তার কথা, তাহার কথা - তৈমুর খান

 

taimur khan

স্রষ্টা আদি মানব আদমকে সৃষ্টি করেও সন্তুষ্ট হলেন না।অনুভব করলেন তাঁর একজন সঙ্গী দরকার। কেননা আদমের মধ্যে স্রষ্টা ‘মন’ দিলেন, ‘ইন্দ্রিয়’ দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদার জন্ম হল। তখন আদমের বাম দিকের একটা পাঁজর নিয়ে সৃষ্টি করলেন কামিনী। পুরুষের অঙ্গ থেকে জাত হল বলেই আর এক নামও হল ‘অর্ধাঙ্গিনী’। যাকে আমরা ‘হবা’ হিসেবে পেয়ে আসছি। আমরা প্রত্যেক পুরুষই ‘আদমে’র উত্তরসূরী এবং প্রত্যেক নারীই ‘হবা’র উত্তরসূরী।

সেই ধারা থেকেই আমাদের অর্ধাঙ্গিনী। যাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে প্রথমে পৌরুষ দেখাতে শুরু করি আর পরবর্তী জীবনে কেউ কেউ কাপুরুষ হয়ে যাই। দজ্জাল স্বৈরিণী ঘাতিনী দেহপসারিণী ইত্যাদি কত নামে ডাকি। ডাকতে ডাকতে আমাদের সৌজন্যের ছায়াটুকু মুছে যায়।

কিন্তু সবকিছু সতর্কতার সঙ্গে যখন এগিয়ে যেতে পারি : সংসারের স্বামী হিসেবে, পিতা হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে; তখন স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা দাম্পত্যের ফুল বাগানে কিছুটা সুবাতাস বইতে থাকে বইকি! তখন নির্দ্বিধায় বলতে পারি : ‘তোমার কোলে মাথা রেখে মরতে আমি চাই’! এমন সংসারে মরারও আনন্দ পাই।

হ্যাঁ, তার কথা যাকে আমি স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। ঘোষণা করেছিলাম, তার মান-ইজ্জত রক্ষা করে সমস্ত দায়িত্বভার বহন করব। তারপর থেকেই দেহ-মনের আদান-প্রদান। একই শয্যায় ও একই মুখের আভাসে জীবনপাতের প্রয়াস। সন্তানের জননী হয়ে, স্বামীর সেবিকা হয়ে, পিতা-মাতার বউমা হয়ে সে সর্বংসহা বসুন্ধরার মতো। কর্তব্য পালনের যেন শেষ নেই। ঘর ঝাঁট দেওয়া, উঠোন নিকানো, গরম ভাতে পাখার বাতাস করা, গামছায় ঘাম মুছে দেওয়া, গায়ে জ্বর আছে কি না পরীক্ষা করা, কাপড় কাচা, বাসন মাজা আবার কাপড় শুকিয়ে আয়রন করে দেওয়া কতই না তার কাজ। দশভুজার মতো সব সামলে ওঠা কষ্টকর। তবু করতে হয় ওকেই। এসব করতে করতেই সে বৃদ্ধা হতে থাকে। তবু এলোচুলে নিমসন্ধ্যেবেলা সে এসে সামনে দাঁড়ালে আমার শ্রাবণ মাস হয়ে যায়।

কখনো মাথা বেঁধে পরিপাটি খোঁপায় পূর্ণিমা নিশিতে হেসে উঠলে তাকে আমার শরৎকাল মনে হয়।

নিজের অযোগ্যতাও ঢাকতে পারি না কখনো কখনো। দশটার বাজার আনতে বেরিয়ে ফিরে আসি বারোটায়। কখনো মাছ পচে যায়। কখনো একগাদা আগাছা মিশ্রিত শাকপাতা । তখন রুদ্রমূর্তি গ্রীষ্মকাল হয়ে সামনে দাঁড়ায়।

সে কি কবিতা বোঝে? আমার লেখালেখি?

না, বোঝে না। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ, বাড়ির পাশের ঝোপে কুবো পাখির ডাক, অথবা শীতরাতে শিয়ালের হুক্কাহুয়া তার খুব প্রিয়। কবিতার বইগুলি সে ছুঁতে পারে না। শাড়ি গুছিয়ে রাখে আলনায়। শিলনোড়ায় হলুদ বাটে । ঝালমসলা দিয়ে রান্না করে কোনো পদ।

তবু কোনো কোনো বসন্তের রাতে কয়েক গোছা চূর্ণ চুল কপালে এসে পড়ে তার। আমি একখন্ড চাঁদের নেমে আসা টের পাই। নিজেকে আদম ভেবে হবার কাছে যেতে থাকি। মনে হয় আমরাও পৃথিবীর আদিম মানব-মানবী। ওকে নিয়েই কখনো কখনো লিখিও ‘তাহার কথা’:

‘শ্যাওলা রঙের শাড়ি

স্রোতে ভাসো তুমি,

তিলোত্তমা।

আমি আবেগের মাঝি

ডুব মেরে শব্দের ঝিনুক তুলি। বোধের চকিত ঘরে আঁকি আলপনা।’

#bangladesh #westbengal #banglasahitya #sahityshruti #taimurkhan