মাঝে মাঝে চিন্তাগ্রস্ত সে। লালসার চোখগুলো তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।

 

Story and Article


লালসা // জয়নারায়ণ সরকার

একটার পর একটা ফ্ল‍্যাশের ঝলকানি। হাসি হাসি মুখে পোজ দিতে হয়েছিল শ্রাবণীর। সে তো বউভাতের সন্ধের ঘটনা। কিন্তু দুপুরে হাতে ভাতের থালা আর কাপড় ধরিয়ে ধীমান বলেছিল, সারা জীবনের ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম। এই কথাটা মনে পড়তেই শ্রাবণীর চোখে হালকা জলের আভা। হায় কপাল! বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দুজনের ব‍্যবধান বেড়েই গেল। এক সময় অতিষ্ট হয়েই ছাড়তে হল ধীমানকে। এখন থেকে আর কোনো কিছুর দায়িত্ব নিতে হবে না। শ্রাবণী আর পরজীবী হয়ে বাঁচতে চায় না। সে নিজেই কিছু করতে চায়।

শ্বশুরবাড়ির পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর মা বলেছিল, একটু মানিয়ে নিতে পারতিস। পাশে বসা বাবা থমথমে গলায় বলেছিলেন, অসম্মান নিয়ে বেঁচে থেকে লাভ কী! মা আর কথা বাড়ায়নি। সম্মানের সাথেই তো বাঁচতে চায় শ্রাবণী। কিন্তু এবার কী করবে! বাবার কাঁধে বোঝা হয়ে থাকবে কতদিন। প্রতিটা মুহূর্ত তাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। পাশের বাড়ির সন্ধ‍্যা কাকিমা বলেছিল, পাড়ায় নতুন আসা সমরবাবুর নাকি বড়ো বিজনেস। তার সাথে যোগাযোগ করলে একটা কিছু হয়ে যাবে। অবশ‍্য শ্রাবণী জানে যে পাড়ার দু-একটি ছেলেও ওর কাছে চাকরি করে। তারা তো এখন সংসার আমূল বদলে দিয়েছে। একদিন দুপুরে সমরবাবুর বাড়ি গিয়ে বউদির সাথে আলাপ করে আসে। এবং চাকরি যে খুব দরকার, সেকথা বলতেও ভোলেনি। বউদি অবশ‍্য আশ্বাস দিয়ে বলেছিল, কাল তো রবিবার, তোমার সমরদা বাড়িতেই থাকবে। যখন সময় পাবে চলে আসবে। আমি বলে রাখব।

সেদিনের রাতটা যেন কাটতেই চায় না। কতক্ষণে সকাল হবে সেই প্রতীক্ষায় বসে থাকে শ্রাবণী। এরমধ‍্যে দু-বার মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে ধীমানের নাম দেখতে পায়। রাত তখন বেশ গভীর। শ্রাবণীকে উৎকণ্ঠায় ঘিরতে থাকে। ধীমান ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেছে তো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডায়াল করতে গিয়ে থমকে যায়। দুজনের বোঝাপড়ার অভাব সে আজো বুঝতে পারে না। অহেতুক সন্দেহ নাকি অন‍্য মেয়ের প্রতি আকর্ষণ! প্রথম প্রথম মানসিক নির্যাতন। পরে গায়ে হাত তুলতেও পিছপা হয়নি। ওইসব দিনের কথা আর মনে রাখতে চায় না সে। কিন্তু মোবাইলে ধীমানের নামটা উঠলে বুকের ভেতরটা এখনো কেমন যেন করে ওঠে।

পরদিন একটু বেলা হতেই সে সমরবাবুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। কলিংবেল বাজাতেই বউদি দরজা খোলে। তারপর হেসে বলে, এসো ভিতরে এসো। তোমার দাদা ঘরেই আছে। ঘরে ঢুকতেই দেখে সমরবাবু কাগজ পড়ছেন। বউদি সামনের একটা চেয়ারে বসতে বলে ভিতরে চলে যান। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর সে কী বলবে বুঝতে পারে না। সমরবাবু খবরের কাগজের পাতা থেকে মুখ তুলে বলেন, তোমার বউদি আমাকে সব বলেছে। আমার অফিস এখান থেকে অনেকটা দূরে। রোজ যাতায়াত করতে পারবে?

শ্রাবণী মুখে কোনো কথা না বলে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। সমরদা এবার বলে, না না, তোমার কষ্ট হবে। তার চেয়ে অফিসের পাশেই আমার একটা ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে। তুমি বরং ওখানে থেকেই অফিস করবে। আর রোববার করে বাড়ি আসবে। নিজের মতো থাকতে পারবে। তবে তুমি কবে যাবে জানিও সব ব‍্যবস্থা করে দেব।
শ্রাবণী আর কোনো কথা বলেনি। কথাগুলো বলার সময় সমরদার চোখ দুটো চকচক করছিল। তাকে অবাক করেছিল প্রথম দিন এ রকম প্রস্তাবে। সে আর যোগাযোগ রাখেনি সমরদার সঙ্গে।


কী করবে বুঝে উঠতে পারে না শ্রাবণী। সে এবার চাকরির পরীক্ষার জন‍্য পড়াশোনা শুরু করে। প্রাইভেটে একজনের কাছে পড়তেও যায়। কর্মসংস্থানের নানা ট‍্যাবলয়েডও পড়তে শুরু করেছে। তবে যেখানে পড়তে যায় সেই বাড়ির সামনে একদিন ধীমানকে দেখেছিল। ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশের গলি দিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরেছিল বাড়ি। খানিকটা ভয়ও পেয়েছিল। বাড়ি ফিরলে কিছুটা উদভ্রান্তের মতো দেখায়।


মা জিজ্ঞেস করেছিল, তোর কি শরীর খারাপ লাগছে?
সে মাথা নেড়ে না বলে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে যায়।
মনের ভেতরটা কেমন তোলপাড় করতে থাকে। ধীমান কেন এসেছিল তা জানতে মনটা উৎসুকও হয়। আবার ভেতরে ভেতরে ভয়ও পায়। এ কথা সে কাউকে বলতে পারে না। খানিকটা উদাসীন হয়ে থাকে সে।


শ্রাবণীকে চা দিতে এসে মা বলেন, তোর কি হয়েছে বল তো?
শ্রাবণী মুখে একটু হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে, না কিছুই হয়নি। মিছিমিছি ভাবছ তুমি।
মা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কিছু না হলেই ভাল। আসলে মায়ের মন তো!

শ্রাবণী মায়ের পাশে বসে গলা জড়িয়ে বলে, তুমি বড্ড চিন্তা করো।


***
চিন্তায় চিন্তায় বাবার শরীর ক্রমশ খারাপের দিকে। শ্রাবণীও একটার পর একটা চাকরির পরীক্ষা দিতে থাকে। কিন্তু কোনোওটাতে সেভাবে সাফল‍্য দেখতে পারছে না। মাঝে মাঝে ব‍্যবসা করার কথাও ভাবে। পরক্ষণেই তা নাকচ করতে হয়। অত টাকা পাবে কোথায়!
ব‍্যাঙ্কের পরীক্ষায় পাশ করে শ্রাবণী। সেই খবর শুনে নিজেই বিশ্বাস করতে পারে না। দু-চোখ আবছা জলের ধারায় ভিজে ওঠে। বাড়িতে স্বস্তির বাতাস বইতে থাকে। অনেক লড়াইয়ের পর একটু নিজের মতো করে বাঁচার আশায় বুক বাঁধে। প্রথম পোস্টিং দূরে হওয়ায় প্রতিদিনই খুব ভোরে উঠে ছুটতে হয় স্টেশনের দিকে। সে কথা প্রথম দিন থেকেই কলিগরা জেনে গেছে। কিছুদিন যাওয়ার পর নতুন ম‍্যানেজার আসে ব্রাঞ্চে। সেদিন ট্রেন লেট করায় পৌঁছতে দেরি হয় শ্রাবণীর। হাজিরার খাতা ততক্ষণে চলে গেছে ম‍্যানেজারের ঘরে। সে ঘরের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। কী বলবে ভেবেই শঙ্কিত সে। কিন্তু কী আর করবে অবশেষে পরদা সরিয়ে ঢোকে। ম‍্যানেজার তখন কাজ নিয়ে ব‍্যস্ত। সে আস্তে আস্তে টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।


সৌম‍্যকান্তি চেহারায় বেশ লাগে ভদ্রলোককে। কাজের ব‍্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ করেন না। ম‍্যানেজার মুখ না তুলেই বলেন, আপনার তো দেখছি মাঝে মাঝেই দেরি হচ্ছে। আপনার অ্যাটেনডেন্স খুবই পুওর।


শ্রাবণী কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। ভেতরে ভেতরে নার্ভাস বোধ করতে থাকে। এবার ম‍্যানেজার ওর চোখে চোখ রেখে বলেন, কাছাকাছি কোথাও থাকার ব‍্যবস্থা করুন। রোজ যদি এভাবে লেট হয়, তাহলে চাকরি বাঁচানো যাবে না।


উৎকণ্ঠা নিয়ে শ্রাবণী বলে ওঠে, না স‍্যার... ওর কথা থামিয়ে ম‍্যানেজার বলেন, এই এলাকাতে আমার একটা ফ্ল‍্যাট ফাঁকা পড়ে রয়েছে। আপনি ইচ্ছে করলে সেখানে থাকতে পারেন। শ্রাবণী এবার তার চোখের দিকে তাকায়। সে সমরদার লালসার চোখ আবার দেখতে পায়। এবার সে বলে, আপনি বললেন স‍্যার, আমি একটু ভেবে দেখি, তাছাড়া বাবা-মায়ের সাথে আলোচনা না করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারব না।


টেবিলে রাখা খাতায় চটপট সই করে বেরিয়ে আসে শ্রাবণী।

আস্তে আস্তে হেঁটে নিজের সিটে গিয়ে বসে। মাথার ভেতরটা কেমন দপদপ করছে। কাউন্টারের সামনে কাস্টমারের ভিড় থাকলেও মাঝে মাঝে চিন্তাগ্রস্ত সে। লালসার চোখগুলো তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।