অমিতাভ সরকার, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, ৯ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০৭৩, প্রচ্ছদ :প্রমিতা মণ্ডল, মূল্য ১০০ টাকা।

 

অমিতাভ সরকার


সব পথই হারিয়ে গেছে রূপকথার অসীমে

☃️

তৈমুর খান 

 🌈


 প্রাত্যহিকের অজস্র কর্মধারায় আমাদের জীবনযাপনের ক্রিয়াগুলিতে যে ভাবনার উদয় হয়, যে অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়, যে ক্ষতি ও ক্ষতের সৃষ্টি হয়—সেসব অভিজ্ঞতাকেই একযোগে ছন্দোবদ্ধ করেছেন অমিতাভ সরকার। তাঁর কাব্যের নাম 'পথ'(প্রথম প্রকাশ আশ্বিন ১৪২৮)।  এই 'পথ' অনেকগুলো রাস্তার সমাবেশে সৃষ্টি হয়েছে। যে রাস্তাগুলিতে আমাদের সভ্যতা প্রবহমান। যে রাস্তাগুলিতে আমাদের জীবন অতিবাহিত। যে রাস্তায় দিন ও রাত নেমে আসে। যে রাস্তায় স্বপ্ন ও হতাশা জেগে ওঠে। যে রাস্তায় আমাদের বিবাহ ও মৃত্যু চলে যায়। যে রাস্তার পাশে আমাদের জীবনের লেনদেন চলতে থাকে। সেই রাস্তাকেই অমিতাভ সরকার 'পথ' করে তুলেছেন। তাই তাঁর 'পথ' চিরন্তন, বহুগামী, আদি-অন্তহীন, দৃশ্যে-অদৃশ্য স্বয়ংক্রিয় যাতায়াতের মাধ্যম। এই ব্যাপক ও বহুমুখী ব্যঞ্জনায় দুই বর্ণের শব্দটিকে ব্যাপ্তি দান করেছেন। সুতরাং কাব্যটি নির্ণীত দর্শনের প্রজ্ঞায় নান্দনিক এক যোগ্যতা অর্জুন করেছে তা বলাই যায়। বিংশ শতাব্দীর আমেরিকান কবি থিওডোর রোথকে বলেছিলেন:

"Over every mountain there is a path, although it may not be seen from the valley."

(Theodore Roethke)

 অর্থাৎ প্রতিটি পাহাড়ের উপরে একটি পথ রয়েছে, যদিও এটি উপত্যকা থেকে দেখা যায় না।  এই পথটি হল প্রতীক। আমাদের বেঁচে থাকার সম্মুখে অনেক সমস্যার পাহাড় এবং পাহাড়ের উপরেও অনেক সমাধানের পথ রয়েছে। তা কিন্তু সবসময়ই আমাদের অবস্থান (উপত্যকা) থেকে দেখা যায় না। 

    কাব্যের প্রথমেই যে সমস্যার পাহাড় কবি উপস্থিত করেছেন তার নাম 'হরতাল'। হরতালে যখন পথ রুদ্ধ তখন পথ-খোঁজা কবিকেই সমস্যার সমাধান বাতলে দিয়েছে:

 "তবু ঘরের বাহির হওয়া

 ভাবনা আছে সেইটাই,

 পেটের টানে শরীর জানে

 পথ দেখাবে পথটাই।"

 ক্ষুধার্ত মানুষ নিশ্চিত একটা কিছু সমাধান খুঁজে পাবেই। প্রতিটি শব্দের মধ্যেই জীবনের ব্যঞ্জনাকে কবি বৃহত্তর করে তুলেছেন। 'পথ' সেই অর্থেই ব্যবহার করেছেন:

 "সাদা-কালো জীবনের ধুলো আলো চায়।

 চেনা-জানা যা ছিল তা হাসি অচেনায়।

 তবু এজীবন-হাট রোজ মাঠ পায়।

পথের পাঁচালী পড়া মতের ইশারায়।"

          কিন্তু কাজের চাপ গুণকে নষ্ট করে। অনেক পথের দাবি নিয়ে পথ আটকে দাঁড়ায়। শেষ পরিণতি কি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে? না, পারবে না। পথ পথেই হারিয়ে যাবে।পৃথিবী ধোঁকায় উড়ছে। শব্দভেদীর রংমশালে কিছুটা  জলছবি ফুটে ওঠে, তা কাব্যেরও শিহরন হয়। কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য। তাই কবির প্রশ্ন: 

"কবিতা জাগিয়ে কবি নিজে সে কী পায়?"

  কবি কিছুই পায় না। কবি শুধু:

  "পথচলা দূর মন খুঁজে যায়

 বালিয়াড়ি জীবনের ধূ-ধূ মাঠ;

 কবিতারা ফিরে আসে এভাবেও।"

   জীবনের পিছল পথটা পিছলই থেকে যায়। সভ্যতার তেলেসমাতি কারবার চলতে থাকে। রবীন্দ্রনাথের গানও পাল্টে যায়। জীবন হয় বকম বকম খোঁচা খাওয়া পায়রা। 'বলো হরি'র কাছেই শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ। সুতরাং মনের মানুষ মনেই খুঁজতে হয়। 'লজ্জার লজ্জা পাওয়া' দেখতে দেখতেই সকলকে নিজের পথে একলা হতে হয়।

   স্বরবৃত্তের সহজ চালে, কোথাও অক্ষরবৃত্তের মিশেলে কবিতাগুলি উপলব্ধির উত্তাপে প্রবাহিত হয়েছে। জীবনকে দেখে, জীবনের গতিকে পরিমাপ করতে চেয়েছেন কবি। তাই কবিতাগুলিতে আকাশ নিসর্গ বর্ষা মেঘ সন্ধ্যা উষ্ণায়ন গোধূলি বারবার ফিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও এসে উপস্থিত হয়েছেন। কবি সকলের মধ্যেই একটি চিরন্তন পথকেই আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। যে পথে কখনো মন, কখনো সুর, কখনো রাত্রি, কখনো স্বপ্ন, কখনো ধ্বংস হেঁটে গেছে। অবক্ষয় এবং মূল্যবোধহীন সমাজের তথা সভ্যতার সংকটে যে বাধা বা সমস্যা ঘনীভূত হয়েছে, তাতে কোনও পথই আর লক্ষগোচর হয়নি। সব পথের অন্বেষণেই প্রশ্নদীর্ণ সংশয় পীড়িত কবি নিজের কাছেই ফিরে এসেছেন। তাই শেষ কবিতা 'প্রেম-ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে'-এর শেষ লাইনটি লিখেছেন: 

'সাগরের গভীরতা বেশতো। সবটা বুঝেও যেটা না-বোঝা।

 মধুবালা আজও সেই অধরা।"

  প্রেমিক পুরুষেরা মধুবালাকে আর খুঁজে পায়নি। অর্থাৎ সব পথই হারিয়ে গেছে রূপকথার অসীমে। শতাধিক কবিতার কাব্যটি আশাকরি পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হবে।

✨

পথ : অমিতাভ সরকার, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, ৯ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০৭৩, প্রচ্ছদ :প্রমিতা মণ্ডল, মূল্য ১০০ টাকা। 


(ছবিতে অমিতাভ সরকার ও তাঁর কাব্যগ্রন্থ)