হারাধন - নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

 
নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

বিদিতা আজও এই সংসারটাতে মুখ বুজে সকল দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করে পরে আছে শুধুমাত্র কৌশিকের জন্য।কৌশিক তাকে নিজের প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসে।ভালোবেসে কৌশিককে বিয়ে করেছিলো। মা,বাবারও এই বিয়েতে কোন আপত্তি ছিলোনা।কৌশিক ভালো চাকরী করে নিজেদের বাড়ি মেয়ে নিজে পছন্দ করেছে তাই তারা বেশ ধুমধাম করেই একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন।

একবুক স্বপ্ন নিয়ে বিদিতা কৌশিকের হাত ধরে শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেই বুঝতে পারে এ সংসারে শ্বাশুড়ী মায়ের কথায় শেষ কথা।শ্বশুরমশাই খুবই নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ।কোন ঝুটঝামেলা তিনি পছন্দ করেননা।তাই পারতপক্ষে তিনি তার স্ত্রীকে এড়িয়েই চলেন শান্তি রক্ষার্থে।

বিয়ের পরপরই বিদিতার শ্বাশুড়ী বিদিতার সবকিছুতেই দোষ ধরতে শুরু করেন।প্রথম প্রথম বিদিতা কথার কোন উত্তর করতোনা শুধু চোখের জল ফেলতো।কৌশিককে বললে সে বলেছিলো,

—আমাদের সংসারে মায়ের কথায় শেষ কথা।এইসব কথা নিয়ে আমি মায়ের সাথে ঝামেলা করতে পারবোনা।তবে হ্যাঁ তোমার যদি এখানে থাকতে খুব অসুবিধা হয় আমি তোমায় নিয়ে অন্যত্র ঘরভাড়া করে থাকতে রাজি আছি।তবে সেটাও তোমার কথা ভেবে।মা বাবার একমাত্র সন্তান আমি।আমার মা যেমনই হোননা কেন সন্তান হিসাবে আমার কিছু দায়িত্ব থেকেই যায় যেমন স্বামী হিসাবে তোমায় ভালো রাখা আমার দায়িত্ব।”

না,এ কথার পরে আর কোনদিন বিদিতা কৌশিককে তার মায়ের কথা নিয়ে কিছুই বলেনি।দু’বছর পরে বিদিতার কোল আলো করে এক পুত্র সন্তান আসে।এই দু’বছরে এমন কোন দিন যায়নি বিদিতা চোখের জল ফেলেনি।এটাকেই সে তার ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে।শ্বশুরমশাই এর সাথে তার খুবই ভালো সম্পর্ক।কৌশিক বাড়িতে না থাকলে বিদিতা সংসারের কাজ সেরে তার সাথেই সময় কাটাতো।

দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস কোনদিন তার ছিলোনা।গল্পের বই ছিলো তার দুপুরের সঙ্গী।শ্বশুরবাড়িতে এসে শ্বশুরমশাই এর আলমারি ঠাসা গল্পের বই দেখে সে খুব খুশি হয়েছিলো।সম্পূর্ণ একটি আলাদা ঘর ঠিক যেন একটা ছোটখাটো লাইব্রেরী।একমাত্র রাতে শুতে যাওয়ার সময়টুকু ছাড়া তিনি এখানেই থাকতেন।বই পড়তে পড়তে কতদিন তিনি তার প্রিয় ইজিচেয়ারটাতেই ঘুমিয়ে পড়েছেন।বিদিতা তার শ্বশুরের সাথে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করতো।তারমধ্যে বড় বড় লেখক লেখিকাদের লেখা গল্পগুলির চারিত্রিক বিশ্লেষণই ছিলো প্রধান।একদম ছিলো বাবা আর মেয়ের সম্পর্ক।কতদিন এমন হয়েছে গল্প করতে করতে দু’জনের কেউই খেয়াল করেনি যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে।শ্বাশুড়ী মায়ের মুখ ঝামটা খেয়ে তবে চা করতে ছুটেছে বিদিতা।কষ্টগুলোকে বুকে ভারি পাথর চাপা দিয়ে এইভাবেই দু’বছর কেটে যায়।

পুত্রসন্তানের মা হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পর সে তার শ্বাশুড়ীর মধ্যে এক আমূল পরিবর্তন দেখতে পায়।সর্বদা তিনি তার নাতী নিয়েই ব্যস্ত থাকেন সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়ে আর মাথা ঘামাননা।একমাত্র ছেলেকে খাওয়ানো ছাড়া ছেলের কিছুই তার করতে হয়না।সে সংসারটাকে তখন আঁকড়ে ধরে।এতদিন সংসারের কাজকর্মে তার কোন স্বাধীনতা ছিলোনা-ছিলো কিছু করতে গেলে সবকিছুতেই একটা ভয়।এখন এতদিন পরে সে যেন বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারছে।রাতে শুধুমাত্র শোয়ার সময়টুকু ছাড়া তিনি তার নাতিকে কাছছাড়া করতেননা।

কৌশিককে একদিন রাতে বিদিতা বলে,

—আচ্ছা একটা জিনিস খেয়াল করেছো মা এখন আমাদের ছেলেকে ছাড়া অন্য কোনদিকেই মন দেননা।সবসময় ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন।মা আগের মত আর চেঁচামেচিও করেননা।

—হু দেখেছি।আসলে মা ভাবেন আমার ভাই আমার ছেলে হয়ে আবার মায়ের কাছে ফিরে এসেছে।

—মানে?তোমার আর একটা ভাই ছিলো নাকি?বলোনি তো আমায় কোনদিন।কি হয়েছিলো তার?

—ভাই আমার থেকে বছর তিনেকের ছোট ছিলো।হঠাৎ একদিন অজ্ঞান হয়ে যায়।হাসপাতাল নিয়ে গেলে বলে ব্লাড ক্যান্সার লাষ্ট স্টেজ।কিন্তু আমরা আগে কিছুই জানতে পারিনি।দিব্যি সুস্থ্য ও সবল ছিলো।খুব ভালো ফুটবল খেলতো। খেলতে খেলতেই মাঠের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল।ওর বন্ধুরাই আমাদের খবর দেয়।তারপর দু’মাস বেঁচে ছিলো।আর ওই ঘটনার পর মা প্রায় উন্মাদ হয়ে পড়েছিলেন।অনেক চিকিৎসা করিয়ে মাকে এই পর্যন্ত আনতে পেরেছি।মা আগে খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন।কিন্তু ভাই চলে যাওয়ার পর মা কেমন খিটখিটে হয়ে পড়েন।সবকিছুই যেন তার মনের মত হয়না।তাই আমি ও বাবা মায়ের এই আচরণ মুখ বুজে মেনে নিই কারন আমরা জানি মায়ের এই আচরণ তার মানষিক রোগের ফল।কোনকিছু তার মনমতো না হলে তিনি চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করেন এই ঘটনার পর থেকে।তাই আমি ও বাবা সবসময় চুপ থাকতাম।আমার মা খুব ভালো মানুষ।কিন্তু ওই আঘাতে মানুষটা কেমন যেন হয়ে গেছিলেন।

বিদিতা পাথর।মনেমনে তখন সে খুব কষ্ট পাচ্ছে।পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শ্বাশুড়ী মায়ের দরজার কাছে যেয়ে ‘মা’ ‘মা’ করে ডেকে তুলে ছেলেকে তার কোলে দিয়ে বলে,

—মা আজ থেকে ও তোমার ঘরেই থাকবে।শুধু খাওয়ানোর সময় হলে আমি ওকে খাইয়ে দিয়ে যাবো।আপনাকে যেয়ে আমার ঘরে ওকে নিয়ে থাকতে হবেনা।ছেলেকে আপনি সামলান আর আপনার সংসার আমি সামলাবো।বলেই ঢিপ করে এক প্রণাম করে।বিদিতার শ্বাশুড়ী চোখ ভর্তি জল নিয়ে ছেলের বৌকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন,

—তুই তো আমার ঘরের লক্ষ্মী মা,আমার হারানো মানিক আমার বুকে তুলে দিয়েছিস।খুব সুখি হ মা।খুব ভালো থাক।

স্নান করে চা নিয়ে শ্বশুরকে দিতে গিয়ে দেখে তিনি তার লাইব্রেরীতে নেই।কাপ দুটো হাতে করে তাদের শোয়ার ঘরে ঢুকে দেখে দু’জনেই ওই অবোধ শিশুটার সাথে অনর্গল বকে চলেছেন হাসি মুখে।

শেষ


#storyandarticle


https://storyandarticle.com