হেড লাইটের আলোতে রাস্তাটা বড্ড অচেনা লাগে

 

webtostory

অচেনা

জয়নারায়ণ সরকার


সকাল থেকেই শরীরটা ম‍্যাজম‍্যাজ করছে। বিছানা ছেড়ে উঠতে ভাল লাগছে না। একবার ভেবেছিল মোবাইল ফোনের সুইচড অফ রাখবে। কিন্তু ব‍্যবসার ফোন কখন কী আসে তা কি বলা যায়! মা চা দিতে এসে বলে, কী রে ওঠ। আজ বেরোবি না?

আড়মোড়া ভেঙে মন্টু বলে, শরীরটা ভাল লাগছে না। আর একটু বাদে উঠব।

মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, ওরকম মনে হয়। উঠে পড়লে দেখবি ঠিক হয়ে যাবে।

পাশ ফিরে আধশোয়া হয়ে চায়ে চুমুক দেয়। গরম চা গলা দিয়ে নামতেই শরীরটা চাঙ্গা লাগে। এবার উঠে পড়তে ইচ্ছে করে। চা শেষ করে উঠতেই একটা ঢেঁকুর ওঠায় গলা দিয়ে টক টক জল আসে। কাল রাতে একটু বেশি দেশী খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মোবাইলটা বেজে ওঠে। বালিশের পাশ থেকে তুলে দেখে নবাদা। হ‍্যালো বলে মন্টু।

নবাদা ওপ্রান্ত থেকে বলে, কীরে, কখন আসবি। দু-লরি বালি এসে পেট্রোল পাম্পে দাঁড়িয়ে আছে। তুই এসে ডেলিভারি করবি। দেরি করিস না।

মন্টুর আর শুয়ে থাকা হয় না। তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে ঢুকে পড়ে। স্নান সেরে বেরোতেই বউদি বলে, ভাই, একটা সার্ফের প‍্যাকেট এনে দেবে?

মন্টু মাথা নেড়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। জামা-প‍্যান্ট পরে দোকান যাওয়ার সময় মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বলে, একটা নুনের প‍্যাকেট আনিস।

সে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। দশ-পনেরো মিনিট পরে ফিরে দরজা থেকে চেঁচায়, মা, খেতে দাও। তাড়া আছে।

কোনোমতে দু-গ্রাস খেয়ে বেরিয়ে পড়ে পেট্রোলপাম্পের উদ্দেশে।

***

একদঙ্গল ছেলের মধ‍্যে তাকে চেনা অনেক সহজ। হাড় জিরজিরে কঙ্কালসার চেহারা। বুকে ছিল অসীম সাহস। তবে যে কোনো ব‍্যাপারেই সবার থেকে এগিয়ে। একমাত্র পড়াশোনা বাদ দিয়ে। ক্লাস এইট অবধি পড়ে আর স্কুলমুখো হয়নি সে। তাতে ওর কিছুই যায় আসে না। পাড়ার যে কোনো অনুষ্ঠানে ওকে ছাড়া চলত না। তাতে ও খুব গর্ববোধ করত। তবে দুষ্টুমিতেও ওর জুড়ি মিলত না। বাড়িতে নালিশ করলে বড়দা উত্তম-মধ‍্যম দিত। কিন্তু দিলে কী হবে, পর দিন থেকে যে কে সেই। যে কোনো কাজ করত খুব মনোযোগ দিয়ে। বন্ধুরা কেউ কেউ আড়ালে ওকে নব‍্য 'শ্রীকান্ত'ও বলত।

পাড়ার রকটা ছিল সকাল-বিকেল মন্টুর দখলে। কারো প্রয়োজন হলে সোজা চলে যেত ওইখানে। প্রয়োজনের গুরুত্ব বুঝে নিয়ে ও কাজে নামত।

এমন একদিন সকালে শান্ত এসে হাজির। মন্টু তখন ওখানে বসে কচুরি খাচ্ছিল। শান্তকে দেখে বলল, কীরে কচুরি খাবি, এখান থেকে একটা নিয়ে নে।

সে হাতে ধরা শালপাতার প্লেটটা দেখায়।

শান্ত ইতস্তত করে বলে, না না, আমি খেয়ে এসেছি। শোন না, বোনের ভাসুরঝি অসুস্থ হয়ে শহরের নার্সিংহোমে ভর্তি। অবস্থা ভাল নয়। বাড়ির লোককে সবসময় থাকতে বলেছে।

মন্টু খাওয়া থামিয়ে বলে, কখন যাবি? এখন?

শান্ত বলে, বাড়ি গিয়ে রেডি হয়ে আয় তারপর না হয় যাব।

মন্টু সাথে সাথে বলে, নিকুচি করেছে বাড়ি। চল।

মন্টু খাওয়া শেষ করে পাশের টাইমকল থেকে হাত ধুয়ে আসতেই শান্ত হাঁটতে থাকে। মন্টুও পাশে পাশে চলতে থাকে।

নার্সিংহোমে প্রায় দিন পনেরো ছিল। শান্তর ভাই গিয়ে জামাকাপড়, টাকা দিয়ে আসত।

বন্ধুদের মধ‍্যে জনপ্রিয়তাও ছিল মন্টুর। যে কাজ কেউ করতে পারত না, সেই কাজ এক মুহূর্তে করে দিত সে।

একদিন ক্লাবে ক‍্যারাম খেলছিল মন্টু। পার্টনারশিপে খেলা। তার সাথে চ‍্যালেঞ্জ হয়েছে যারা হারবে তারা লবঙ্গলতিকা খাওয়াবে। বেশ জমে উঠেছে খেলা। কিছুক্ষণ বাদে সঞ্জু এসে হাজির। ঢুকেই বলে, একটা কথা আছে তোদের সাথে।

কেউ সেভাবে কথা না বললেও মন্টু খেলা থেকে চোখ উঠিয়ে বলে, কী কথা, তাড়াতাড়ি বল।

সঞ্জু বলে, আমার দিদি যে বাড়িতে ভাড়া থাকে তার বাড়িওয়ালা উঠিয়ে দেওয়ার জন‍্য উৎপাত করছে।

পাশ থেকে অসিত বলল, তোর জামাইবাবুর নতুন বাড়ি তৈরি এখনও হয়নি।

সঞ্জু সাথে সাথে বলে, আর মাস দুয়েক লাগবে। তারপর তো উঠেই যাবে। কিন্তু বাড়িওয়ালা কোনো কথা শুনছে না।

খেলা ততক্ষণে থেমে গেছে। মন্টু সাথে সাথে সঞ্জুর হাত ধরে বলে, চল তো, বাড়িওয়ালাকে একটু সমঝে আসি। বলেই এক ঝটকায় সঞ্জুকে টেনে নিয়ে দৌড়ে হাজির হয় বাড়িওয়ালার সামনে। পেছনে পেছনে অন‍্যরাও এসে ভিড় করে। মন্টুর নরমে-গরমে দু-মাসের জন‍্য রাজি হয়। সঞ্জুর দিদির মুখে স্বস্তির হাসি দেখে ফিরে আসে মন্টু।

আজকাল মন্টুকে রকে সকাল হতে না হতেই দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ থাকার পর আবার কোথায় চলে যাচ্ছে। বন্ধুরা ওর নাগাল পাচ্ছে না। তবে একদিন গার্লস স্কুলের সামনে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে অনুপ। সে ক্লাবে এসে খবরটা দেয়। সবাই ওঁৎ পেতে থাকে মন্টুকে ধরার জন‍্য। সন্ধেবেলায় আবার রকে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পরে আর দেখা যায় না। তবে অনুপ ওকে ফলো করে দেখেছে, পাড়ায় এক মাস্টামশাইয়ের কাছে পাশের পাড়ার একটা মেয়ে পড়তে আসে। মন্টুও ওই বাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। পড়া শেষ করে বেরোলেই মন্টু ওর সাথে গল্প করতে করতে গলির মধ‍্যে দিয়ে ও পাড়ায় চলে যায়। মন্টুর সাজপোশাকেও বদল এসেছে।

হঠাৎই একদিন মন্টু হতাশাগ্রস্ত মুখ নিয়ে রকে বসে। ওভাবে বসে থাকতে দেখে স্বপন কাছে গিয়ে বলে, কী হয়েছে তোর?

মন্টু ছলছল চোখে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকে। স্বপন এবার জোরে ওকে ঝাঁকাতেই জোরে কেঁদে ওঠে। স্বপন অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর চোখের জল মুছে মন্টু বলে, শান্তা আর আমার সাথে মিশবে না। ও এখন শান্তর।

স্বপন থতমত খেয়ে বলে, তোকে কে বলল?

মন্টুর গলা তখনও কাঁপছে। সে বলল, শান্তা নিজে বলেছে।

স্বপন কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। মেয়েটার ওপর ভীষণ রাগ হয়। শান্ত যেহেতু বড়লোকের ছেলে, তাই ওদিকে ঝুলে পড়েছে। আবার শান্তটাও বা কেমন!

এতকিছু ভেবে নিয়ে স্বপন বলে, ঠিক আছে, সবাইকে খবর দিচ্ছি সন্ধেবেলায় আলোচনা করব। সেখানে শান্তও থাকবে।

স্বপনের কথা শুনে মন্টু আস্তে আস্তে মাথা নেড়েছিল।

রাতের অন্ধকারে ওরা বসেছিল মাঠের মাঝখানে। ভাদ্র মাস থাকায় প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। গাছগুলো একটুও নড়ছিল না। গলগল করে ঘামছিল সকলে। মন্টু, শান্ত ছাড়াও আরও চারজন বন্ধু বসেছিল আলোচনায়। সেখানে স্বপন পক্ষ নিয়েছিল মন্টুর, বাকিরা শান্তর পক্ষে।

ওই অন্ধকারের মধ‍্যে মন্টুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল। মুখের ঘামের সাথে কান্নার জল মিশে একাকার হয়েছিল সে রাতে।

***

মন্টুকে আর দেখা যায় না এলাকায়। সে এখন বিজনেস নিয়ে ব‍্যস্ত। কত রকম কাজ। সব করতে হয় তাকে। ইট-বালির বিজনেসে ঝামেলা লেগেই থাকে। কোনওদিন লরি খারাপ, কোনওদিন ওভারলোডিং, কোনওদিন পার্টির টাকা আদায়ে ঝামেলা। সবই দেখাশোনা করতে হয় মন্টুকে। সেই ঘটনার পর থেকে বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক রাখে না। যদিও বা রাস্তায় দেখা হয় একটু হেসে এড়িয়ে যায়।

একমাত্র স্বপনের সাথে যোগাযোগ রাখে। তাও মাসে দু-একদিন। আজকাল সন্ধের পর মদ খাওয়া ধরেছে। এই খবর স্বপনের কানে যেতেই পেট্রোল পাম্প লাগোয়া ওর অফিসে একদিন সন্ধেবেলায় গিয়ে হাজির হয়। সেখানে দেখে ঘরের বড় চেয়ারে নবাদা বসে আছেন। সে মন্টুর কথা জিজ্ঞেস করতেই বলে, একটা মাল খালাস করতে গেছে। এখুনি এসে পড়বে। তুমি একটু বোসো।

স্বপন বাইরের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই মন্টু এসে হাজির। স্বপনকে দেখা মাত্র মুখটা ফ‍্যাকাশে হয়ে যায়। ঘরের ভেতর থেকে নবাদা বলে, আগে এদিকে আয়।

ডাক শোনামাত্র মন্টু প্রায় দৌড়ে নবাদার ঘরে ঢুকে পড়ে।

নবাদা বলে, পুরো টাকা পেয়েছিস?

মন্টু কী বলে স্বপন আর শুনতে পায় না। নবাদা তখন চিল চিৎকারে মন্টুকে অশ্রাব‍্য ভাষায় গালিগালাজ দিতে দিতে বলে, চাকর চাকরের মতো থাকবি। মাথায় ওঠার চেষ্টা করবি না।

পরদার ফাঁক দিয়ে স্বপন মন্টুর ক

বিবর্ণ হয়ে ওঠা মুখটা দেখতে পায়।

তবে কি ব্যবসাটা মন্টুর নয়? এরকম নানা প্রশ্নে ভেতরটা উথালপাথাল হতে থাকে।

এলোমেলো পায়ে বড় রাস্তার ধার ঘেঁষে হাঁটতে থাকে স্বপন।

একের পর এক চলে যাওয়া গাড়ির হেড লাইটের আলোতে রাস্তাটা বড্ড অচেনা লাগে স্বপনের।