বিশ্বের প্রথম ধর্ষিতা নারী কে জানেন? আমাদের মা সরস্বতী। কা'র দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে জানেন?

Story and Article

 

নিবন্ধ     অথঃ সরস্বতী কথা

[ পুরাণ-কাহিনী ]


অথঃ সরস্বতী কথা

শংকর ব্রহ্ম

-----------------------------


[ মা সরস্বতীকে স্মরণ করে 

প্রথমে পুষ্পাঞ্জলী মন্ত্র পাঠ করে 

তারপর বিষয়ের অবতারণা করি  ঃ-


" ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে

কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে,

বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে

ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্ততে।

নমঃ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিতাং

সরস্বতৈ নমো নমঃ

বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ

এস স-চন্দন পুষ্প বিল্ব পত্রাঞ্জলী সরস্বতৈ নমঃ। ]



বিশ্বের প্রথম ধর্ষিতা নারী কে জানেন?

আমাদের মা সরস্বতী। কা'র দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে জানেন? স্বয়ং পিতা ব্রহ্মার দ্বারা। দু'টি পুরাণে (সরস্বতী পুরাণ ও মৎস পুরাণ) এর বিবরণ পাওয়া যায়।

দু'টি পুরাণে অবশ্য এ'ব্যপারে দু'রকম ভাষ্য পাওয়া যায়। আমি এখানে দু'রকম ভাষ্যের কথাই বলব। 

     আগে বলি সরস্বতী পুরাণের কথা।

ব্রহ্মা যখন ব্রহ্মান্ড তৈরী করলেন, সেখানে তিনি একা। আর কেউ নেই। কিন্তু সেখানে তার একার পক্ষে বাস করা দুঃসহ হয়ে উঠল। তখন তিনি তার মুখগহ্বর থেকে সৃষ্টি করলেন পাঁচ কন্যাকে। যথাক্রমে -

সন্ধ্যা, প্রসূতি, ব্রাহ্মনী,শতরূপা ও সরস্বতীকে। তাদের মধ্যে সরস্বতী হলো, সবচেয়ে অপরূপ সুন্দরী,পাকা সোনার মতো উজ্জ্বল বর্ণ, গঠন সৌষ্ঠবে রূপবতী, গুণবতী ও বিদুষী কন্যা। তার দিকে চেয়ে চোখ ফেরাতে পারলেন না স্বয়ং ব্রহ্মা। তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন, তার সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা। সরস্বতীর কোন মা নেই, একমাত্র পিতা। তার কু-দৃষ্টি যখন তার উপর পড়ল, সরস্বতী বুঝতে পারলেন এবং তার দৃষ্টির আড়ালে থাকার জন্য লুকিয়ে পড়লেন উত্তরে। ব্রহ্মা তখন তা'কে খোঁজার জন্য নিজের মাথায় পাঁচটা মুন্ডু সৃষ্টি করলেন।

এবং উত্তর থেকে তাঁকে খুঁজে আনলেন। কিছুদিন পর সরস্বতী লুকালেন দক্ষিন প্রান্ত প্রদেশে। ব্রহ্মা সেখান থেকেও তাকে খুঁজে বার করলেন। আবার তারপর সরস্বতী ব্রহ্মার লোলুপ দৃষ্টির থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য লুকালেন,পূর্ব দেশে। তা'তেও কোন লাভ হলো না। ব্রহ্মা সেখান থেকে খুঁজে বার করলেন তাকে। ব্রহ্মার দৃষ্টি এত প্রখর ছিল যে সরস্বতীর মনে হতো তিনি তাকে চোখ দিয়ে আপাদ মস্তক লেহন করছেন। এবার তিনি পালালেন পশ্চিম দেশে। তা'তেও কি পরিত্রাণ পেলেন তিনি। না পেলেন না।ব্রহ্মা আবারও তাকে সেখান থেকেও খুঁজে বার করে আনলেন। এই জন্যই তো সে তাঁর পাঁচ মাথা সৃষ্টি করেছেন, সরস্বতী লুকিয়ে থাকবে কোথায়?  সবখান থেকে খুঁজে বের করবেন, তিনি তাকে । এবার সরস্বতী নিরুপায় হয়ে দ্বিধা সংকোচে ভয়ে লুকালেন গিয়ে আকাশ গঙ্গায়। 

   ব্রহ্মা পঞ্চম মাথা দিয়ে আকাশ নিরিক্ষণ করে সব দেখতে পেলেন, এবং সেখান থেকে  সরস্বতীকে ফিরিয়ে আনলেন। এবং তখনই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। সরস্বতী কিছুতেই রাজী হলেন না। ব্রহ্মা তখন তাকে জোর করে সম্ভোগ (ধর্ষণ) করলেন। তখন সরস্বতী বিবশ হয়ে তাকে বিয়ে করলেন।

তারপর একশ' বছর ধরে তারা একত্রে বনে বনে কাটালেন। তাদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে হলো।

ছেলের নাম সয়ম্ভু মনু। মেয়েটির নাম শতরূপা। এই মনুই এই পৃথিবীর প্রথম মানুষ, যার থেকে এই মানব গোষ্ঠীর সৃষ্টি। ব্রহ্মার ইচ্ছা সম্পূর্ণ হবার পর সরস্বতী তার কাছ থেকে মুক্তি পেলেন।

     মুক্তি পাওয়ার পর সরস্বতী শিবের কাছে গিয়ে সব ঘটনা বলে, তার উপর সব ক্ষোভ উগরে দিলেন। সব শুনে শিব মহা ক্রদ্ধ হয়ে উঠলেন। এবং তার ত্রিশূল দিয়ে

ব্রহ্মার পঞ্চম মাথাটি কেটে ফেললেন, এবং তাকে অভিশাপ দিলেন যে , মর্তবাসী লোকে কেউ তার পূজা করবে না।

     আমাদের আদি দেব হলেন - তিনজন।

ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর(শিব)। একত্রে এদের বলে ত্রিদেব। মর্তলোকে শিব ও বিষ্ণুর অনেক মন্দির আছে,সেখানে আড়ম্বর সহকারে তাদের পূজা হয়। কিন্তু ব্রহ্মার মন্দির নেই তেমন। মোট তিনটি মন্দির ছিল। দু'টি ইতমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।

পুস্করে( রাজস্থান) একটি মন্দির থাকলেও সেখানে পূজা পাঠ কিছুই হয় না। বছরে একবার শুধু মেলা বসে ।

শিব ভক্ত ( শৈব্য), বিষ্ণু ভক্ত( বৈষ্ণব), দের অনেক দেখা পাওয়া গেলেও, ব্রহ্মা ভক্ত (স্মার্ত) দের দেখা পাওয়া দুরূহ বটে।


       মৎস পুরাণের কাহিনী একটু অন্যরকম -

বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির পর ব্রহ্মা একা থাকতে না পেরে, তিনি বিষ্ণুর কাছে এসে তার অসহায় নিঃসঙ্গতার কথা ব্যক্ত করলেন , বিষ্ণু তাকে সৃষ্টির নির্দেশ দিলেন। ব্রহ্মা তখন, কমুন্ডল থেকে এক আজলা জল নিয়ে পৃথিবীতে ছুঁড়ে দিলেন। সেই জল পৃথিবীতে এসে পড়া মাত্র পৃথিবীতে আলোড়ণ সৃষ্টি হল। ভূকম্পন চলল কিছুদিন, তারপর আশ্চর্য  এক রূপবতী, বিদুষী, গুণবতী নারীর আবির্ভাব ঘটল।

ব্রহ্ম তার সৃষ্টির স্বরূপ উপলব্ধি করতে, পৃথিবীতে নেমে এলেন। সেই রূপবতী নারীকে দেখে চোখ ফেরাতে পারলেন না। মুগ্ধ হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলেন। এবং প্রেমে পড়লেন তাঁর । তাকে বিয়ে করলেন, তিনি হলেন সাবিত্রী (সরস্বতী)। সেখানে শত বৎসর অতিবাহিত করে স্বর্গে ফিরে এলেন, সেখানে তার পুত্র কন্যা ও স্ত্রীকে রেখে। 

কিছুদিন পর পৃথিবীর মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করার জন্য পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসার প্রয়োজন হলো।

যজ্ঞের স্থান নির্বাচণের জন্য তিনি স্বর্গোদ্যান থেকে একটি পদ্ম ফুল ছিঁড়ে নিয়ে,পৃথিবীতে নিক্ষেপ করলেন। সেটি গিয়ে পড়ল, রাজস্থানের( বর্তমানে) পুষ্করে। ব্রহ্মা পুনরায় পৃথিবীতে নেমে এসে, সেখানে যজ্ঞ শুরু করলেন। যজ্ঞ সম্পূর্ণ সমাধা করার জন্য তার স্ত্রীসঙ্গ প্রয়োজন হলো। কিন্তু তখন তার স্ত্রী সাবিত্রী সেখানে এসে পৌঁছাননি। দেরী করলে যজ্ঞ বিফলে যাবে ভেবে, তিনি নিরুপায় হয়ে এক স্থানীয় বেদজ্ঞ রমনী, গায়ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করে, যজ্ঞ সমাধা করার প্রস্তুতি নিলেন। বিভ্রাট ঘটল তারপরেই। সে সময় সেখানে এসে হাজির হলেন সাবিত্রী (সরস্বতী)। গায়ত্রীকে ব্রহ্মার পাশে যজ্ঞস্থলে সহযোগী হিসাবে বসে থাকতে দেখে, তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন।

সমস্থ দেবতারও তাকে অনুনয় বিনয় করে শান্ত করতে পারলেন না। তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে ব্রহ্মাকে অভিশাপ দিলেন, মর্তলোকে কখনও তার পূজাপাঠ হবে না। কার্যত তাই হলো। ব্রহ্মা মর্তলোকে পূজিত হন না।

( অন্য এক পুরাণ থেকে জানা যায়, ব্রহ্মার পাঁচ পত্নী ছিল)।

   মৎস পুরাণে দেখা যায় মনু ( ব্রহ্মারই পুত্র) মৎস দেবতার কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ব্রহ্মা কামনার বশে জোর করে, সরস্বতীকে বিবশ করে বিয়ে করতে বাধ্য করেছিলেন। এতে কি তিনি পাপের ভাগীদার হননি?

মৎসদেব উত্তর দিয়েছিলেন, হে রাজন, যিনি চতুর্বেদর সৃষ্টিকর্তা, তার বিচার মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। ব্রহ্মা আবার তার এই কাম তাড়নার জন্য দায়ী করেছেন কামদেবকে। কামদেব তার উত্তরে বলেছেন, হে প্রভু, আপনিই তো আমাকে সৃষ্টি রক্ষার্থে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে তাদের উপর কামের প্রভাব বিস্তার করতে বলেছেন, আমি আপনার আজ্ঞা পালন করেছি মাত্র। এতে আমার অপরাধ কোথায়? ব্রহ্মা হেসে বললেন, শেষ পর্যন্ত আমার আদেশ উপরই প্রথম বর্ষণ করলি , হায় মদন।