নদীয়ার রানাঘাটে তার সুনাম তখন‌ও ছিল এবং আজ‌ও যারা তাকে চেনেন না

 

Story and Article

অজানা ইতিহাস

শ্রী প্রীতম গোস্বামী
আজ বোধহয় ঠাকুমা বেশ খোশমেজাজে আছেন। যে কাজের চাপে সঙ্গীত নিয়ে চর্চা করার সময় পান না সে আজ হঠাৎ ৪০ বছরের পুরনো হারমোনিয়ামটি টেনে নিয়ে গান করা শুরু করলেন। ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার তো!

আমাদের বাড়িতে সঙ্গীতের একটি বড় ইতিহাস লুকিয়ে আছে ——
আমাদের বাড়িতে সঙ্গীতকে ঘরে প্রবেশ করানোর মূল মানুষ যিনি ছিলেন তিনি হলেন আমার স্বর্গীয় ঠাকুরদাদা শ্রী নন্দ গোপাল গোস্বামী। ঠাকুমার সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক দেখা যায় শৈশব থেকেই।

ঠাকুমারা ছিলেন আমাদের মতন কৃষ্ণোপাসক।আমাদের মতোই কৃষ্ণ পূজারী। তাই খোল -কর্তাল ছাড়া তাদের বাড়িতে বাজনা বাজানোর বিশেষ উপকরণ‌ই বাহুল্য ।কাঁচের চুড়ি দেওয়ালে আঘাত করে ঠাকুমা গান ধরতেন। ফলে চুড়ি তৎক্ষণাৎ ভেঙে যেত।

ঠাকুমার বিবাহ হয় ১৯৮০ সালে ; বাবা এবং জ্যেঠু জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮১ও ১৯৮৪ সালে। বাবা এবং জ্যেঠু ছোটোবেলা থেকেই তবলা বাজানো শিখতেন। একদিন ঠাকুরদাদা বললেন -" ওরা যখন তবলা বাজানো শিখেছে তখন তুমি গান করা শেখো। আমি টিচার নিযুক্ত করে দেবো ক্ষণ ।

ঠাকুমা গান শেখা আরম্ভ করলেন ১৯৯৫ সাল থেকে। তাকে গান শেখাতেন নদীয়ার বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী শ্রীমতী সুকন্যা গোস্বামী( বর্তমানে আমি তার কাছে শিক্ষা নিয়ে থাকি)।

সুকন্যা দেবীর একজন সঙ্গীত গুরু ছিলেন। তার নাম হল ওস্তাদ শিব কুমার চট্টোপাধ্যায়। নদীয়ার রানাঘাটে তার সুনাম তখন‌ও ছিল এবং আজ‌ও যারা তাকে চেনেন না কিন্তু তারা তার গান শুনেছেন তাদের আস্যে এখন‌ও তার নাম শোনা যায়। আমি তাকে চাক্ষুষ কখনো দর্শন করি নি, কারণ তিনি আমার জন্মের পূর্বে তিনি অমৃতলোকে যাত্রা করেন। তবে আমার ঠাকুমা তাকে চাক্ষুষ দেখেছেন।

সুকন্যা দেবী হারমোনিয়াম বাদিকা হিসেবেও ওস্তাদজীর সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজাতেন আকাশবাণীতে।

ওস্তাদজী অমৃতলোকে যাত্রা করেন ১৫ই মে ১৯৯৩ সালে। তাকে নিয়ে তার এক শিষ্যা লিখেছেন —
"গুরুদেবের এমন ইন্দ্রপতনের কোনো পূর্বাভাসই ছিলনা, সম্পূর্ণ সুস্থ, সজীব প্রাণবন্ত একজন মানুষ-- সঙ্গীত সাধনা থেকে অপূর্ব মন্ত্রোচ্চারণে পূজোপাঠ, ফুলগাছের পরিচর্যা থেকে প্রিয় পোষ্য 'লাকি'কে স্নান করানো--জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রের অভ্যস্ত, অনায়াস বিচরণ সেদিনও জারি ছিল।

বিকেলে আমার জেঠিমা কলকাতায় রওনা হয়েছিলেন আমার জ্যাঠতুতো দিদির কাছে, ও'বাড়িতে সে রাতে কেবল ছিলেন বড়দা আর বৌদি.. পাশের বাড়িতে বাবা-মা-আমি। আমার মা তাঁকে দেখেছিলেন বিকেলে,অভ্যস্ত দক্ষতায় বোগেনভেলিয়া গাছের টবের মাটি খুঁড়তে। রাত দশটা নাগাদ দাদা হঠাৎ উদভ্রান্তের মতো বাবাকে এসে বললো,"কাকামণি, বাবা কেমন যেন করছে, তাড়াতাড়ি এসো".. দৌড়ে গেলাম তিনজনেই.. দুঃসহ যন্ত্রণার তীব্রতায় তিনি তখন অর্ধচেতন, অচিরেই জ্ঞান হারালেন.. ততক্ষণে চলে এসেছেন ডাঃ চিন্ময় দত্ত ও ডাঃ সৌরেন্দ্র নাথ নাগ..প্রাণপণ প্রচেষ্টা, জীবনদায়ী ইঞ্জেকশনের প্রয়োগ কিন্তু ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের নিয়তিকে খন্ডাতে পারলোনা..স্তম্ভিত, হতভম্ব, অসহায়,দাদা-বৌদি-বাবা-মা-আমি!

চিন্ময় জেঠু গম্ভীর স্বরে বললেন ''মুখে গঙ্গাজল দাও''.. মনে আছে আমার, তিনতলার ছাদের পূজোর ঘর থেকে গঙ্গাজল এনে তাঁর মুখে দিয়েছিলেন আমার মা.. জীবনে সেই প্রথমবার চোখের সামনে আমি কোনো 'মৃত্যু' দেখেছিলাম তাও আবার নিজের আত্মীয়ের.. ভয়ঙ্কর দমবন্ধ,হাত-পা ঠকঠক করা এক অনুভূতি ! একটি সাঙ্গীতিক যুগের অবসান ঘটিয়ে, নিঃশব্দে-অতর্কিতে আসা মৃত্যুর হাত ধরে, মৃত্যুকে ঠিকমতো বুঝতে না পেরেই, কিছুক্ষণের মধ্যে চিরবিদায় নিয়েছিলেন আমার 'টুটু'(আজন্ম ঐ নামেই সম্বোধন করেছি তাঁকে),যাঁর তুলনা তিনি ছিলেন নিজেই, স্বীয় সঙ্গীত-ঐশ্বর্যের এক অমূল্য প্রতিষ্ঠান।

আজ চোখ বুজলে সে রাতের কথা যখন মনে পড়ে, মনের ভেতর ভেসে আসে আমাদের চিরপ্রিয়, অকাল-মৃত্যুপথযাত্রী, স্মরণীয় শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের মৃত্যুর আগে লেখা শেষ দুটি লাইন--
"ঘনিয়ে এলো
ঘুমের ঘোর
গানের পালা
সাঙ্গ মোর।"
এই মর্মাতিক বেদনাকে সামলে সুকন্যা দেবী আমার ঠাকুমাকে গান শেখিয়েছিলেন। ঠাকুমার গান শেখার প্রবৃত্তি থাকলেও কাজের তাগিদে সে আর গান শিখতে পারলেন না। তিনি গান স্থগিত করলেন ২০০০ সালে। তিনি সঙ্গীত নিয়ে চর্চা করেছেন মাত্র ৫ বছর। তার গান স্থগিত করার অন্যত্র কারণ‌ও ছিল। যে ঠাকুমাকে গান শেখার কথা প্রকাশ করেছিলেন তিনিই যখন চির জীবনের ছুটি নিয়ে চলে গেলেন তখন আর গান শিখে কি লাভ ? এই অভিপ্রায় তিনি গানকে ত্যাগ করলেন।

ঠাকুমার পর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলাম আমি ও আমার কনিষ্ঠ মনোশিষ। আমি শিখতুম গান আর ও শিখত তবলা। বহু স্টেজ প্রোগরাম আমরা একত্রে করেছি। আমাদের দুজনের‌ই নাম রয়েছে নদীয়া জেলার খাতায় ( Distinction)। আমার নাম লেখা ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতে ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে। এবং ভায়ের নাম ছিল তলায়।

আমরা দুজনেই সঙ্গীত চর্চা করেছি চন্ডীগড়ের অধীনে। সেই সঙ্গীত সংস্থার নাম হল প্রাচীন কলাকেন্দ্র। তাছাড়াও আমরা বহুবার অনুষ্ঠান করেছি আলাপ সঙ্গীত শিক্ষায়তনে।

সঙ্গীত যে আমাদের কাছে কেবল গান‌ই নয়। সঙ্গীত আমাদের সকলের কাছে একজন বন্ধুও। আপনার সুখ, দুখ সব‌ই এই সঙ্গীতের ভিতর দিয়েই প্রকাশ করা যায়।

শ্রী প্রীতম গোস্বামী