সম্পাদক ও স্রষ্টা এবাদুল হক এক অনন্য ব্যক্তিত্ব - তৈমুর খান

 

এবাদুল হক
এবাদুল হক

মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত এলাকায় অর্থাৎ ভগবানগোলার কানাপুকুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করে এবাদুল হক(১৯৬০-২০২১) সাহিত্য চর্চায় যেভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন তাতে খুব কম সময়ের মধ্যেই সকলের কাছে পরিচিত ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। সাহিত্যের জন্য কখনোই তিনি শহরমুখী হতে চাননি। বাণিজ্যিক কাগজে লেখা প্রকাশেও তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না।

 নিজেকে নিজেই শাণিত করেছেন নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। তাই তিনি নিজেই বলতেন: ‘দরকার হলে শহরই একদিন আমার কাছে ছুটে আসবে।’ একদিকে পত্রিকা সম্পাদনা, অন্যদিকে সাহিত্যচর্চা দুটি ধারাতেই তিনি সকলের কাছে সমীহ আদায় করে নেন। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল: ‘কবিতা কাকলি’, ‘সূর্যাস্তের আগে ও পরে’, ‘নাগকেশরের ফুল’, ‘অগ্নিজল’, ‘বাউল জল’ ইত্যাদি। সব কাব্য-কবিতাগুলিতেই আত্মরসায়নের নিবিড় সংশ্লেষ ঘটেছে। সকল মানুষের মাঝে, প্রকৃতির মাঝে, বেঁচে থাকাও স্বপ্নের মাঝে, সংগ্রাম ও বিদ্রোহের মাঝে, আনন্দ ও বেদনার মাঝে, বেঁচে থাকা এবং মৃত্যুর মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। এক সদর্থক মরমিয়াবাদকেই তিনি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। 

স্বাভাবিকভাবেই কখনো তা অতিবাস্তবের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তবে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে অবিসংবাদিত এক প্রজ্ঞাময় ব্যাপ্তি লক্ষ করেছি। নব্বই দশকের প্রারম্ভ থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। বিভিন্ন সময়ে সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বহরমপুর শহরে এলে সর্বপ্রথম তাঁর কথাই মনে পড়ত। এক সংগ্রামী জীবনের বহু উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়েই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। পোড়-খাওয়া বলতে যা বুঝি তা তাঁকে দেখেই উপলব্ধি করেছি। একটানা একচল্লিশ বছর ধরে পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। বেঁচে থাকলে এখনও করতেন। তাঁর অকাল প্রয়াণ শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, গ্রাম বাংলার বহু তরুণ-তরুণীর অবলম্বনকেও মুছে দিল। তাঁর অভাব হয়তো কোনোদিন পূরণ হবার নয়।

এবাদুল হক আজীবন একজন বিরল সম্পাদক ছিলেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর মতো ত্যাগের মহিমা কেউ স্থাপন করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। নিজের রোজগারের সিংহভাগ অর্থই তিনি পত্রিকা প্রকাশের কাজে ব্যবহার করতেন। কলকাতা থেকে বহুদূরে এক মফস্বল এলাকায় বসবাস করেও যে পত্রিকা তিনি প্রকাশ করতেন তা যথেষ্টই ঈর্ষণীয় ছিল। ‘আবার এসেছি ফিরে’ পত্রিকার এক একটি সংখ্যা প্রায় হাজার পৃষ্ঠার বা তারও বেশি হতো। একজন কবি, প্রাবন্ধিক বা গল্পকার তিনি যত নতুন লেখকই হোন না কেন, এই পত্রিকায় সমানভাবে মর্যাদা পেতেন। বহু উপেক্ষিত এবং প্রান্তিক লেখক যাঁদের সারাজীবনেও কোনো সম্মান বা মর্যাদা জোটেনি, তিনি তাঁদের নিয়ে পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা করেছেন। আগামীতেও কয়েকটি সংখ্যা করবেন বলে লেখাও সংগ্রহ করেছিলেন। আমার বেশ কয়েকটি বিশেষ সংখ্যায় লেখার সুযোগ হয়েছে। যতদূর সম্ভব দেবী রায়, অজিত বাইরী, কবিরুল ইসলাম, বেণু দত্ত রায় প্রমুখ। আরও কয়েকজনকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করার কথা ছিল। আমি লেখাও দিয়েছিলাম। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য: রাণা চট্টোপাধ্যায়, অনন্ত রায়, পুষ্পজিত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। একজন লেখকের গুচ্ছ গুচ্ছ লেখা তিনি একটা সংখ্যাতেই প্রকাশ করতেন। পত্রিকা পাঠাতেন রেজিস্ট্রি ডাকে। এত খরচ কোথা থেকে আসত? মাঝে মাঝে শুনেছি সংসার অচল হয়ে যেত। প্রেসের ধার কোনোদিন মিটত না। একটা অ্যাক্সিডেন্ট এর পর বহুদিন চিকিৎসা করিয়েছেন। প্রায় পঙ্গু অবস্থায় তবুও ছুটে গেছেন বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানে। অকাতরে পত্রিকা এবং বই দান করেছেন। লেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি ছিলেন বলেই বিভিন্ন সময়ে লেখার তাগিদ অনুভব করতাম। মাঝে মাঝে জাগিয়ে দিতেন। আজ তিনি নেই বলেই মনে হচ্ছে মাথার উপর থেকে একটি স্নেহের হাত সরে গেল। মফস্বল থেকে তাঁর মতো এমন বড় মনের মানুষ খুঁজে পাওয়া বিরল।

তিনি নিজে কেমন লিখতেন?

লেখার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। সর্বদা গতানুগতিক লেখা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতেন। একটু আলাদা করে ভাবনার প্রয়াস লক্ষ করতাম। রুচি এবং মানের বিষয়টা তিনি ভালোই বুঝতেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে বর্ধমানের একটি অনুষ্ঠানে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিনটি কাব্যগ্রন্থ: ‘পলাতক ছায়া’, ‘সময়ের জলছাপ’ এবং ‘একগ্লাস জলের ছায়ায়’। সব কাব্যগুলিতেই ছড়িয়ে আছে ‘অনুভবের আগুন’। অন্ধকারে পা রাখার জায়গা খুঁজে খুঁজে কবি পায়ের কথাই ভুলে গেছেন। ক্লান্তি-হতাশা নিয়ে বসবাস করতে করতে তারাও গা-সওয়া হয়ে গেছে। চাঁদ-সুরুজের রোমান্টিকতাও কবিকে আর প্রলুব্ধ করে না। এই মাটির পৃথিবীতে মানুষের রক্ত-ঘাম বিবর্ণতা এবং দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে তিনি উজ্জীবনের ইশতেহার রচনা করতে চেয়েছেন। ‘পলাতক ছায়ায়’ বলেছেন:

“যেখানে চাঁদ নেই সূর্য নেই নক্ষত্রের ঝিকিমিকি—

শুধু আছে একরাশ ভালোবাসার সোনালি স্বপন।”

এই স্বপ্নচর কবি তাই আগুন নিভিয়ে, দোযখ নিভিয়ে প্রাণকে প্রেমের ভাষা শেখাতে চেয়েছেন। যে ভাষায় বিপ্লবী গান গায়। যে ভাষায় চুম্বনের চুমকুঁড়ি ওঠে। যে ভাষায় জয়ধ্বনি দিয়ে মানবিক সভ্যতার সদ্গতি সম্ভব।

‘সময়ের জলছাপ’ কাব্যে প্রেমের এক গভীর প্রত্যয় নিয়ে ম্যাজিক রিয়ালিজমের সদর্থক ক্রিয়ায় আত্মমুক্তির সোপান রচনা করেছেন। কখনো তা কিউবিজম চেতনার প্রভাবেও ভাস্বর হয়ে উঠেছে। তৃষ্ণা লুকিয়ে ফেলে এক ভিন্ন জলের সন্ধান করেছেন। একটি কবিতায় লিখেছেন:

“তোমাকে স্বপ্নে দেখি কাঁচঘেরা মাছের জগতে

কলমের নিবের নিঃশ্বাস সেখানে পৌছবে কোনোমতে।”

আত্মবোধের বিস্তারকে তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবে সঞ্চারিত করেছেন মরমে। যেখানে দেহ নেই অথচ প্রেম আছে। যেখানে আস্ফালন নেই অথচ আশ্বাস আছে। যেখানে ব্যাকরণ নেই অথচ মহিমা আছে। প্রেমের হিরণ্যদ্যুতি জন্মের যন্ত্রণায় সেই কারণেই ছটফট করেছে। কবি উপলব্ধি করেছেন:

“প্রেমের হিরণ্যদ্যুতি রাত্রির সৌরভে মিশে

জন্ম হবে আমাদের জল-স্থলে দূর মহাকাশে।”

রাত্রির অন্ধকারও তখন প্রেমের আলোয় আলোকিত এক মানবিক সভ্যতার রূপ পাবে। যেখানে সম্পর্ক ও সহানুভূতির কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।

‘একগ্লাস জলের ছায়ায়’ কাব্যটি করোনা মুহূর্তের নানা উপলব্ধিতে রচিত হয়েছে। মানবজীবনের দুরবস্থাকে খুব কাছ থেকে কবি দেখেছেন। লাশের প্রাচুর্য দেখে নিজেও কষ্ট পেয়েছেন। কবিতায় লিখেছেন:

“নিঃসঙ্গ পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে আমার মজ্জায় তাদের শোকগাঁথা”

অনন্ত বিষাদে ডুবে থাকা কবি তাঁর চেতনার কাছে ফিরে আসতে চেয়েছেন। কিন্তু এক ঘোর অন্ধকারের ছোবল তাঁর তৃষ্ণার্ত হৃদয়কে কাতর করে তুলেছে। জটিল রাজনৈতিক মুহূর্ত এবং অমানবিক কাজকর্ম কবির অস্তিত্বে এক সংকটের বার্তা বয়ে এনেছে। কবিতায় লিখেছেন:

“দেখেছি গ্রামের পথে মধ্যরাতে হিংস্র নির্জনতা

রাজনৈতিক থাবার দাগ বারান্দায়, পীড়িত বাগানে

জানালায় চাপাস্বর ঝুঁকে থাকা অশরীরী ছায়া”

এই অশরীরী ছায়াই কি মৃত্যুর দূত ছিল? ‘মানুষের মৃত্যু’ এবং ‘মানবের মৃত্যু’ দুই মৃত্যুই কবির কাছে ঘুরে ফিরে এসেছে। বাঁচার আশ্বাস খুঁজেছেন। ‘একগ্লাস জলের ছায়ায়’ কি সেই ক্লান্তি, সেই তৃষ্ণা নিবারণ হওয়া সম্ভব? বাস্তবের বিপন্নতাকে জয় করে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু পদে পদে উপলব্ধি করেছেন বিপরীতগামী অজানা প্রতিপক্ষের। হয়তো এই মৃত্যুকেই কবি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই এই কাব্যের প্রতিটি কবিতায় মৃত্যুবোধ নানা প্রতীকে ফুটে উঠেছে। বুক টান করে উত্তপ্ত দিনের সীমানায় বৈশাখী ঝড়ের মোকাবিলা করেও এই বিপন্নতা দূর হয়নি। আশ্চর্য উপলব্ধি কবির:

“নিজেকে বিদীর্ণ করে আছি এই ঘরে

এই শূন্য ছায়ার ভেতর একাকার

আমি ও আমার রৌদ্র কঙ্কালের ঘর।”

পৃথিবী যেন অবসিত মৃত্যুপুরীর এক ভয়ঙ্কর তীর্থে পরিণত হয়েছে। তাই প্রতিটি দৃশ্যকল্পে কবির ভগ্নস্বর এবং আত্মপীড়নের প্রকীর্ণ বিলাপ শুনতে পেয়েছি। উদ্দামতা হারিয়ে যাওয়া মানুষের মতোই তিনি যেন ‘ব্যর্থতার বিকলাঙ্গ ঘুড়ি’। আত্মা আর জেগে ওঠেনি।

বাংলা কাব্যের ইতিহাসে এবং পত্রিকা সম্পাদনার ইতিহাসে এবাদুল হক এর আসন চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। আমরা যারা সাহিত্য চর্চা করি আগামী দিনে তাঁকে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এই কাজটি না করে গেলে ইতিহাসও আমাদের ক্ষমা করবে না। এবাদুল হক কত বড় মাপের কবি ছিলেন তাঁর কাব্যগুলি বিশ্লেষণ করলে নিশ্চয়ই আমরা কিছুটা আঁচ করতে পারব। তাঁর যাবতীয় সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ করা এই মুহূর্তে একটা জরুরি বিষয়।

#bangladesh #westbengal #banglasahitya #sahityashruti