ওই মেয়েটার বাড়িতে খবর দিতে হবে না

web to story


 ধারাবাহিক গল্প- 

ধূমকেতু [দ্বিতীয় পর্ব]

সুশান্ত_ঘোষ 


রামবিলাস বাবুকে দেখে বেশ কিছুটা চিন্তায় মনে হলো শুভময়ের । এখানে ফরেস্ট অফিসে কাজে জয়েন করার পর থেকে শুভময় দেখেছে এই মানুষটার মধ্যে একটা সততা ও মানবিকতা লুকিয়ে আছে অন্যান্য অনেক অধস্তন কর্মচারীদের থেকে । ফলে মুখে সামনাসামনি কিছু না বললেও এনাকে শুভময় ব্যক্তিগত ভাবে বেশ কিছুটা ভালবাসে । 


শুভময় বলল, কি ব্যাপার রামবিলাস বাবু ? আপনাকে এতো চিন্তিত মনে হচ্ছে কেন ? আমি আপনাকে বলেছি আগেই আমি যতক্ষণ আছি এই রেঞ্জে আপনি নিশ্চিন্তে আমাকে সব কথা বলতে পারেন । এখন এই সময়ে আবার কি সমস্যা হলো ? আমি তো এইমাত্র কোয়ার্টার এ এসে ঢুকলাম । আলাদা হওয়া হাতি দুটো কি পিড়াকাটার জঙ্গলের থেকে আমাদের এদিকে আসার কোন খবর পেয়েছেন । হাতির দলটা যাতে লোকালয়ে রাতে আর না ঢুকতে পারে আমি সমস্ত জোনে নিজে গাড়ি নিয়ে ঘুরে সবার দায়িত্ব এইমাত্র বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে এলাম । কারো শরীর খারাপ হয়েছে না কি ?


রামবিলাস বাবু বললেন, না না স্যার শরীর সবার ঠিক আছে, কিন্তু এটা একটা উটকো সমস্যা তৈরি হয়েছে । এই আজকাল কলেজের ছেলে ছোকরার দল এমন হয়েছে, যে ওরা নিজেদের সব হিরো হিরোইন মনে করে । 


রামবিলাস বাবুর কথা শুনে শুভময় হেসে উঠে বলল, আরে রামবিলাস বাবু ছেলে ছোকরারা কি বুড়োদের মতো আচরণ করলে আপনার ভালো লাগত ? তা ছেলে ছোকরা কি করেছে বলুন তো ?


রামবিলাস বাবু যা বললেন, তাতে শুভময় কে বেশ চিন্তায় ফেলে দিল । বিহার থেকে অনেকদিন আগে এলেও রামবিলাস বাবুর কথায় এখনও বিহারের কথার একটা আলাদা টান রয়ে গিয়েছে আজও । রামবিলাস বাবু বললেন আজ মেদিনীপুর শহর থেকে কলেজের ফাইনাল ইয়ারের সাতটি ছেলে মেয়ে, ওদের মধ্যে পাঁচ জন ছেলে দুজন মেয়ে আছে- চারটে মোটর সাইকেলে করে হাতি দেখতে জঙ্গলে এসেছিল, না ঘুরতে এসেছিল এই পিড়াকাটা পাথরকুমকুমি বলতে পারি না । ওরা ওখানে ঘুরে আবার ভাদুতলা পেরিয়ে বেশ কিছুটা আসবার পর রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে জঙ্গলের মধ্যে পায়দালে ঢোকে । তারপর হঠাৎ কুছুর আওয়াজ শুনে হাতির পায়ের আওয়াজ মনে করে ওরা সবাই ছুটে বেরিয়ে পালিয়ে আসে । কিন্তু ওদের মধ্যে একটা মেয়ে সম্ভবত পড়ে গিয়ে থাকতে পারে জঙ্গলের মাঝে । কুছুতে ধাক্কা লেগে । ওরা ছজন রাস্তায় উঠে পড়ে অনেক ফোন করছে মেয়েটাকে । কিন্তু কেউ ধরছে না । বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তা ওরা কি করবে বুঝে না পেয়ে ভাদুতলা ফিরে গিয়ে ওখানের আমাদের রেঞ্জ অফিসে সবাই এসে হাজির হয়েছে । ওখান থেকে আমাদের এখানে জানিয়েছে । এখন ওই মেয়েটার বাড়িতে খবর দিতে হবে না কি করা যায় তাই আপনার কাছে ছুটে এলাম । 


রামবিলাস বাবুর কথা শুনে শুভময় বলল, ওই ছেলে মেয়েগুলো একবার পেছন ফিরে দেখলো না যে তাদের বন্ধুর কি হয়েছে ? জঙ্গলের বুনো হাতি কি করতে পারে কোন ধারণা আছে ওদের ? হাতির সাথে সেলফি তুলতেও ওদের আপত্তি নেই । তা যায়গাটার সঠিক লোকেশন টা আমাকে বলুন আপনি । ওরা যেখানটা বলেছে । বাঁদর ছেলে মেয়ে যতো নিজের মনেই বলতে বলতে ড্রেস করতে থাকে শুভময় । আর তাড়াতাড়ি মাথায় হেলমেট পরে মোটর সাইকেলে বেরিয়ে পড়ে শুভময় ।


রামবিলাস বাবু বলেন, স্যার আপনি যাচ্ছেন ওখানে ? আমি যাই না আপনার সাথে ? যদি কোন সমস্যা হয় ? সন্ধ্যা হয়ে আসবে এখনই । 


শুভময় বলল, না আপনার যাওয়ার দরকার নেই । ওই ছেলেমেয়েগুলোকে ওই মেয়ের বাড়িতে খবর দিতে বলুন হিরো হিরোইন এর দলকে । আর শালবনি থানায় ফোন করে গোটা ঘটনাটা জানিয়ে দিন একটা অফিসিয়াল ডায়েরি করে । আপনি একটু অফিসে থাকুন আমি বেরিয়ে দেখি । আলো থাকতে থাকতেই কতটা কি করতে পারি ।


রামবিলাস বাবুর কথা মতো শুভময় মাঠ বরাবর এসে রাস্তার পাশে শাল ডুমুরিয়া পেরিয়ে গাছের তলায় মোটর সাইকেল টা রেখে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে থাকে পায়ে হেঁটেই । এখানে মোটর সাইকেলে ঢোকার মতো কোন রাস্তাও নেই । বেশ কিছুটা যাওয়ার পর জঙ্গলের চেহারা ক্রমেই গভীর হয়ে আসছে । অন্যান্য সময় এখানে গাছের পাতা ঝরে পড়ে তাও সূর্যের আলো ঢোকে । এই বছর গরমের তীব্রতা এখনও স্বমহিমায় আসার আগে ক্রমশ জঙ্গলের চেহারা যেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে । শুভময় একটু দাঁড়িয়ে চিন্তা করে না ওরা কি এদিকে আর এগোতে পারে ? এমন সময় এর চেয়ে বেশি ঢোকা ওর নিজের জন্যেও সঠিক নয় । হঠাৎ করেই শুভময় এর চোখে পড়ে সামনেই একটা গাছের আড়ালে লাল আর হলুদ রঙের শাড়ির আঁচল পেছন থেকে । আসতে আসতে এগিয়ে যায় শুভময় । দেখে গাছের আড়ালে বসে পা ধরে যন্ত্রণায় কাতর একটি মেয়ে । শুভময় কে দেখেই চমকে ওঠে আচমকা ওই মেয়েটি । শুভময় বুঝতে পারে ইনিই সেই হিরোইন । হাতির সাথে বন্ধু হওয়ার সখ নিয়ে সন্ধ্যা হওয়ার মুখে সম্ভবত পা মচকিয়ে পড়ে যেতে দেখেও জীবনের ভয়ে সব বন্ধুরা যাকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে । 


শুভময় ওই মেয়েটিকে বলল হাতির দেখা পেয়েছেন ? 


মেয়েটি অবাক বিস্ময়ে শুভময়ের দিকে তাকিয়ে থাকে । কি অদ্ভুত ব্যাপার। এখানে এই সময়ে আমার কাছে আমার প্রিয় মানুষটা হাজির । যেন ভগবানের কঠিন করুণা । আরো কিছুটা কষ্ট পেলেও সহ্য করতে রাজি সবকিছু । 


শুভময় বলে, কি দেখছেন অমন করে । আমি ডাকাত কিনা ?


মেয়েটি বলল, আমি জানি আপনি ডাকাত হতে পারেন না । 


শুভময় বলল, ভাগ্যটা ও দেখছি দেখতে জানেন । তা হাতির সাথে বন্ধু হওয়ার সখ মিটেছে ?


মেয়েটি বলল না আজকের সখের জন্য এখন আর কোন দুঃখ নেই । তবে ওটা হাতি ছিল না, একটা বুনো শুয়োর । আর বেশ কয়েকটি নেউল দেখেছি । একটা শেয়াল ও চোখে পড়েছে । আর ভীষণ মশা কামড়াচ্ছে । আর পা টা ফুলে গিয়ে একটু কষ্ট হচ্ছে । 


শুভময় বলল, এবার আপনি বাড়িতে ফিরে যাবেন? না সারারাত এখানে বসে মশার কামড় খেয়ে আরো কিছু দেখতে চান ? 


আপনার সাথেই যেতে চাই । কিন্তু আমি তো ভালো করে দাঁড়াতেই পারছি না । 


শুভময় বলল, আপনার মোবাইল কোথায়? ফোনে কেউ পাচ্ছে না কেন? এখানে তো এখনও টাওয়ার আছে আমাদের। 


মেয়েটি বলল, মোবাইল ফোন টা বাজলেও হাত থেকে ছিটকে এখানে দূরে কোথায় পড়ে গিয়েছে । আমি এতো গাছের পাতায় দেখতে পাচ্ছি না। শুভময় ওনার মোবাইল নাম্বার নিয়ে রিং করতে মনে হোল একটু দুরে মোবাইল টা বাজছে। শুভময় এগিয়ে গিয়ে গাছের পাতা সরিয়ে মোবাইল টা গুড়িয়ে এনে ওনার হাতে তুলে দিল । দিয়ে বলল আগে চলুন এই জঙ্গল থেকে বেরোই । তারপর আপনার সব বীরপুরুষ হিরোদের সঙ্গে কথা বলবেন। এবার আস্তে আস্তে চেষ্টা করুন দাঁড়ানোর। 


মেয়েটি বলল, আমি তো অনেকবার চেষ্টা করেছি। যেতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। পারছি না হাঁটতে । পা টায় ভর দিলে ভীষণ লাগছে। 


শুভময় বলল, মানে আপনি চেষ্টা করুন দাঁড়ানোর আমি ধরছি আপনাকে । জঙ্গলের থেকে আগে রাস্তায় পৌঁছাতে হবে তো ? জঙ্গলের মধ্যে সন্ধ্যা নেমে গেলে অনেক বিপদ । এটা আর তখন সিনেমার মতো সাজিয়ে পরিবেশন করা হবে না । কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় ।


মেয়েটি বলল, আর কোন বিপদ আমাকে ছুঁতে পারবে না আমি জানি । বলে শুভময় এর কাঁধে হাত ধরে ভীষণ কষ্টে এক আধ পা এগোবার চেষ্টা করলো মেয়েটি । শুভময় দেখল এইভাবে এতটা পথ হেঁটে যাওয়া যাবে না। ফলে বাধ্য হয়েই মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে এগিয়ে চলে শুভময় । শুভময় এর গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে থাকে মেয়েটি। রাস্তায় যেতে যেতে শুভময় জিজ্ঞেস করে আপনার নাম কি ? এই রকম আর কি কি উটকো সখ আছে আপনার ? 


মেয়েটি বলল আপনার মতো কলেজ জীবনে টেবিল বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইবার । 


শুভময় বলল, মানে আমি কলেজ জীবনে টেবিল বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইতাম । এটা আপনাকে কে বলল ? 


ক্রমশ- পরের সপ্তাহে 


স্বত্ব সংরক্ষিত






#webtostory      #লেখার_স্পর্শে