আগে একটা চায়ের দোকানে কাজ করত । সে মালিকও ঠিকমতো খেতে দিতনা । বরং ভুলচুক হলেই মার দিত ।

রথীন্দ্রনাথ রায়


 দুই রাখালরাজার কাণ্ড

রথীন্দ্রনাথ রায়


"শিশুরা জাতির ভবিষ্যত । এদের প্রতি যত্ন নিন । ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলুন ।" বিরাট ঢাউস একটা হোর্ডিং । ঠিক বাজারে ঢোকার মুখে তেমাথার মোড়ে । যাতে বিজ্ঞাপনটা সবার চোখে পড়ে । হ্যাঁ পড়ে বৈকি । বিজ্ঞাপনের ছবিতে কয়েকটা ফুটফুটে শিশুর ছবি । আর তারই নিচে ক্ষয়াটে চেহারার একটা শিশু কাছের হোটেলের খাওয়ার থালাগুলো ধুয়ে নিচ্ছে । 


মালিক শ্যামসুন্দর দত্ত-- পেটমোটা, গলা থেকে একটা মাদুলি ঝোলায়মান, ডান হাতের বাহুতে গোটাতিনেক মাদুলি, চার আঙুলে চারটি আংটি  -- চিৎকার করে ছেলেটিকে ডাকে  , এই রতনা ব্যাটা হারামযাদা, থালাগুলো কি তোর বাপ্ ধুয়ে আনব

-- হ্যাঁ রে হারামী  ! আমার বাপ না ধুলেও তোর বাপ ধুয়ে আনবে । শ্লা চোকের মাতা খেয়েচিস? দেকতে পাসনা  ? সকাল থেকে খাটাই লিচিস।খাওয়ার সময় পয্যন্ত দিচিসনা । আবার বাপ তুলে গাল দিচিস ? 

  

-- দেবই তো শুয়োরের বাচ্চা । থালাগুলো নিয়ে আয় আগে । খদ্দের বসে আছে । 

 

-- আনবনা থালা, করবনা তোর কাজ । 

উঠে পড়ে রতন । দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুলতে থাকে শ্যামসুন্দর । 

ঘরের ভেতর থেকে সেফটিপিন আঁটা প্রায় ছেঁড়া ব্যাগটা নিয়ে আসে রতন । বলে, আমার মাইনের টাকা দে । 

-- টাকা নিবি হারামীর বাচ্চা । বেরো এখান থেকে ।

বলতে বলতে কয়েকটা থাপ্পড় কষিয়ে দেয় মালিক । লোকেরা ধেয়ে আসে , করেন কি । মরে যাবে যে  ! 

  

ছাড়া পেয়ে রাস্তায় নেমে আসে রতন । বলে, হারামী খাটিয়ে নেবে -- খেতে দেবেনা-- পয়সা দেবেনা । শালা শকুন, শালা চামচিকে । 

পথচলতি লোকেরা চারপাশে দাঁড়িয়ে বেশ মজা উপভোগ করছে । মালিক পেটাচ্ছে শিশুশ্রমিককে । মার খেয়ে প্রতিরোধহীন শিশুর মুখ থেকে গালাগাল শুনতে বেশ লাগছে । 

  

দাঁড়ায়না রতন । ভিড় সরিয়ে হাঁটতে থাকে । আগে একটা চায়ের দোকানে কাজ করত । সে মালিকও ঠিকমতো খেতে দিতনা । বরং ভুলচুক হলেই মার দিত । সেখান থেকে পালিয়ে এসে এই হোটেলে । এখানেও তাই । এরপর সে কোথায় যাবে  ? বাড়ি গেলেও তো সেই মারই জুটবে  ! আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে বাবাটা যেদিন মরে গেল সেদিন থেকেই শুরু হল তার দুঃখের দিন । মাও কাজ করে । কিন্তু তাতে চলেনা । ছোট ছোট দুটো বোন এবং তাকে নিয়ে চারজন । মাসের আধেক দিন খাওয়াই জুটতনা । আর সব রাগ গিয়ে পড়ত তার ওপর । কারণে অকারণে মা তাকে গালাগালি দিত । আর মার তো ছিলই । এর থেকে বাঁচতেই কাজের ছেলের খাতায় নাম লিখিয়েছে সে । মাঝে মাঝে মৃত বাবার উদ্দেশ্যে বলে, বাবা, কেন তুমি মরে গেলে? তোমার জন্যই আমার এতো কষ্ট । কেউ ভালোবাসেনা ।শুধু মারে আর খেতে দেয়না ।  

কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে সে ।স্বপ্ন দেখে-- বাবা তাকে পরম যত্নে খাইয়ে দিচ্ছে, লেখা শেখাচ্ছে  , ঘুম পাড়াচ্ছে  -- আরো কতো কিছু  । 

 ঘুম ভাঙত মায়ের অথব মালিকের চিৎকারে । আবার সেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর আধপেটা খাওয়া । এভাবেই বাবার মৃত্যুর পর তিনবছর কেটে গেছে । এখন সে শিশুশ্রমিক । তবে আজ থেকে সে কাজ হারানো পথশিশু । 

চলছে । রেললাইনের পাশে সরু একফালি পায়ে চলা পথ । এপথটা কোথায় গিয়েছে সে জানেনা । তবু চলছে । পেটের মধ্যেটা ক্ষিধেয় মোচড় দেয় । টিফিন করার কথা বলেছিল । কিন্তু মালিক বললে, এতো বেলায় টিফিন করতে হবেনা । একবারে ভাত খেয়ে নিবি । 

সেই খাওয়াটাই হলনা । শালার চামচিকেটা ঠিক খাওয়ার সময়েই খুপড়িটা গরম করে দিলে । মনে মনে আরও কয়েকটা গাল দিয়ে নেয় রতন । এখন দুপুরবেলা । শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি । আকাশে কখনো মেঘ কখনো রোদ্দুর । কিছুদূর যেতেই রেললাইনের পাশে একটা বটগাছের ছায়া পেল রতন । কাছে যেতেই দেখল সেখানে বসে রয়েছে এক বৈরাগী । তার পাশে একটা ঝোলা আর একটা বাজনার যণ্ত্র । সেটা সে আগেও দেখেছে । কিন্তু কি নাম জানেনা । 

বৈরাগী বলে  , বাপধন কোথায় যাবে গো  ? 

 

রতন পাশে বসে বলে, জানিনা । 

 

 তারযণ্ত্রটা দেখিয়ে বলে , এটার নাম কিগো ?

 

 বৈরাগী যণ্ত্রটা হাতে তুলে 'টুং 'করে একটা শব্দ করে বলে, এটার নাম একতারা । দেখবে  ? দেখো । 

 

একতারাটা হাতে নেয় রতন । ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে । টুং টাং শব্দ করে । তারপর বৈরাগীর হাতে ফিরিয়ে দেয় । কিছুক্ষণ পরে কোনও ভূমিকা না করেই বলল, তোমার ঝোলায় খাবার আছে গো  ?  

 বৈরাগী ওর শুকনো চেহারা দেখে বুঝতে পারে রতনের খুব ক্ষিধে পেয়েছে । হাসিমুখে বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ আছে বৈকি । আমার রাখালরাজার দরবারে কেউ না খেয়ে থাকেনা গো । এই নাও মুড়ি আছে , চিড়ে আছে খাও । তারপর চলো আমার সঙ্গে । আমার রাখালরাজার সংসারে  আমার আশ্রমে । 

 

রতন বেশ কিছুটা শুকনো মুড়ি চিবোয় । তারপর বৈরাগীর সঙ্গে থাকা বোতলের জল খেয়ে বেশ একটা লম্বা ঢেকুর তোলে । 

বৈরাগী তার ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে বলে, চলো । 

 

-- না, তোমার সঙ্গে যাবোনা । তুমি দোকানে অথবা হোটেলে কাজে ঢুকিয়ে দেবে । আমার ওসব কাজ করতে ভালো লাগেনা । লেখাপড়া শিখে বড়ো হতে ইচ্ছে করে । বাবাটা মারা না গেলে আমি অনেকটা বড়ো হতাম ।  

বৈরাগী বলে, না গো বাপধন, কেউ তোমাকে আর কাজে ঢোকাতে পারবেনা । আমি আছিনা, তোমার বৈরাগীঠাকুর । আমার আশ্রমে তোমারই মতো গুটি পাঁচেক হারিয়ে যাওয়া শিশু আছে গো । তাদের সব থেকেও কেউ নেই । শুধু আমি আছি ।  

-- বেশ চলো । যদি বুঝি তোমার মতলব ভালো নয় তবে আবার অন্য কোথাও চলে যাবো । তুমি গাল দেবেনা তো  ? দেখো আমি তোমার সব কাজ করে দেব । শুধু দুটো খেতে দিও । আমার বাবা না ভারি দুষ্টু ছিল । আমি খেতে পারতাম না, তবু আমাকে বেশি বেশি খেতে দিত । বলত, বেশি বেশি না খেলে তাড়াতাড়ি বড় হতে পারবিনা । জানো, বাবার মতো কেউ আমাকে ভালোবাসে না ।  

মায়ার সংসার থেকে দূরে থাকা বৈরাগীর দুচোখ বুঝি জলে ভরে এসেছিল । আড়ালে মুছে নিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে  , বাবা মায়েরা সন্তানদের ভালোবাসবেই । তোমার বাবার ইচ্ছে ছিল তোমাকে বড় করে তোলার । আর সেটা তোমাকে করে দেখাতে হবে । 

  ওরা চলতে থাকে । বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর একটা বাঁধের ওপর উঠল । দুপাশ গাছপালায় ঢাকা । যেন জঙ্গল । তারপর বাঁধ থেকে নেমে মাঠের ওপর দিয়ে চলতে থাকে । চারদিকটা ঝোপঝাড় আর ছোট বড় গাছপালায় ভর্তি । কিছুক্ষণ চলার পর পথটা যেখানে শেষ হল  -- সেখানে পাটকাঠির বেড়া দেওয়া কয়েকটা ছোট ছোট ঘর । আর নানা রকমের ফুলগাছ । 

 ওদের দেখেই কয়েকটা ছোট্ট ছেলে দৌড়ে এল । বৈরাগী ওদের মধ্যে সব থেকে ছোট্টটিকে কোলে তুলে নিয়ে বললে  , কি ব্যাপার  , আজ তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে ফিরে এসেছ যে  ?

 

-- তুমি জানোনা  , আজ বিধান রায়  -- বাংলার রূপকার এর  "জন্মদিন , মৃত্যুদিন "। স্যার বলেছে । 

-- হ্যাঁ, তাইতো । আমি ভুলেই গিয়েছিলাম । 

-- তুমি শুধুই ভুলে যাও ।  

-- না ভুলে যাইনা । 

ওকে কোল থেকে নামিয়ে একটা ব্যাগ থেকে বেশ কয়েকটি শিশুপাঠ্য বই বের করে বৈরাগী । ছেলেটি সেগুলি প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে চলে যায় ।  বৈরাগী পুঁটে নামক ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে, ভোলা কোথায় রে  ? 

-- রান্নার যোগাড় করছে । 

-- সত্যিই তো  , আজ আমার খুব দেরি হয়েছে । 

তারপর রতনকে দেখিয়ে বলে  , এ তোমাদেরই একজন । আর রতন, এরা তোমার ভাই । 

 

 

রতনকে দেখিয়ে বলে, এরা তোমার ভাই । 

রতনকে নিয়ে যায় ওরা । 

বৈরাগী আর দাঁড়ায়না ।রান্নার ব্যবস্থা করতে হবে । ছুটির দিন বাদে অন্য দিনগুলোতে বাচ্চাগুলো স্কুলেই খেয়ে আসে । তাই রান্নায় খুব একটা তাড়া  থাকেনা । ভিক্ষেয় যাবার আগে রাখালরাজার সেবা করে নিয়েছে । এখন বাচ্চাগুলো আর নিজের জন্য রান্না করতে হবে ।   মাঘীপূর্ণিমায় রাখালরাজার বিশেষ পূজার্চনা উপলক্ষে এখানে অনেক মানুষ আসেন । লোকালয় থেকে বহুদূরে নির্জন ভাগীরথী তীরে এই মাধবীকুঞ্জ মিলনমেলায় পরিণত হয় । ভক্ত এবং শুভানুধ্যায়ীদের দানে তার ভান্ডার ভরে ওঠে । শুরু হয় ভান্ডারা উৎসব । রাখালরাজার নামগানে মুখরিত হয়ে ওঠে মাধবীকুঞ্জ । 

 

  ক'দিন পরেই ঘটল সেই ঘটনা । যার জন্য খবরের কাগজের প্রথম পাতায় ছাপা হল মাধবীকুঞ্জের নাম । বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হল সেই ঘটনা । ঘটালো সেই অকুতোভয় দুটো বাচ্চা ভোলা আর রতন । সেদিন ওপারে 'ভবা পাগলা'র তিরোধান দিবস উপলক্ষে ছিল উৎসব । হাজার হাজার লোক এসেছিল উৎসবে । খেয়াঘাটে ছিল উপচে পড়া ভিড় । মাত্র দুটো নৌকা । তাতেই ঠাসাঠাসি করে লোক উঠছে তো উঠছেই । নৌকা দুটোর মধ্যে একটা প্রায় মাঝনদীতে এসেছে এমন সময় ভিড়ের চাপে হঠাৎ টাল খেয়ে উল্টে গেল নৌকাটা । চারদিকে আর্ত চিৎকার  -- বাঁচাও ।  

এপার ওপার দুপারেই সোরগোল উঠল । কিন্তু ডুবন্ত মানুষগুলোকে বাঁচাতে কোনও নৌকা এগিয়ে এলোনা । খেয়াঘাটেই ছিল রতন ও ভোলা । ঘাটে বাঁধা ছিল হীরু মাঝির মাছ ধরা নৌকো । সেটাই খুলে নিল বাচ্চাদুটো । ইঞ্জিন চালু করে তীরবেগে পৌঁছে গেল ডুবন্ত মানুষগুলোর কাছে । দুঃসাহসিকতার চরম নিদর্শন দেখিয়ে রতন তার থেকে বেশি ওজনের লোককে টেনে তুলল নৌকোয় । কিন্তু ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বাচ্চা তলিয়ে যাচ্ছিল । তাদের দিকে লম্বা একটা কাপড় ছুঁড়ে দিল ভোলা । ধরতে  পারলনা বাচ্চাগুলো । স্রোতের টানে কোথায় যেন হারিয়ে গেল । দক্ষ মাঝির মতো হাল ধরে আরও অনেক মানুষকে বাঁচাল ওরা । বাকি রইল আরও অনেকে । তাদের খোঁজে আরও নৌকা এল , ডুবুরি এল  , বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এল । সবশেষে এল জেলাশাসক । 

  

ভাগীরথীর দুই তীরেই ধন্য ধন্য পড়ে গেল । কোথাকার দুটো বাচ্চা আজ যেভাবে বেশ কিছু মানুষের প্রাণ বাঁচাল তা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছু নয় । যারা নৌকা চালানোর কিচ্ছু জানেনা, তারা স্রোতের মাঝে নৌকা ঠিক রাখল এবং অনেক মানুষকে উদ্ধার করল ।

 

বৈরাগী প্রায় ছুটতে ছুটতে খেয়াঘাটে এসে ভিড়ের মাঝে রতন আর ভোলাকে দেখতে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে  ,  ওরে তোরা অসাধ্য সাধন করেছিস । এতো আমার রাখালরাজা ছাড়া আর কেউ পারতনা । তোরাই আমার রাখালরাজা, তোরাই আমার ভগবান  , তোরাই আমার সব ।  

 

আবেগে বৈরাগীর দুচোখ বেয়ে জল ঝরতে থাকে  ।

 

  শেষ