গল্প -আশ্রয়

web to story




আশ্রয় 

দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য 


প্রবল বন্যায় চোখের সামনে পরিবার এবং সর্বস্ব খুঁইয়ে, রমেশের ঠাঁই হয় প্রকান্ড এক বটগাছের নীচে। বয়েসে ৬-৭ বছরের ছোট্ট শিশুর একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠে ওই গাছ। অজানা নদীর পাড়ে নির্দিধায় মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের ছায়ায় কতো অজানা পাখি, পথিকের পাশাপাশি রমেশেরও ঠাঁই হয়। রোদ বৃষ্টি ঋতু পরিবর্তনকে সাথে করে গাছের নীচেই তৈরী হয় রমেশের বাসস্থান । ধিরে ধিরে অনাথ শিশুর বড়ো হয়ে ওঠা। স্থানীয় চা'এর দোকানে অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে রাতের ঘুম কিংবা স্বপ্নের সাথী হয় গাছটি। কখনও দোল খাওয়া,  পাতা ছিঁড়ে মাটিতে পেতে শোয়া, প্রবল বৃষ্টিতে গাছের উপরে ঠাঁই নেওয়া ইত্যাদি চলতোই। 


তবে রমেশের আলাদা প্রতিভা ছিলো, যা বন্ধু বান্ধব আশেপাশের লোকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ধিরে ধিরে। সে কবিতা লিখতে পারতো, জীবনের কথা বুঝিয়ে বলতে পারতো,  গাছের ছায়ায় , পাখির কাকলী ,নীল আকাশ , পথিকের আসা যাওয়া ,নদীর ধরন,  ধনী দরীদ্রের জীবন যাপন সবই ছিলো তার উপলব্ধি এবং এরাই ছিলো তার সম্বল । এভাবে রমেশ ধিরে ধিরে রামেশ্বর হয়ে উঠলো, বহু লোকের সমাগম হতে লাগলো , নাম পরিবর্তন এবং গাছতলায় রামেশ্বরের শ্রোতা বাড়তে লাগলো । জীবিত অভিবাবক বলতে একমাত্র ওই বটবৃক্ষ ।


একটা সময় তার মনে হলো সে উচ্চতার শিখরে । তার প্রয়োজন  নির্দিষ্ট বাসস্থান । গাছের ছায়ায় আর নিজেকে দেখতে চাইছিলো না। একদিন লোকজন ডেকে গাছটি কেটে, নির্মিত হলো রামেশ্বরের কংক্রিটের বাড়ি । 

এখন রামেশ্বর উর্ফ রমেশের আস্থানা পাকা,  গাছ নেই, মনে মনে সে ভাবতে লাগলো এতো বছরের কঠিন পরিশ্রমের সাফল্য সে পেয়েছে । এখন আর কাজ করে খেতে হয়না রমেশকে, তার কথা এবং কবিতা বিকোয় চড়া দামে।


মাস কয়েক যেতে না যেতেই পরবর্তীতে শ্রাবণের প্রকোপে প্রবল বন্যা দেখা দিলো গ্রামে, শিকড়ের বাঁধা না থাকায় অনায়াসেই তলিয়ে গেলো রমেশের সোনার আশার প্রাসাদ। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে রমেশের চোখে জল, শেষ বার তার কেবলই মনে পড়ছিলো গাছটার কথা। যে আসল আশ্রয় ছিলো রমেশের জীবনের।