স্বামীজির জীবনের শেষ দিন নিয়ে বহু লেখা প্রকাশিত। বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯০২এর ৪ জুলাই সকাল এগারোটা নাগাদ অন্যান্য দিনের মতোই কাজকর্ম চলছিল বেলুড় মঠে।

Story and Article


 স্বামীজী ও মাষ্টারদা

পুলক মন্ডল

আজ ১২ জানুয়ারি। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন।   একইসাথে আজ ১২ জানুয়ারি মাষ্টারদা সূর্য সেনের শহীদ দিবস। দুজনের মধ্যে বয়সের ব‍্যবধান ছিল ৩৩ বছরের। মাষ্টারদা যখন জন্মেছেন তখন বিবেকানন্দের শিকাগো জয় হয়ে গেছে, গোটা বিশ্ব ক্রমশ স্বামীজীর আলোকছটায় মুগ্ধ হতে শুরু করেছে। মাষ্টারদা যখন ৬ বছরের শিশু সে বছরেই স্বামীজীর মহাপ্রয়াণ। কারো সাথেই কারো তুলনা চলেনা। একজন শান্তি ও ভালোবাসার বাণী দিয়ে ভারতের বিবেক জাগ্রত করার আমৃত্যু চেষ্টা করেছেন, অন্যজন সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা চেয়ে শহীদ হয়েছেন।  কিন্তু কি অদ্ভুত সমাপতন দুজনের প্রয়াণে। বয়সের দিক থেকে। দুজনেরই চল্লিশের কোঠায় পা রাখতে না রাখতেই শেষ বিদায়।


         স্বামীজীর শেষ দিন 

        ----------------


স্বামীজির জীবনের শেষ দিন নিয়ে বহু লেখা প্রকাশিত। বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯০২এর ৪ জুলাই সকাল এগারোটা নাগাদ অন্যান্য দিনের মতোই কাজকর্ম চলছিল বেলুড় মঠে। ঠাকুরঘরে ধ্যানে বসেছিলেন স্বামীজি। ধ্যানপর্ব সমাধা হলে শুরু করলেন গান।  ভাল গানের গলা ছিল স্বামীজির। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণও তাঁর গান শুনে আপ্লুত হয়ে যেতেন। সেদিন সকালে বেলুড়ের ঘাটে জেলেদের নৌকা ভিড়েছিল। প্রচুর ইলিশ উঠেছিল। শোনা যায়, ইলিশের ঝাল-ঝোল-অম্বলের মতো পদ দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েছিলেন স্বামীজি। দুপুরে খাওয়ার

পর সামান্য বিশ্রাম,  তারপর যান লাইব্রেরিতে, সঙ্গী প্রেমানন্দকে নিয়ে বেড়িয়ে আসেন বেলুড় বাজার পর্যন্ত। মঠে ফিরে সন্ধ্যা সাতটার আরতির পর ফের ধ্যানের ঘরে ঢুকলেন, কিছুক্ষণ পর স্বামীজির ঘর থেকে সাড়া এল, গরম লাগছিল তাঁর। জানলা খুলে দেওয়া হল। সঙ্গী ব্রজেন্দ্র স্বামীজির পা টিপে দিতে শুরু করলেন। এরপর রাত ন’টার পরই সব কিছু বদলে যেতে শুরু করল। স্বামীজির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, হঠাৎ কান্নার মতো শব্দ, জোরে জোরে শ্বাস পড়ছিল; কিন্তু মুখে কথা নেই। রাত ৯টা ১০–মাথা বালিশ থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল–দেহ স্তব্ধ; মুখে হালকা হাসি লেগে আছে। সন্ন্যাসী গুরুভাইরা মনে করলেন, ভাবসমাধি হয়েছে হয়তো। চলল শ্রীরামকৃষ্ণের নাম গান। আরও কিছুক্ষণ কোনও সাড়া না মেলায় বেলুড় থেকে এলেন ডাক্তার মহেন্দ্র মজুমদার, বৈকুন্ঠনাথ সান্যাল। কলকাতায় থাকা স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও সারদানন্দের কাছে খবর গেল, তাঁরাও চলে এলেন। কিন্তু নিজেই চলে গেলেন স্বামী বিবেকানন্দ।


রাতটুকু কাটতেই সকাল থেকে মঠে ভিড়। খুব ভোরের দিকে চলে এলেন নিবেদিতা।  স্বামীজির মাথার কাছে বসলেন তিনি। পাখার হাওয়া করতে থাকলেন গুরুকে। স্বামীজির মা’কে খবর দেওয়া হল। দ্রুত চলে এলেন ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত সঙ্গে স্বামীজির ভগ্নীপতি। কিছুক্ষণ পরেই এলেন ভুবনেশ্বরী দেবী সঙ্গে নাতি ব্রজমোহন ঘোষ। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ এলেন একটু পরের দিকে। বেলা চারটে নাগাদ মঠেই গঙ্গার ধারে দাহ করা হয় স্বামীজিকে। গঙ্গার ঠিক বিপরীত দিকে দাহ করা হয়েছিল তাঁর গুরু শ্রী রামকৃষ্ণকে। স্বামীজির শেষকৃত্যের সময় বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন নিবেদিতা। তার আগেই তিনি একটি রুমালে গুরুর পায়ের ছাপ নিয়ে নেন। যদিও রামকৃ্ষ্ণের শেষ দিনটিতে একটি ছবি তোলা হলেও বিবেকানন্দের শেষ যাত্রার কোনও ছবি মেলে না। নিবেদিতা নিজে স্বামীজির চিতার চারদিকে ঘুরতে থাকেন। গাউনে আগুন লেগে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্রহ্মানন্দের নির্দেশে এক সন্ন্যাসী তাঁকে ধরে অন্যত্র বসান। সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ দাহকাজ সম্পন্ন হয়।


স্বামীজির মৃত্যুর পরও স্বামীজির জীবনের শেষ দিন নিয়ে চর্চা থামেনি। স্বামী ব্রহ্মানন্দ, প্রেমানন্দর লেখা চিঠিতে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে স্বামীজির স্বাস্থ্য, মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে। তবে মঠের সন্ন্যাসীদের দৃঢ় বিশ্বাস শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কথা মতো স্বামীজি যোগবন্ধনের মাধ্যমে সমাধিতে দেহত্যাগ করেছেন। স্বামীজি নিজেই বলতেন, তিনি চল্লিশ পেরোবেন না। যেদিন তাঁর মৃত্যু হয় তখন স্বামীজির বয়স ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন। শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামীজি সম্পর্কে বহু জন বহু ভাবে লিখেছেন। তবে তাঁদের সম্পর্কে বোঝানোর জন্য ভগিনী নিবেদিতার একটি উক্তিই বোধহয় সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য। নিবেদিতাকে একবার রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের মধ্যে তফাত নিয়ে প্রশ্ন করা হয়? নিবেদিতার উত্তর ছিল, ‘অতীত পাঁচ হাজার বছরে ভারতবর্ষ যা কিছু ভেবেছে, তারই প্রতীক শ্রীরামকৃষ্ণ। আর আগামী দেড় হাজার বছর ভারত যা কিছু ভাববে, তারই অগ্রিম প্রতিনিধি স্বামী বিবেকানন্দ।’


        মাষ্টারদা'র শেষ দিন 

     -------------------------


 চট্টগ্রাম সেন্ট্রাল জেলের কনডেম্‌ড সেলে সূর্য সেনকে কড়া পাহারায় নির্জন কুঠুরীতে রাখা হত। একজন কয়েদি  সূর্য সেনের লেখা চিঠি ময়লার টুকরিতে নিয়ে জেলের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বন্দী বিপ্লবীদের দিয়ে আসতো। মৃত্যুর আগে জেলে আটক বিপ্লবী কালীকিঙ্কর দে’র কাছে সূর্য সেন পেন্সিলে লেখা একটি বার্তা পাঠান। সে বার্তায় তিনি লেখেন “আমার শেষ বাণী-আদর্শ ও একতা”। তার ভাষায় “ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যে সব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো”। শেষ দিনগুলোতে জেলে থাকার সময় তার একদিন গান শোনার খুব ইচ্ছা হল। সেই সময় জেলের অন্য এক সেলে ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। রাত ১১টা/১২টার দিকে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের অন্যতম বিপ্লবী কল্পনা দত্ত তাকে চিৎকার করে বলেন “এই বিনোদ, এই বিনোদ, দরজার কাছে আয়। মাষ্টারদা গান শুনতে চেয়েছেন”। বিনোদ বিহারী গান জানতেন না। তবুও সূর্য সেনের জন্য রবিঠাকুরের “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” গানটা গেয়ে শোনালেন। ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি মধ্যরাতে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসী কার্যকর হবার কথা উল্লেখ করা হয়। সূর্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মম ভাবে অত্যাচার করে। ব্রিটিশরা হাতুড়ী দিয়ে তার দাঁত ভেঙ্গে দেয় এবং তার হাড় ও ভেঙ্গে দেয়। হাতুড়ী দিয়ে নির্মম ভাবে পিটিয়ে অত্যাচার করা হয়। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। নিষ্ঠুরভাবে তাদের অর্ধমৃতদেহ দুটি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের লাশ আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি এবং হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী পোড়ানো হয়নি। ফাঁসীর পর লাশদুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজার “The Renown” এ তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।


তথ্যসূত্রঃ স্বামী ব্রহ্মানন্দ, প্রেমানন্দর লেখা চিঠি, 'অজানা বিবেকানন্দ'- শঙ্কর ; 'সূর্য সেনের স্বপ্ন ও সাধনা'- অনন্ত সিংহ এবং উইকিপিডিয়া।