অনেক নতুন গল্প আছে, তোদের জন্য লেখা।

 

web to story

বিদায় নেওয়া সেই দিন

তন্ময় রায়


আমাদের এই ছন্দময় জীবনে সুখ-দুঃখ , হাসি-কান্না, জানা-অজানা , বিরহ-মিলন কত ঘটনা ঘটে প্রতিদিন ।রোজ নতুন ভাবে বেড়ে ওঠা, নতুনকে শেখা , নতুনকে জানা । কত কিছুই না ঘটে রোজ। একদিকে যেমন মানুষের কাজের জীবন, তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা-বাঁচার লড়াই। আবার অন্যদিকে তার ফেলে আসা সীমাহীন খুশির একটি সুন্দর স্মৃতি। সেই স্মৃতি তাকে জীবনের একাকী মুহূর্তে খুশি দেবে , তার একাকীত্ব দূর করবে যাতে কোনো মিথ্যা থাকবে না। শুধু থাকবে লোভ , সেই স্মৃতিকে ফিরে পাওয়ার লোভ।

       আমি তখন দশম শ্রেণীতে পড়ি। এক দিন আমি ও আমার দশজন সহপাঠী বন্ধু শুধু ক্লাস এসেছি। সেই দিন সকাল থেকেই আকাশ কালো মেঘে ঢাকা ছিল। স্কুলে পৌঁছে প্রথমে ক্লাসের পরেই বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। খুব জোরে নয়, টিপটিপ করে। বুঝলাম এ বৃষ্টি সহজে থামবার নয়। বছরের প্রায় শেষ সময় অর্থাৎ শীতকালীন বৃষ্টি। ঠান্ডা একেবারে হাড় কাপানো। অনেকক্ষন  ক্লাসে কোনো স্যার কিংবা মেডাম না আসায় বুঝলাম এর পরেও কেউ আসবে না। তাই আমরা সকলে মিলে বসে আড্ডা দিতে শুরু করলাম। দিনের আলো কোন চিহ্নই ছিল না। শুধু ছিল একটি খোলা জানলা আর নিস্তেজ সাদা জ্বলন্ত বাল্ব। জানলা দিয়ে বাইরের আকাশ আর পথ দেখা যাচ্ছিল। বৃষ্টি হয়েই চলছে। আগের খানিকটা জোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। আড্ডা আরো জমে উঠতে লাগলো।

       এই আড্ডা প্রতিদিনের একঘেয়েমি থেকে, জ্বর বস্তুর জগৎ থেকে নিয়ে যায় সুন্দরের জগতে। আড্ডায় উঁচু-নিচু , জাত-ধর্ম-গোত্র। কোন কিছুরি জায়গা ছিল না। ছিল শুধু বন্ধুর জায়গা ।

       এই আড্ডার কোন নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ছিল না। যে যা পারছে তাই শোনাচ্ছে । কেউ তার হাস্যকর ব্যর্থ প্রেমের কথা , কেউ বা তার ঘুরতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ইত্যাদি।কিছুক্ষণ পরে আমাদের আড্ডা ভূতের গল্পে এসে পৌঁছল। এই দায়িত্বটা পরল আমার উপরে। সত্যি বলতে সেইদিন আমিও জানিনা এত ভালো করে গল্পটা বললাম কি করে। সেই আবহাওয়ায় গল্পটা বেশ জমে উঠেছিলো। তারা প্রায় প্রত্যেকেই ভয় পেয়েছিল। অবশেষে আবেগপূর্ণ কিছু কথা , বন্ধুত্ব নিয়ে কিছু কথা । কথা বলতে বলতে স্কুলের পাশে দোতলা বাড়ি থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের - " যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে " গানটা বেজে উঠলো । মনটা সুরের সঙ্গে যেন মিলিয়ে যেতে চাইলো। হঠাৎ স্কুলের শেষ ঘন্টা বাজায় আমরা যেন মায়া ভরা সুন্দর জগৎ থেকে বেরিয়ে এলাম।

         

           তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। আমারা যে কয়েকজন ছিলাম তাদের মধ্যে থেকে এখন দু-তিন জন একসাথে একই পথে যে যার বাড়ি যাচ্ছি । রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম পড়ন্ত বিকেলে দূরের পাহাড়ের ওপরে কে জানি তরল সোনা ঢেলে দিয়েছে, রাঙা রোদে মাখামাখি হয়ে আছে নারকেল গাছ, সোনার মতোই ঝকঝক করছে শিব মন্দিরের চূড়া । 


   শিব মন্দিরের পাশের মাঠে কিছু ছেলে ফুটবল খেলছিল । তাদের মধ্য থেকেই একজনের ফুটবল জোরে শট মারায় ফুটবল মাঠের বাইরে এসে লাগে আমার সঙ্গে হেঁটে যাওয়া এক বন্ধুর। সে প্রায় একটুর জন্য বেঁচে যায় ,কারণ কাঁদা ও জলে ভরা একটা গর্তের পাশে সে পড়ে যায়। সেই ছেলেটি আমাদের কাছে এসে একটু অনুশোচনা না করে বলে "খেলবি নাকি"।আমরা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তার প্রতি কোন রূপ রাগ পোষণ না করে, সেখান থেকে চলে আসি। আসতে আসতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন গল্প আর হাসি। সবার আগে আমার বাড়ি পরে। তাই আমি যখন বাড়ির গেটের সামনে পৌঁছাই তখন তারা আমায় বলে  "বিদায় বন্ধু কাল দেখা হবে " এবং চলে যায় । আমিও দিকে হাত উঠিয়ে হাসি মুখে বিদায় দিলাম, আর মনে মনে বললাম -

      

     অনেক নতুন গল্প আছে,

     তোদের জন্য লেখা।

     বলবো একদিন সময় করে,

      যদি পাই এমন দিনের দেখা।


      বিদায় নিয়ে,

      মুখে বললাম আসি।*ভালোবাসি

      যাবার আগে শুনে যা,

     বন্ধু "আমি তোদের বড্ড ভালোবাসি।"



        একটানা জীবনপ্রবাহের এরকম অনেক ঘটনাই বুদবুদের মতন ক্ষণিক। তার মধ্যে দু-একটা ঘটনা ভোলা যায় না। ভোলার নয় ।  আমার কাছে আজও সেই বর্ষার দিনটি আবেগপূর্ণ। সেই দিনের স্মৃতি আজও আমাকে আনমনা করে, উদাস করে।


#webtostory