আমি কী এমন একটি পদ্মফুলের ঘ্রাণ কোনোদিন লইতে পারিব না?

 

web to story

পদ্মফুলের রূপকথা

কোয়েল তালুকদার

আমার দাদাজানকে আমি কখনই দেখি নাই। তাহার কোনো ফটোগ্রাফ কিংবা কোনো  তৈলচিত্রও কোথাও আঁকা নাই। বাবার কাছে শুনিয়াছি,  তিনি  ঊনিশ শত ছত্তিশ সালে মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন। তিনি দেখিতে নাকি অনেকটা ঋৃষিদের মতো ছিলেন। ভাল পুঁথি পাঠ করিতে পারিতেন। গত রাতে আমার দাদাজানকে স্বপ্নে দেখিলাম।


উনিশ'শ তিরিশ দশকের এক নিঝুম সন্ধ্যারাত্রি। বাড়ির উঠানে বসিয়া দাদাজান পুঁথি পাঠ করিতেছে।  মাটির প্রদীপদানীতে সলতে মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছে। তাহার পাশে অনেকেই বসিয়া তাহার পুঁথি পাঠ শুনিতেছে। দাদীমাও বসিয়া আছেন সেখানে । আমি ঠিক দাদীমার বাহুতে হেলান দিয়া সেই পূথি পাঠ মন্ত্রের মতো হা করিয়া শুনিতেছি। পরম উদ্গ্রীব হইয়া শুনিতেছিলাম আর ভাবিতেছিলাম --- আহা! এমন করিয়া তিনি যদি সারা রাত্রি পুঁথি পাঠ করিয়া যাইতেন! কী সুন্দর  সুরেলা প্রেমময় কণ্ঠ তাহার। অনেকটা ব্রজবুলি ভাষায় তিনি দৌলত কাজীর পুঁথি পাঠ করিয়া যাইতেছেন।


'‘‘

কি কহিব কুমারীর রূপের প্রসংগ।

অংগের লীলায় যেন বান্ধিছে অনংগ

কাঞ্চন কমল মুখ পূর্ণ শশী নিন্দে।

অপমানে জ্বলেতে প্রবেশে অরবিন্দে "


একটা সময়ে তিনি পুঁথি পাঠ বন্ধ করিলেন। আমার দিকে তাকিয়া কহিলেন --


বৎস, এই যে তুমি তোমার দাদীজানকে দেখিতেছ এর কথা তোমাকে কী বলিব? একবার আমি আরাকান পাহাড়ে গিয়াছিলাম। সে তখন হাঁস হইয়া ওখানের একটি নদীতে ভাসিতেছিল। সে কখনও মাছ হইয়া সাঁতার কাটিত নাফ, কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীতে । আবার কখনও  হাজার পাপড়ির পদ্মফুল হইয়া ফুটিয়া থাকিত সরোবরে – দূর দূর দেশ থেকে অনেকেই আসিত তোমার দাদীমার সৌন্দর্য দেখিতে। কিন্তু কেহই তাহার সৌন্দর্য সুধা উপভোগ করিতে পারে নাই। আমিই পারিয়াছিলাম। তাহার পাঁপড়ির ঘ্রাণে আমিই প্রথম  মুগ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলাম।


আমি আমার দাদাজানকে বলিলাম, আমি কী এমন একটি পদ্মফুলের ঘ্রাণ কোনোদিন লইতে পারিব না? তিনি বলিলেন --- তুমি তোমার মাথাটি আমার দিকে আগাইয়া ধরো। এসো বর দিয়া দেই -- তোমার এই রূপবতী দাদিমার মতো তুমিও যেন জীবনে এমন একটি পদ্মফুলের পাঁপড়ির ঘ্রাণ লইতে পারো।


আমি ঠিক বুঝিতে পারিলাম না ঠিক কোন্ পদ্মফুলের পাঁপড়ির ঘ্রাণে আমার ঘুম হঠাৎ ভাঙ্গিয়া গেল! 


~ কোয়েল তালুকদার