অর্গানিক ফার্ম – পিউ নন্দী

 
পিউ নন্দী

বেশ কয়েকদিন ধরেই অগ্নি হজমের সমস্যায় ভুগছে। এমনিতে তার শরীর স্বাস্থ্য বেশ ভালোই কিন্তু কে জানে কী রোগ বাসা বেঁধেছে! বর্তমানে মানুষের শরীর যেন চীনা ইলেকট্রনিক্স এর জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছে।চলছে তো ঠিক আছে কিন্তু কখন যে বিগরে যাবে কেউ জানে না। ড: বসু অগ্নিকে ভালো করেই চেনেন। 


ওনার ওষুধ খেয়ে সমস্যা টা কমলেও অগ্নির মন থেকে খুঁতখুতুনি যাচ্ছিল না। একদিন বন্ধুদের আড্ডায় এই প্রসঙ্গে কথা কথা বলতে বলতে অগ্নি জানতে পেরেছিল অর্গানিক ফার্মিং সম্পর্কে।

আজকাল বাজারের শাকসবজিতে যে রাসায়নিক বিষ মেশানো হচ্ছে তা কিন্তু শরীরের পক্ষে ভীষন ক্ষতিকর । বাজারের বেশিরভাগ সবজিই রঙিন জলে চুবিয়ে বিক্রি করা হয়। দেখে মনে হয় টাটকা। আর বাঙালি কোনদিনই বা তেল চুকচুক নধর বেগুন বা ঘন সবুজ রঙের পটলের লোভ সামলাতে পেরেছে!

দীর্ঘ দিন ধরে এই বিষ শরীরে জমলে পেটের সমস্যা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে শরীরের অনেক বড় ক্ষতি কিন্তু হয়ে যেতে পারে । তাই এর থেকে বাচঁতে অর্গানিক মেথড বা সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি খাওয়া উচিৎ। কথাটা অগ্নির খুব মনে ধরেছিল। সে এসব নিয়ে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করলো। ইন্টারনেট ঘেঁটে বেশ কিছু তথ্য সে পায়।

শপিং মল গুলোতে অর্গানিক ভেজিটেবল বিক্রি হয় বটে কিন্তু তার দাম আকাশছোঁয়া। এক আধদিন সখ করে খাওয়া যেতে পারে কিন্তু রোজের খরিদ্দার হতে গেলে পকেটে নির্ঘাত টান পড়বে। অগ্নি আরো জানতে পারে আজকাল কলকাতার উপকণ্ঠে বেশকিছু চাষী এইরকম অর্গানিক শাক সবজি চাষ করছেন এবং সরাসরি তাদের থেকে কিনলে দাম বেশ খানিকটা কমই হয়। বর্তমানে তাদের মধ্যে কয়েকজন বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে এই সংক্রান্ত পেজ খুলেছেন যেখানে গিয়ে অর্ডার দিলে বাড়িতে হোম ডেলিভারির ও থাকে।

বাহ এটা তো বেশ ভালো ব্যবস্থা তাহলে তো এরকম কোন একটা পেজে অর্ডার দিলেই হল।বাড়িতে বসেই অপেক্ষাকৃত কম দামে টাটকা সবজি পাওয়া যাবে। স্বাস্থ্যকর এবং সাশ্রয়ী। দ্বিরুক্তি না করে সোশ্যাল মিডিয়াতে এইসব পেজগুলোতে সার্চ করতে থাকে অগ্নি। এইরকমই সার্ফিংয়ের সময় হঠাৎ একটা পেজ অগ্নির চোখে পরে। পেজটার নাম “কিচেন গার্ডেন”। পেজটির প্রোফাইল পিকচার এ একটা ফার্ম হাউসের ছবি। ছোট্ট একতলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ির পাশে সবুজে ভরা সবজির বাগান।ছবিটা যেন অগ্নিকে টানে।

পেজটা খুলে ভেতরে ঢোকে অগ্নি। পেজে পোস্ট করা প্রত্যেকটি ছবিই শাক সবজি সংক্রান্ত। বিভিন্ন শাক সবজির ছবি পোস্ট করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।তাতে যেমন ইয়াব্বড়ো সাইজের তেল চকচকে বেগুনের ছবি আছে তেমনি নধর সাইজের এক পেল্লাই কুমড়োর ছবিও দৃশ্য মান। 


গাছ ভর্তি ঝুলন্ত পেঁপে,গাঢ় সবুজ রঙের ক্যাপসিকাম,লাল টুকটুকে লঙ্কা,পুঁই-কুমড়ো-শসা-পটলের মাচা এমনকি মাটিতে ফলানো রসুন, পেঁয়াজ,দেশি ফুলকপি, বাঁধাকপি এমনকি হালকা লাল রঙের দেশি গাজরও স্বমহিমায় বর্তমান। দেখে তো মনে হচ্ছে ভালই। তবে এই পেজে শেষ পোস্ট করা হয়েছিল প্রায় ছয় মাস আগে।তারপরে কোনো পোস্ট নেই। আরেকটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ে।

এই ফার্মটির মালিকের নাম বা তার কোনো ফটো না থাকলেও প্রতিটি ছবিতে একজন মানুষের হাত দেখা যাচ্ছে। কখনো কুমড়োর মাচাতে বা কখনো সেই হাতের মুঠিতে ঝুঁটি বেঁধে ঝুলছে পেঁয়াজ শাক। তবে ফার্ম টা কোথায বা কিভাবে কাস্টমারকে সার্ভিস দেওয়া হয় তার কোনও তথ্য উল্লেখ নেই।


তাই পেজের তলায় থাকা ফোন নম্বরে একটু ইতস্তত করেই ডায়াল করে ফেলে।ফোনে রিং বেজেই চলে। বার চারেক চেষ্টা করেও কেউ ফোন ধরে না। অগ্নি হতাশ হয়ে ফোন রেখে দেয়।আজ এমনিতে সে খুব ক্লান্ত ছিল। শরীরটা ও ভালো না। হালকা কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি।

ফোনের রিং এর শব্দে ঘুমটা চটকে যায় অগ্নির।সামনের দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে তখন রাত একটা ছুঁই ছুঁই। এতো রাতে আবার কে! একটু অবাকই হয় সে। ও তো বরাবর ফোন সাইলেন্ট করেই ঘুমাতে যায়। আজও তো তাই করেছিল। তাহলে? ভাবতে ভাবতেই হাত বাড়ায় বেড সাইট টেবিলে রাখা ফোনের দিকে। ফোনের হালকা নীল আলোয় যে নাম্বারটা স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে সেটা তার অজানা। 

রাতেরবেলা অচেনা নম্বর রিসিভ করবে কি না বুঝে উঠতে পারে না।এই দোলাচলের মধ্যে কখন যে তার আঙ্গুল এর স্পর্শে কলটা রিসিভ হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলে ‘হ্যালো কে বলছেন?’ অপরপ্রান্তের এক ভরাট পুরুষ কন্ঠ তার কানে আসে ‘হ্যালো আমি কিচেন গার্ডেন অর্গানিক ফার্ম থেকে বলছি। আপনি আমায় ফোন করেছিলেন সন্ধ্যে বেলায়।

আমি দুঃখিত তখন রিসিভ করতে না পারার জন্য’।অগ্নি বলে উঠতে যাচ্ছিল যে এটা ফোন করার সময় না কিন্তু ভদ্রলোকের এমন অমায়িক গলার দুঃখ প্রকাশে সে কথাগুলো বলতে গিয়েও গিলে ফেলে। গলা টা খাকরে বলল ‘ হ্যাঁ ফোনটা আমিই করেছিলাম। আমার নাম অগ্নি চৌধুরী। আপনার পেজ থেকে কন্টাক্ট নম্বর টা পেয়ে ফোন করেছিলাম। আসলে পেজে এত কম ইনফরমেশন ছিল যে একটু ভালো করে জানার জন্য ফোনটা করা’। ভদ্রলোক বললেন-‘ নমস্কার।আমি ভবতোষ রায়।আমার একটা ছোট অর্গানিক ফার্ম আছে।

ওটারই নাম কিচেন গার্ডেন।এই সবজি বেচাকেনার সুবিধের জন্য ফেসবুকে পেজ খুলে ছিলাম। যে যুগের যা নিয়ম.. তা বলুন আপনি কি জানতে চান?’ অগ্নি বলল ‘আমার কিছু অর্গানিক ভেজিটেবলস দরকার।তাই অর্ডার দেওয়ার জন্য একটু রিলায়েবল ফার্ম খুজছিলাম একটা।ফেসবুকে আপনার পেজের পোস্ট করা ছবিগুলো দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে।তা আপনার ফার্ম টা কোথায় ?’ 


ভবতোষ বাবু তাঁর ফার্মের ঠিকানাটা দিলেন। শহর থেকে কিছুটা দূরে হাওড়ার এক দিকে গ্রামের দিকে ওনার ফর্মটা। জানালেন ওনার বাড়ির সাথে লাগোয়া জমিতেই ফার্মটি খুলেছেন। হোম ডেলিভারিরও ব্যবস্থা আছে। দাম অগ্নির সাধ্যের মধ্যেই।ভদ্রলোক দরাজ গলায় অগ্নিকে আমন্ত্রণ ও জানালেন ফার্মে আসার।’একদিন এসে নিজের চোখে দেখে ই যান না আমার কাজের পদ্ধতি। সব দেখে শুনে তবেই না হয় অর্ডার দেবেন।

একটু সময় নিয়ে আসবেন সব ঘুরে ঘুরে দেখিয়ে দেবো আপনাকে।’ ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বরের উষ্ণতা অগ্নিকে স্পর্শ করে। সে এককথায় রাজি হয়ে যায়। ঠিক হয় আসছে শনিবার সে ভবতোষ বাবুর ফার্ম দেখতে যাবে।আরো দু-চারটে কথা বলে ভবতোষ বাবু গুডনাইট বলে ফোন রেখে দেন।অগ্নি কথা বলে বুঝতে পারে ভদ্রলোক বেশ শিক্ষিত মার্জিত স্বভাবের মানুষ।

এরকম মানুষের সাথে মিশতে সত্যি ভালো লাগে। কেমন যেনো একটা টান অনুভব করছিল অগ্নি। কিচেন গার্ডেন দেখতে যাওয়ার এক অদম্য ইচ্ছা যেন তাকে ভর করেছে। ফার্মহউসটা একটু বেশিই যেন তাকে আকর্ষিত করেছে তাকে। তার ঘুম পাচ্ছিল। ফোনটা পাশে রেখে অগ্নি ঘুমিয়ে পড়ে। তবে যদি ঘুমাবার আগে অগ্নি ফোন টা চেক করত তবে দেখতে পেত তার ফোনটা এখনো সাইলেন্ট মোডেই আছে আর যে নম্বরে ফোন টা এসেছিল তার অস্তিত্ব তার কল হিস্ট্রি থেকে মুছে গেছে।

#banglasahitya #bangladesh