প্রায় এক বছর অপেক্ষার পর আলোর রেখা দেখতে পেল। মাল্টিন‍্যাশনাল কোম্পানি, শুরুতেই স‍্যালারিটা বেশ ভাল।

 

Story and Article

বীজ // জয়নারায়ণ সরকার

রাস্তার মোড়ের মাথায় যে বটগাছটা আছে ওই অবধি যেতে পারবি। ওটা পার করে তোর যাওয়া চলবে না। মায়ের এই নিষেধাজ্ঞা শুনে সৌম্য মাথা নাড়ে। তখন তো সে ক্লাস ফাইভে পড়ে। তবে সে দেখেছে ভাইবোনেরা ওই গাছটাকে তোয়াক্কা না করে দিব‍্যি চলে যায়। মায়ের এই ফরমান শুধুমাত্র তার জন্য।


বন্ধুরাও কেউ কেউ বলে, চল না একটু ঘুরে আসি। কিন্তু সৌম্যের যে লক্ষণরেখা ভেদ করে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। মা একবার জানলে আর আস্ত রাখবেন না। তাই করুণ মুখে বন্ধুদের না করে দেয়। তখন থেকেই মনের ভেতর জেদ ঘনীভূত হতে থাকে। কী আছে ওইদিকে, কেনই বা মা যেতে বারণ করছেন? কিছুতেই বুঝতে পারে না। মাঝে মাঝে ওই বটগাছটা ছাড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে সৌম্যের। গাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে তখন মায়ের কথাগুলো ঝড় তোলে মনে। ভয়ে হাতে-পায়ে ঘাম জমতে থাকে। আবার ফিরে আসে বাড়িতে। এদিকে সৌম্যকে দেখতে না পেয়ে মা খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে। সে এসে দাঁড়াতে মায়ের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। শঙ্কিত গলায় মা বলে, কোথায় গিয়েছিলি?

সৌম্য কোনও কথা বলে না চুপ করে থাকে।
কিছুক্ষণ পরে বাবাও তো ফিরলেন বাড়ি ওই রাস্তা ধরে, কই, মা তো একটা কথাও জিজ্ঞেস করল না। শুধুমাত্র সৌম্যের বেলায় যত নিষেধ! কেন মা এ রকম করে বুঝতে পারে না সৌম্য। মায়ের এই রকম উদগ্রীব অবস্থা দেখে সে বাড়ির সামনেই খেলে বেড়ায়।

কোনও কোনও দিন বাবা-মায়ের কথা কানে আসে সৌম্যের। তাকে নিয়ে চলছে দুজনের বাকযুদ্ধ। বাবা বলছেন, কতদিন এভাবে তুমি আটকে রাখবে সৌম্যকে। একদিন তো ও বড় হবে, তখন কি পারবে আটকাতে?
বাবার এই প্রশ্নের উত্ত‍রে মা কী বলল সেটা সে শুনতে পায় না।

***


অফিসে প্রথম দিন আসার সময় জয়া কপালে চন্দনের ফোঁটা লাগিয়ে তবে ছেড়েছিল। অফিস থেকে ফেরার পর জয়া প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করে তুলেছিল। অবশ‍্য সৌম্য রাগ করে না তার এ রকম আচরণের জন‍্য। সে তো জানে একটা ভীতি থেকেই সে এমন করে। তার কী দোষ। প্রথম চাকরিটা হঠাৎ করেই চলে গিয়েছিল। রাতারাতি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারপর এক বছরের মতো কোনও কাজ ছিল না সৌম্যের। সেটা ছিল বিয়ের তিন বছর পরের ঘটনা। ততদিনে তাদের মধ‍্যে ছেলেও এসে গেছে। সংসারের খরচও বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। তখন সম্বল ছিল জয়ার কতগুলো টিউশনি। তবে জয়া কোনওদিন কিছু বলেনি। সে নিজের ভাগ‍্যকে দোষারোপ করেছে।


সৌম্য সারাদিন বাড়িতে থাকায় আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশিরা নানা কথা বলে। সেসব কানে শুনলেও মাথায় ঢুকতে দেয় না। সৌম্যের বন্ধুরা আজ এস্ট‍্যাবলিস্ট।


এক রাতে সৌম্য বেসামাল হয়ে বাড়ি ফেরে। জয়া ওই রাতে তাকে কিছু বলেনি। পরদিন সকালে সৌম্য বিছানা ছাড়তে জয়া বলে, এখন এসব খাওয়ার সময় নয়। যেদিন নতুন চাকরিতে জয়েন করবে সেদিন বড় করে সেলিব্রেশন হবে।


জয়ার কথাগুলো শুনে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সৌম্য।
এবারের চাকরিটা অনেক চেষ্টা করে পেয়েছে সে। প্রায় এক বছর অপেক্ষার পর আলোর রেখা দেখতে পেল। মাল্টিন‍্যাশনাল কোম্পানি, শুরুতেই স‍্যালারিটা বেশ ভাল। চাকরিতে মন-প্রাণ ঢেলে দেয়। একটু একটু করে প্রমোশন পেয়ে উঁচু পদে ওঠে, সেইসাথে স‍্যালারিও অনেক বেড়ে যায়।


আর পেছনে তাকাতে চায় না সৌম্য। পুরনো দিনের কথা মনে পড়লে আজও কেমন উদাস হয়ে পড়ে। একটা সময় অবসাদের শিকারও হয়েছিল। সারাক্ষণ মনের ভেতরে ভয় বাসা বেঁধেছিল।


সে সময় পাড়ার নন্দীবাবুর কাছে গেলেই চাকরি পাকা। দু'-তিনজন বন্ধু ওই অফিসেই কাজ করে। রাস্তায় নন্দীবাবুর সঙ্গে দেখা হলে, কথায় কথায় চাকরির খোঁজ নিতেন। সৌম্য সে কথা এড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেত। নন্দীবাবু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতেন। সৌম্য শুধুমাত্র মনের ভেতরে একটা জেদ পুষে রেখেছিল, কারও দয়ায় চাকরি করবে না।


***


সময় এখন অনেক এগিয়ে গেছে। বটগাছ পরিয়ে বহু দূর চলে গেলেও আজ আর মায়ের বাধার সম্মুখীন হতে হয় না। অনায়াসে যেখানে খুশি চলে যেতে পারে।


বটগাছের পাশ থেকে চলে গেছে পিচের বড় রাস্তা। সৌম্য বটগাছের নীচে গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে গাছটাকে দেখতে থাকে। ওই গাছকে জড়িয়ে কত সুতো। হয়তো এই সুতোগুলোর মধ‍্যে মায়েরও একটা হতে পারে। গাছের ছাওয়ায় ঠান্ডা বাতাসে তার শরীর-মনে প্রশান্তি নেমে আসে।


সৌম্য উপলব্ধি করে অজান্তে মনের মধ‍্যে জেদের বীজ বপন করে গিয়েছেন মা।