হাঁটছি তোমার মাঝে শতধারা:দীপংকর রায়, এবং কথা প্রকাশন,২৬ বাঁশদ্রোণী প্লেস, কলকাতা-৭০০০৭০, প্রচ্ছদ:অঞ্জলী রায়, মূল্য-উল্লেখ করা হয়নি।

 

দীপংকর রায়


আত্মমগ্ন নিভৃতচারী কবি দীপংকর রায়

🍂

তৈমুর খান 

🍂

 আশির দশক থেকে কাব্য-কবিতার জগতে সক্রিয় থাকলেও এবং 'এবং কথা' নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করলেও সর্বদা নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছেন এবং সর্বদা আড়াল করেছেন। কখনো উচ্চকিত হননি। কখনো দীর্ঘ রাস্তার মাঝখানে হাত তুলে দাঁড়াননি। সেই নিভৃতচারী কবি দীপংকর রায়(জন্ম১৯৫৮) এর দুটি কাব্যগ্রন্থ আমার হাতে এসে পৌঁছেছে।

১)'আমি-ই তোমার একমাত্র সাক্ষী, আমি-ই তোমার প্রতিপক্ষ' (অক্টোবর ২০১৭) 

২) 'হাঁটছি তোমার মাঝে শতধারা' (জুলাই ২০২১)

 দুটি কাব্যই দীর্ঘ কবিতার, প্রথমটিকে কবি বলেছেন:'কবিতা-উপন্যাস'। দ্বিতীয়টি অতিমারির কালে মাতৃবিয়োগের হাহাকারে লেখা শোককাব্য। কবি বলেছেন : 'হাহাকারের বর্ণমালা'।

 কেমন লেখেন দীপংকর রায়?

    কাব্য ভাবনায় একটা স্বয়ংক্রিয় ঘোরের মধ্যে তিনি নিজেকে চালিত করেন। একটা নিস্তব্ধতার বাতাবরণ তৈরি হয় তাঁর কাব্যদর্শনে। মিথস্ক্রিয়ার নানা অনুষঙ্গ এসে উপস্থিত হয় তাঁর ভাবনায়। দেশীয় লোকজশব্দের ব্যবহারে তিনি মৃত্তিকালগ্ন ও জীবনলগ্ন উপলব্ধিকে চারিত করেন। স্বাভাবিকভাবেই মর্ম ও মাটির ঘ্রাণ তাঁর কবিতায় উঠে আসে। বাহিরের শিল্পসৌকর্যে তিনি উজ্জ্বল নন, বরং শব্দে ভেতরের শ্বাসবায়ুকেই প্রাণ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেন। এক কষ্ট ও হাহাকারের ক্ষরণ থেকেই স্মৃতিচারণায় নির্মিত হয় চিত্রকল্প। প্রকৃতির সঙ্গে আত্মজীবনের নিবিড় সান্নিধ্যকে মরমিয়া বাতাবরণে লিপিবদ্ধ করেন। মূল স্রোতের কবিতা পাঠকের কাছে অনেকক্ষেত্রেই তাঁকে 'অপ্রচলিত' বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নিজস্ব ভিত্তির ওপর তিনি তাঁর সৃষ্টিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন এবং এটাই তাঁর ব্যতিক্রমী ধারা।

   🍃'আমি-ই তোমার একমাত্র সাক্ষী, আমি-ই তোমার প্রতিপক্ষ' একে 'কবিতা-উপন্যাস' বললেও আমার কাছে একটি নিটোল কবিতা। কবির দুটি সত্তার কথোপকথন। একটি সত্তায় মিশে আছে বাংলাদেশ; আরেকটি সত্তায় ছিন্নমূল জীবনের শূন্যতা। কবি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও শৈশব কেটেছে বাংলাদেশে। সেখানকার আত্মীয়-স্বজন, বাল্যজীবন, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক কিছুতেই ভোলার নয়। তারা সবাই কবির হৃদয়ে বসবাস করে। কিন্তু দেশভাগ যে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আসে এবং তাতে যে দূরত্ব রচিত হয় তা এক অদৃশ্য আঘাত। একটি সত্তাকে যেন খুন করে দেয়। সেই সত্তার মৃত্যুকে আজীবন কবি বহন করে নিয়ে চলেছেন। সেই কষ্টকেই এই কাব্যে রূপায়িত করেছেন। কবির গভীরতম হৃদয়ের তলদেশ থেকে যে যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাস ঘনীভূত হয়েছে, যে বিপন্নতার বিস্ময় জেগে উঠেছে তার নিরাময় কখনোই সম্ভব নয়। মানবিক আবেগের হত্যা যে কত বড় ট্র্যাজেডি তা এই কাব্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। দেশের জন্য কষ্ট, মানুষের জন্য কষ্ট, প্রকৃতির জন্য কষ্ট, নিজস্ব শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য কষ্ট যা নিরবধি নিরন্তর বয়ে চলেছে। উপন্যাসের নায়ক কবি নিজেই। নায়িকা দেশ ও দেশের প্রকৃতি। সাম্প্রতিককালের নাগরিক পঞ্জিকরণের রাষ্ট্রীয় বিধানও কবিকে উদ্বিগ্ন করেছে। গ্রন্থের  ২ নং পর্বে খুবই উদ্বেগের কথা লিখেছেন:

"বাড়ি ভেঙে বাড়ি বানাবার দৌড়ে


       আজও যখন ঘরছাড়া হয় যৌথ পরিবার;

তারই খেলায় গোটা দেশ অজান্তে বাড়াচ্ছে বুঝি


                          অপ্রাকৃত মানুষের জঙ্গল:

নতুন কিছু নয় এ যুদ্ধ, এ ঘরছাড়াদের দৌড়ে

                        তুমি আমি একাল সেকাল

 ফিতে ধরে সকলেই এগিয়েছি

কেটে নিয়েছি পড়শির মাটি,পরবাসের ঘর

বারবার হয়েছি উদ্বাস্তু;

উদ্বাস্তু হয়েছে সকল সময়!"

 এই উদ্বাস্তু এখনো আতঙ্কের মতো জড়িয়ে আছে জীবনে। স্বপ্ন, প্রবৃত্তি, বাঁচা বারবার ক্ষুণ্ন হয়েছে। সময় চলে গেছে অসময়ের দিকে। হাজারো মৃত ভাই আর তাদের বিধবা স্ত্রীর অসহায় চোখ বারবার ভেসে উঠেছে। ঘূর্ণমান জীবনে মোহনার খোঁজ করেছেন কবি। অথচ কাউকে বোঝাতে পারেননি। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ওরা দেশভাগ উদযাপন করেছে। এই গল্পে কবি নিজেকে 'আকাট' ভেবেছেন। নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন:

 "কে আমি? কে তুমি?

 কে আমার আমাতে সুখের আঁচড় কেটে

 নিজ সুখে হয় আহ্লাদিত!"

 যেন এক বিবেকের দংশন বারবার ছোবল মেরেছে। যে ভাজা মাছ দিয়ে পান্তাভাত খাওয়া যৌথজীবন তা ভুলতে পারেননি। তারপর বিচ্ছেদ বেদনা ৪০ বছর ধরে বহন করে চলেছেন। বর্ষা,মেঘ,নদী, ছিপে মাছ ধরা, জল-বাতাস, অন্ধকার বিকেল, বিদ্যুৎ চমক, জলপ্রপাত, জঙ্গল, সজারুর হাসি ওটা হুল, নেকড়ের ডাক, বন্যহাতির যাওয়া-আসা, আর ভাষা শিক্ষার নিজস্ব বর্ণমালা বারবার মনে উদয় হয়েছে। বকুল ফুলের মালা হাতে স্বপ্নের প্রেরণাদাত্রীকে আজও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। নিজস্ব শিকড়ের টানে বৈষ্ণবীর আখড়ায়, শ্রীচৈতন্যের কীর্তনের আসরে এবং লালন-বাউলের একতারায় নিজেকে খুঁজে পান। মৃত্যুর পরেও নবগঙ্গার পাড়ে মাটি হতে চান। আজান আর ঘন্টা ধ্বনির মধ্যে মহামানবের মহাসমন্বয়ে অফুরন্ত ভালোবাসার দিন স্মরণ করেন। লাঙল-জমি, ভাতফোটার ঘ্রাণ এখনো উজ্জীবিত করে। নিজেকে অন্বেষণ করেন। মানবধর্মের কাছেই মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন:

"যে ধর্মের বিকল্প-পৃথিবী শুধুমাত্র মানুষেরই

মানুষেরই জন্যে সমস্ত পৃথিবী একটি দেশ হবে?"

 কিন্তু কবি আজ দিকভ্রান্ত 'পথহারা আমি' বলে নিজেকে উল্লেখ করেন। 'অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার আগুনে দিশেহারা পথিক হয়ে' ঘুরতে থাকেন।

   হৃদয়ের দাবি নিয়ে স্মৃতির বিন্যাসে অতীতচারণ যেখানে, সেখানে দেশও এক পরমামানবী। সমস্ত মন জুড়ে বিরাজ করছে। হৃদয়হীন ক্ষমতালিপ্সু স্বার্থপর রাজনীতির কারবারিরা তাকে ভাগ করেছে, কিন্তু তারা মনকে ভাগ করতে পারবে না। আত্মাকে ভাগ করতে পারবে না। এই ভাগের কষ্টই কবিকে তাড়া করেছে। ভাষাহারা করেছে। জীবনকে এলোমেলো করে দিয়েছে। তাই নিজেকে খুঁজেছেন নিজের শৈশবে। কিন্তু নিজেকে কিছুতেই ধরতে পারেননি। শরৎচন্দ্রের 'শ্রীকান্ত' এবং বিভূতিভূষণের 'অপুর সংসারে' নিজেকে দেখতে পান। প্রকৃতির মধ্যেও নিজেকে দেখেন:

"ফড়িং, প্রজাপতি ও আমি একে অন্যের চেহারায় হারাতে হারাতে

এই বাংলার সকল সন্ধ্যাবেলা পেয়ে যাই…"

 সব কিছুর মধ্যেই এই আত্মসঞ্চার ঘটতে থাকে। এক সময় নিজেকে দেখেন:

"দ্বিধাহীন এই আমি,আমাকে খোঁজার মধ্যে

যে জীবন ব্যয় করি, ব্যয় করে ফেলা হয় বলে

ভাবে যারা, তাদেরই জন্যে এ সময়ের বড় দাম দিতে হয়।"

 কবির হৃদয়ই একটা দেশ। কবির জন্মের দেশ। স্বপ্নের দেশ। বাঁচার ও মরণের দেশ। প্রচলিত ধারায় কাব্যটি লেখা হয়নি, কিন্তু জীবনের উত্তাপে যে শব্দগুচ্ছ মর্মরিত হয়েছে, যে আর্তি ও উপলব্ধি বিস্তৃতি পেয়েছে তাতে নিজস্বতা ফুটে উঠেছে। আমরা একে কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারি না।

   🍃'হাঁটছি তোমার মাঝে শতধারা'

 করোনাকালীন দিনগুলিতে মাকে নিয়ে যেভাবে দিন যাপন করেছিলেন কবি সেই স্মৃতিগুলি বারবার ফিরে এসেছে। পুত্রের জীবনে মায়ের প্রভাব কতখানি এবং মায়ের মৃত্যুতে পুত্রের হৃদয়ের শূন্যতা কতখানি তা পরিমাপযোগ্য নয়। এক গভীর শোকের মধ্য দিয়ে কবি বাঁচার পথ অন্বেষণ করেছেন। এই মহাবিপন্ন মুহূর্তে কোন্ খড়কুটো ধরে তিনি বেঁচে ফিরবেন? না, চোখের সামনে কোনো সান্ত্বনা-ই দেখতে পাননি। বরং তীব্র এক বেদনা বিহ্বল দিগন্ত তাঁকে হাতছানি দিয়েছে। মায়ের হাতের সূচীশিল্পের নিদর্শনকে কাব্যের প্রচ্ছদ করেছেন। যে শোকের বর্ণমালা জেগে উঠেছে সেখানে এক দার্শনিক চেতনাও বারবার উঁকি দিয়েছে। অসহায় সন্তান জানেন মায়ের কোনো বিকল্প নেই। তাই মনের মধ্যে মা-কে নতুন করে নির্মাণ করেছেন। সমস্ত চেতনা জুড়ে মায়ের উপস্থিতি টের পেয়েছেন। মৃত্যুকালীন শয্যায় মায়ের কথাবার্তা,অভ্যাস, আচরণ প্রসঙ্গক্রমে সবই উঠে এসেছে। পারিপার্শ্বিক মানুষজনের ব্যবহারে কতটা আন্তরিকতা ছিল তাও স্পষ্ট হয়েছে। নিজেকে স্থির রাখা মুশকিল হয়েছে একজন পুত্র হিসেবে। তাই কবি লিখেছেন:


        "আমি কি আছি?

 কেমন ভাবে থাকলে, ঠিকঠাক হয়ে যাবে

             আগের মত সব?"

 হ্যাঁ থাকা তো এক রহস্যময়। মানুষের হাতে কোনো সমাধান নেই। মায়ের মতো সবাইকেই যেতে হবে। আমরা সবাই অপেক্ষা করছি যাওয়ার জন্য। তাহলে ভাবনা কেন? কিন্তু তবু ভাবনা আসে। শূন্যতা পাক খায়। হৃদয় মোচড় দেয়। মায়ের স্মৃতি সম্মুখে দাঁড়ায়। কার্নিশে একলা ঘুঘু ডাকে। বারবার বিকারগ্রস্ত হয়ে যান কবি। সমস্ত দিকই মনে হয় গভীর অসুখে থরথর করে কাঁপছে। কোনো অস্থির বালক যেন ফড়িং ধরার ফাঁদ পেতেছে। মনের কষ্টের সঙ্গে মনের প্রশ্নসংকুল যন্ত্রণাও প্রতিফলিত হয়েছে। কবি তাঁর চেতনাকে পরকাল পর্যন্ত প্রবাহিত করেছেন। এক নিস্তব্ধতা এসে কবির সংলাপে অংশগ্রহণ করেছে।  শোকের কাব্য হলেও হৃদয় ক্ষরণের মগ্নতায় আমাদের আবিষ্ট করে রাখে।


🍂


১)আমি-ই তোমার একমাত্র সাক্ষী, আমি-ই তোমার প্রতিপক্ষ: দীপংকর রায়, এবং কথা প্রকাশন,২৬ বাঁশদ্রোণী প্লেস, কলকাতা-৭০০০৭০, প্রচ্ছদ:মানিক মৈত্র, মূল্য-১০০ টাকা(ভারত) ও ১৫০ টাকা (বাংলাদেশ)।


 🍂


২) হাঁটছি তোমার মাঝে শতধারা:দীপংকর রায়, এবং কথা প্রকাশন,২৬ বাঁশদ্রোণী প্লেস, কলকাতা-৭০০০৭০, প্রচ্ছদ:অঞ্জলী রায়, মূল্য-উল্লেখ করা হয়নি। 



🗣️কবির সঙ্গে কথা : ৮২৯৬৪৪৯২৬২


ছবি: দীপংকর রায়



দীপংকর রায়

দীপংকর রায়

দীপংকর রায়