বই মানুষকে এক রহস্য পথের সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়ে দেয়।মানুষের অন্তর্নিহিত প্রবণতা সেই সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে পথ খুঁজে পায়।

Story and Article



 স্মৃতিমেদুর বইমেলা

প্রিয়াঙ্কা ঘোষ

বইমেলার' স্মৃতিকথা লেখার শুরুতেই 'মেলা' সম্বন্ধে সামান্যকিছু না লিখলে লেখাটা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।তাই সূচনাপর্বেই মেলাকে অবলম্বন করে শুরু হলো কলমের যাত্রা।তারপর বইমেলাকে নিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকবে লেখার কলম।


মেলা শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো মানুষের মিলন ক্ষেত্র। অনেক মানুষ এখানে একসঙ্গে মিলিত হয়।একে অন্যের সঙ্গে ভাব বিনিময় হয়। মানুষের ক্লান্তি একঘেয়েমি ব্যস্ত জীবনে মেলা এনে দেয় কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি।সকল মানুষের আনন্দ এবং মিলনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মেলার প্রকৃত সার্থকতা।মেলা অনেক ধরনের হয়ে থাকে।তার মধ্যে বইমেলা হলো একটি অন্যতম বহুল প্রচলিত জনপ্রিয় মেলা।


বই মানুষকে এক রহস্য পথের সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়ে দেয়।মানুষের অন্তর্নিহিত প্রবণতা সেই সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে পথ খুঁজে পায়। তাছাড়াও পাঠকদের মনজগতে আলোড়ন ঘটাতে সক্ষম একটি বই। তাই বই পড়তে যারা ভালোবাসেন তাদের জন্য বইমেলা এক বিশেষ উৎসব।বই এর প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার এক অন্যতম ক্ষেত্র বইমেলা।নতুন থেকে পুরোনো প্রজন্ম সব বয়সের মানুষেরই আকর্ষণ থাকে বইমেলায়।প্রকাশকরা বুঝতে পারেন ক্রেতাদের চাহিদার কথা,তাদের পরস্পরের সঙ্গে পরস্পরের আলাপ আলোচনায় একটা নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে।বইমেলার উন্মুক্ত পরিবেশে বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা কবি, সাহিত্যিক, লেখক সাংবাদিক প্রমুখ সর্বস্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ।ভক্ত পাঠকরা খুব সহজেই তাদের প্রিয় লেখকের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়ে থাকে বইমেলায়।


আমার মননে বিরাজ করে আমাদের কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা।এই মেলার আয়োজক পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড সংস্থা।বইমেলার আয়োজনস্থল পূর্বে ছিল মিলন মেলা প্রাঙ্গণ।এই স্থানটি আমার বেশ প্রিয় ছিল।আর বইমেলার আয়োজনস্থল হিসেবে আদর্শ স্থান মনে হতো। এরও পূর্বে বইমেলা ময়দানে অনুষ্ঠিত হতো।আর এখন তো বইমেলার আয়োজনস্থল সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্ক।তবে বইমেলা যেখানেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন বইমেলার দিনগুলোর স্মৃতিকথা মনের অলিন্দে আজও বিচরণ করছে।সেই স্মৃতিগুলোকে রোমন্থন করলে চারিদিকটা যেন বইমেলার মধুর সুবাসে ভরে ওঠে।বইমেলার ঝুড়ি ঝুড়ি স্মৃতিকথা যেন বলে অথবা লিখে শেষ করা যাবেনা।তাও যতোটুকু সম্ভব হলো লেখার প্রয়াস করলাম।



বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে এই একটি পার্বণ হলো বইপার্বণ।জানুয়ারি মাস এলেই আমাদের মনটা কেমন আনচান করে ওঠে এই পার্বণের জন্য।আমাদের এই কলকাতার বইমেলা কলকাতার অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মেলা।এই মেলাটি কলকাতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে।কলকাতার বইমেলা মানেই সেখানে বাংলা বইয়ের বেশি আধিপত্য। কিন্তু এর পাশাপাশি অন্যান্য সব ধরণের দেশীয় ভাষা এবং বিদেশী ভাষার বইও পাওয়া যায়।


আমার প্রথম বইমেলা যাওয়া আরম্ভ হয় আমার কলেজ জীবন থেকে।স্কুল জীবনে বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি।কারণ আমার স্কুল জীবনের পুরোটাই অতিবাহিত হয়েছে মফঃস্বলের একটা ছোটো শহর বনগাঁতে। তাই তখন বইমেলার ঐ সময়টা কলকাতায় আর আসা হয়ে উঠতো না। তারপর কলেজ জীবন শুরু হওয়ার পর থেকে বইমেলার স্বাদ আস্বাদন করা শুরু করলাম। তখন থেকে প্রায় প্রত্যেক বছরই বইমেলায় যাওয়া হতো।কোনো বছর দল বেঁধে বন্ধুদের সঙ্গে যেতাম, আবার কোনো বছর পরিবারের মানুষের সঙ্গে।

সাধারণত আমরা ছুটিরদিনেই যেতাম।একটা ছুটিরদিন দেখে বেলায় বেলায় বেড়িয়ে পড়তাম তারপর সেখানে সারাদিন ঘুরে অনেক বই কিনে রাত্রিকালীন আহার সম্পন্ন করে বাড়িতে ফিরতাম।ভাবলেই মন শিহরিত হয়ে ওঠে।সেখানে অনেক মানুষের সমাগমে একেবারে মেতে উঠতো কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা।অন্যান্য দিনের তুলনায় শনি-রবিবার গুলোতেই মেলায় মানুষের ঢল নামতে দেখা যেত। বইমেলার স্মৃতিচারণায় প্রথমেই চলে আসে বইমেলার থিমের কথা,থিমের জৌলুসে বইমেলা যেন আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।তার সঙ্গে থাকে থিমের গান।

প্রত্যেক বছরই মেলার থিম কোনো না কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের আদলে হয়ে থাকে।আর তাদের প্যাভিলিয়ন জুড়ে থাকে সেইসব দেশের বিভিন্ন ছবি।এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য আমাদেরকে মুগ্ধ করে তুলতো।মেলা প্রাঙ্গণের প্রান্তে প্রান্তরে থাকে নতুন বই এর মন মাতাল করা গন্ধ।সেই মাতাল করা গন্ধ নিয়ে বইমেলায় ঘুরে বেড়ানোর এক আলাদা আবেগ।তার সঙ্গে চলে পছন্দের লেখকদের লেখা বই সংগ্রহ। আর যদি নিজের পছন্দের লেখকদের দেখা মিলে যায় তাহলে তো সোনায় সোহাগা।এরকমটা প্রায় সববছরই হতো।কিন্তু তাঁদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলার তেমন ভাবে সুযোগ হয়নি। তাই তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতার কোনো স্মৃতি আমার কাছে নেই। তবে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবলেই মনের রাজ্যে একটা অন্যরকম স্মৃতি প্রকট হয়।


মেলা প্রাঙ্গণে পথ চলতি অনেক পাঠকই থাকেন যারা তাদের আকাঙ্ক্ষিত সাহিত্যকদের যদি নাগালে পেয়ে যান এবং তাদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পান,তখন সেখানে সেলফি আর সই এর মেলবন্ধনে একটা উন্মাদনার ঝড় বয়ে যায়।এমন সব দৃশ্যও বেশ উপভোগ্য এবং বহুদিন পর্যন্ত এর রেশ থেকে যায়।মেলায় বই এর সমারোহ। তাইজন্যই তো নাম বইমেলা।প্রত্যেক স্টলে থরে থরে সাজানো থাকে হরেক রঙের মলাটে মোড়া বই।পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও ভারত সরকারের বাংলা প্রকাশনা বিভাগগুলিরও এই মেলায় স্টল থাকে।আবার বিদেশের দূতাবাসগুলিও স্টল সাজিয়ে নিজের দেশের প্রকাশিত বই এর প্রদর্শনী করে।শিল্পী মানুষদের জন্য আলাদা আলাদা স্টল থাকে।


শিশুদের জন্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও লিটল ম্যাগাজিনের জন্য বিশেষ একটা চত্বর নির্ধারিত করা থাকে।এছাড়াও বিখ্যাত সব পাবলিশার্সদের স্টল থাকে।জাগোবাংলা স্টলটি গ্রামবাংলার পটভূমিকায় তৈরি হওয়ায় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।বইমেলায় বই এর অফুরন্ত সম্ভারের মধ্যে হাল্কা মেঠো ধুলোর আস্তরণ।অনেক অনামী লেখকও মেঠো পথ দিয়ে হাঁক দিয়ে যান স্বল্প মূল্যে নিজের লেখা বই বিক্রি করার জন্য।অনেক অখ্যাত চিত্রশিল্পীরা এসে নিজের নিজের চিত্র প্রদর্শন করে থাকেন।নানারকম হাতের কাজের জিনিসও বইমেলায় বিক্রি হতে দেখা যায়।এর সঙ্গে বই প্রেমীদের জন্য উপরি পাওনা থাকে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান। যেমন- সেখানে বাউল গান হয়।


বিভিন্ন ব্যান্ডের শিল্পীরা এসে অনুষ্ঠান করেন। আমরা বেশ সুন্দর ভাবে এই অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।এর পাশাপাশি আছে নানা রকমের খাবারের স্টল।সেইসব বাহারী খাবারের ঘ্রানে বাতাস মুখরিত হয়।বইপ্রেমীরা এই ঘ্রাণের জন্য স্টলগুলোর প্রতি একটা টান অনুভব করে।আমরাও এই স্টল গুলোতে টহল দিয়েছিলাম খাবারের টানে।


মেলায় ঘুরতে ঘুরতে চলে সেলফির উল্লাস।আর এই উল্লাসে সবার ফটো গ্যালারি উপচে পড়ে তারপর সেই ফটোগুলো ঠাঁই পায় ফেসবুকের দেওয়ালে। আমরাও তাই করতাম। অনেক অনেক সেলফি তুলে ফটো গ্যালারিতে জমিয়ে রাখতাম।প্রত্যেক বছরের বইমেলাই মনের গভীরে এক বিশেষ অনুভূতি এনে দেয়।বইমেলার সেইসব দিনের স্মৃতি অমলীন হয়ে আছে।



বিগত বছরগুলোর মধ্যে ২০২০র বইমেলাতে আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।তারপর এসে গেলো অতিমারির তরঙ্গ।অতিমারির কারণে আজ সবই যেন অতীত।এই তরঙ্গের জন্য ২০২১ এর বইমেলার আয়োজন সম্ভব হয়নি ।তবে এই বছর আশা রাখছি বইমেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে মেলার মধুর দৃশ্যগুলো আবার আঁখিপল্লবে বন্দী করে আনবো আর আমার স্মৃতির ঘরে যত্নসহকারে গুছিয়ে রেখে দেবো।



© প্রিয়াঙ্কা ঘোষ