দেখল রক্তের নদীতে পরে আছে তারই নিষ্প্রাণ দেহ!

 

webtostory

প্রতিশোধ 

মাসরুর জামান তামিম 


এক


অমাবস্যার রাত। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। হঠাৎ হঠাৎ কয়েকটি জোনাকি পোকা জ্বলে উঠছে। পরক্ষণেই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে গভীর অরণ্যে। মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। বিষন্ন এক সুর। মনে হচ্ছে যেন কাঁদছে। শফিক হাঁটছে নীরবে। সন্তর্পনে। পাছে কেউ যদি দেখে ফেলে– এই ভয়ে সাথে আনা টর্চ লাইটটাও জ্বালায়নি শফিক। হঠাৎ কারো পদচারণার শব্দ কানে আসে তার। ভয়ে থমকে দাঁড়ায় শফিক। দ্রুত এক গাছের আড়ালে বসে পরে। তার অন্তরাত্মা কাপতে থাকে এক অজানা আসংকায়। যদি হানাদার বাহিনী বা তার দোসররা দেখে ফেলে! শফিককে ইচ্ছে হয় আবার আপন নীরে ফিরে যেতে। নিজেকে মায়ের কোলে সপর্দ করতে। ভাবনা অনুযায়ী বাড়ির দিকে পা ফেলতে থাকে শফিক। হঠাৎ সে দেখতে পায় –তার সামনে তার বাবা দাড়ানো। বাবাকে দেখে কিছুটা চমকে যায় শফিক। তার বাবাকে একদল রাজাকার ধরে নিয়ে গিয়েছে আনেক দিন হলো। এরপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।  অনেক খোঁজার পরও যখন আর পাওয়া গেল না তার বাবাকে তখন পাড়া-প্রতিবেশী বলতে থাকে –তার বাবাকে মেরে ফেলেছে হানাদার বাহিনীর লোকজন এবং ভাসিয়ে দিয়েছে নদীর জলে। এমন আরও অনেককে ধরে নিয়ে গিয়েছে রাজাকারের দল। যাদের লাশটাও পাওয়া যায়নি আর। তা-ই শফিকর মাও এ কথা মনে গেথে নেয় যে, তার বাবা চলে গিয়েছে পৃথ্বিলোক থেকে। কিন্তু শফিকের কাছে মনে হতো –তার বাবা মরেনি বেঁচে আছেন। আশেপাশে কোথাও আছেন গা ঢাকা দিয়ে। যুদ্ধ শেষ হলে আবার চলে আসবেন তাদের কাছে। শফিকের বন্ধু রফিকও বলে তার বাবা বেঁচে আছেন। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিলে দেখা মিলবে তার বাবার। শফিক রফিকের কথা মতো মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়ার ইচ্ছে করে। এ জন্য কাল বের হওয়ার কথা ছিল। রফিকের সাথেই যাওয়ার কথা হয় তার। রফিকের বাবাকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল হানাদার বাহিনী। তারপর আর দেখা মেলেনি তার। তা-ই  দুইজন একসাথে যোগ দেওয়ার কথা হয় মুক্তি বাহিনীতে। কিন্তু কাল রাতে বের হওয়ার সময় শফিক ধরা পরে যায় তার মায়ের হাতে। শফিকের মা হালিমা খাতুন শফিকের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই আর যাওয়া হয়নি তার কালকে এবং যোগ দেওয়া হয়নি মুক্তি বাহিনীতে। আজ এই অমাবস্যার রাতে শফিক বেড়িয়েছে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতে। তার বাবাকে খুঁজে বের করতে। কিন্তু পথেই  তার বিশ্বাস সত্য প্রমাণিত হলো। তার বাবা এখন তার সমনে দাঁড়িয়ে আছেন। দিব্যি সুস্থ মানুষটির মত। শফিক দৌড়ে যায় বাবার কাছে। নিজেকে সপর্দ করতে চায় বাবার কোলে। কিন্তু তার বাবা পিছনে সরে যায় এবং উচু আওয়াজে অভিমানী কন্ঠে বলতে থাকে,

— খবদার আমায় ছুবি না তুই। যে ছেলে নিজের দেশের- জাতির- শত্রুদের থেকে পালিয়ে বেড়ায়; নিজের বাবার খুনিদের হত্যা না করে ঘরে বসে থাকতে চায়, তার স্পর্শ আমার গায়ে লাগুক, এটা আমি চাই না। শফিক তার বাবার কথা শুনে থমকে দাঁড়ায়। নীরবে অশ্রু ঝরায়। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করে বাবার কাছে— দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত বাসায় ফিরবে না সে। প্রয়োজনে জীবন দিবে- রক্ত ঝরাবে- তার বাবার মত শহীদ হবে।

 


                     । দুই । 


পূর্বাকাশ সকালের ক্ষীণ আলোয় উদ্ভাসিত। সুর্যের ঠান্ডা আলোয় এখনও চাঁদ তারারা ভাস্বর। চারদিকে ফজরের আজান এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সুমধুর গানে মুখরিত। দমকা হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠছে; আর ঝরে পরছে মাটিতে  শুকনো পাতার বাহার। হালিমা খাতুন আরমড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসে। পাশে শফিককে না দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন তিনি। শফিক প্রতিদিন ফজরের নামাজের জন্য উঠেই জাগিয়ে দেয় হালিমা খাতুনকে। এরপর চলে যায় মসজিদে। কিন্তু আজ তাকে না জাগিয়েই চলে গেলো শফিক মসজিদে! বিষয়টি ভাবিয়ে তুলে হালিমা খাতুনকে। এদিকে সূর্য উঠে যাচ্ছে দেখে দ্রুত উঠে নামাজ পড়ে নেয় হালিমা খাতুন। নিয়ম অনুযায়ী নামাজের পর উঠোন ঝাড়ু দিতে নেমে পরেন তিনি। একটু বেলা করেই বাড়িতে ফিরে শফিক প্রতিদিন। ফজরের নামাজের পর ইমাম সাহেবের সাথে মক্তবের বাচ্চাদের কোরআন পড়ায়  শফিক। হাফেজ হওয়ার পর থেকে সে এই কাজ করে সযত্নে। তাই সকাল সকাল রান্নাঘরে যেতে হয় না হালিমা খাতুনকে। এই সময়টুকু তিনি ঘর-উঠোন পরিষ্কার করতে ব্যয় করেন। 

হালিমা খাতুন উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছিলেন আর সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করছিলেন। এমন সময় সৈয়দ আলি এসে দাঁড়ায় বাড়ির উঠোনে। তাকে দেখে ক্ষোভে লাল হয়ে ওঠে হালিমা খাতুনের চোখ-মুখ। এই আলি-ই শফিকের বাবাকে ঘর থেকে নিয়ে গিয়েছিল এবং তুলে দিয়েছিল পাক বাহিনীর হাতে। 

হালিমা খাতুন উচু আওয়াজে ঝাঝাল কন্ঠে বলে, 

—এই তুই কেন এসেছিস আমার বাড়িতে। আবার কাকে নিয়ে যেতে এসেছিস!?

আলি কিছুটা সামনে এসে বলে,

—না, তেমন কিছু না। শফিকের খোঁজ খবর নিতে এসেছি আরকি। আজ নামাজে দেখলাম না। তাই ভাবলাম –একটু দেখে যাই ছেলেকে, কোনো রোগ বাধিয়ে বসেছে কিনা!

আলির কথা শুনে কিছুটা অবাক হয় হালিমা খাতুন। –আবির মসজিদে যায়নি তাহলে গেলো কোথায়! হালিমা খাতুনের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ পরে। সৈয়দ আলি তা দেখে কিছুটা এগিয়ে এসে নিচু আওয়াজে বলে, 

—শফিকের মা! জানই তো দেশের পরিস্থিতি। কখন কি হয়ে যায় বলা তো যায় না। ছেলেটাকে দেখে রেখো কেমন! 

আলি একগাল হেসে চলে যায়। আলির প্রস্থান পথে তাকিয়ে থাকে হালিমা খাতুন এক বুক ঘৃণা নিয়ে। এখন কি করা উচিৎ – বুঝতে পারে না হালিমা খাতুন। তার গলা শুখিয়ে আসে এক অজানা আসংখায়। ঘরে গিয়ে পানির ঝগ হাতে নিতেই দেখে নিচে রাখা এক টুকরো কাগজ। তাতে কিছু একটা লেখা। কিন্তু কি লেখা পড়তে পারে না হালিমা খাতুন। পাশের বাসার মনির কাছে কাগজ হাতে ছুটে যায় হালিমা খাতুন। মনি কাগজটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে,

— মা! তোমার এই অভাগা ছেলে তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে, পাক বাহিনীর কাছ থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলা গড়তে যোগ দিয়েছে মুক্তি বাহিনীতে। তুমি দোয়া কোরো আমি যেন দেশ স্বাধীন করে আবার তোমার কোলে ফিরে আসতে পারি।


ইতি

তোমার ছেলে শফিক।


চিৎকার করে কাঁদতে থাকে হালিমা খাতুন। মনি তাকে সান্তনা দেয়। বলে,

—খালাম্মা আপনি এভাবে কাঁদলে শফিকের তো কোনো উপকার হবে না৷ অপনি দোয়া করেন ওর জন্য, যেন বাংলার জয় ওর হাত ধরে আসে আমাদের কাছে।

হালিমা খাতুন দুই হাত উপরে তুলে ধরে। "আল্লাহ" বলে চিৎকার করে বেহুশ হয়ে যায়। মনি বুঝতে পারে না এই ঘুমই কি তার শেষ ঘুম কিনা।


                       ।  তিন  । 


আবির মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছে বেশ অনেক দিন হয়েছে। এরই মধ্যে  কয়েকটি অপারেশন সম্পন্ন করেছে মুক্তি বাহিনী।  প্রতি অপারেশনে বিজয় তাদের পদচুম্মন করেছে। কিন্তু কোনো অপারেশনেই নেয়া হয়নি শফিককে। শফিক ছোট বলে তাকে কমান্ডার নিতে চায় না এই সব ঝুঁকি পুর্ণ আক্রমণে। শফিক প্রতিবারই আবেদন করে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কমান্ডার পরের অভিযানে নিবেন বলে তার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলে শফিককে। শফিকের খুব খারাপ লাগে একা একা ক্যাম্পে থাকতে।  তারপরও কমান্ডারের আদেশ পালনার্থে থেকে যায় আবির। আজ এক পাক বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা করতে যাবে তাদের বাহিনী। তারই প্রস্তুতি চলছে এখন তাদের ক্যাম্পে। শফিক দৃড় প্রতিজ্ঞা করে –যে করেই হোক আজ সে তাদের সাথে যাবেই। পাক বাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনবেই। শফিক যায় কমান্ডারের কাছে। জোরালো অনুরোধ করে তাকে নিতে। কমান্ডার প্রথম নিষেধ করে। বলে ক্যাম্পে থাকতে। কিন্তু না, শরিফ আর শুনতে চায় না কমান্ডারের কথা। শেষে বাধ্য হয়ে শফিককে প্রস্তুত হতে বলে কমান্ডার।  শফিকের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। আনন্দে তার চোখে পানি চলে আসে। সে ছুটে তার তাবুতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। পথে সবাইকে বলতে থাকে,

 —আমি আজ যাচ্ছি তোমাদের সাথে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে লড়াই করতে।

সবাই শুনে খুশি হয়। মাথায় হাত বুলিয়ে কেউবা পিঠ চাপরে অভিভাদন জানায় শফিককে। 


                      ।  চার  । 


অনতিদূরে পাক বাহিনীর ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে। কয়েক জন যোদ্ধা বাইরে পাহারা দিচ্ছে বাইরে। ব্যস্ততার দেখা নেই তাদের মাঝে। নিরলস বসে আছে আর গালগল্প করছে। হঠাৎ গুলির আওয়াজ আসতে লাগলো চতুর দিক হতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব ক'জন পরে মাটিতে। কয়েকজন বেড়িয়ে এলো ক্যাম্পের ভিতর থেকে। হঠাৎ কি শুরু হলো জানতে। কিন্তু তারাও ঝরে গেল প্রবল গুলি বর্ষণে।  দুই শয়তানকে কুপকাত করেছে শফিক নিজ হাতে। তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পেরেছে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল শফিক। চিৎকার করে বলতে লাগলো জয় বাংলা। অন্য সবাই তার সুরে সুর মিলালো। হঠাৎ শফিক দেখতে পায় তার বাবা-মাকে।  মিষ্টি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের ইশারায় তারা ডাকল কাছে শফিককে। শফিক ছুটে গেল তার বাবা-মার কাছে। জড়িয়ে ধরল তাদের। এদিকে আবার জয় বাংলা স্লোগান উঠলো। তা শুনে শফিক ও তার বাবা-মাও বলতে লাগলো জয় বাংলা!! 

শফিক হঠাৎ লক্ষ্য করল  –কয়েক জন মিলে ক্যাম্পের সামনে নিয়ে আসল একটি লাশ। তাদের কোনো এক সাথি শহীদ হয়েছে নিশ্চিত।  কিন্তু কে জানতে শফিক ছুটে এল। দেখল রক্তের নদীতে পরে আছে তারই নিষ্প্রাণ দেহ!