ধারাবাহিক গল্প - ধূমকেতু - পর্ব - ৩ - সুশান্ত ঘোষ

  

webtostory

ধূমকেতু   [ ৩ পর্ব ]

সুশান্ত ঘোষ  


শুভময় এর বিস্ময়ের মাঝে মেয়েটি বলল, তবে কি আপনি অস্বীকার করছেন । আমি তো জানতাম আপনি পরিস্কার কথা শুনতে বা বলতে নাকি পছন্দ করতেন?


শুভময় বলল অবাক কথা বলছেন আপনি - আমি পরিস্কার কথা বলতে ও শুনতে ভালবাসি । কলেজ জীবনে টেবিল বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইতাম এইসব কথা আপনি বলছেন আবার আমাকেই । যাকে আপনি চেনেন না, আমি কে ? কি কাজ করি সেটাও জানেন না এখনও ? ঠ্যাং মচকে আমার কোলে চেপে চলেছেন । আমি কখন আপনাকে হাত থেকে আমার কষ্ট হলে ফেলে দেব এটাও আপনার অজানা ? তবুও পাকা পাকা কথা বলতে একটুও দমবার লক্ষণ নেই। 


মেয়েটি বলল, যার কোলে করে চলেছি তার হাত থেকে পড়ে যাওয়ার কোন ভয় আমার নেই । আর যার গলাটা জড়িয়ে ধরে আছি যদি এই জীবনে পড়ি তো তাকে নিয়েই পড়ব এটা নিশ্চিত । একটা মেয়ে যখন কারো বাঁধনে বিপদের মুখেও আবদ্ধতায় বাঁধা পড়ে তখন সেই মানুষটির মনটা পড়ে নেওয়ার ক্ষমতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েটির থাকে মিস্টার হিরো । তবে টেবিল বাজিয়ে কলেজ জীবনের কিশোর কুমারের ভক্ত আমি হতে পারিনি ।  আর বাহিরে গাম্ভীর্য দেখিয়ে রোমান্টিক হিরো আজকের দিনে আদ্দিকালের বদ্দিবুড়োর মতো রাজেশ খান্নার ভক্ত আমি নই ।


শুভময় অবাক হয়ে মেয়েটিকে বলে আমি রাজেশখান্নার ভক্ত এটা আপনাকে কে বলল ? আর আমি কিশোর কুমারের গান পছন্দ করি এটাই বা আপনি মনে বলছেন কি করে ? আপনি কি মানুষের মনটাও পড়তে পারেন নাকি ?


মেয়েটি বলল তা একটু আধটু পড়তে পারি । মন চাইছে আজ ফাগুনের রঙে সাজতে আমি আপনার মতো অভিনয় করে সরে থাকতে পারব না ? তবে কলেজ জীবনের ক্লাস অফ হলেই আপনি কিশোর কুমারের " হাম দোনো দো প্রেমি দুনিয়া যো চেলে " , এই গানটা বেশি গাইতেন কিনা ? 


হ্যাঁ অবশ্যই গাইতাম । সাথে অন্য অনেক গান গাইতাম । যেখানে রাজেশখান্না গানটা সিনেমায় গাননি । কিন্তু এটা আপনাকে কে বলল ? আপনার দাদা বা পরিবারের কেউ কি আমার সাথে পড়ত ? কিন্তু সেক্ষেত্রে আমি কে বা আপনি আমাকে চিনবেন কি করে ? আপনার নাম কি আগে বলুন ?


আমার নাম শুভমিতা । আপনি আমাকে মিতা বলে ডাকতে পারেন ।


আমি আপনাকে কি বলে ডাকতে পারি, সেটাও আপনি আমাকে বলে দিচ্ছেন ? কঠিন ডেঁপো মেয়ে তো আপনি ? পা মচকে হাঁটতে পারছেন না, একটা অপরিচিত লোকের কোলে যাচ্ছেন, আপনার কি ভয়ডর ও নেই ? আপনার বাবার নাম কি ? কি করেন উনি ? 


বাবার নাম শুভ্রাংশু বোস । বাঁকুড়া কলেজের অধ্যাপক । আর মা গৃহবধূর দায়িত্ব পালন করেন । সম্বন্ধ করার জন্য আর কোনো প্রশ্ন আছে আপনার ?


একদম নির্লজ্জ বেপরোয়া একটি মেয়ে আপনি । পরিবারের ছাড়পত্র নিয়ে অধ্যাপক বাবার বদনাম করেই ছাড়বেন দেখছি ? আর বাকি দাদা বা বোন ?


শুভমিতা বলল, সবেধন নীলমণি। আর কোন ভাই বোন নেই আমার । এবার আপনার আর কি কি প্রশ্ন আছে করে ফেলুন ?


শুভময় বলল নীলমণি নয় বলুন আপনি অসভ্যতার শিরোমণি ?


শুভমিতা বলল, সেটাও আপনি আমাকে আপনার অজ্ঞতা বশত বলতেই পারেন। ঠিক আছে ওটা আমি ক্ষমা করে দিলাম আপনাকে । 


শুভময় বলল, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিলেন ? উচিৎ ছিল আজকে আমার এখানে এসে আপনাকে না উদ্ধার করা । তখন বুঝতেন কে কাকে ক্ষমা করে দিত ?


শুভমিতা বলল, অদ্ভুত মানুষ বটে আপনি- বলছেন এখানে অনেক বিপদ ছিল। এইরকম জঙ্গলে বেঁচে থাকার আশা কম ছিল। সেক্ষেত্রে আপনি না আসলে এখানে আমি সুস্থ থেকে ভালো থাকলে তবেই তো আপনার ক্ষমা করার প্রশ্ন আসত । তাহলে তো এই জীবনে আপনার সাথে আমার আর দেখাই হতো না। তবে ভগবান এতটা নিষ্ঠুর নন, যতটা আপনি নিষ্ঠুর ।


শুভময় বলল, না আপনার কাছে আর কিছু বলার নেই আর বিশেষ কিছু প্রশ্ন নেই ? ভুল মানে করছেন ? শুধু আপনি গ্রেস করে এতগুলো কথা বললেন কি করে ভাবছিলাম আমি ?


শুভমিতা বলল কোন কোন কথাগুলো নিয়ে ভাবছেন ?


শুভময় বলল, টেবিল বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান কলেজ জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছাত্র ছাত্রীদের জীবনে ঘটেছে । কিন্তু আমার প্রিয় গায়ক কিশোর কুমার ও নায়ক হিসেবে আমি রাজেশ খান্নার বেশি ভক্ত এটা আপনাকে কে বলতে পারে ?


তবে খুঁজতে থাকুন উওরটা মিষ্টার শুভময় ঘোষ ? যদি উওর খুঁজে পান তবে হয়তো মনে মনেও এটা ভেবে বলবেন, যে একটা মেয়ে তার নিজের জীবনের মাঝে অপরিচিত কোন অবিশ্বাসী লোকের  যায়গা কিভাবে ধরে রাখতে পারে ? মেয়েদের নিজস্ব আব্রু রক্ষার জন্য আজকের সমাজ ব্যবস্থায়  মেয়েদের কি আজকের দিনে এতটা দুর্বল ভাবাটা সঠিক ?


অবাক বিস্ময়ে শুভময় বলল, আমার নামটাও আপনার কাছে পরিচিত । সত্যিই আমি আপনাকে যত দেখছি ততই অবাক না হয়ে পারছি না । যদি সেইরকম কোন কথা রাস্তায় বলে কষ্ট দিয়ে থাকি দুঃখিত। তবে আপনার এই আজকের দিনে এই ধরনের পাগলামির প্রয়াস আমি সমর্থন করি না । যে কোন সময় যে কোন রকম বিপদ ঘটতে পারত । আজ আমি আপনাকে জঙ্গলে খুঁজে না পেলে আপনার কোনও বড়ো বিপদ ঘটে যেতে পারত । ভেবে দেখবেন আমার আপনাকে বলা কথাগুলো । কথা বলতে বলতে পেরিয়ে চলে এসেছি জঙ্গলটা । ওই যে সামনে আমার মোটর সাইকেল। এবার আপনাকে কোথায় ছেড়ে গিয়ে আসব বলুন ? তার আগে একটা প্রশ্ন আপনি আমার নামটা জানলেন কি করে ? কতদিন আমাকে চেনেন আপনি ?


শুভমিতা বলল, আমি সুদীর্ঘ পাঁচটি বছর আপনাকে চিনি । 


শুভময় বলল পাঁচ বছর ? কোথায় কি করে  ?


শুভমিতা বলল কলেজে আমি যখন ঢুকি ক্লাস ইলেভেন, আপনি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন । পরের বছর আমার দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী অবস্থাতে আপনি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র ছিলেন। এই দু বছর আপনি আমাকে দেখেছেন, হয়তো সুন্দরী নয় বলে মুখ ঘুরিয়ে চলে গিয়েছেন । আমি কিন্তু আপনার গান সবটাই শুনেছি এবং সামনাসামনি দেখেছি অনেকবার, হয়তো সুযোগ করে কথা বলে উঠতে পারি নি । আপনাকে যেহেতু পছন্দ করতাম আপনার কিছু বিশেষ নিজস্ব স্টাইলের জন্য তাই মাঝে মাঝেই আপনার ক্লাসরুমের কাছে অজান্তেই মনের টানে ঘুরে ফিরে আসতাম । আর আজ আমি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী এই পরের তিন বছর আপনি বুঝবেন না কিভাবে চিনি আপনাকে । স্বভাবতই আমি শুভময় ঘোষ কে চিনি কিন্তু এটা জানি না আপনি কি করেন ? আর কিছু শুনতে চান ?


শুভময় বলল বুঝলাম, সুন্দরী মেয়ে বলে আপনার অহঙ্কারও আছে ? আর আমি আপনাকে ডেঁপো মেয়ে বলেছি বলে অভিমান করেছেন আমার ওপর । তা ভালো । আবার একটা ছেলের সামনে Desperately বলছেন আপনি আমাকে পছন্দ করতেন ?


শুভমিতা বলল আমার কোনও অহঙ্কার নেই, আমি সুন্দরী না অসুন্দর এটা নিয়ে। তবে মনের দিক থেকে আমি যথেষ্ট পরিস্কার এটা গর্ব করে বলতে পারি। আপনি ডেঁপো মেয়ে বলেছেন বলে আমার কোনও কষ্ট হয়নি বরং আপনার মুখে এটা শুনতে ভালো লেগেছে । যাকে পছন্দ করি , তার সামনে অথবা অপরের কাছে এটা বলার জন্য আমার কোনও লজ্জা নেই। তবু তো বলিনি এখনও যে আমি আপনাকে মনে মনে ; না থাক। আমার মনে হয় আমার চেনা শুভময় ঘোষ এতটা বোকা নয় , যে আমার কথা বুঝতে পারে নি। বরং নিজের মনে ভালোবেসে শুনতে চাইছে কথাটা ।


শুভময় বলল, এবার কিন্তু নামাচ্ছি আপনাকে । ভীষণ হাতটা ধরে গিয়েছে।  সাবধানে মোটর সাইকেল টা ধরে দাঁড়ান । আর ফোন করে আপনার বীরপুরুষ হিরোরা কোথায় জিজ্ঞেস করুন । আমি পৌঁছে দিয়ে আসব । আর বাড়িতে ফোন করুন আগে । আপনার বাড়ির সবাই ভীষণ চিন্তিত নিশ্চিত ? আর আমারও অফিস থেকে একটা ফোন এসেছে ধরে নি আমি । আর থানায় একটা ইনফর্মেশন দিয়ে দি আগে ।


শুভমিতা বলল হাঁদুরাম কোথা কার । যাক এইটুকু অন্তত স্বীকার করেছেন চুপচাপ নীরবে । ধন্যবাদ । আর আপনার মোবাইল নাম্বারটা ও আমি পেয়ে গিয়েছি । পরে অবশ্যই ফোন করব । না চেনার ভান করে আবার কেটে দেবেন না অবশ্যই । 


শুভময় রামবিলাস বাবুর ফোনটা ধরেই শুভমিতার এই হাঁদুরাম কথাটা শুনে ঘুরে বলে উঠল, আপনি আমাকে হাঁদুরাম বললেন ?


ওদিক থেকে রামবিলাস বাবু বলছেন, স্যার আপনি কি বলছেন আমি আপনাকে ওই রকম অসভ্য কথা বলতে পারি ? 


শুভময় রামবিলাস বাবুকে বলছেন, আরে না না একজনের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিল তাকে বললাম । 


রামবিলাস বাবু বললেন, সে কে স্যার আপনাকে হাঁদুরাম বলছে ? মেয়েটির কোন খবর কি পেয়েছেন স্যার ?


শুভময় বলল, হ্যাঁ পেয়েছি আমি ওনাকে একটু ওনার হিরোদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে ফিরে যাচ্ছি । আর চিন্তার কিছু নেই। শালবনি থানায় একটু ফোন করে জানিয়ে দিন । বলে ফোনটা রাখে শুভময় । 


চলবে- পরের সপ্তাহে 


স্বত্ব সংরক্ষিত


সুশান্ত ঘোষ