আউনি,বাউনি,চাউনি- যেন এক বাঙালি নস্টালজিয়া – পুলক মন্ডল

story and article

 ” মুদগ বড়া, মাস বড়া, কলা বড় মিষ্ট

ক্ষীরপুলি নারিকেল পুলি আর পিষ্ট ” – চৈতন্য চরিতামৃতে গৌরচন্দ্রের জন্য রাঁধা পঞ্চাশ ব‍্যঞ্জনে ছিল পিঠেপুলিও। শ্রীরামকৃষ্ণের খাদ্যাভ্যাসেও পিঠে ছিল স্বমহিমায়, একাধিকবার সে প্রসঙ্গ এসেছে বিশিষ্টদের লেখায়। তবে পিঠের প্রাচীনত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে কেননা ঠাকুরমার ঝুলির কাকঁনমালা, কাঞ্চনমালা গল্পে রয়েছে পিঠ-কুড়ুলি ব্রতকথা। সেখানে আছে রাজ‍্যের প্রজাদের মধ্যে পিঠে বিলানোর অনুষ্ঠান, যেখানে দাসীরা পিঠের যোগাড় করে আর রানীরা বসে বসে বানান।

তখনও যৌথ পরিবারে ভাঙন ধরেনি। তখনও ঢেঁকিতে চাল ছাঁটা হতো। তখনও ননস্টিক ফ্রাইংপ‍্যান কি বস্তু কেউ জানত না। চালগুঁড়ো যে প‍্যাকেটবন্দী হতে পারে তা শুনলে গড়গড়ায় তামাক টানতে গিয়ে নির্ঘাৎ বিষম খেতেন বৈঠকখানায় বসে থাকা কর্তা কিম্বা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হেসে উঠতেন অন্দরমহলে বড়গিন্নী…

পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন গ্রামবাংলায় গেরস্তবাড়ির উঠোন পরিস্কার করে নিকিয়ে সেখানে চালগুঁড়ো দিয়ে দেওয়া হতো চমৎকার সব আল্পনা। যার মধ্যে কুলো, সপ্তডিঙা মধুকর, প‍্যাঁচা, দেবী লক্ষীর পা এবং ধানের ছড়ার আল্পনা বেশি প্রচলিত ছিল। মালক্ষী ঘরে আসবেন বলে এত তোড়জোড়। নতুন ধান গোলায় তোলার সময় কয়েকটি পাকা ধানের শীষ বাড়ির এখানে ওখানে বেঁধে রাখা হতো সৌভাগ্যের চিহ্ন রুপে এবং ছড়া কাটা হতো——‘ আউনি বাউনি চাউনি/ তিনদিন কোথাও না যে/ ঘরে বসে পিঠে-ভাত খেও’।

অনেক সাধারণ মানুষই এর ব‍্যাখ‍্যা করতেন এভাবে- তিনদিনের পিঠে-উৎসবের প্রথম দিন ‘আউনি’ অর্থাৎ ঘরে পিঠের সরঞ্জাম আনো, তারপর ‘বাউনি’ অর্থাৎ পিঠে বাঁধো বা তৈরি করো এবং সবশেষে ‘চাউনি’ অর্থাৎ যত পারো চেয়ে খাও। যদিও বিশিষ্ট ভাষাতাত্বিক কামিনী কুমার রায় বলেছেন—-আউনি- লক্ষীর আগমন, বাউনি- লক্ষীর বন্ধন এবং চাউনি- তাঁহার নিকট প্রার্থনা। যে কারনে বাউনি অর্থাৎ বাঁধার আগে আজও অনেক বাড়িতে মাটির সরায় পিঠে ভাজা হয়।

আবার এই ‘ আউনি-বাউনি-চাউনি’-র তিনদিনে কর্তার ফরমায়েশিতে পিঠে করতে করতে ক্লান্ত বধূটিকে নিয়ে রসিক কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত একসময় লিখেছেন- ” উনুনে ছাউনি করি বাউনি বাঁধিয়া / চাউনি কর্তার পানে কাঁদুনি কাঁদিয়া “……

আউনি-বাউনি-চাউনি যেন অবিভক্ত বাংলার এক নস্টালজিক হস্তশিল্প। একদিকে আল্পনার অভিনবত্ব তো অন্যদিকে পাটিসাপটা-চিতই পিঠে- দুধপুলি-গোকুল পিঠে-কাঁকন পিঠে-ভাপা পিঠে- আসকি পিঠে-সরুচুকলি-চন্দ্রপুলি-পাতসিজা পিঠের কত রকমারিত্ব………………..

পিঠেপুলি কি শুধুই রসের! পিঠেপুলি মানেই বাঙালির একান্নবর্তী পরিবারের স্মৃতিমেদুরতা। পিঠেপুলি মানেই স্নেহের আর ভালোবাসার স্পর্শ। এই মধুর পরশটুকু পাওয়ার জন্য বাঙালির যে মনকেমন করা নস্টালজিয়া সেটাই তো আউনি-বাউনি-চাউনি, পিঠেপুলি কিম্বা উত্তরায়নের সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ঘুড়ি উড়িয়ে বাড়িতে এসে সদ‍্য ভাজা পিঠের স্বাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা…… এসব নস্টালজিয়া বাঙালি ছাড়া আর আছে কার বলুন তো!!!!!!!!!!


#storyandarticle


https://storyandarticle.com