বইটির উৎসর্গ পত্র এইভাবে লেখা আছে

 

কোয়েল তালুকদার


মনে রেখো আমায়

কোয়েল তালুকদার


মোঃ আব্দুল বারেক নামে আমার এক ফেসবুক বন্ধু কবে লিস্টে যোগ হয়েছিল মনে নেই। সে কখনই সক্রিয় ছিল না। আমার কোনো পোস্টে লাইক কমেন্টও সে দিত না।  গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে আমার ইনবক্সে একটি ম্যাসেজ আসে তার থেকে। সেখানে লেখা ছিল --


'শ্রদ্ধেয় ভাইজান,

আমার ছালাম গ্রহণ করিবেন। আমি নিতান্তই আপনার একজন পাঠক। আপনার লেখা আমি নিয়মিত পড়ি। খুব ভাল লাগে। কিন্তু আমি কোনো লাইক কমেন্ট দেই না। যাহাহোক, পর সমাচার এই যে, আমি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে এক নিভৃত পল্লীতে থাকি। আমি কবিতা লিখি। এইবার অনেক কস্ট করিয়া একটি কবিতার বই প্রকাশ করিয়াছি। আপনি যদি আমার কবিতার বইখানি পড়িতেন তাহা হইলে আমি খুব খুশি হইতাম। আপনি আপনার ঠিকানা পাঠাইলে আমার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ' মনে রেখো আমায়' বইটি পাঠাইয়া দিতাম। '


আরজ গুজার ---

মোঃ আব্দুল বারেক।

মৌতলা, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা।'


আমার খুব ইচ্ছা হলো এই কবির বইটি পড়তে।  আমি তাকে উত্তরে জানালাম, আপনি বইটি পাঠাতে পারেন একটি শর্তে। আমার কাছ থেকে সম্মানীর টাকা নিতে হবে। আপনার বিকাশ নাম্বারটি পাঠিয়ে দেন। আমি  টাকাটা পাঠিয়ে দিব। তিনি আমাকে তাই করেন এবং আমি টাকা ও ঠিকানা পাঠিয়ে দেই। যথারীতি দুইদিন আগে ' মনে রেখো আমায় ' বইটি আমার হস্তগত হয়েছে। 


বইটির মুদ্রণ মান খুবই নিম্নমানের। মফস্বলের কোনও এক অখ্যাত প্রেস থেকে বইটি ছাপা হয়েছে। প্রকাশক : মো: আবুল কালাম চৌং। প্রচ্ছদে হাতের সেলাইয়ের কাজ করা একটি রুমালের ফটোগ্রাফ। বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে লতা পাতা ফুল আর পাখির ছবি আঁকা। অস্পষ্ট ভাবে লাল সুতার সেলাইয়ে লেখা আছে ---' মনে রেখ আমায়। ' পাতা উল্টিয়ে দেখলাম, প্রচ্ছদ পরিকল্পনা : মোসাম্মদ দিলারা বেগমের নকশি রুমালের ফটোগ্রাফ অবলম্বনে, মো : আব্দুল বারেক।


বইটির উৎসর্গ পত্র এইভাবে লেখা আছে :


'এই গ্রন্থটি আমার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী, আমার নয়নতারা নয়নের মনি মোসাম্মৎ দিলারা খাতুন কে উৎসর্গ করিলাম। যাহাকে অন্তর্যামি বেহেস্তে লইয়া গিয়াছেন।'


উৎসর্গ পত্রটি দেখে মনটা একটু খারাপই হলো। ' মনে রেখো আমায় ' বইটির সব পাতা এলমেল করে উল্টাতে থাকি। বইটি আমার কাছে পুরোপুরি কবিতার বই মনে হলো না। গদ্য পদ্য মিলে একটি খন্ডিত আত্মকথা মূলক বই মনে হলো। কিছু কিছু লেখায় চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারলাম, মো: আব্দুল বারেক তাঁর স্ত্রীকে অত্যধিক ভালবাসিত।


প্রথম দেখা :


বইয়ের প্রথম লেখাটির নাম 'প্রথম দেখা'। কবি মো: আব্দুল বারেক লিখেছে -- আমি তখন দশম শ্রেনীতে পড়ি। একদিন আশ্বিন মাসের বিকালে থানা পরিষদের কাঁচা রাস্তার উপর দিয়া হাঁটিয়া বাড়িতে আসিতেছিলাম। মেঠো রাস্তায় নামিয়া কিছুদূর আসিবার পরই শেখদের বাড়ি। আইল রাস্তার পাশেই একটি ছোট্ট পুকুরপাড় পরে । সেই পুকুরপাড়ে লিচু গাছ তলায় দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখি দিলারা বেগমকে। মাথায় তাহার ঘোমটা দেওয়া ছিল। আমি তাহাকে দেখিলাম, সেও আমাকে দেখিল। দুজনের চোখ দুজনকেই দেখিয়া ভালো বাসিয়া ফেলিল।'


তারপরেই পদ্যে লেখা ---

'হেরিনু যখন পদ্ম আঁখি তাহার

ধ্যান যেন ভাঙ্গিত না আমার, মুগ্ধ হইয়া দেখিতাম তাহাকে, যেমন দেখিত 

বুদ্ধ তাহার আম্রপালীকে.....।'


এক জায়গায় দেখলাম, কবি উল্লেখ করেছে -- ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর দাদাজান আমাকে বিবাহ করাইবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে। আমি দাদাজানকে বলিলাম, শেখ ৰাড়ির দিলারা বেগমকে যদি আমার সাথে বিবাহ করাইয়া আনেন, তবেই বিবাহ করিব। '


পরম আহলাদে নবপরিণীতা বধূকে নিয়ে কবির লেখা একটি কবিতা আছে এই রকম ---


' চাঁদ পরী আমার টিয়া পাখির শাড়ি পড়িয়া হাঁটে উঠানে, 

মন আমার উৎফুল্ল হইয়া ওঠে 

চুপি চুপি নয়ন মেলিয়া দেখি তাহাকে

আমার সাথে দেখে বেহুঁশ হয় আমার দাদাজান

বধুর পায়ের আলতা যেন আমার হৃদয়ের 

রক্তের মতো লাল ... তারপর

থরথরিয়ে কাঁপুনি আসে, কখন নামিবে রাত্রি। '


'মনে রেখো আমায়' বইটি জুড়ে দিলারা কে নিয়ে ভালোবাসার অনেক কথা লিখেছেন কবি। লিখেছেন তাদের দাম্পত্য খুনসুটির কথা, রোমান্টিক মুহূর্তের অনেক মধুর মধুর কথা লেখা আছে কবিতায়। অজো পাড়াগাঁর সামান্য এক অখ্যাত কবি এমন সুন্দর সুন্দর লেখা লিখতে পারে, তা পড়ে সত্যিই আমি বিস্মিত হলাম। 


কালিন্দী তীরে :


বইয়ের শেষের দিকে 'কালিন্দী তীরে' অংশটুকু কবি ৰর্ণনা করেছেন এইভাবে ---


'বাড়ীর পিছনে আমাদের কালিন্দী নদী। আমি প্রায়ই দিলারাকে নিয়া নদীর কূলে বেড়াইতে যাইতাম।  ওপারেই ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলা। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ উঠিল। জ্যোৎস্নায় বান ডাকিল প্রান্তর জুড়িয়া। একবার ইচ্ছা হইল ঘরে বসিয়া কবিতা লিখি। কিন্তু তাহা করিলাম না। মন বড়ই চঞ্চল হইয়া উঠিল। দিলারাকে দেখিলাম -- একটি সাদা রঙের তাঁতের শাড়ি পড়িয়াছে। তাহাকে বলি,  চলো -- নদী দেখিয়া আসি। '

দিলারা আমাকে বলিল, ওগো, আমার বুকে একটু কান পাতিবে? শোনো, কেমন যেন নদীর কূলকূল ধ্বনি  বাজিতেছে। নদী যেন আমাকে ডাকিতেছে। তুমি আমাকে কালিন্দী তীরে লইয়া যাও। '


আমরা সেদিন রাতে গিয়েছিলাম কালিন্দী তীরে। যাইয়া দেখিতে পাই, ঘাটে একটি ছোট্ট ডিঙি নৌকা নিয়া বসিয়া আছে সন্তোষ মাঝি। আমরা ওর নৌকায় যাইয়া বসিলাম। নৌকা মাঝ দরিয়ায় চলিয়া গেল। অজস্র জ্যোৎস্নার রোসনাই আসিয়া পড়িতেছিল জলে। চিকচিক করিতেছিল জলরাশি। আমি দিলারার মুখের দিকে তাকাইলাম। দেখি  জগতের সকল সৌন্দর্য যেন ওর মুখখানিকে আলোকিত করিয়া ফেলিয়াছে। আমি আলো আঁধারিতে মুগ্ধ হইয়া দেখিতেছিলাম সেই রূপ। আমি ঝুঁকিয়া পড়িয়া একটি চুম্বন দিতে চাহিয়াছিলাম ওর কপালে। নৌকাটি কখন স্রোতের টানে ভাসিয়া চলিয়া যায় ভারতের জলসীমায়। হঠাৎ ওপারের দিক হইতে একটি গুলির শব্দ পাওয়া যায়। দেখি, দিলারা আমার বুকের উপরে লুটাইয়া পড়িল।'


শেষের কবিতাটি ছিল এইরকম :

'আমার রাত্রি শেষ হইতে চাহে না, আমার দিন ফুড়াইতে চাহে না,

পূর্নিমা আসে প্রতিমাসে একবার

শতবার আমার বুক পোড়ে চাঁদের আগুনে

কালিন্দীর ভাঙ্গনের শব্দ শুনি

মনে হয় বিসর্জন দেই এই দেহকে তাহারই জলে

এখনও যে আগুন জ্বলে 

এখনও যে পরান পোড়ে তাহারই তরে।'


~  কোয়েল তালুকদার