ভারতে এই মুহূর্তে এডুকেশন মার্কেটের ভ্যালু প্রায় $700-800 মিলিয়ন, সেটা দশ বছরে বেড়ে $30 বিলিয়ন হতে পারে বলে ধরা হচ্ছে।

 

Story and Article

অনলাইন লার্নিং অ্যাপ এবং...

লিখেছেন : প্রোজ্জ্বল পাল

প্রথমে বাছাই করা হবে স্কুলে কারা সাইন্স নিচ্ছে। তারপর জিজ্ঞেস করা হবে তাদের মধ্যে কারা নিট দেবে, কারা জেইই দেবে, কারা দুটোতেই বসবে। তারপর তাদের একদিন নিয়ে যাওয়া হবে সেন্টারে।
বাস আসবে সেন্টার থেকে। সেই বাসে করে সব ছাত্রছাত্রী স্কুল থেকে যাবে কোচিঙে। বিরাট মোজাইক করা সেন্টার, সিলিং থেকে আলো পিছলে যাচ্ছে, সবার আলাদা আলাদা বেঞ্চ। সেইখানে গার্জেন আর স্টুডেন্টদের আলাদা আলাদা করে বসিয়ে দুটো তিনটে ডেমো ক্লাস নেওয়া হবে। গার্জেনদের বোঝানো হবে কেন এই কোচিঙে না 'এনরোল' করলে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট বা কেন এইখানে এক্ষুণি ভর্তি না হলে আপনার সন্তান, আপনার অপার সম্ভাবনাময় সন্তান খবরের কাগজের প্রথম পাতায় টপারের বিজ্ঞাপনে জায়গা পাবে না। এসি চলবে ঘরে। প্রোজেক্টর চলবে দেওয়ালে। আর শেষে ভাত, কাতলা কালিয়া, মাংস, আনারসের চাটনি।

পুরো কোর্সের খরচ, নিট হলে পঁচাশি হাজার টাকা, এক বছরের পুরোনো হলে পঁচানব্বই হাজার টাকা। ক্লাস ইলেভেন থেকে হলে জেইই একলাখ পঁয়ত্রিশ। আর শুধু স্টাডি মেটেরিয়াল কিনতে চাইলে মোটামুটি কুড়ি পঁচিশ হাজার টাকা দাম। বাড়ি বসে টপ ক্লাস স্টাডি মেটেরিয়াল সল্ভ করবে স্টুডেন্ট। সেই জোরে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার।
অথবা এত দেরী করলে চলবে না। একদম ক্লাস ওয়ান থেকেই ভর্তি হয়ে যাক কোচিঙে। ওয়ান থেকে টেন অবধি নতুন স্কিম চালু হয়েছে এখন অনলাইনে। বাড়ি বসে অ্যাপে সব লেসন সুন্দর করে সাজানো, হিন্দী আর ইংলিশে। সেখানে আলাদা ভিডিও, আলাদা টাস্ক, দুর্দান্ত গ্রাফিক্স, যখন ইচ্ছে ক্লাস। ক্লাস ফাইভের ম্যাথ আর সাইন্স ক্লাসে এনরোল করার খরচা মাত্র ছাব্বিশ হাজার টাকা।

এইটুকু খরচা করবেন না? আপনি জানেন না আপনার ছেলে সাইন্স নেবে মাধ্যমিকের পর? আপনি জানেন না আপনার মেয়ে ডাক্তার হবে? ওকে এখন থেকে তৈরী হতে হবে তো! এই প্যানডেমিকের সময়ে তো স্কুল বন্ধ। বাচ্চাদের স্কুল কবে খুলবে কেউ জানে না। স্কুলের বৃদ্ধ বয়ষ্ক ইন্টারনেটে অনভিজ্ঞ স্যার অনলাইন ক্লাস করাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, ভিডিওয় তার শুধু টাক দেখা যাচ্ছে, এই তো সেদিন লিঙ্ক থেকে ক্লাসে ঢুকে একটা অচেনা ছেলে লিখে এসেছে,'স্যার আপনার মেয়েকে একটু আনুন না ভিডিওয়'। সেটার স্ক্রিনশট আছে আপনার ছেলের কাছে। এইসব করে পড়াশোনা হয় বলুন তো!

স্কুলে পড়াশোনা হয় আর? শুধু স্কুলে পড়ে থাকলে শিখবে কিছু? প্রাইভেট টিউটর আছে? কী হবে প্রাইভেট টিউটরে? তারা এই সেন্টারের মতো কোয়ালিফায়েড? তাদের প্রজেক্টর আছে? বেঞ্চ আছে কোচিঙে? আলাদা স্টাডি মেটেরিয়াল দেয়? সবার জন্য আলাদা ল্যাপটপ? ফালতু একটা ছেলে যার নিজেরই চাকরী নেই, তার কাছে কোন ভরসায় তুলে দেবেন নিজের সোনার টুকরোর ভবিষ্যৎ!

তারচেয়ে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, পড়াশোনা অনলাইন হয়ে গেছে। গতবছরের লকডাউনের পর থেকে অনলাইনে পড়াশোনার স্ক্রিনটাইম বেড়েছে তিরিশ শতাংশ। বাউজুস, যারা আগামী বেশ ক'বছর আইসিসির সবকটা ইভেন্ট স্পনসর করবে, তাদের শুধু লকডাউনেই 33 মিলিয়ন নতুন ইউজার হয়েছে, আর আনঅ্যাকাডেমীর ইউজার বেড়েছে 40 মিলিয়ন। বাইজু আকাশ ইন্সটিটিউটকে কিনেছে মাত্র তিয়াত্তর হাজার কোটি টাকায়। শুধু দুহাজার কুড়িতেই ভারতের নানা Edtech সংগঠন (শব্দটা চিনে রাখুন, educational technology) প্রায় 2.22 বিলিয়ন ইউএস ডলার ফান্ডিং পেয়েছে। শুধু বাইজুস এর নেট worth এখন পনেরো বিলিয়ন ইউ এস ডলার। আর এইটাই ভবিষ্যৎ।

ভারতে এই মুহূর্তে এডুকেশন মার্কেটের ভ্যালু প্রায় $700-800 মিলিয়ন, সেটা দশ বছরে বেড়ে $30 বিলিয়ন হতে পারে বলে ধরা হচ্ছে। এই মুহূর্তে ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ, নিট, জয়েন্ট, নানা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, ইউপিএসসি থেকে শুরু করে টিচারদের অনলাইনে পড়ানো শেখানোর অ্যাপ মিলিয়ে প্রায় 4530 টা edtech স্টার্টআপ আছে ভারতে। আপনার ছেলে বা মেয়েকে শিগগির এগুলোয় ভর্তি করান। টুয়েলভ অবধি অপেক্ষা করবেন না, ফাইভে ভর্তি করান। স্কুলকে গুলি মারুন, আর্টস গ্রুপ গুলি মারুন, আর বাকি সব গুলি মারুন, এখানে শুধু হিন্দী আর ইংলিশে ক্লাস হবে (এমনিও আপনি ছোটবেলা থেকে আপনার বাচ্চাকে 'বেটা, কুকুর না, ডগি বলো' শিখিয়েছেন।)


এবার কথাটা হলো, আপনার মাসিক আয় কত? সমীক্ষা বলছে ফেব্রুয়ারী দুহাজার কুড়ি থেকে ফেব্রুয়ারী দুহাজার একুশের মধ্যে ভারতে মোট সাত বিলিয়ন লোক কর্মহীন হয়েছে। ভারতের মোট গরীবের পরিমাণ পঁয়তিরিশ শতাংশ থেকে বেড়ে 50.4- 55.87 শতাংশ হয়ে গেছে (381-418 মিলিয়ন ভারতবাসী)। আপনার আয় কমেনি লকডাউনে? হাফ মাইনে পান নি? বাড়ির কারো কোভিড হলে কী হবে, লাখ টাকা কোথা থেকে আসবে সেই চিন্তায় বেশি বেশি করে হাত ধুয়েছিলেন না? অথচ আপনার ছেলে মেয়েকে শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানানোর পরীক্ষায় বসানোর প্রিপারেশনের খরচা লাখ খানেক। তার ওপর নেট প্যাকের ক্রমবর্ধমান খরচার কথা ছেড়ে দিলাম। আর স্কুল তো কবে খুলবে জানা নেই। স্কুলে শুধু চাল ডাল মাস্ক অ্যাক্টিভিটি টাস্ক।

ওদিকে আপনার সন্তানকে ডাক্তার হতেই হবে। ক্লাস ফাইভ থেকে হতে হবে। সে খেলবে না, কারণ ওই সময়ে ডাউট ক্লিয়ারিং লেসন আছে অ্যাপে। সে গল্পের বই পড়বে না, কারণ ওই সময়টা একটু টুয়েলভের বইগুলো ঘাঁটলে কাজ দেবে। সে আঁকবে না, চুপ করে বসে থাকবে না, হীরক রাজার দেশে দেখবে না, কোহলীর কভার ড্রাইভ দেখবে না, হ্যারি পটার পড়বে না, গল্প শুনবে না ঠাকুমার গা ঘেঁষে, সে স্কুলে যাবে না, কারণ স্কুলে কিচ্ছু হয় না, তার কোনো বন্ধু থাকবে না কারণ মক টেস্টে বন্ধুর মার্কস বেশি, সে শুধু পড়বে আর পড়বে আর পড়বে কারণ 'ওই যে দাদাটার কথা শুনলি না দিনে আঠেরো ঘন্টা পড়ত!' তাকেও সেটাই হতে হবে। হতেই হবে।

না হতে পারলে সেন্টারের নিজস্ব কাউন্সিলর আছে। সে ঠিক মোটিভেট করে দেবে। তাছাড়া তার পেছনে লাখ টাকা ইনভেস্ট করা প্রতি বছর। তাকে পারতেই হবে।

শুধু আপনি সমস্ত কাজ শেষ করে রাত্তিরের দিকে ফেসবুকে নিজের পুরোনো স্কুলবাড়ির ছবি শেয়ার করে লিখবেন,'ছেলেবেলার সেই স্কুলবাড়ি আর নেই।' আপনার মনে পড়বে ছোটবেলার কোন স্যারের কথা, সামনে টিচার্স ডে তো। মনে পড়বে ক্লাসে করা দুষ্টুমিগুলো। আপনি ফেসবুকে লিখবেন,'বেসরকারীকরণ ভালো।'

আর আপনার অলক্ষে সরকারী স্কুলগুলো মরে যাবে। গরীব জৌলুসহীন প্রাইভেট টিউটররা মারা যাবে। আপনার শিশুটিও একটি প্রোডিজি হতে গিয়ে প্রোডাক্ট হয়ে যাবে।
পৃথিবীর কোন ডাক্তার সারাবে এই মহামারী?

Prajjal Paul
তথ্যসুত্র:
1) Economic times (edtech এর সম্ভাবনা প্রসঙ্গে)
2) India Corporate Law ও IBFF (Edtech কম্পানীগুলোর ফান্ডিং প্রসঙ্গে)
3) Statista ও Indian Express (দারিদ্রের হার ও বেকারত্বের হার প্রসঙ্গে)।