যাডের কথা বলবে কি করে? এমন কাজ দেয়না সুমনা। নিজেই তো কেনে। কাল কিনতে পারতো। অথবা অনলাইনে আনাতে পারতো। মনে ভাবলো দুজন মহিলা দোকান থেকে গেলে মুখ খুলবে। তখনই একজন ঘাড় ঘুরিয়ে শান্তুনুকে মাস্কছাড়া দেখেই মুখ কুঁচকে উঠলো।

–একি মাস্ক ছাড়া ঘুরছেন। আপনারা আর শুধরোবেন না।
শান্তুনু ঠিক জানতো এরকম কিছু একটা ঘটতে পারে। বুঝতে পারলো কড়া ধাতের নীতি পুলিশের খপ্পরে পড়েছে। মাথা ঠান্ডা রেখে ও উত্তর দেয় –
– না, মানে আমি ওটাই কিনতে এসেছি।
– আশ্চর্য, এতদিন হয়ে গেছে। একস্ট্রা মাস্ক বাড়িতে রাখেন না ? এইভাবেই তো রোগ ছড়ায়। গ্রাফ নিচের দিকে নামবে কি করে।

– হ‍্যাঁ রাখি তো। কিন্তু সব কিছুই তো একদিন ফুরিয়ে যায় দিদি।
ভদ্রমহিলা দোকানিকে বললেন, ভাই এনাকে আগে ছেড়ে দিন। উনি আগে ওটা বাঁধুন।
দুর থেকে দোকানি জিজ্ঞেস করলো দাদা কি লাগবে ?
শান্তুনু শান্ত মিহি গলায় উত্তর দেয় নিচু স্বরে
– স‍্যানিটারি প‍্যাড।
– এ্যাঁ কি ? দোকানদারের প্রশ্ন।

লোকটা কি কালা ? মুখ নাড়া দেখেইতো বোঝা উচিত ছিল। দোকান চালাচ্ছে! শান্তুনু এবার জোরে উত্তর দেয়
– প‍্যাড প‍্যাড , স‍্যানিটারি ন‍্যাপকিন..
ভদ্রমহিলা চমকে তাকালেন শান্তুনুর দিকে। যেন সে এক জেল ভাঙা আসামি। শান্তুনু বুঝতে পারলনা তার অপরাধ কোনটি গুরুতর,মাস্ক পরেনি বলে, মাস্কের নাম করে প‍্যাড নিচ্ছে বলে নাকি একজন মহিলার সামনে এমনভাবে প‍্যাড প‍্যাড করে চেঁচাচ্ছে বলে। দোকানি কালো প্লাস্টিকে মুড়ে স‍্যানিটারি প‍্যাড দিয়ে দাম নিয়ে নিলো। আর এই নিন এই কোম্পানি এই প্রোডাক্টের সঙ্গে একটা সার্জিক্যাল মাস্ক ফ্রী তে দিচ্ছে।

 শান্তুনু বুঝতে পারে ভদ্র মহিলা ওকে দেখছে। মাস্কের ভিতর উনি কি মিটিমিটি হাসছেন? বোঝা গেলনা। একবার দৃষ্টি বিনিময় করেই মাস্কটা নাকে গলিয়ে শান্তনু হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। ডোরবেল বাজাতেই সুমনা দরজা খুলে স‍্যানিটাইজারের স্প্রেতে শান্তুনুকে হাল্কা বর্ষার ছাট বুলিয়ে দিল। পায়ের চেটো অবধি বাদ গেলনা। তুমি মাস্কটা টেবিলের ওপর রেখে ভুলে চলে গেছিলে। এটা আবার কিনলে নাকি ?
– না না, তোমার ওই প‍্যাডের সঙ্গে ফ্রী তে দিল।

– প‍্যাডের প‍্যাকেটটা কই ? কিগো ।
স‍্যানিটাইজারে হাত ঘষতে ঘষতে শান্তুনু মনে করে মাস্ক বাঁধার সময় প‍্যাকেটটা দোকানের ডেস্কের এক কোনায় রেখেছিল আর চোখটা ছিল সেই ভদ্রমহিলার দিকে। ব‍্যালেন্স টাকাটা পকেটে পুরে সুপারস্টার রজনীকান্ত্ স্টাইলে ফ্রীতে পাওয়া মাস্ক পরে হাঁটা দিয়েছিল বাড়ির দিকে।

©️সোমনাথ চ‍্যাটার্জ্জী
রচনাকাল: ২৭-০৭-২০২১

#storyandarticle #banglasahitya #bangladesh