কবিতার লাইনগুলি বিদ্যুৎ ঝলকের মত আমার চেতনায় আঘাত করলো।

webtostory


পাঁচটি পাঁচবছর

      অজিত কুমার দত্ত 


     না না! আমাকে মেরো না! আমি কোন অন্যায় করিনি! আমি নির্দোষ! আমি মেরীকে ভালোবাসি! মেরী আমাকে ভালোবাসে!-----ওরা শোনেনি আমার কথা। আমার হাতে-পায়ে বেঁধে, তোমার বাবার নির্দ্দেশেই চাবুক মেরেছিল। দর দর করে রক্ত ঝরছিলো। তবুও আমি ব্যথা পাইনি! -----ব্যথা পেলাম তখন, যখন  তোমার বাবা জানতে চাইলেন, আমাদের ভালোবাসার কথা, তোমার নিজের মুখ থেকে!--তুমি মাথা নত করে নিরুত্তর রইলে!---আমি চিৎকার করে বলেছিলাম -----মেরী! যা সত্য, যা বাস্তব, তা-ই বলে দাও! মিথ্যা বলার দরকার নেই। তবুও তুমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলে। তোমার ভাবান্তর দেখে ওরা ভাবলো আমি ভাওতা দিচ্ছি, জীবন বাঁচাবার জন্য মিথ্যা বলছি! ---শেষে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে হাজতে পাঠালো। চারদিকে জমাট বাঁধা অন্ধকার। আমি তখনও তোমার কথা ভাবছিলাম। সেই মূহুর্ত্তের কথা বারবার মনে হচ্ছিল। হায়রে পৃথিবী!--কঠিন বাস্তবের মুখোমুখী হলে, নিজের আত্মাটাও  নিজেকে অস্বীকার করতে পারে! তাই ভাবছিলাম। 


বেঞ্জামিনের এসব কথা শোনে  চোখের জল আর ধরে রাখতে পারেনা মেরী। --- ফ্রিদেল! তুমি আমাকে ভুল বোঝনা। আমি তখন------ ! ---কথা শেষ করতে দেয়না বেঞ্জামিন, নিজের জীবন কাহিনী শোনাবার জন্য, আজ সে বাঁধন হারা নদীর মত -----

একি! তুমি কাঁদছ? না -না, কেঁদোনা মেরী! জানতো, জীবনটা একটা নাটক!এখানে আমরা প্রত্যেকেই অভিনয় করে যাচ্ছি! তবে ঘটনাটা কি জান, একই রঙ্গমঞ্চে কেউ কমেডি আবার কেউবা ট্রেজেডি চরিত্রে।। ---আচ্ছা, যা বলছিলাম! ঐ অন্ধকার কারাগৃহে বসে বসে ভাবতাম তোমার কথা। তুমি হয়তো রাত্রির অন্ধকারে চুপি চুপি আসবে। আমায় ডাকবে! তাই সারারাত জেগে বসে থাকতাম তোমার অপেক্ষায়! বাইরে কোন শব্দ হলেই, চেয়ে দেখতাম, তুমি এসেছ কি না? যখন দেখতাম তুমি নও, অন্য কারো আত্মীয়, -----মনটা ভীষন খারাপ হয়ে যেতো।  ---শেষে যখন বুঝলাম, তুমি আর আসবেনা। তুমি হয়তো সব ভুলে, আবার নতুন করে কাউকে ভালবেসেছ!-----কেঁদোনা মেরী! এ বড় বাস্তব, সত্যিকারের কাহিনী তোমাকে শুনাচ্ছি।

  -----যাক! যখন বুঝলাম, তুমি হয়তো অন্য কাউকে ভালোবেসে ,তোমার নতুন জীবন শুরু করেছ,-----তখন ওই চাঁদের দিকে তাকিয়ে তোমার হাসিমাখা মুখখানির কথা মনে করতাম! তারার দিকে চেয়ে চেয়ে তোমার নীল চোখ দু'টির কথাই ভাবতাম।

----হ্যাঁ! রুঢ় বাস্তব জীবনে, এটুকুই ছিল মাত্র কল্পনা---রোম্যান্স! হয়তো তাই ওই প্রগাঢ় অন্ধকারেও বেঁচে ছিলাম। 


   তারপর কি করে যে পাঁচটি বছর কেটে গেলো, আজ তা বলতে পারবোনা। ---যেদিন জেল থেকে ছাড়া পেলাম,-----তোমাদের প্রাচীরের বাইরে যে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম, কে জানে? ভেবেছিলাম যদি একটু দেখা পাই তোমার---সেই আশা নিয়ে। -----"ইয়া ছোকরা! ইধারছে হঠ যাও!"----তোমাদের দারোয়ানের কন্ঠে চমক ভাংলো। পথ চলতে থাকলাম! বাবা-মা গত হয়েছেন, জেলে বসেই খবর পেয়েছিলাম। তাই কোন পিছুটানই ছিলোনা!---কোথায় যাবো জানা ছিলোনা! কে আমার আর আপন আছে তাও জানাছিলোনা। তবুও চল্লাম---

এমন সময়, বেঞ্জামিনের সহায়ক চা ও প্লেটে স্যান্ডুইচ নিয়ে এলো। শব্দ পেয়ে, পিছনে তাকিয়ে বলল বেঞ্জামিন, কি রে! চা এনেছিস? ---মেরীর দিকে তাকিয়ে বলল, নাও, একটু চা খেয়ে নাও। সেই তখন থেকে তো শুধুই বকবক করেই যাচ্ছি! ---না না আমি চা খাইনা। জীবনপাত্রের তলানি পর্যন্ত পান করেছি যে, তাই চা তে তৃপ্তি নেই! 


  যাক! তবুও চললাম, বুকে প্রত্যাশা,চোখে স্বপ্ন নিয়ে ব্রাজিল থেকে সুইডেন! কিউবা থেকে বুলগেরিয়া পর্য্যন্ত আমার মানস প্রতিমাকে তন্ন তন্ন করে খোঁজে বেড়ালাম। ------

জীবনের আরো পাঁচটি পাঁচবছর এভাবে কেটে গেলো। তোমার আর দেখা পেলামনা।


শুনেছিলাম সেই ঘটনার পর তোমার বাবা তোমাকে জোর করে বিদেশে পাঠিয়েছে। তাই তোমার খোঁজে, বুক ভরা স্মৃতি নিয়ে জীবনের কত চড়াই-উৎরাই যে অতিক্রম করেছি---আজ তা স্বপ্নের মত মনে হয়। ----হ্যাঁ! যা বলছিলাম --এমনি ভাবে চলতে চলতে হঠাৎ আমার প্রিয় মহাকবির একটি কবিতা মনে হয়ে গেলো,----


  "আশার ছলনে ভুলি কি ফল   লভিনু হায়

তাই ভাবি মনে!

জীবন প্রবাহ বহি কাল সিন্ধু পানে ধায়,

ফিরাবো কেমনে?

.********       *******

নারিলি হরিতে মণি, দংশিল কেবল ফণী!

 এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি,মন,কেমনে!"------


কবিতার লাইনগুলি বিদ্যুৎ ঝলকের মত আমার চেতনায় আঘাত করলো। আমি যেন অনেকটা হালকা অনুভব করলাম নিজেকে। যেন একটা নেশা কেটে গেলো! --মনে হলো হ্যাঁ! আমি মিছেমিছি মরীচিকার পিছনে ঘুরছি। আলেয়ার  অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছি দেশ থেকে দেশান্তরে! মনস্থির করলাম, এভাবে আয়ু ক্ষয় করে কি লাভ? জীবনের বাকি সময়টুকু যদি মানুষের কল্যাণে লাগাতে পারি ---সেটুকুই তো লাভ।


তোমার কষ্ট হচ্ছে না তো মেরী? ---যদি ইচ্ছা না হয়, তাহলে থাক! ---মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় মেরী। বেঞ্জামিন আবার শুরু করে,----আচ্ছা ঠিক আছে। চালিয়ে যাচ্ছি! এ যে আমার জীবনের ফেলা আসা কঠিন ইতিহাস! -----হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, ---তারপর শক্ত একটা মন নিয়ে দিল্লী শহরে উঠলাম! এলাকাটা অনেকটা কারখানা শ্রমিকদের মহল্লার মত।  আজ থেকে ঠিক পনর বছর আগে। তখন সেখানে ছিলাম এক অজ্ঞাত, অখ্যাত, অপরিচিত বাউন্ডুলে যুবক। ----- কিছুদিন এলোমেলো করে কাটাবার পর ঠিক করলাম-----কিছু একটা করতে হবে, এভাবে বাউন্ডুলে জীবন চলতে পারেনা। তাই একদিন ওই কোচিং কলেজের দিকে গেলাম। পাগল মনে করে ওরা আমাকে তাড়িয়ে দিল। কিন্তু আমি হাল ছাড়লামনা। শেষে একটা চাকরী জুটলো অত্যন্ত কম মাইনার! যদিও তখন ঐটুকুই যথেষ্ট ছিল আমার! আনন্দের সঙ্গেই ছাত্রদের পড়াচ্ছিলাম ছাত্রদের আনন্দ দেখে নিজেও খুশী ছিলাম। টাকা যা পাচ্ছিলাম তাতে কোনরকম চলে যাচ্ছিল ভালোই। কাজের পর সন্ধ্যায় বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে ছেলেমেয়েদের পড়াতাম, ওদের খোঁজখবর নিতাম। কে খেল, কে না খেয়ে থাকলো সব খোঁজ নিতাম, সাধ্যমত সাহায্য করতাম। ওরা আমায় দেবতার মত  ভাবতো। আমি ভাবতাম বন্ধু বলে। ভালো-মন্দ খাবার হলে, আমার ভাগেরটা থাকতো যতদিন না যেতাম ততদিন পর্য্যন্ত। এভাবেই চলছিল দিনগুলি। ---তোমার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। 


  কিন্তু ভাগ্যে বেশীদিন সুখ সইলোনা। কারখানার শ্রমিকেরা মজুরী বৃদ্ধির দাবীতে ধর্ঘটের ডাক দিয়েছিল। ---আমি ওদের সভায় গিয়ে ওদের পক্ষে দাঁড়িয়ে সমর্থন করে বক্তৃতা দিয়েছিলাম। সে কারখানার মালিকপক্ষ পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে আমাদের আটক করলো।মিথ্যা মামলা রুজু করলো। এদেশের আইন-আদালত সব ধনীদের পক্ষে, তাই জেল হলো আমাদের। আবার আরও পাঁচবছর জেলে থাকতে হলো। তারপর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে, চাকরিটা পেলাম ঠিক, কিন্তু মন বসাতে পারলাম না। তাই নিজেও পড়া শুরু করলাম। শেষে IAS কমপ্লিট করে পোস্টিং পেয়ে এসে উঠলাম এই কলকাতা শহরে।


সেদিনও জানতামনা তুমি এই শহরেই আছ! আর ওই কোম্পানির মালিকই তোমার স্বামী । যাকে আসন্ন বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে, তুমি ছুটে এসেছ আমার কাছে!--জীবনটা কত আশ্চর্য ! যেন সম্পূর্ণ একটা নাটক,---একবার ভেবে দেখতো মেরী!----হ্যাঁ! আমি যদি ইচ্ছা করি তবে শ্রমিক-মালিকের একটা মিটিং ডেকে একটা জোড়াতালি দিয়ে আপাত সমাধান করতে পারি,-----তোমার এ ধারনাটা কিছুটা ঠিক! কিন্তু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কি লাভ, বলতো মেরী?------সেই মহাভারতের কাহিনীটা মনে করে দেখ!--মহাভারত পড়েছ নিশ্চয়ই ? ----কুন্তী আসন্ন যুদ্ধের ভয়ালতার হাত থেকে পান্ডবকুলকে বাঁচাবার জন্য-----তাঁর পরিত্যক্ত পুত্র কর্ণের কাছে এসেছেন----তাঁকে পান্ডবের পক্ষে যোগদান করার অনুরোধ নিয়ে!-----কর্ণ উত্তর দিয়েছিলেন, ----আজ আর তা সম্ভব নয়!---যেদিন তুমি অসহায় ভাবে আমাকে ত্যাগ করেছিলে,----সেদিন তো একবারও আমার কথা ভাবনি!---আজ ঠিক তেমনি একটা নবমহাভারতের উপাখ্যান,------তুমি তোমার স্বামীকে আসন্ন ভয়ালতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য, প্রার্থণা জানাতে এসেছো, তোমার অতীতের ভালোবাসার কাছে!--কিন্তু সেদিন-------


        যাক সেকথা! তোমার প্রার্থণা মঞ্জুর হতে পারেনা মেরী! তুমি কি চাও জীবনের পাঁচটি পাঁচবছর অতিক্রম করে, যে দায়িত্ব পালনে, কর্তব্য নিষ্ঠায়,সততা, স্বচ্ছতা, দক্ষতায় এত মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস অর্জন করেছি, কোন একজন ব্যক্তির স্বার্থে, তাকে জলাঞ্জলী দিয়ে, সমষ্টির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করি? ---তুমি কি চাও-----তোমার অতীতের সে ভালোবাসার মর্যাদা দিতে গিয়ে, আমি ঐ কোম্পানীর হাজার-হাজার শ্রমিকের স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিয়ে তাঁদের বঞ্চিত করি?---–তুমি যাই চাওনা কেন মেরী! বুঝতেই পারছো,আমার দ্বারা তা অসম্ভব ! কারণ আমাদের লক্ষ্য শ্রমিকের স্বার্থরক্ষা করার। ----কোন মানুষই কি এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে? ---পারেনা মেরী!----তাই বলছিলাম। হোকনা শ্রমিক আন্দোলন,ধর্মঘট বা লে অফ!--যেটা সত্য শেষ পর্য্যন্ত সেটাই টিকে থাকবে। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে তোমাদের এত ভয় কিসের??