তৈমুর খান - সাম্প্রতিক কবিতার অভিমুখ

 

webtostory

সাম্প্রতিক কবিতার অভিমুখ 

তৈমুর খান 

ব্যক্তিঅভিক্ষেপ থেকে নৈর্ব্যক্তিক অভিক্ষেপে


তোমার মধ্যে প্রতিবাদ আছে। মানবিকতা আছে। সংবেদনশীল হৃদয়ের স্পন্দন আছে। তোমার মধ্যে ভালো মানুষও আছে। কিন্তু তবু তুমি কবি নও, যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমার ভাষাকে শিল্প মাধুর্যে উন্নীত করতে পারছ। যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমার ভাষাকে কাব্যিক ব্যঞ্জনায় আলাদা করতে পারছ। যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমার শব্দকে বহুমুখী বিনির্মাণে প্রয়োগ করতে পারছ। যতক্ষণ না পর্যন্ত ছন্দকে ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে ব্যবহার করতে পারছ।


 মনে রেখো—তোমার ব্যবহৃত চিত্রকল্প ব্যক্তিঅভিক্ষেপ থেকে নৈর্ব্যক্তিক অভিক্ষেপে পৌঁছাবে।


 মনে রেখো—তোমার বক্তব্য দৃশ্য থেকে অদৃশ্যের রূপান্তরে পৌঁছাবে।


 মনে রেখো—তুমি কবিতা লিখছ, প্রবন্ধ নয়। এখানে বিবৃতি বা বর্ণনা বা স্লোগান বা মিছিলের ভাষা প্রয়োজন হবে না।


  মনে রেখো—কবিতায় রহস্যময়তার আবরণ থাকতে পারে, শূন্যতার স্পেস থাকতে পারে, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তর আসতে পারে, অবচেতনের প্রভাবে বিক্ষিপ্ততা বা অসংলগ্নতা সৃষ্টি করতে পারে। জাদুবাস্তবতার বা অধিবাস্তবতার দ্বারাও কবি চালিত হতে পারেন। কখনো কখনো স্বয়ংক্রিয়তাও চলে আসতে পারে। 


  কবি আবার নিজেই নিজেকে প্রকাশ করার জন্য বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারেন। তা কবির সৃষ্ট বাস্তব। শিল্পীরা যেমন বিভিন্ন রং-তুলির সাহায্যে তাঁর মনের বাস্তবতাকে প্রকাশ করেন, কবিরাও তেমনি শব্দের সাহায্যে তাঁর মনের উপলব্ধিজাত বাস্তবতাকে প্রকাশ করেন। শিল্পী এবং কবি উভয় ক্ষেত্রেই তাঁদের শিল্প তখন কিউবিস্ট শিল্প হয়ে ওঠে। অনেক সময় বাইরে থেকে তা কিম্ভূতকিমাকার মনে হতে পারে। কিন্তু মননশীলতার অন্তর রূপে সত্যকে খুঁজে পাওয়া যায়। 


 কখনো কখনো বাস্তবতার বা রিয়ালিজমের বিরুদ্ধেও কবিরা ভাবতে শুরু করেন। বস্তু বিশ্বকে বাহ্যিক দিক দিয়ে যেমন দেখা যায়— ঠিক তেমন ভাবে তাকে চিত্রিত না করে মনের গহীনে যে বিশ্ব বিরাজ করে—তাকেই কবিরা প্রকাশ করতে চান। বাহিরের দৃশ্যকে দেখে অন্তর্দৃষ্টির আলোকে তাকে নতুন করে প্রকাশ করতে গিয়ে কবিরা কিছু পরিবর্তনও ঘটান। এক্ষেত্রে তাঁদের প্রয়োজন হয় চড়া আবেগ, উদার কল্পনা, তীব্র সংরাগ এবং প্রতীক ও অতিশয়োক্তির। সুনিয়ন্ত্রিত শব্দ নির্বাচন ও বিশেষণ প্রয়োগ করে বক্তব্যকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এবং উদ্দেশ্যমুখী করার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাহিত্যে এরকম প্রচলনকেই অভিব্যক্তিবাদ হিসেবে কবিরা গ্রহণ করেন।



সাম্প্রতিককালের কবিতার অভিমুখ 


🦋


    সাম্প্রতিককালের বেশিরভাগ কবিতাতেই তুলনা বাচক শব্দের ব্যবহার খুব কম ক্ষেত্রেই হয়। কবিরা মেটাফর অলংকার প্রয়োগ করতেই বেশি পছন্দ করেন। স্বাভাবিকভাবেই কবির উপলব্ধিতে রূপকাত্মক বা অভেদ কল্পনার বিষয়টি গভীরভাবে রেখাপাত করে। অনিশ্চয় সূচক অব্যয় এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। প্রাচীন কবিতাগুলিতে 'যেন', 'মনে হয়', 'হতে পারে' ইত্যাদি ব্যবহার হত। বর্তমানে এসবকে কবিরা এড়িয়ে চলেন। তাতে কবিতার বক্তব্য আরও সূক্ষ্ম ও তীব্র হয়ে ওঠে।


       আমেরিকার আধুনিকতাবাদী পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া বিখ্যাত দুই সময়ের দু'জন কবির বক্তব্য থেকে কবিতা বিষয়ে আমরা জানতে পারি মূল্যবান কিছু কথা। এখানে তা উল্লেখ করছি।


 🧙কবি ওয়ালেস স্টিভেন্স(১৮৭৯-১৯৫৫) বলেছেন:


১,"A poet looks at the world the way a man looks at a woman." 


 অর্থাৎ একজন পুরুষ একজন নারীকে যেভাবে দেখে একজন কবি বিশ্বকে দেখেন।


২,"The poet is the priest of the invisible"


  অর্থাৎ  কবি অদৃশ্যের পুরোহিত।



  🤱কবি অ্যান সেক্সটন(১৯২৮-৭৪) বলেছেন:


১,"One of my secret instructions to myself as a poet is: ‘Whatever you do, don’t be boring.’"


 অর্থাৎ একজন কবি হিসেবে আমার কাছে আমার একটি গোপন নির্দেশনা হল: 'তুমি যাই কর না কেন, বিরক্ত হবে না।'


২,"The beautiful feeling after writing a poem is on the whole better even than after sex, and that’s saying a lot."


অর্থাৎ একটি কবিতা লেখার পরে সুন্দর অনুভূতি যৌনতার পরের থেকেও ভাল, এবং এটি অনেক কিছুই বলছে।


   তরুণ কবিরা কবিতা বিষয়ে কখনো অধৈর্য হবে না। 'কবিতা হচ্ছে না', 'আবার চেষ্টা করুন' বললে রেগে যাবে না। বরং এসব কথায় তোমাকে আরও মনোযোগী করে তুলবে। পাঠের অভ্যাস বাড়াবে। এবং কবিতা বিষয়ে প্রকৃত আনন্দের অনুসন্ধানী হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।



কবিতা আত্মজীবনের দহনের ভাষা


🦋


  মনে রেখো প্রতিটি কবিতাই লেখা হয় আত্মজীবনের দহনের ভাষা হিসেবে।তা নিজস্ব অনুভূতি  প্রকাশের মাধ্যম হয়ে যায়। প্রকৃতির উপমাগুলিও এই দহন জাত প্রক্রিয়া থেকেই উঠে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলিই সার্বিক শাশ্বতের কাছে মুক্তি পায়। যা ছিল আমার নিজের, তা তখন অন্যের অনন্তের হয়ে ওঠে। জীবনকে যেমন অস্বীকার করতে পারি না, তেমনি নিজের বাইরে বেরিয়ে প্রকৃতি, ইট-কাঠ-পাথর-স্টেশন, কাগজ কুড়ানি মেয়ে, মজুরখাটা ছেলে, ভিখিরি দেখেও কবিতা লিখতে পারি না। বস্তুতান্ত্রিক বিবৃতি বর্ণনার মধ্যে কবিতাকে খুঁজে পাই না। তবে যখন রক্তপাত মৃত্যু দেখে, ধর্ষণ বলাৎকার দেখে, শোষণ পীড়ন দেখে বাড়ি ফিরি, তখন এক ধরনের মানসিক ক্লেশ আমার অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে। বিক্রিয়া হয় লেখার মধ্যেও। লিও নার্দ কোহেন এই কারণেই হয়তো বলেছিলেন "poetry is just the evidence of life.If your life is burning well, poetry is just the ash"  


অর্থাৎ কবিতা শুধু জীবনেরই প্রমাণ। যদি তোমার জীবন ভালোই জ্বলছে,তবে কবিতা শুধু ছাই । সুতরাং কবিতায় কখনও মিথ্যে কথা লেখা যায় না। কবিতা চর্চা শৌখিন মজদুরিও হতে পারে না। 


           কিন্তু অবশ্যই কবিরা বলবেন কবিতা বহু রকমের হয়। সেটা হয় হয়তো। কিন্তু আমাদের চিরন্তন ভালোবাসার কবিতা একমাত্র সেই কবিতাই—যে কবিতায় কবির কোনও ছলনা নেই। যে কবিতা অন্তর-দহনের ঘ্রাণে জারিত। যে কবিতা কবির আত্মমুক্তির সোপান। অনুভূতির ভাষা। হোক তা এলোমেলো, হোক তা ছক ভাঙা এক নতুন পথের সন্ধানী। 


             অন্যের কষ্ট আত্মস্থ করে নিজের কষ্ট করে তোলা এবং তাকে আত্মক্ষরণের পর্যাপ্ত আলোয় উন্মোচন করতে পারাকেই আমরা প্রকৃত কবিতা বলে মনে করতে পারি।




কবিতা এক মুক্তির প্রয়াস


 🦋 


আবার কবিতা এক মুক্তির প্রয়াসও। ছন্দ থেকে মুক্তি, অলংকার থেকে মুক্তি, বিষয় থেকে মুক্তি, আঙ্গিক থেকে মুক্তি। শব্দ, বিশেষ্য, বিশেষণ ব্যবহারের গতানুগতিকতা থেকেও মুক্তি। কবিতার এই রূপান্তর এবং সর্বদা পরিবর্তনশীলতা একমুখী এবং স্থির পাঠক মেনে নিতে পারে না। পাঠকেরও যে গতিশীলতা দরকার সেটা তিনি হয়তো উপলব্ধিও করতে পারেন না। কবিতা পাঠের এবং নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা লাভের একটা অ্যাডভেঞ্চার আছে। বিস্ময় ও বিহ্বল হয়ে শূন্যতার অসীমতায় পক্ষবিস্তারের এক ভিন্ন ধরনের আনন্দ আছে। সেই আনন্দ, সেই রহস্যই তো কবিতার কাছে আমাদের প্রাপ্য। জ্ঞানের সংজ্ঞা কি নির্ধারণ করা সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই জ্ঞান অসীমতার নিরিখে বিচার্য। তেমনি বিস্ময়কেও সঠিকভাবে প্রকাশের ভাষা নেই। অনুভূতির যেমন প্রকাশ নেই, স্বপ্নের যেমন বাস্তব নেই, মনের যেমন শরীর নেই —কবিতাও তেমনি নিরবধি এক চেতনার জাগরণ। তাকে শব্দরূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র। যাঁরা কবিতায় বিবৃতি-বর্ণনা, নীতি-নৈতিকতা, তথ্য-তত্ত্ব, বক্তব্য-শ্লোগান তুলে ধরেন তাঁদের কবিতাকে এসময়ের কবিতা বলা যায় না। তা প্রাচীন, গতানুগতিক, প্রতিভাহীন অর্জিত অভিজ্ঞতার কচকচানি মাত্র। আবার কবিতার নামে যাঁরা শুধু কথা আমদানি করতে চান, এলোমেলো শব্দ প্রয়োগে জবরজং শব্দপ্রলাপের কাঠিন্য প্রযুক্ত করেন —সেটাও কৃত্রিম, মস্তিষ্কপ্রসূত ছদ্ম পাণ্ডিত্যের প্রকাশ হয়ে যায়। কবিতার আত্মা সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় না। 


       কবির মনন-দর্শনে নিবেদিত যে আত্মক্ষরণের সম্মোহন সূচিত হয়, সময়ের ভগ্নস্বরে যার যাপনক্রিয়ায় নানা প্রসঙ্গান্তর উঠে আসে ;বহুমুখী পর্যায়ের সুন্দর-অসুন্দর, পূর্ণ-অর্ধ, প্রকৃত-বিকৃত একাকার হয়ে যায় —কবিতা তারই মুহূর্ত সেই সমীক্ষণের প্রাচুর্যে উদ্ভাসিত প্রকৃত স্বর বলে গণ্য হতে পারে। পাঠক সচেতন হলে সহজেই অনুধাবন করতে পারেন কত অমোঘ তার শব্দাবলি, কত নিখুঁত সেই উচ্চারণ। 


     এই সময়ের লেখা নকিব মুকশি-র “হেজিমনিক পোয়েট্রি”-র দুটি অংশে দেখতে পাই :


“ফলখাদক—প্রেম চিনে না


মমিন—কবিতা বুঝে না


নদী—মাছ বেচে না


আর তুমি—আমায় খোঁজ না


পিল—মীন জানে না…



শ্রী হারানোর পর শুধুই পাই—খাঁটি মৃৎ ও তুমিটুকু....


এইসব বেলেফুল—আধুনিক ভান সংসার...


এবং দোকানদার জানে—কী চায় তোমাদের অন্দরমহল...?”


     সময়, অভিজ্ঞতা, আত্মকথা, সংসার যাবতীয় বিচিত্র কথা কথার ভেতর ঢুকে যায়। কখনও সৌরসেক্স, সেক্স ওয়ার্কারস্, গোলআলু, কর্মশালা, আম্মার ডাক, জাত-ঘৃণা সব এসে যায়। কোনও কোনও কবি বলেছেন “বোকাচোদা চাঁদ। চাঁদ সুন্দর ।” আবার কোনও কবি পৃথিবী শব্দের বানান জানলেও লিখেছেন “পৃথীবি”। এটা তো কবির দেখার পৃথিবী, যা ভঙ্গুর, অনিশ্চিতের উলট দর্শন । বিখ্যাত শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ বলেছেন :


“Poetry surrounds us everywhere, but putting it on paper is, alas, not so easy as looking at it.”(Vincent Van Gogh)  কবিতা আমাদের চারপাশে ঘিরে আছে। কাগজে লেখা হলে তবেই আমরা তা বুঝতে পারি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তা সহজে ধরা যায় না। একজন প্রকৃত কবিই তা ধরতে পারেন। 



#webtostory