জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে আর কবিকে গাছ হয়ে থাকার অভ্যাস করতে বলেছে।

প্রশান্ত দেবনাথ


আত্মসত্য অন্বেষণের কবিতা 

🗣️

তৈমুর খান 

🍁


 "এই মন মরে গেলে শরীর কাঠামো হয়ে থাকে" এরকমই একটি পঙক্তি লিখে শুরু হয়েছে প্রশান্ত দেবনাথ এর কাব্য 'কৃষ্ণপক্ষের কবিতা'(প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০২২)। সমগ্র কাব্যগ্রন্থের মধ্যেই কবি এই আত্মসত্য আত্মআবিষ্কারের পথ অন্বেষণ করেছেন। এই প্রসঙ্গে শেক্সপিয়ারের 'হ্যামলেট' নাটকের একটা উক্তি মনে পড়ে: "This above all; to thine own self be true."

অর্থাৎ এটাই সবার উপরে; তোমার নিজের সত্য। 

  এই সত্যকেই অনুধাবন করে বারবার কবি নিজের কাছে ফিরে এসে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে চেয়েছেন। তাই কাব্যের শেষ কবিতার শেষ পঙক্তিটিতে লিখেছেন:"নিভৃত শব্দের খোঁজে ক্ষারজলে হাঁটি"। কাব্যের প্রতিটি শব্দকেই আমার নিভৃত শব্দ বলে মনে হয়েছে। কারণ কবি যে নিজস্ব বৃত্ত রচনা করেছেন সেখানে সর্বদা আত্মঅবস্থান, আত্মক্ষরণ এবং আত্মশরণেরই এক সমন্বয় ঘটেছে। বোধের মূল উৎসে সেই আত্মরতিকেই প্রজ্ঞার ব্যাপ্তি দান করতে চেয়েছেন। কবিতায় উল্লেখ করেছেন:

"নির্জন সন্ধ্যার প্রান্তে ডাইরির পাতা ওড়ে

 জন্মদাগে ঝরে পড়ে বিষণ্ন কদম

 লেখাগুলো মনে হয় আমনের খেতজুড়ে মায়া"

 কবির এই ডায়েরির পাতায় আত্মার স্বরই শোনা যায়।কবির শব্দের বাগানে বিষণ্ন কদমই ঝরে পড়ে। কবিতাগুলি মায়াবী ফসলের রূপ পায় তখন। 

   কাব্যের নাম কবিতায় কবি লিখেছেন:

"কবির উঠোন থেকে বাতিল কবিতা পোড়ানোর

                                                 গন্ধ আসে

আবার কোনোদিন দীর্ঘশ্বাসে পাণ্ডুলিপি ওড়ে" 

  তখন বোঝা যায় কবিতার কাছে তিনি কতখানি অকপট। কবিতাকে কখনও ছদ্ম বিলাসিতার শিল্প করে তোলেননি। উপলব্ধির তীব্রতাকেই শব্দবদ্ধ করতে চেয়েছেন। আর এই কারণেই বাতিল কবিতা পোড়াতে পেরেছেন। দীর্ঘশ্বাসে পাণ্ডুলিপিও উড়েছে। 'গোপন ডায়েরি থেকে'ও এই কবিকে আবিষ্কার করা যায়। যে প্রেম অধরাই থেকে গেছে, আর ফিরে আসেনি, সেই প্রেমের পাণ্ডুলিপির আয়োজন করেছিলেন নিজেকে হামিংবার্ড ভেবেই। অনুভূতি লিখে ফেলেছিলেন একবুক দিঘির শাপলার পাতায়। কিন্তু সেই প্রেমের সর্বনামটি দমনপুরের জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে আর কবিকে গাছ হয়ে থাকার অভ্যাস করতে বলেছে। এখন কবি সেই প্রেমের পায়ের ছাপ দেখেই ছুটে যান। দিনযাপনের হাহাকারের মধ্যেও তাকে স্মরণ করেন। রাত্রির সঙ্গে কড়ি খেলে নিজে নিজেই হেরে যান। তারপর কবিতায় লেখেন:

"আর খেলায় হেরে গেলে স্বপ্নের লাশ কাঁধে নিয়ে ঘুরি

 সুরকি বিছানো পথে চলতে চলতে

 খিদে পায়, কান্না পায়, ঘুম পায়

 আমি স্বপ্নের লাশ নামিয়ে রাখি জলে…"

 এই স্বপ্নের লাশ বহনকরা জীবনপথের পথিক কবিকে কারও চিনতে অসুবিধা হয় না। গাজন লিখতে গিয়ে যেমন এপিটাফ লেখেন, তেমনি ভালোবাসাকেও পাপোশের নীচে পড়ে থাকতে দেখেন। রবীন্দ্রনাথের গানের কাছেও নিজের শুশ্রূষা নেন। নিজের মায়ের কাছেই কবিতার দীক্ষা পান। যে কবিতা উঠে আসে গমক্ষেতের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট নদী থেকে। ডুয়ার্সের প্রকৃতি মানবী হয়ে ওঠে। কবির মনে হয় নোনাইয়ের জলে হলুদ রঙের পালক নিয়ে স্বপ্ন নামছে। তখন আবেগ ফিরে আসে।যে আবেগ চিরন্তন মানবিক প্রবাহ। আবার 'বাথান'ও কবিতার বিশাল ক্ষেত্রজুড়ে বিরাজ করে। কবি নিজেকে প্রশ্ন করেন:

 "বাথানের গল্পে এত মায়া?"

 এই প্রশ্নের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন:

"মেঘলা 

দুপুর আলুথালু করে দেয়,ঘুম আসে না রাতে"

 মৈষালবন্ধুর নানা কিংবদন্তির উপকাহিনি জেগে ওঠে। উত্তরবঙ্গের জনজীবনে যে কাহিনি আকীর্ণ হয়ে আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই কবিকেও তা আকৃষ্ট করেছে:

"শূন্যতায় রয়েছে এক মায়াবী ইশারা

মহিষের ডাকে রাঙা হয়ে উঠছে মৈষালের মুখ"

মৈষালকে কেন্দ্র করে কত লোকগান, আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন চলতে থাকে। জল-জঙ্গলের বন্ধনে গড়ে ওঠে নানা মিথ। কিন্তু মৈষাল আর কতদিন নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে? কোথাও একটা সংশয় থেকেই যায়।

    ৫৬ টি কবিতায় কবির ব্যক্তিজীবনের অনুষঙ্গগুলি যেমন প্রশ্রয় পেয়েছে, তেমনি ব্যক্তিচেতনার স্ফুরণও ঘটেছে। ব্যক্তিভাঙনের নিজস্ব স্বর উঠে এসেছে এই  নির্মেদ কবিতাগুলিতে। নিজের ভাষায় নিজেকে লেখা, নিজেকে এমন উন্মুক্ত করে দিতে ক'জন পারে:

"আমি জানি, আমার ডানা ঝাপটানোর শব্দে

 অনেকের ঘুম ভেঙে যায় ঘন কুয়াশার রাতে


 ক্ষমা করুন আমাকে, এই ব্যর্থ কবিকে…"

 নিজেকে 'ব্যর্থ কবি' বলার মধ্যে দিয়েই তিনি সার্থকতার সীমানায় পৌঁছে গেছেন। সহজ সরল অনাড়ম্বর প্রায় উপমাবিহীন কথনভঙ্গির এক মরমি আবেদন নিয়ে তিনি বাংলা কবিতা পাঠকের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

    ✨

 কৃষ্ণপক্ষের কবিতা: প্রশান্ত দেবনাথ, বিয়ন্ড হরাইজন পাবলিকেশন, বক্সা ফরেস্ট রোড, আলিপুরদুয়ার, পশ্চিমবঙ্গ, প্রচ্ছদ: কৌশিক বিশ্বাস, মূল্য-১৩০ টাকা।

🐦



(ছবিতে প্রশান্ত দেবনাথ ও তাঁর কাব্যগ্রন্থ)