স্কুল কলেজে খুব কষ্ট করে পড়তে হয়েছে,অনেকটা লুকোচুরি খেলার মতো।

 

এস এইচ সুমন

বীরাঙ্গনা মা'য়ের সন্তান 

এস এইচ সুমন 


-ওই দেখো,রাজাকারের নাতি হেঁটে যায়।

-দেখো দেখো,কিরকম নির্লজ্জ,আজকে ২১ এ ফেব্রুয়ারি,আর এই রাজাকারের বংশধরও শহীদ মিনারে এসেছে।

কি ভাবছেন?কথাগুলো কার হতে পারে?কথাগুলো আমাকেই শোনানো হচ্ছে।আমি আপন,২০২২ সালে এসে পূর্ব পুরুষের কৃতকর্মের জন্য লোকমুখের এই কথাগুলো হজম করা যে কতোটা যন্ত্রণাদায়ক তা আপনারা কখনো বুঝবেন না।

লোকমুখে শুনে আসছি,আমার দাদা একজন দালাল রাজাকার ছিলেন,১৯৭১ সালে তার সাহায্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেক নারী ধর্ষিতও হয়েছেন।

কিন্তু আমরা তো কিছু করিনি,তবে রাজাকারের বংশধর হওয়াটাই কি অন্যায় ছিলো?

বিশ্বাস করুন,যেকোনো জায়গায় গেলে অপমানিত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

মাঝেমাঝে মন চায়,এসব শোনার থেকে একেবারে মরে যাই,কিন্তু সাত পাঁচ ভেবে আবার পিছনে চলে যাই।

আমি যুদ্ধ দেখিনি,যতদূর জানি,এই বাংলার মুক্তির নেতৃত্বে যিনি ছিলেন তিনি(বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) কখনো পাপকে রেখে পাপীকে প্রাধান্য দেননি।

যে পাপ করেছে তার শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন,তবে আমি বা আমার পরিবার তো কখনো পাপ করিনি,পাপ করলে পূর্ব পুরুষ করেছে,তার শাস্তি আমরা কেন পাবো?

বাংলার প্রত্যেকটা দিবস যখন আসে,তখনই আমিসহ আমার পরিবার এক যন্ত্রণায় ভোগে,চারিদিকে লোকমুখে কটুক্তি আর ব্যঙ্গ ভাষা শুনে আর বাংলার মাটিতে থাকতে ইচ্ছে করে না।

স্কুল কলেজে খুব কষ্ট করে পড়তে হয়েছে,অনেকটা লুকোচুরি খেলার মতো।

যখন যেখানে জেনে গেছে আমি রাজাকারের বংশধর,সেখানেই অপমানিত আর লাঞ্চিত হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।

তবে একটা ঘটনা বলি আপনাদের।

আমি মা'য়ের মুখে শুনেছি,সময়টা তখন ১৯৭১ সালের শেষের দিকে।

যুদ্ধ তখন আস্তে আস্তে শুরু হওয়ার উপক্রম,সে সময়ে মা'য়ের বয়স ১২ কি ১৪ হবে।

আমার দাদা তখন ২২ বছর বয়সী ছেলের সাথে মা'য়ের বিয়ে দেয়।

বিয়ের ৩ মাস পর দেশে যুদ্ধ যখন বড় পরিসরে শুরু হয় তখন দাদা নাম লেখায় দালাল রাজাকারের দলে।

বিষয়টা নিয়ে নাকি মা আর বাবা দাদার সাথে আলোচনা করে,যাতে এসব না করে।

এটা দেশের সাথে বেঈমানী করা ছাড়া আর কিছুই না,দাদা তবুও এসব নীতিকথা শুনতে নারাজ।

নিজের মা'য়ের বিষয়ে আজ এমন লজ্জাজনক একটা বিষয়বস্তু প্রকাশ করতে হচ্ছে শুধুমাত্র আপনাদের এসব নোংরা নোংরা কথার জন্য।

তবুও আজ আমি বলবো,আমাকে আজ সব বলতেই হবে।

তখন পাকিস্তানি বাহিনী সবসময় বাড়িতে আসা যাওয়া করতো,আরেকদিন হঠাৎ দাদার কাছে মা'কে চেয়ে বসলো।

দাদাও নিজের প্রাণের কথা ভেবে রাজি হয়ে গেলো,বাবা বাঁধা দেওয়াতে নাকি বাবাকে দাদার চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো।

তবুও দাদা মা'কে ওদের হাতে তুলে দেয়।

একজন রাজাকার হওয়া মানে যে কতোটা পাষবিক হতে হয়,তা মনে হয় দাদা সেদিন পুরো বাংলাকে দেখিয়ে দিয়েছে।

পাকবাহিনীর দল প্রত্যেকটা সময় মা'কে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতো। 

এভাবে চলতে থাকে দিনের পর দিন।

দেশ যখন স্বাধীন হয়,বাংলার ছেলেরা যখন যুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করে তখন তারা মা'কে উদ্ধার করে ।

দাদাকে তখন পাকবাহিনীর সাথে গ্রেফতার করা হয়,দেওয়া হয় ফাঁসি।

মা তখন অন্তঃসত্ত্বা,আমি ছিলাম পেটে।

স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে মা নানা বাড়িতে চলে যায়,সেখানে তাকে আরেক যন্ত্রণা সইতে হলো।

গ্রামবাসী ও পাড়ার নারী পুরুষ সকলে মিলে মা'কে হেনস্থা করে।

তারপর একটা পর্যায়ে গ্রামবাসীরা বিচার সালিশ করে মা'কে অপবাদ দিলো,মা'য়ের পেটে যে সন্তান আছে সে পাকিস্তানিদের অবৈধ সন্তান।

তাকে আর এই গ্রামে রাখা যাবে না,নানা নানুও তখন নিরুপায় হয়ে পড়লো তাদের কাছে।

জুতোর মালা পড়িয়ে মা'কে বের করে দেওয়া হয় গ্রাম থেকে।চোখের সামনে নানা নানু মা'য়ের জন্য কিছুই করে উঠতে পারলো না।

একপর্যায়ে,আমাকে পেটে নিয়েই মা চলে গেলো দূরে অনেক দূরে,সেখানে কেউ আমাদের চিনে না।

মা খুব কষ্ট করে আমাকে পেটে নিয়ে একা একা কাজ করে,যেখানে কাজ করতো সেখানে একটা আশ্রয় পায়।

আমাকে ভূমিষ্ঠ করা থেকে শুরু করে আমাকে বড় করে তোলা পর্যন্ত মা কঠিন লড়াই করে গেছেন।

আমি যখন মেট্রিক পরীক্ষা দিলাম আমাকে জন্মের মতো একা করে আমার মা পাড়ি জমালো না ফেরার দেশে।

খুব কষ্টে এই দুনিয়ায় টিকে ছিলাম তখন।

কেটে গেলো বহুবছর,দিন হতে লাগলো আধুনিক,প্রজন্মও প্রজন্মের মতো বদলাতে লাগলো।

আজ আমার বয়স ৫১ বা ৫২ হবে,বিয়ে করেছি,সংসার হয়েছে,বাড়িতে স্ত্রী সন্তান আছে।

কিন্তু পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে পাওয়া রাজাকারের এই অপবাদ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি।

এখন আপনাদের কাছে  আমার একটা কথাই জানতে চাওয়ার আছে,১৯৭১ এ আমার মা কি এই দেশের জন্য কিছুই করেনি?নিজের সম্মান হারিয়ে দেশের সম্মান রাখেনি?

ওরে ও বেঈমান বাঙালি,ইতিহাস কতটুকু জানো তোমরা?তোমরা আজ যে বাংলা পেয়েছো তা এতো সহজেই পাওয়া হয়ে উঠেনি।

ইতিহাস ঘেটে দেখো,কেঁচো খুড়তে গিয়ে অনেক সাপও বেরিয়ে আসবে।

তবে তোমরা আমার খারাপ ইতিহাসটাকেই দেখলে,ভালোটা দেখতে পেলে না।

এই আমি এখন আজীবনের জন্য চোখ মুছলাম,আমি আর কখনো কাঁদবো না।

আমার মা এতো সংগ্রাম করে গেছে,আমি তারই সন্তান হয়ে কেন'ই বা ভেঙে যাবো?

আজ থেকে এই ভাষার মাসে আমি আমার বীরাঙ্গনা মা'য়ের কসম খেয়ে বলছি,তোমরা যতোই আমাকে পদদলিত করতে চাও না কেন?আমি আর তোমাদের পায়ে মাথা নত করবো না,আমি বাঁচবো,হ্যাঁ আমি বাঁচবো,তবে বীরের মতো মাথা উঁচু করে।

কারণ আমি ৭১ এর বীরাঙ্গনা মা'য়ের সন্তান।