জীবন শিল্পী ফজলুল: সম্পাদনা মানস ভাণ্ডারী, দে পাবলিকেশন, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটারজি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০৭৩, প্রচ্ছদ:প্রণব হাজরা, মূল্য-৪০০ টাকা।

 

ফজলুল হক


ফজলুল হককে নিয়ে আকর গ্রন্থ: 'জীবনশিল্পী ফজলুল' 

🍁

তৈমুর খান 

🌷


সত্তর বছরে পদার্পণ করার মুহূর্তে বীরভূম জেলার রাঙামাটির সাহিত্যিক ফজলুল হক(জন্ম ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ)-কে নিয়ে বিশেষ একটি সংকলন 'জীবনশিল্পী ফজলুল'(কলকাতা বইমেলা ২০২২)  সম্পাদনা করেছেন বীরভূম জেলার আর এক অন্যতম সাহিত্যিক মানস ভাণ্ডারী। ফজলুল হকের একটি সাক্ষাৎকারসহ প্রায় ৩১টি রচনা এই সংকলনে ঠাঁই পেয়েছে। এছাড়া লেখকের জীবনপঞ্জী এবং বিভিন্ন মুহূর্তে বিশিষ্টজনদের সঙ্গে তোলা নানা ছবিও সংকলনের শেষে যুক্ত করা হয়েছে। সবদিক দিয়েই সংকলনটি মনোগ্রাহী এবং মানুষ ও লেখক ফজলুল হককে চিনিয়ে দেওয়ার পক্ষে পর্যাপ্ত আয়োজন বলেই বিবেচিত হবে।

   ফজলুল হক মূলত কথা সাহিত্যিক হিসেবেই সকলের কাছে সুপরিচিত। কিন্তু নাজিম আফরোজ ছদ্মনামে তিনি কবিতারও চর্চা করেছেন। আর এই দুই ধারাতেই তিনি সফল। ব্যক্তিজীবনে তিনি সমস্ত ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা এবং ভণ্ডামির ঊর্ধ্বে মানবিক জীবনধারাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছেন। তাই ধর্ম বলতে তিনি মানবধর্মকেই তাঁর জীবনদর্শনে আশ্রয় দিয়েছেন। আজ থেকে ৫০ বছর পূর্বে 'তমসুক' পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে সমমনস্কা রীনা কবিরাজের সঙ্গে প্রণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ভিন্ন সম্প্রদায়ের এই যুবক-যুবতীর সম্পর্ককে সেই সময়ে সমাজ মেনে নেয়নি। কিন্তু তাঁরা সমাজের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েই অগ্রসর হতে থাকেন আর তাতেই জয়ী হন। তেমনি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসগুলি নানা সময়ে বিতর্কের সৃষ্টি করে। 'জাদুবাক্সে' ধর্মের বদ্ধ ধারণার প্রাচীর ভাঙতে তিনি কম্পিউটার তথা ইন্টারনেট ব্যবহারের মোক্ষম প্রয়োজনীয়তাকে দৃষ্টিগোচর করেন। এর সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম বা জাত নয়, প্রকৃত মানুষের স্বরূপ কী তা বুঝিয়ে দেন। 'গন্ধমূষিকে' কুটিল ও জটিল রাজনীতির প্রতি তিনি ব্যঙ্গাত্মক ও কুশলী কুঠার হানেন। 'নিসর্গের রূপকথা'য় তিনি দেখিয়েছেন প্রবৃত্তির আগুন কতটা অমোঘ, যার কারণে সমস্ত নৈতিকতাই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। 'মৃতরাত্রিপুরাণে' দেখিয়েছেন প্রেম বয়স মানে না, প্রেম অধিকার চায়। 'ছায়াবৈরী'তে ব্যক্তি জীবনের দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির মুহূর্ত চেতনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই উঠে এসেছে। এভাবেই তাঁর প্রতিটি রচনা জীবনের আদিমতাকে স্পর্শ করে অন্তর্জীবনের অন্ধকারময় দিকগুলির উন্মোচন করতে পেরেছে। ছোটগল্পগুলিতেও তিনি পাঠককে বাস্তব এবং পরাবাস্তবের সীমানায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। যৌনতাও কতটা অমোঘ সত্য, ইন্দ্রিয়জ চেতনার কাছেও আমরা কতটা দায়বদ্ধ তা তিনি দেখাতে পেরেছেন। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতেই জীবনের আর্তনাদ শোনা যায়। দীর্ঘশ্বাস পতনের শব্দ মানুষ অনুভব করতে পারে। তেমনি চিরন্তন আদিমতার প্রবাহকেও অনুধাবন করতে পারে। সময়কে যেমন তিনি অস্বীকার করেন না, তেমনি জীবনকেও তিনি অস্বীকার করেন না। কিন্তু এই জীবনের উপরে যখন ভণ্ডামি এবং ছদ্ম নীতি-নৈতিকতার ভার চাপিয়ে দেয়, তখন তিনি বিদ্রোহ করেন। তখনই তাঁর সাহিত্য রচনার প্রয়োজন হয়। তেমনি রাষ্ট্র-সমাজ যখন মানুষকে এবং মানবসভ্যতাকে অনুশাসনের অজুহাতে বন্দি করতে চায়, স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করতে চায়— তখনও তিনি গর্জে ওঠেন। আর এই গর্জনই তাঁর সাহিত্য হয়ে ওঠে। তাই এই সংকলনের প্রসঙ্গকথায় সম্পাদক উল্লেখ করেছেন: "নিজস্ব জীবন এবং রচিত রচনায় এই অক্ষরশিল্পী ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত। সমাজ, চিরাচরিত ধর্ম এবং সমকালের পাশাপাশি সাহিত্য ক্ষেত্রেও তিনি যেন ভিন্ন এক সৈনিক। মানব ধর্ম তাঁর কাছে শেষ কথা। স্রোতের বিরুদ্ধে সন্তরণের স্বাভাবিক আঘাতগুলি সহ্য করেছেন, কিন্তু জীবনসত্য, বিশ্বাস ও লক্ষ্যে থেকেছেন অবিচল। আদ্যন্ত এক সৎ এবং নিষ্ঠাবান সৈনিকের পক্ষেই এটা সম্ভব।"

 এই কথাটির মর্মধ্বনি সমগ্র সংকলনটিতেই উঠে এসেছে। শুধু বিষয়ের ক্ষেত্রেই নয়, ফজলুল হক এক অসাধারণ ভাষাশিল্পী। ওরহান পামুক, গার্সিয়া মার্কেজ প্রমুখ বহু বিদেশী সাহিত্যিকের পদধ্বনি তাঁর সৃষ্টিতে শোনা গেলেও তিনি শব্দ গঠন এবং বাক্যবিন্যাসে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছেন। সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেছেন: "আমার লেখায় চেষ্টা করেছি ভাষাকে সুমধুর কাব্যিক করে তুলতে। বাক্যগুলি যেন কবিতা হয়ে ওঠে।" এই কথার সত্যতা তাঁর সমগ্র সৃষ্টিতেই ছড়িয়ে আছে।১৩৮০ বঙ্গাব্দে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ে সম্পাদনায় প্রকাশিত 'প্রবাসী' পত্রিকায় 'বিপ্রলব্ধ' গল্প লিখে তাঁর যাত্রা শুরু। তারপর বহু সাপ্তাহিক, মাসিক ও দৈনিক পত্রিকায় অজস্র গল্প লিখেছেন।তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হল: জাদুবাক্স, ছায়াবৈরী, ছায়ানিলয়, মৃতরাত্রিপুরাণ, নিসর্গের রূপকথা, গন্ধমূষিক, নদী বয়ে যায়, মহাশূন্যের সংলাপ, ছায়াযুদ্ধের ঘোড়া ইত্যাদি। পেয়েছেন রাঢ় বাংলা সাহিত্য একাডেমি শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার সম্মাননা, বাউল ফকির আখড়া কথা সাহিত্যিক পুরস্কার, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মাননা, সুফিয়া স্মৃতিপুরস্কার ইত্যাদি। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত ও আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: নলিনী বেরা, শক্তিনাথ ঝা, মীরাতুন নাহার,ড.ফাল্গুনী দে, অভিনব গুপ্ত, তৈমুর খান, সুকান্ত দেবনাথ, নাসিম এ আলম, আর্য দাশগুপ্ত, আনসার উদ্দিন, তপন গোস্বামী, মুসা আলি, অনিমেষ মণ্ডল, প্রতিষ্ঠা আচার্য, লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল, জ্যোতির্ময় রায়, জয়ন্ত সোম, গোপাল রায়, আবদুস সালাম, সৈয়দ মৈনুদ্দিন হোসেন, অর্ঘ্য ঘোষ, তারাপদ হাজরা, সোমনাথ দাস চান্দল্য, সমরেশ মণ্ডল, সৈয়দ সাইফুদ্দিন, আনারুল হক, মধুমিতা সরকার, শিবপ্রসাদ খাঁ;এছাড়া সহধর্মিনী রীনা কবিরাজ ,কন্যা এফা তসলিম এবং জামাতা জোসেফও কলম ধরেছেন। ব্যক্তি ফজলুল হক এবং সাহিত্যিক ফজলুল হক কতটা মানবিক, সংবেদনশীল, দায়িত্ববান, অকপট এবং দুঃসাহসী তা এই লেখাগুলিতেই বোঝা যায়। সংকলনটি বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে এবং বাংলা সাহিত্যের গবেষকের কাছে একখানি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ এবং আকর গ্রন্থ হয়ে উঠবে। সম্পাদক মানস ভাণ্ডারীর অসাধারণ সম্পাদনা এবং বহুমুখী বহুবিচিত্র লেখা সংগ্রহের তারিফ না করে পারি না।


🌿

 জীবন শিল্পী ফজলুল: সম্পাদনা মানস ভাণ্ডারী, দে পাবলিকেশন, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটারজি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০৭৩, প্রচ্ছদ:প্রণব হাজরা, মূল্য-৪০০ টাকা। 


ফজলুল হক