নদীর দিকে বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল দেখে, আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

 

শংকর ব্রহ্ম

বাঘিনীর প্রেমে

শংকর ব্রহ্ম

   

                 প্রথমে আমি মোটেও বুঝতে পারিনি সে ছিল একটা বাঘিনী। তার গড়গড় আওয়াজ শুনেছিলাম শুধু। অন্ধকারে সে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়ল, আধো আলোতে দেখে বুঝলাম সে বাঘিনী। শুয়েই সে ঘুমিয়ে পড়ল, তার গা থেকে লতা পাতার ভেজা তাজা গন্ধ আসছিল। একটি বন্য প্রাণীর গায়ে যেমন গন্ধ থাকে, যা আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল সাময়িক ভাবে। প্রথমে গা তার ভেজা ছিল, তার ত্বক থেকে সেই আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়ে, আমার চারপাশে এক শীতল আবেশ সৃষ্টি করেছিল। 

       রাতে আমি ভাল ঘুমিয়েছি। সেও ছিল চুপচাপ এবং মনেহয় তারও ভাল ঘুম হয়েছে। 

       সকালে যখন তার ঘুম ভাঙল, সে ঘর থেকে বেরিয়ে, নদীটার দিকে তাকিয়ে রইল, যেটা পেরিয়ে সাতরে সে এসেছিল আমার ঘরে।

আমি তাকে, আমার কাছে আসবার জন্য ইশারা করলাম এবং কিছু মাংস তাকে খেতে দিলাম ফ্রীজ থেকে বের করে।

      আশা করেছিলাম, সে হয়তো কাছে এসে আমার সাথে কিছু কথা বলবে, কিন্ত সে ছিল নীরব; তবে সময়ে সময়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল , চোখে তার চোখ পড়লে চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলো সে। চোখ দেখে মনে হচ্ছিলো, কিছুই বলার নেই তার। অবশেষে. আমি তার সাথে কথা বলার প্রত্যাশা ছেড়ে দিলাম।

  আমি তাকে বলতে গেছিলাম, 

'বেশ কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে বাইরে যাব,  তোমাকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমার না ফেরা পর্যন্ত, তা বেশ কিছুদিন হতে পারে, তুমি কি বাড়ির বাইরে না ভিতরে থাকতে চাও?

    আমি ঘরের দরজাটি তালাবন্ধ করব কিনা জানতে চাইলাম? সে কোন উত্তর না দিয়ে শুয়ে পড়ল দরজার পাশেই।, আমি বুঝলাম যে আমার আর ঘর বন্ধ করার দরকার নেই, আমি একাই চলে গিয়েছিলাম বাইরে ।

   ফিরে এসে আমি দেখি, সে খোলা চোখে  শুয়ে আছে। আমাকে দেখে উঠে বসল।

   বাড়িটি যেমন ছিল তেমনি আছে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম এবং তার জন্য আমি কিছু মাংস নিয়ে এসেছি, জানালাম। ধরে নিয়ে ছিলাম যে সে আমার ভাষায়, আমার কথা বুঝতে পারছে।

       তার কিছুদিন পর আমি যখন নদীর ধারে মাছ ধরতে যেতাম তখন সে প্রায়ই আমার সঙ্গে যেত, গিয়ে পাশে বসে থাকত। আমি যে মাছটি ধরতাম, তা মনোযোগ দিয়ে দেখতো। তার বেশী কিছু নয়।

       যখন আমি বনের মধ্যে কাঠ কাটতে যেতাম (সেখানে সে ছিল) সেও আমার সঙ্গে যেত এবং প্রতি রাতে সে আমার পাশে এসে শুয়ে ঘুমাত। তারপর সে একদিন আমাকে ছেড়ে চলে গেল কিছু না বলে, এক ভোরবেলা।

 সে যাবার আগে আমাকে স্পর্শ করে জাগাতে চেষ্টা করেছিল এবং তাকিয়ে ছিল আমার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে. আমি বুঝতে পারিনি মোটেই যে সে চলে যাবে , তারপর সে ধীরে ধীরে উঠে দরজা দিয়ে বেরিয়ে, নদীর দিকে বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল দেখে, আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

          সাঁতার কেটে নদীর ওপারে সে চলে গেল। তখনও টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল।

আমি ভাবতে পারিনি যে চিরদিনের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

আমি এখনও আশা করি যে সে আবার ফিরে আসবে আমার কাছে।

আমি আজকাল আর নদীতে মাছ ধরতে যাই না,

 বা যাই না বনে কাঠ কাটতে।

 আমি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি ,আর ভাবি শুধু তার কথা। 

         যেদিন সে প্রথম এসেছিল, মনে পড়ে যায়। আনন্দ যেন সে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চলে গেছে।

আজকাল আমি ঘুমোতে যাওয়ার আগে, একবার হলেও তার কথা ভাবি। ভাবি, যে একদিন হয়তো সে ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে থাকবে। ঘুমের মধ্যে, আমি তার গাঢ় শ্বাস ফেলার শব্দে জেগে উঠে তাকে দেখতে পাব। আমি একাই শুয়ে থাকি আজকাল। ঘুম আসে না আর আমার , তার কথা ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে যায়।

       আমি বাইরে বেরিয়ে এসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি একদৃষ্টিতে তার ফেরার প্রতীক্ষায়। 

জানি না সে ফিরে আসবে কিনা। তবুও আশা ছাড়তে পারি না।