আপনি কেন কবিতা লিখেন?

 

story and article

আপনি কেন কবিতা লিখেন?

কবি তৈমুর খান এর সঙ্গে একটি একান্ত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। এখানে সেটি হুবহু উল্লেখ করা হল।

প্রশ্ন : আপনি কেন কবিতা লিখেন? কবিতা জীবনের কী কাজে আসে?

উত্তর : ️কবিতা এমনই একটি শিল্প যার মধ্যে আত্মযাপনের নিবিড় মুহূর্তগুলি অতি সূক্ষ্মভাবে উঠে আসে। ক্ষয়, দীর্ঘশ্বাস, বেদনা, শূন্যতার অভিক্ষেপ ব্যক্তিহৃদয়কে যেমন ক্ষতবিক্ষত করে, তেমনি মৌল প্রবৃত্তির অনুজ্ঞাও লালিত হয় নিষিক্ত শব্দের ব্যবহার। সংকেতে সততায় রূপকে ব্যঞ্জনায় জীবনলিপির এই স্বয়ংক্রিয় শিল্পটিতে অতি সহজেই নিজেকে প্রকাশ করা যায়। আড়াল করা যায়। আশ্রয় নেওয়া যায়। আমার “আত্মসংগ্রহ”গদ্যের বইটিতে “আমার লেখার উদ্দেশ্য” প্রবন্ধে একথা উল্লেখ করেছি :

“একা হয়ে যাই। উত্তর মেলে না। প্রতিবাদ করতে পারি না। বাহুবল নেই। নিজের গোপন কথা কার কাছে বলব ?

এই সমাজনীতি, রাজনীতি, এই মানবনীতি আমাকে বিব্রত করে । মানতে পারি না এই প্রথাবদ্ধ চিরাচরিত ধর্মনীতিও । মানুষ কী মূল্য পায় এখানে ? কেন শুধু আমাকে ‘মুসলমান’ অথবা ‘মুছুলমান’ বলে ডাকে ওরা ? কেন আমি মানুষ নই ? কেন জাতের নামে , ধর্মের নামে আমাকে আলাদা করে দ্যাখে ? কেন আমার প্রণয়িনীকে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ?

— এসবের উত্তর খুঁজতেই আমাকে লিখতে হয় । আত্মখননে আত্মদহনে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে হয় । না , চাঁদ ফুল পাখি নয় । জীবনের মর্মে মর্মে যে হলাহল ওঠে — তা-ই আমার লেখার উৎস। একদিকে প্রতিবাদ, একদিকে ভালোবাসা — মানবজীবনের অস্তিত্ব ঘোষণায় বেজে ওঠে প্রতিটি শব্দ ।

হ্যাঁ, একদিন আমার কৈশোর ছিল। দিনের পর দিন উপোস অথবা আধপেটা । ঘাসকাটা অথবা গোরুচরা । সারাদিন পর শুধু কচুশাক সেদ্ধ। পুঁইশাক সেদ্ধ। জলসেদ্ধ। জাউ। ছেঁড়া নজরুল জীবনী। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কয়েক লাইন। বারবার মুখস্থ। দারিদ্রের কঠোর শাসন, বিদ্রোহের কঠিন শপথ আমাকে উন্মাদ করে তুলেছিল। তখন থেকেই কবিতা হয়েছে প্রতিবাদ।

হাতিয়ার। বর্ধিষ্ণু হিন্দুমোড়লের বাড়িতে সারাদিন কর্মশ্রান্ত । রাত্রে গোয়াল ঘরে রাখা ফুটো থালায় একপাই মুড়ি । নির্দিষ্ট কাপে এককাপ চা । খাওয়ার পরে পুকুরঘাট থেকে মেজে আনার আদেশ। ছোঁয়াছুঁয়ির দূরত্ব। অবহেলা। অন্তরাত্মা তখন থেকেই ফুঁসে উঠেছে। নীরব গর্জন করেছে। কিন্তু কেউ শুনতে পায়নি। কবিতা জানে সেই অভিমান। কবিতা জানে সেই নিভৃতে কেঁদে ফেলা ।

এখনও কৈশোর এসে সামনে দাঁড়ায় । যৌবনকে ফালা ফালা করে। যে মেয়েটি চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ফুল দিয়েছিল, যে মেয়েটি প্রথম চুমু খেয়েছিল বসন্তের বিকেলে , যে মেয়েটি কথা দিয়েছিল ‘ফিরে আসবই’ — এখনও আকাশে বাতাসে তার কথা শুনতে পাই। তার স্নিগ্ধ মুখ মনে পড়ে। সে আসতে পারেনি। সমাজ এসেছে। হাতে অস্ত্র নিয়ে, জাতের দোহাই দিয়ে। নিয়মের শৃঙ্খল নিয়ে। ভীরু মেয়েটির চোখ শুকিয়ে গেছে। মুখে শব্দ ফোটেনি। আজও সে নাড়া দেয় আমাকে। না লিখে পারি না ওকে।

কত দিন পৃথিবীতে জাত থাকবে ? কত দিন মানুষ মন্দির মসজিদ নিয়ে লড়াই করবে ? কত দিন এই রেষারেষির রাজনীতি ? ভোট উৎসব ? কত দিন গুজরাত, ধানতলা, বানতলা বিরাজ করবে ? এতটুকু স্বপ্ন দেখার জায়গা নেই ? মানুষকে মানুষ ভাববার অবকাশ নেই ? মেধা মননকে মূল্য দেওয়া নেই ? এইভাবে জন্তুর মতো দিন কাটে । আমাদের অতীত ঐতিহ্য মুছে যায়। মুছে যায় মানবিক সম্পর্ক — ভ্রাতৃত্ব প্রেম ইতিহাস। বিচ্ছিন্ন দীর্ণ দীন হতে হতে আজ আমরা এক ধ্বংসাবশেষ হয়ে যাই।

না লিখে পারি না এসব। স্বপ্ন-মৃত্যুর দুর্দান্ত শোক আমাকে কাতর করে। হাসপাতালে ধর্ষিতা মেয়েটির কথা ভুলতে পারি না। স্টেশনে পাচার হওয়া মেয়েটির কান্না আমাকে ছুঁয়ে যায়। গরিব বোনটির শতচ্ছিন্ন শাড়ি আমাকে নির্ঘুম করে। গলাটিপে হত্যা করা পুকুরে ভেসে ওঠা মেয়েটিকে আমার মনে হয় একুশ শতকের চাঁদ। একদিকে যন্ত্রণার এই বিষাদ করুণ মুখ — বঞ্চনা পীড়ন ধর্ষণ মৃত্যু সব সময় আমাকে তাড়া করে ফেরে। অন্যদিকে আত্মজীবনীর ধূসর ছায়া কী মর্মান্তিক ক্ষয় আর হাহাকার জীবনযাপনে যে অপূর্ণতা নিয়ে আসে তারই নিহিত তাৎপর্য হয়ে ওঠে। যে অনুভূতি, যে বিবেকের কণ্ঠস্বর, যে স্বপ্নলব্ধ মূল্যায়ন আমার কৈশোর যৌবনে অর্জিত হয়েছে — স্বাভাবিকভাবেই তা আমার লেখায় প্রতিফলিত । এই অনুভূতি, এই বিবেক, এই স্বপ্নকে আমি ঘুমিয়ে রাখতে পারি না। তাই লিখতে হয়, তাই লিখি।

আমার জ্বর লিখি। আমার মৃত্যু লিখি। আমার বেঁচে ওঠা লিখি। আমার পুনর্জন্ম লিখি। আমার অতীত লিখি। আমার ভবিষ্যৎ লিখি। আমার মন খারাপ লিখি। আমার মন ভালো লিখি। আমার প্রেম লিখি। আমার বিরহ লিখি। আমার প্রতিবাদ লিখি। আমার নারী লিখি। আমার ব্যর্থতা লিখি। না লিখে পারি না এসব।”

কবিতা তো মানবপ্রবৃত্তির চিরন্তন আবেগকে ধারণ করে এক মেধাবী আলোকপ্রত্যয়ের নির্ণীত ক্ষেত্রে পাঠককে অবগাহন করায়। সুতরাং কবিতা এক আত্মিক মূল্যবোধের ভেতর মানবিক কল্যাণের পথে সভ্যতাকে চালিত করতে পারে। তেমনি ব্যক্তিহৃদয়কে শব্দের আয়নায় প্রদর্শন করে। নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার মাধ্যম তৈরি হয়। যে শূন্যতার ভাষা নেই, কবিতা তার ভাষা দেয়। কবিতার কাছে কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখে জীবনের নতুন মন্ত্র খুঁজে পাওয়া যায়। নিজেকে ভালবাসা যায়। শব্দ ও ইমেজের চমৎকারিত্বে মানসিক প্রসন্নতা ফিরে আসে।

প্রশ্ন : সমকালীন কাব্যবিশ্বে বাংলা কবিতার অবস্থান কোথায়? আপনি এর পক্ষে কী করছেন?

উত্তর :️ সমকালীন কাব্যবিশ্বে বাংলা কবিতার অবস্থান সর্বব্যাপী না হলেও অবহেলার যে নয় তা জোর দিয়েই বলা যায়। বাঙালির মননচর্চার ক্ষেত্রে কবিতাই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি জাতি বিশ্বের যে দেশেই অবস্থান করুক, কবিতাও তাঁর সঙ্গে আছে। বাংলা ভাষার কবিতা বিশ্বের শক্তিশালী ভাষাগুলিতে অনূদিত হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশি পাঠকদের কাছে। রবীন্দ্রনাথের যুগ থেকে আমরা দেখছি। বাংলা সাহিত্যের প্রভাব অবশ্যই বিশ্বসাহিত্যে পড়ে। ভারতীয় ভাবধারা, বাউলতত্ত্ব, আধ্যাত্মিক চেতনার ছায়া তো আগেই পড়েছিল। The Waste Land এর শেষ পংক্তিটি ছিল — দত্ত, দয়ধ্বম, দাম্যত। এছাড়া এলিয়টের The Elder Statesman কাব্যনাট্যে হিন্দু ধর্মের প্রভাব দেখা যায়। সেখানে একটা উক্তিতে আছে —

“They think in Spanish, but their thoughts are Indian thoughts. “

ভারতীয় জীবনবোধের সহজিয়া ভাবনা, শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের কর্মযোগ, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বচৈতন্য ধারা আজও বিদেশী সাহিত্যিকদের কাছে গৃহীত হয়ে চলেছে। টি এস এলিয়ট, ডব্লু বি ইয়েটস, অ্যালেন গিনসবার্গ প্রমুখ সাহিত্যিকগণ ভারতীয় সাহিত্যে প্রভাবিত হয়েছেন। সাম্প্রতিককালের কবিতার ক্ষেত্রেও নতুন লিখতে আসা বহু কবিও নিষিক্ত হচ্ছেন। বাংলা কবিতার প্রতি তাঁদের সমীহ ও সম্মোহন আছে বলেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণার জন্য তাঁরা পাড়ি দিচ্ছেন এদেশে।

️বাংলা কবিতাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছাতে আমিও বেশ কিছু নিজের ভালো লাগা কবিতা অনুবাদ করেছি। বিদেশে অবস্থানরত বন্ধুদের কবিতা অনুবাদ করতে উৎসাহিত করেছি। এছাড়া বাংলা কবিতার প্রচারে ও কবিতার বহুমুখী পর্যায়গুলি তুলে ধরে পাঠককে এই সৃষ্টির মাহাত্ম্য কতখানি তা বোঝাবার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন :এই সময়ে বাংলা কবিতা যাঁরা লিখছেন, তাঁদের প্রধান নিরীক্ষণ কী?

উত্তর :️ এই সময়ে বাংলা কবিতা যাঁরা লিখছেন, তাঁদের প্রধান নিরীক্ষণ হচ্ছে ব্যক্তিহৃদয়ের নিরবধি ভাঙনকে ইমেজের মাধ্যমে তুলে ধরা এবং সময়ের সাথে মানবজীবনের যে রূপান্তর তাকে শব্দায়িত করা। ব্যক্তিজীবনের শূন্যতা, অচরিতার্থতা, বিদ্রোহ ও বিষণ্ণতা কখনও কখনও নাথিংনেস্ এবং এম্পটিনেস্ প্রজ্ঞারই ভিন্নরূপ যাত্রায় পরিণতি পায়।

প্রশ্ন : তরুণতম কবির প্রতি আপনার আহ্বান কী?

উত্তর :️কবিতা লিখে যশস্বী হবার ঝোঁক ত্যাগ করা উচিত। নিঃস্বার্থ সাহিত্য সেবার মনোভাব নিয়ে কবিকে অগ্রসর হতে হবে। এক মেধাবী উদাসীনতায় নিজেকে চালিত করতে হবে। লেখার থেকে সংবেদনশীল হৃদয় দিয়ে পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। উত্তরাধিকারী হিসেবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে গ্রহণ করেই বোধিদীপ্ত নতুন সৃষ্টির পথ অন্বেষণ করতে হবে।

প্রশ্ন : এই সময়ের সাহিত্যমাঠে অনলাইন কী ভূমিকা রাখছে? সৃজনশীলতার জন্য কতটা পজিটিভ?

উত্তর : ️আমরা এমন একটা সময়ে উপস্থিত হয়েছি যে, প্রতিটি মুহূর্ত আমরা নেটের সাহায্য নিতে বাধ্য হই। খবরাখবর থেকে শুরু করে জ্ঞানভাণ্ডারের নানা তথ্য সংগ্রহ করতে এমনকী দুষ্প্রাপ্য বইপত্রের পিডিএফ ফাইল পড়তে ও জটিল যে কোনও সমস্যার সমাধান জানতে এর দ্বারস্থ হই। বইপত্র সব সময় কাছে থাকে না। কিন্তু একটা ছোট্ট যন্ত্রে নেট সংযোগ করে মুহূর্তে আমরা উত্তর পেয়ে যাই। সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অনলাইনেই সংগ্রহ করে এই ব্যস্ত সময়ের মানুষেরা। ব্যাপারটা খুবই সহজলভ্য। সুতরাং বিভিন্ন কাজের ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্যপাঠও অনলাইনে হচ্ছে বলেই কবিতারও কদর বেড়েছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার কবিতা পাঠক পেয়ে যাচ্ছেন।

️সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও অনলাইনের ভূমিকা বেশ পজিটিভ। নিজের সৃষ্টির খবরাখবর, বই প্রকাশ ও অনুষ্ঠানের খবর, নির্বাচিত কবিতা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লেখার সাথে পাঠকের পরিচয় করাতে অনলাইনের ভূমিকা যথাযথ। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু অকবি, মেধাহীন পাঠক, রুচিহীন সাহিত্যিক তাদের অপটু ক্লিশে কুম্ভীলক বৃত্তিতে গৃহীত সৃষ্টি নিয়ে অনলাইনে উপস্থিত হন। এর ফলে প্রকৃত পাঠকেরও ভ্রান্তি বাড়ে । অনেক সময় বিচারবোধ হারিয়ে সাহিত্যের প্রতি অনীহার জন্ম হয়। এইজন্য সাবধানতাও দরকার।

প্রশ্ন : আপনার প্রিয় একটি কবিতা লেখার গল্প বলুন।

উত্তর : ️আমার জীবনযন্ত্রণার কবিতা ও তার প্রেক্ষাপট

তৈমুর খান

ঘাসকাটা

__________

দু’বেলাই ঘাস কাটি মজুরের ছেলে

কাঠখড়ের উষ্ণতায় রাত্রি করি পার

তবুও পার্টির লোক আমার দরজায়

না বাপু , কামাই হলে আমিই উপোস

কী খাই, কী খাই সারাদিন….

মিছিলের লাল ধুলো, ঘুরবে আকাশ

আর একটু দাঁড়াও কার্ল মার্কস,

কয়েক শতাব্দী আরও কেটে নিই ঘাস ।

কবিতাটির প্রেক্ষাপট

প্রায় বাল্যকাল থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত চরম দারিদ্রের মধ্যেই আমার জীবন কাটে। বুনো কচুর শাক সেদ্ধ থেকে হেলা, ডুমুর, শালুক এবং খুচরো মাছ ধরে প্রায় প্রতিদিনই খাবার জোগাড় করার রীতি হয়ে দাঁড়ায়। বেশ কয়েকবার মুম্বাই শহরে গিয়ে মুটেগিরি করেও রোজগার করতে হয়। কিন্তু পড়াশোনা চালানোর জন্যই থাকতে হয় গ্রামে। স্কুল-কলেজে পড়ার সময়েও মাঠে মাঠে গরু চরানো, মুনিষখাটা, ঘাসকাটা, ইঁদুর গর্তের ধান তোলার মতো ক্ষুন্নিবৃত্তিও গ্রহণ করতে হয়।

কষ্টলালিত এই জীবনে বড়ো হয়ে ওঠার গল্পটিও খুবই যন্ত্রণাদায়ক। কেননা, বস্তুগত অভাবই মানসিক মনোবলকে অনেক সময়ই ভেঙে ফেলেছে। বাবার কোনো আয় নেই। ছোটো ছোটো ভাইবোনদের অনাহার ক্লিষ্ট শুকনো মুখ। কয়েক ছটাক গম অথবা খুদ ভাজা নিয়ে মাঠে গিয়ে ঘাসকাটা। কয়েক বস্তা ঘাস কাটলে এককেজি গম অথবা এককেজি খুদ পাওয়া যায়। তাই দিয়ে রান্না হয় জাউ । সারাদিন পর সেই জাউ খেয়েই উঠোনে বাবার সঙ্গে বসে পড়াশোনা। এরকমই অবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন চলে যাচ্ছিল।

প্রশ্ন : কবিতা কি তখন আসত না ?

অবশ্যই কবিতা আসত । যৌবনের সংরাগ , কামনার অপার্থিব স্বপ্ন এবং বিরহের অনন্তদিশারি আগুনের স্পর্শ অনেকটাই দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। পেটে ক্ষুধার আগুন , তাই অন্য আগুনের ততটা স্পর্ধা হয়নি। নব্বই দশকে বামপন্থী রাজনৈতিক দলের মিছিলে কলকাতায় কতবার এসে দুটো রুটি ও গুড়ের জন্য কত লড়াই করতে হয়েছে। সেসবও মনে জ্বল্ জ্বল্ করে। বামপন্থীরা তাদের দলে ডেকে নিয়ে যায় ভবিষ্যতে কোনো কাজের ইশারায়। কিন্তু কাজও হয় না। শুধু মার্কামারা “মিছিলের লোক” হয়ে উঠি। পরে বুঝতে পারি এ সমস্তই স্তোকবাক্য। কাজের কাজ কিছুই হবে না। আমাকে লেখাপড়া শিখেও ঘাসকেটেই খাবার জোগাড় করতে হবে। কার্ল মার্ক্সীয় নীতি সাম্যবাদ আনতে পারবে না।

গরিব চিরদিন গরিবই থেকে যাবে। এই বোধই আমাকে আমার অভিজ্ঞতার একটা মরমি ক্ষেত্র দান করে। সেখানেই কবিতার জীবনসত্যটি মর্মরিত বাণীমূর্তি লাভ করে। নব্বই দশকের শেষলগ্নে এসে চরম এই আত্মদহনের পর্যায়টিতে যতগুলি কবিতা লিখেছিলাম তার মধ্যে “ঘাসকাটা”ই অন্যতম। সেই সময় প্রথম পাঠাই ” দেশ ” পত্রিকায় কবিতাটি। অবশ্য লেখার বছর দুয়েক পর। পাঠানোর পর পরই খুব দ্রুতই ৪ নভেম্বর ২০০২ সালের “দেশ” পত্রিকায় কবিতাটি প্রথমেই স্থান অধিকার করে প্রকাশিত হয়। কবিতার সঙ্গে একটি বড়ো চিত্রও সেখানে সন্নিবিষ্ট করা হয় এবং সেটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষুধার্ত হাড্ডি পাঁজরাসার একটা মানুষের হাতে ধরা একটা কাস্তের ছবি। ঘাসকাটা মজুর।

আমার প্রাণের আকুতি, কষ্ট, স্বপ্নভঙ্গ, অভাব সবই এই কবিতাটিতে ধরা আছে। আমি পার্টির লোককে সত্যিই একদিন বলেছিলাম, মিছিলে গেলে আর খেতে পাব না। সারাদিন বীরভূমের লাল ধুলো মেখে আমাকে ঘুরতে হবে। মিছিল করেও আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন আসবে না। কবিতাটি সেই অন্তর্জ্বালার সত্যতা থেকেই লেখা। এই সময় থেকেই বামপন্থী শাসনের অন্তঃসারশূন্য গর্জন সকলের কাছেই প্রতিভাত হতে থাকে। এবং পরবর্তী সময়ে তা প্রায় ভেঙে পড়ে। কবিতাটি যে একটা রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পটপরিবর্তনের ইংগিত হয়ে উঠেছিল তা অনেকেই স্বীকার করবেন।

সত্যি কথা বলতে গেলে কী, প্রকৃত কবিতার জন্ম তো কোনো সত্যতাকেই অবলম্বন করে। এই সত্যতা জীবনের চরমতম অভিজ্ঞতা, যেখানে দুঃখ কষ্টের ছোবলগুলি প্রতিনিয়ত ক্ষত সৃষ্টি করে। কয়েক বস্তা ঘাস কাটতে হত আমাকে রোদে জলে ভিজে না-খেয়ে। তা মাথায় করে বয়ে এনে গেরস্থ বাড়িতে দিতে হত। তারপর আঁচল পেতে নিতে হত গম অথবা খুদ।

শীতকালে অথবা বৃষ্টিদিনে বাড়িতেও থাকার তেমন জায়গা হত না। তালপাতার ও খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরে শীত ঢুকত অথবা বৃষ্টি। জ্বালানির জন্য কাঠ-পাতা জমা করে রাখতাম। অথবা খড় বিছিয়ে তার উপর শোয়ার ব্যবস্থা হত। দিন আনি দিন খাই লোকের বাড়ি। সেখানে কুকুর বেড়ালের আনাগোনা। কিন্তু পার্টির লোক মিছিলের জন্য আসত। সরাসরি এ কথাই কবিতায় উপস্থিত হল। আর শেষ দু লাইনে সমাজতাত্ত্বিক কার্ল মার্ক্সের উল্লেখ করে আরও গভীর ভাবে উচ্চারণ করা হল জীবনের ক্ষুন্নিবৃত্তির কথা। তিন দশক ধরে বামপন্থী শাসনের আস্ফালন দেখে দেখে আমাদের হৃদয়বৃত্তির আকাশ ক্রমশ ঊষর মরু হয়ে উঠেছিল। কবিতাটি সেই নিহিতার্থেই পুষ্ট হয়ে উঠেছে।

আমার প্রিয় কবিতার মধ্যে এটি যে অন্যতম, তার কারণ আমার দীর্ঘশ্বাস । আমার অসহায় জীবনের আত্মধ্বনি বা আর্তধ্বনি এবং অপশাসনের রাষ্ট্রীয় প্রতিভাস কবিতাটির দর্শনে উঠে আসে। খুব কম কথা বলেও একটা যুগের অমোঘ নির্ঘোষ হয়ে থাকবে কবিতাটি। ব্যক্তির ইতিহাসে, সময়ের ইতিহাসে , রাষ্ট্রের ইতিহাসে এবং সমাজতাত্ত্বিক দর্শনে কবিতাটির উচ্চারণ শোনা যাবে। অক্ষরবৃত্তের চালে ব্যঞ্জনাবহ সহজ সাবলীল শব্দ প্রয়োগে এবং নাটকীয়তায় কবিতাটির আত্মাকে খুঁজে পাওয়া যাবে।

সময়লিপির ভেতর অস্তিত্বের পরিমাপটিই বুঝিয়ে দিয়েছে কবিতাটি ।

প্রশ্ন : কবিতা লেখার কূটকৌশলে শব্দচয়ন ও চিত্রকল্পের সমন্বয় সাধনে কবির ভূমিকা কী হতে পারে?

উত্তর : ️

চিত্রকল্পই কবিতার আধার। সময়ের সাথে মানবজীবনের যে রূপান্তর, যে জটিল জীবন প্রক্রিয়া তাতে স্বাভাবিকভাবেই চিত্রকল্পও ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। চিত্রকল্প শুধু ছবি নয়, কল্পনা নয়, অলংকার নয় — ব্যক্তিজীবন ও সমাজসভ্যতার প্রগাঢ় এক বিপর্যয়ের ভাষা ও ভাষ্যরূপ, যার সঙ্গে সময়চেতনার গভীর সম্পর্ক থাকে; শূন্যতা ও হাহাকার থাকে; স্বপ্ন ও ইশারা থাকে; ধ্বংস ও বিচ্যুতির দীর্ঘশ্বাস থাকে। সুতরাং চিত্রকল্পকে কোনো সীমারেখা দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না।

জাঁ জ্যাক রুশো এই কারণেই বলেছেন –“ The world of reality has its limits; the world of imagination is boundless.” বাস্তবতাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা, জীবনকে মুক্তি দেবার প্রক্রিয়া এবং ভাবনাকে ব্যাপ্তির পথে নিয়ে যাবার স্বয়ংক্রিয় কৌশলটির নামই চিত্রকল্প। আর এটাই বাস্তব, কারণ নিজস্ব বাস্তবতার ক্ষেত্রভূমিই নির্মিত হয়। পাবলো পিকাসো নিজের উপলব্ধিতেই তা বুঝিয়েছিলেন বলেই বলেছিলেন “ Everything you can imagine is real.”

সাম্প্রতিককালের বাংলা কবিতায় চিত্রকল্পের ভিন্ন ভিন্ন রূপ চোখে পড়ে। সাধারণত দুই ধরনের চিত্রকল্প সৃষ্টি হয় — আত্মগত এবং বস্তুগত। আত্মগত চিত্রকল্পই বেশি সমাদর পায় কবির কাছে। কারণ ব্যক্তিজীবনের ক্ষয় ও শূন্যতা, ভাঙন ও দীর্ঘশ্বাস এবং অবদমন ও আদিমতার নানা রূপ প্রতীকায়িত হয়। এখানে এক একটি শব্দও সংকেত বা চিত্রকল্পের ভাষা হয়ে ওঠে। ব্যক্তিজীবনের প্রেক্ষাপটে এইসব চিত্রকল্প আশ্রিত বলেই ব্যক্তিহৃদয়ের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা ও স্বপ্নের মৃত্যু এবং আত্মসংকটের অভিন্ন রূপ পাওয়া যায়। কখনো আদিম অবচেতনের প্রভাব ঘটে।

অধিবাস্তবের কাছেও কবিকে আশ্রয় নিতে হয়। কারণ সমাজ-নিষিদ্ধ কোনো অবদমিত ইচ্ছাকে সসরাসরি প্রকাশ করা যায় না। তখন প্রতীক ও রূপকের অন্তরালে যেসব প্রকাশ করতে হয়। আবার নাথিংনেস বা এম্পটিনেসকেও হাহাকারের অন্তরালে রেখে দিতে হয়। তবু এই জীবনযাপনের স্মৃতি, প্রেমের অমোঘ বাতাবরণ, আত্মব্যঞ্জনের দহনে সর্বদা বিপন্নতার অন্তরদর্শী এক চিত্রকল্পের পর্যায় গতিময় হয়ে ওঠে। কবি মাসুদ মুস্তাফিজ ‘পোড়োমাটির চাঁদ-সমুদ্র’ কবিতায় লেখেন –

“তোমার মেঘচোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি প্রতিদিন ডুবে যাই ওই রোদনমনের রঙিন সমুদ্রকালের ভেতর সূর্যের শাদা হাওয়ার দিন ফিরে আসে

আর অন্যদিকে তোমার অবিরল কথা ফুরিয়ে গ্যালে অথবা না রাখা কথাগুলোর দুস্তরজনের অবাধ্য হাতে বুকের কাঁপন তোলে আর কিছু পূর্বের মেঘালু বাতাসের লুকানো আলোয় বিশ্বাস আমার দীর্ঘশ্বাসে মাটির যৌবনে সূর্যচোখ বিঁধে যায় চিনচিন করা অধরা তোয়াক্কা ছায়াগুলো দলবাঁধা ঘোলা শব্দের রাত্রিযাপনে জড়িয়ে ধরে সাহসী ভোরের বিশ্বাসী জলসত্রে”

নিজস্ব ব্যথাকে শূন্যতা ও অধরাকে, প্রেম ও প্রেমের মৃত্যুকে যখন ভাষা দেবার প্রয়োজন হয়, যখন বাইরে টেনে আনার প্রয়োজন হয় তখন তো এভাবেই লিখতে হয়। জীবন মহাজীবনের সমুদ্রে ভেসে ওঠে। প্রেমিকার চোখ আকাশ(মেঘচোখ) হয়ে যায়। মন রোদমনের রঙিন সমুদ্র যা সূর্যের শাদা হাওয়ার দিনে পরিণত হয়। কথা না রাখার দুস্তরজনের অবাধ্য হাতে বুকের কাঁপনে নৈর্ব্যক্তিক হওয়া এবং পূর্বের মেঘালু বাতাসের লুকানো আলোয় বিশ্বাস হয়ে দীর্ঘশ্বাসে রূপান্তরিত সবই চিত্রকল্পের ভাষা পায়। যার মধ্যে থাকে আত্মগত মানবীয় প্রবৃত্তিরই জাগরণ।

চিনচিন করা অধরা তোয়াক্কার ছায়া, যারা ঘোলা শব্দের রাত্রি-যাপনে জড়িয়ে ধরে সাহসী ভোরের বিশ্বাসী জলসত্রে। চিত্রকল্পগুলি মেটাফোরিক বোধের তীব্রতায় চলাফেরা করে- যা ব্যক্তিগত হয়েও অনন্তের সত্তায় মিশে যায়। মেঘচোখ, রোদনমন, সমুদ্রকাল, দুস্তরজন, মেঘালুবাতাস, অধরা তোয়াক্কা, বিশ্বাসী জলসত্র প্রভৃতি শব্দবন্ধগুলি এক-একটি রূপকাশ্রিত সংকেতের ধারক যারা চিত্রকল্পের প্রগাঢ় বিন্যাসকে অনিবার্য করে তুলেছে।

কবি অরবিন্দ চক্রবর্তী’র ‘মুখোশ নাচ’ কবিতাতেও এরকম রূপকাশ্রিত চিত্রকল্পের প্রয়োগ কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। বাহিরের ক্রিয়াসংযোগে অন্তরের প্রবাহমান ব্যাপ্তি কত তাৎপর্যপূর্ণ তা বোঝা যায় –

“স্ট্যাচুর মাথায় টোপরপরানো সূর্যোদয়,

তোমাকে বলা যায় — আমি আহ্লাদিত, স্বপ্নদুষ্ট নই

এবার যেকোনো শাড়িহিন রাত্রিকে কোলবালিশের পাশে শুয়ে

যেতে বলা যায়।

কিছু ঘুমপোকা ছিপি খুলে ভুতুম-পায়ে এগিয়ে এসে

আমাকে ব্র্যান্ডি ওয়াইনে বুঁদ হতে নির্দেশ করে…

সবুজ অক্সিজেন সরবরাহকারি এক সনাতন নাচুনেকে তখনো

দেখি

গোপন প্রেমিজ ডোবানো ফোয়ারাতলে

বেঁচে থাকার বাসনায় রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে স্নানঘরের অন্যান্য

মুদ্রামগ্নতায়।“

স্ট্যাচুর মাথায় টোপরপরানো সূর্যোদয় দেখতে দেখতে ‘আহ্লাদিত’ ভাবটির শুয়ে যেতে বলতেও এম্পটিনেস্‌ বা নাথিংনেস্‌কে মনে পড়ায়। ‘ঘুমপোকার’ বাস্তব উপস্থিতি না থাকলেও উপলব্ধির ক্ষেত্র থেকে তাকে নির্ণয় করা সম্ভব। কারণ ব্র্যান্ডি ওয়াইন যখন নেশার বস্তু তখন ঘুমপোকার ভুতুম পায়ে অগ্রসর হওয়ার চিত্রকল্পটিও জীবন্ত রূপ এনে দিতে পারে। আবার সবুজ অক্সিজেনের রঙ দেখে সনাতন নাচুনেকে কল্পনা করা যায় যা উদ্ভিজ্জ হলে হোক।

গোপন প্রেমিজ ডোবানো ফোয়ারাতল অথবা রক্তধুয়ে যাওয়া স্নানঘরের মুদ্রামগ্ন রূপ সবই বেঁচে থাকার বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আত্মক্ষরণের সীমানায় জীবনের অনন্ত প্রজ্ঞাকে স্থাপন করেছেন কবি। তাই শব্দগুলি আত্মসামীপ্য থেকে বহির্জগতের ব্যঞ্জনায় ধাবিত জীবন্ত রূপ লাভ করেছে।

পরাবাস্তববাদী ভাবনার আলোকে কবিরা নির্জ্ঞান মনের অন্ধকারেও পথ খুঁজেছেন। তাঁদের উপলব্ধিকে সেই স্তরে নিয়ে গেছেন। সেখানে বিশেষ্য বিশেষণ একাকার হয়ে গেছে। ক্রিয়া ব্যবহারে চিরাচরিত রীতিও পালটে গেছে। যে বাস্তবের মুখোমুখি কবিরা করতে চেয়েছেন তা সম্পূর্ণই আলাদা এক জগৎ যেন। কবি গোলাম রসুল ‘খড়ের হাওয়ায় গাড়ির শব্দ’ কবিতায় লিখলেন –

“ নিগূূূঢ় কালো

অজস্র ঘুম

কালোর আড়ালে চলে গেলে। স্বর্গের দুটি রঙ

এখন ভাসছে দু চারটি গর্ভবতী নৌকা

জানি না কে আর কারা জন্ম নিতে আসছে অদ্ভুত একা একা

মাটির তলায় বাজনা

কাদায় জ্বলছে আলো”

নিগৃঢ় কালো, অজস্রঘুম এবং স্বর্গের দুটি রঙ, গর্ভবতী নৌকা, মাটির তলার বাজনা, কাদায় জ্বলা আলো সবই আমাদের জানা দৃশ্য হতে পারে, তবু স্বপ্নদৃশ্যের মতো মনে হয়। মেটাফিজিক্‌সের ছায়াপাত ঘটে। ‘সূচে ভাসছে সমুদ্রের বীজ’ নামে আর একটি কবিতায় কবি লিখেছেন –

“দীর্ঘতর চাঁদ

সূচে ভাসছে সমুদ্রের বীজ

মাছের পিঠে জীবন্ত ঢেউ

মানুষের কবর আহার করছে দূরে

পুবে সূর্য ডুবছে স্বর্গের দুটি রঙে

জানিনা কিভাবে সন্ধ্যা নামছে আবার”

দীর্ঘতর চাঁদের ধারণা বাদ দিলেও কীভাবে সূচে সমুদ্রের বীজ ভাসে আমরা জানি না। মাছের পিঠে জীবন্ত ঢেউ জন্মালেও মানুষের কবর কীভাবে আহার করে জানি না। ‘স্বর্গের দুটি রঙ’ আমাদের জানা নেই। সমস্ত যুক্তিপরম্পরা ভেঙে দিয়ে যে অন্যতর বাস্তবের পটভূমি কবি দান করেন তা অধিবাস্তবেরই প্রয়োগ। ১৯২৪ সালে আঁন্দ্রে ব্রেঁতো যে ‘সুররিয়ালিজমম ম্যানিফেস্ট’ প্রকাশ করেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেন — “ A higher reality could be captured by freeing the mind from logic and rational control.” সুতরাং কবির চিত্রকল্পে কোন যুক্তিই গ্রাহ্য হতে পারে না।

ইমপ্রেশানিজম্‌ মতবাদের প্রভাবে সাম্প্রতিককালের কবিরা ব্যক্তিগত আবেগ-উপলব্ধিকে মূর্তিদান করতে গিয়ে এবং সেগুলি স্বয়ংক্রিয়তা দিতে গিয়ে বর্ণ ও আলোর কারুকাজকে চিত্রে রঙে ক্রিয়ায় প্রকাশ করে থাকেন। সেই কারণেই নিঃসঙ্গতা বা Alonenesses কে আবার কবিরা ‘অদ্ভুত একা একা’ বা Mysterious Person বা বিভ্রান্তিকর ব্যক্তি হিসেবে উপলব্ধি করেন। তাঁদের কবিতায়ও সেই Mysterious বা বিভ্রান্তিকর রূপ ফুটে ওঠে। কখনো জাদুবাস্তবের চিত্রকল্প হয়ে যায়। যেমন –

১) নাসির আহমেদ –

“আয়নায় তাকাতেও ভয়ে জড়োসড়ো হই অকস্মাৎ

আশ্চর্য ঘোরের মত আমার মুখের মধ্যে অন্য কারও মুখ!

এ কোন্‌ বিভ্রম তবে, শব্দ করে আয়না ফেটে যায়

দেখি সেই বিচূর্ণ আয়নায় গল্প বলে যায় আমারই নানীর মুখ”।

( আয়নার ভেতরে বিবর্তন)

২) ওয়ালী কিরণ –

“আমার ঘরের আয়না জাদুর আয়না এক –

তার সামনে গিয়ে যেই দাঁড়ালাম, দেখি –

আমি এক হিজড়ে বা মেয়ে মানুষের রূপ ধারণ করেছি”।

(জাদুর আয়না)

আত্মগতবোধের চিত্রকল্পই আজকের কবিতায় বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছে, কারণ বস্তু-পৃথিবীর objective দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় নেই বললেই চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ একসময় বস্তুগত চিত্রকল্পের প্রভাব ফেলেছিল। সেইসময় ‘এযুগের চাঁদ হল কাস্তে’ বলে দীনেশ দাসের কিংবা ‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে’ বলে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় লেখা হয়েছিল। শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখলেন ‘অন্তরে মেঘ করে/ ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে’ থেকে শুরু হল কবির অন্তর্মুখী বোধের যাত্রা। যেখানে ‘অবনি বাড়ি আছো’ ভাবের মধ্যেই ঘটল এর সূচনা, অর্থাৎ subjective দৃষ্টিভঙ্গির জাগরণ।

তবু বস্তুগত চিত্রকল্পের একটা ধারা সাম্প্রতিককালের কবিতাতে প্রতিফলিত হচ্ছে। যদিও কবির ব্যক্তিগত উপলব্ধি, শব্দপ্রয়োগ এবং বিশেষ্য ব্যবহারের নতুনত্ব আছে। এইসব কবিতাতেও এই সময় ও ভাবগত নানা অনুষঙ্গ বিভিন্নরূপে ফুটে ওঠে। কবি কুমার চক্রবর্তী ‘আমি’ কবিতায় নিজেকে, নিজের ব্যক্তিসত্তাকে এভাবে মেলে ধরলেন আলো-অন্ধকারের সামিপ্যসম্মেলনে —

“এই আমি, মূলত অন্ধকার, কিছুটা আলোয় মেশানো

প্রতিভাত করে না কিছুই, শুধু তার বিস্মৃত বিস্ময়

ছায়াসহ পড়ে আছে নির্জ্ঞান ভূমিতে, অথবা সে নাই,

চাকার মতন ঘোরে শূন্যতায়, মিশে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়।”

ব্যক্তিসত্তাকে আর ব্যক্তিরূপে প্রতিভাত করা য্যা না। আলো-আঁধারের তীব্র রহস্যময়তায় সে হারিয়ে গেছে। শুধু তার ছায়ামাত্র পড়ে আছে অবচেতনের নির্জ্ঞান ভূমিতে। শূন্যতায় পাক খায় শুধু অথবা হাওয়ায় হাওয়ায় মিশে যায়। এই ‘হাওয়া’ বস্তুজগতের নিরীক্ষায় বলয় নির্মাণ করে চলেছে। ব্যক্তিশূন্য হলে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে যায় আর বস্তুশূন্য হলে ‘হাওয়া’ হয়ে যায়।

Subjective -> Objective

Objective -> Nothingness

আর আমরা জানি ‘Nothingness not being nothing, nothingness being emptiness.’ (Isabelle Adjani). সুতরাং বস্তুর মধ্যেও এই শূন্যতার দর্শনটি সাম্প্রতিককালে ক্রিয়াশীল। বাহ্যিক বর্ণনা বা বিবৃতির আড়ালে কবি হৃদয়ের শূন্যতা বা হাহাকারই প্রতিস্থাপিত হয়ে চলেছে। মেটাফোরিক দৃশ্যেও এর অন্যথা ঘটে না। চাঁদ-ফুল-পাখির ছবি, কিংবা হরিণ-উট-বাঘ-জিরাফ সব প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জের ছবির প্রতীকেই বস্তু পৃথিবীর ধ্বংস, রিরংসা, হিংস্রতা, ক্ষয় ও প্রলুব্ধতার নানা চিত্র বহুমুখীন দৃশ্যকল্পে রূপান্তরিত। প্রকৃতির নানা ঋতু, মাস, জ্যোৎস্না-অন্ধকারের দৃশ্যে সভ্যতার অবক্ষয়ীরূপই চিহ্নিত বা প্রতিফলিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে তা পজেটিভও সেকথা না বললেও চলে। পাহাড়, কুয়াশা, নদ-নদী, সূর্য-নক্ষত্র সবই চিত্রকল্পে স্থান পায়। কবি শংকর লাহিড়ী ‘জলের শব্দ ও ধাবমান টাট্টু’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতায় লিখেছেন –

“ঘাসের ওপর লম্বা পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে

ফড়িং। ভোরবেলায় প্রসব বেদনায় জেগে উঠেছে

স্ত্রী পাখিরা, একে একে খসে পড়েছে তাদের পালক।

বিছান থেকে চাদর খসে পড়েছে।

উষ্ণ সাবলীল জলে ও সাবানে ভিজে যাচ্ছে

রাতের অসংখ্য হত্যাগুলি”।

খুব বস্তুগত কতগুলি চিত্রের বর্ণনা কবি দিয়েছেন, যা প্রকৃতিরই ক্ষেত্র থেকে নির্ণীত। ফড়িং এর হেঁটে যাওয়া, পাখিদের জেগে ওঠা এবং পালক খসে পড়া, বিছানার চাদরের খসে পড়া, জলে সাবানে মিশে যাওয়া। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় পাখিদের প্রসব বেদনা এবং জলে সাবানে ভিজে যাওয়া রাতের অসংখ্য হত্যা। যদিও দুটি বহুবচন শব্দ ‘অসংখ্য’ এবং ‘হত্যাগুলি’ পরপর ব্যবহার করেছেন কবি। তবু ‘সাবলীল জল’ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে বস্তু এখানে আর বস্তু থাকে না।

স্রোতের অবিমিশ্র ধারণায় মুছে যাওয়া নিরন্তর শূন্যতাকেই বন্দনা যেন। পাখির প্রসব বেদনায় প্রাণীকুলের সৃষ্টি প্রাচুর্যকে প্রতীকায়িত করেছেন। ‘অসংখ্য হত্যা’ সভ্যতারই নিষ্ঠুরতম প্রবৃত্তিকে তুলে ধরেছেন। সমগ্র কবিতাটিতেই এই সময়কে অতীতের নিষ্ঠুরতম যুদ্ধের প্রবৃত্তির সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন এক সেতুর প্রতীকে। টাট্টু ঘোড়ার প্রতীক তো ধাবমান সময়। সময় নিয়ে এসেছে ভোগ আর ভোগের প্রাচুর্য নারী। কবিতায় কবি যাকে ‘গণিকা’ বলেছেন। কারুকার্যের উত্থান, অহংকারী সভ্যতার হৃদয়হীন রূপটি কবিতার বিষয়। কিন্তু বিষয়ের অন্তরালে প্রাণের হাহাকারই জেগে ওঠে।

কবি সোমনাথ রায় ‘বিকেলের আলো’ নামে একটি কবিতায় লিখলেন –

“ভাঙা সেতু ডুবে থাকে

মাথার ওপরে পাক খায় শঙ্খচিল

তার শিসে রেফারির হুইসেল বাজে

চোখের আড়ালে কাঁপে বিদ্রূপে তটস্থ ভিজে কাঠ

পেছনে স্মৃতির গাঢ় সাদামাটা আলপনা নির্জনে জেগে আছে

তার বুকে ধরা থাক শেষ বিকেলের আলোটুকু”

ডুবে থাকা ভাঙা সেতু, মাথার ওপর পাক খাওয়া শঙ্খচিল, তটস্থ ভিজে কাঠ, সাদামাটা আলপনা, শেষ বিকেলের আলো সবই খুব চেনা চিত্রকল্প। কিন্তু এই বস্তুগত বর্ণনার মধ্যে দিয়ে যখন কবি ‘রেফারির হুইসেল’ শুনতে পান, ‘বিদ্রূপ’ দেখতে পান, স্মৃতির গাঢ় আলপনা দেখতে পান তখন বিকেলটি দিনের নয় — জীবনের বিকেল হয়ে যায়। The life-afternoon. চিত্রকল্পের বস্তুগত ইমেজে প্রতিষ্ঠিত জীবনেরই অপসৃয়মান এক ক্ষয় ও চিহ্ন।

যতই বস্তুগত ধারণার মধ্যে দিয়ে চিত্রকল্প গড়ে উঠুক না কেন, তাকে নিরীক্ষণ করার জন্য চোখ নয়, উপলব্ধির ব্যাপ্তি দরকার। কারণ ইমেজ চোখের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে না। মার্ক টুইন তাঁর “ A Connececticut yankee in king Arthur’s court” — এ বলেছেন — You can’t depend on your eyes when your imagination is out of focus”. অর্থাৎ চোখের বাইরেও চিত্রকল্পের বৃহত্তর একটা জগৎ থেকে যায়। এই জগতেরই সন্ধান দেন আজকের কবিরা।

বাস্তবের কদর্য ক্রূরতা একঘেঁয়েমিতে জীবনের পথ যখন সংকীর্ণ, তখন চিত্রকল্পের হাত ধরে কবিরা তাঁদের আশ্রয়ভূমি নির্মাণ করে চলেছেন। একদিকে দুঃখ, হতাশা, আত্মিকসংকটের অন্ধকার প্রতিমুহূর্তে কবিদের দিশেহারা করে চলেছে। তখনি দার্শনিকবোধের কেন্দ্রভূমিতে নিজেকে বিস্তৃত করার মধ্যে দিয়ে কবিরা এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন। জাতীয় জীবনে Waste Land বা পোড়োজমির চিত্রকল্প একসময় মারাত্মক হয়ে উঠেছিল। মূল্যবোধের অবক্ষয়ী চিত্র হিসেবেই তা এসেছে কবিদের কাছে। কিন্তু সম্প্রতি ব্যক্তিজীবনের শূন্যতায় কবিরা এক-একজন এক একটা তাঁবুর ভিতর প্রবেশ করেছেন। প্রতিমুহূর্তে এই পরিবর্তন ঘটে চলাকে সিসিল.ডে.লুইস লক্ষ্য করেই লিখেছিলেন –

“Yet the image is the constant in all poetry and every poem is itself an image. Trends come and go, diction alters metrical, fashions change, even the elemental subject-matter may change almost out of recognition: but metaphor remains, the life-principle of poetry the poet’s chief test and glory.” (The Poetic Image)

#storyandarticle

https://storyandarticle.com