শুধু তার রক্তের স্রোতই দেখা গিয়েছিল এক ঝলক।

 

webtostory



নৌকা বিধ্বস্ত 

মনোয়ার পারভেজ 


বিকেলের দিকে কিছুটা মন মরা হয়েই বাড়ির পাশের নদীর পাড়ে একা বসে ছিলো রিফাত। নদীর স্রোতের বেগ দেখছিলো আর মনে মনে ভাবছিলাম সময় কিভাবে পরিবর্তন হয়। নদীর স্রোতে পানি গুলো যাচ্ছে তার দিগন্তের মিলনে , সময়ও তেমনি চলে যাচ্ছে। তবে সময়ের বিবর্তনে কতকিছুই না দেখতে হয়। এইযে গতকাল পাকিস্তানি মিলিটারীরা পাশের গ্রামের রহিম কাকা সহ অনেকের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিল। আজ জানি আবার কাদের উপর জাপিয়ে পড়ে। 

এমনটা ভাবছিল রিফাত হটাত দেখে রৌদ্র তার পাশে এসে বসেছে। 

সেও চুপচাপ বসে রইল কিছু বলল না। রিফাতও তাকে কিছু বলিনি। সময় দশেক পড়ে রৌদ্রকে জিগ্যেস করল কিরে কি হয়েছে? এভাবে মন মরা হয়ে বসে আছিস কেন? কোনো কথা বল? 

সে কিছুই বলে না। রৌদ্রের চোখে মুখে চিন্তার চাপ দেখতে পাচ্ছিল। 

রৌদ্র হঠাৎ রিফাতের হাতে টান দিয়ে তাকে এখন থেকে তোলে মাঠের দিকে নিয়ে গেল। রিফাত বলল কিরে কি হয়েছে এভাবে আমাকে টানছিস কেন? কিছু বলিস না কেন? 

রৌদ্র মাঠের পাশের আম গাছটার নিচে গিয়ে রিফাতকে দাড় করায়। রিফাতও হতবম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইল। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। 

হঠাৎ রৌদ্র বলে উঠে রিফাত তোর সাথে এখানে আমার কত স্মৃতি, এই সবুজ গালিচার মাঠে কত ফুটবল খেলেছি। বৃষ্টিতে ভিজেছি, ঝড়ের দিনে এই গাছটি থেকে কত আম কুড়িয়েছি। 

রিফাত তখন বলে হ্যাঁ, এখানে আমাদের স্মৃতি আছেতো। কেন কি হয়েছে তোর, এভাবে কথা বলছিস কেন আজ?  

রৌদ্র বলে জানিস তোর সাথে আমার সোনালী শৈশব শেষ হয়ে যাচ্ছে। নদীতে একসাথে আমাদের আর মাছ ধরা হবেনা।   

সাথে সাথে রিফাত বলল, কেন হবেনা? 

রৌদ্র বলে জানিনা, আমার কাছে বেশি সময় নেই। তোকে ছেড়ে চলে যেতে হবে আজকে। আমরা ভারতে চলে যাচ্ছি। বাবা-মা আজ এই সিধান্তে উপনীত হয়েছেন দেশের যা অবস্থা কখন জানি মিলিটারী এসে আমাদের গ্রামটাকেও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। তুই তো জানিস বাবার অবস্থা তেমন ভালো না। ছোট্ট বোনটাও এখানে থাকতে ভয় পাচ্ছে। মা বলেছেন আমরা যেন ভারতে মামার বাড়িতে চলে যাই। রাতেই কাপড় চোপড় সব গুছিয়ে নিয়েছি। মাটির মায়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। বাবা অবশ্য এই নিয়ে আফসোস করেছেন। কিন্তু কিছু করার নেই ! দেশের যা অবস্থা বলা যায় না কখন বলে রৌদ্র থেকে গিয়ে বলে.... কিরে রিফাত তুই কিছু বলছিস না যে? 

কি আর বলব? বলার মতো কিছুই আমার নেই ! এই দেখ না আমার ভাগ্যটা ! একটা ঝড় আসলো হায়নার মতো ! গাছ ভেঙ্গে পড়ল টিনের চালে, গাছের নিচে পড়ে একসাথে বাবা-মা দুজনেই মারা গেলেন। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় ছিল মৃত্যুর আগে বাবা-মায়ের সাথে আমার কোনো শেষ কথা হলোনা। আমি তখন ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সকালে খবর আসল ঝড়ে বাবা-মা দুজনে মারা গেছেন। বয়স তখন মাত্র আমার পাঁচ বছর। মৃত্যু মানে কি তেমন একটা বুঝতাম না ! মনে করেছিলাম বাবা-মা বোধহয় ঘুমাচ্ছেন। আবার তো ঘুম থেকে উঠবেন ! আশ্চর্য কি বোকা ছিলাম আমি ! 

তারপর থেকেই বলতে গেলে আমি একা। ফুফুর বাড়িতে ছিলাম দুই মাস। সে বাড়ির অনেকেই আমাকে সহ্য করতে পারত না। সেই কষ্ট বুঝতে পেরে মামা নিয়ে এলেন আমাকে এখানে। সেই থেকেই মামার বাড়িতে আছি। নিজের গ্রামের মাটিকে ভুলে এখানে আছি আজ পনেরো বছর হয়। যখন থেকে বুঝতে পারি বাবা-মা আর পৃথিবীতে ফিরে আসবেনা। ওনারা চলে গেছেন সারাজীবনের জন্য। আমার সাথে আর কোনোদিন তাদের এই পৃথিবীতে দেখা হবেনা। তখন থেকেই বাবা-মায়ের শূন্যতা অনুভব করি। তবে অবশ্য মামা-মামি তাদের আদরে রেখে সেই শূন্যতা তেমন বুঝতে দেয় নাই। 

আচ্ছা তরা কবে যাচ্ছিস রৌদ্র ? 

এইতো বাড়িতে তর সাথে দেখা করার কথা বলে আসলাম। এখান থেকে বাড়িতে গিয়েই রওনা দিব। বাবা-মা অপেক্ষা করছেন। 

আচ্ছা রিফাত তুই এখন কি করবি? এখানেই থাকবি নাকি তোরা? 

হ্যাঁ, কোথাও যাওয়ার তো জায়গা নেই ! এখানেই আছি। মামি অবশ্য বলছেন এলাকা ছেড়ে ওনার বড় বোনের বাড়ি চলে যাওয়ার। ওনার বড় বোনের বাড়ি সুনামগঞ্জের শেষ প্রান্ত মেঘালয় পাহাড়ের কাছেই কোথাও ! মামা যেতে রাজি হচ্ছেন না। ভিটে মাটি ছেড়ে কোথাও যাবেন না। মরলে এখানেই মরবো, বাঁচলে এখানেই বাঁচব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মামিকে। 

তাহলে তুই আমাদের সাথে চলে আয় আমার মামার বাড়িতে। 

না হবেনা, তুই চলে যা। মামাকে ছেড়ে আমি যেতে পারিনা। এই দেশের মাটি ছেড়ে কোথাও যাব না। প্রয়োজনে এখানেই মরবো। তবে তুই চলে গেলে আরেকটি শূন্যতা অনুভব করব। খুব মনে পড়বে তোর কথা। 

সে তো আমারও মনে পড়বে। তোকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। না যেয়েও পারছিনা। বাবা-মায়ের আদেশ যেতেই হবে। 

আচ্ছা রিফাত আমাদের কি আর দেখা হবেনা? আমরা কি আবারো বট গাছের নিচে মার্বেল খেলতে যাব না? 

জানিনা ! দেশে যুদ্ধ লেগেছে। দেশ স্বাধীন হলে এখানে আবার ফিরে আসিস। যদি বেঁচে থাকি আমি তোর অপেক্ষায় থাকব। 

রৌদ্র আমরা শুধু বন্ধু নই। আমরা দুজন ভাই। ভাইয়ের মতোই চলেছি। এইযে আমরা দুজন দুই ধর্মের তবুও একসাথে থেকেছি। আমাদের মধ্যে কখনও কোনো মনোমালিন্য হয় নি, ঝগড়া হয় নি। 

রৌদ্র তখন বলে, আর বলিস না ভাই ! কষ্ট হচ্ছে আমার। 

দুজনের কথা অন্তিম হয়ে এসেছে। হটাৎ রৌদ্রের ছোট বোন পূজা এসে হাজির। 

পূজা - দাদা তোকে বাবা-মা ডাকছেন। 

রৌদ্র - হ্যাঁ আসছি। তুই যা। 

পূজা - না মা তোকে সাথে নিয়ে যেতে বলেছেন। রিফাত ভাই আমরা চলে যাচ্ছি। আপনার কথা মনে পড়বে অনেক। জানিনা আর কখনও দেখা হবে কিনা ! 

রিফাত - তোমাদের কথাও আমার মনে পড়বে। তোমাকে আমার ছোট বোন বলেই ভাবতাম। তোমার হাতের বড়ই আচার খুব মিস করব ! আন্টির হাতের খাবার গুলো। প্রায়ই তোমাদের বাসায় খাওয়া দাওয়া করতাম। 

পূজার চোখে পানি এসে গেছে এসব কথা শুনে ! 

রিফাত - পূজা কাঁদছো কেন? 

ভাইয়া রৌদ্র ভাইকে আর আপনাকে আমি আলাদা মনে করেনি কখনও। নিজের ভাই বলেই মনে করতাম। নিয়তি আজ আমাদের আলাদা করে দিচ্ছে। 

আরে বোকা মেয়ে কান্না করো না। আমাদের আবার দেখা হবে। দেশ একদিন নিশ্চয়ই স্বাধীন হবে। নরপিশাচদের পতন হবে। তখন তোমরা আবার এখানে চলে আসবে। পূর্বেকার মতো আমাদের সময় ফিরে আসবে। 

এই যেন হয় দাদা। বলে পূজা চোখের পানি মুছতে চেষ্টা করে। 

রৌদ্র - রিফাত, অনেক সময় হয়েছে। এখন যেতে হবে। বেলা থাকতে থাকতে আমাদের যাওয়া দরকার। রাত হয়ে গেলে নয়তো আমাদের রাস্তায় থাকতে হবে। বলা যায়না রাস্তায় যদি আবার মিলিটারীরা দেখে ফেলে তখন সেখানেই মেরে ফেলবে। 

রিফাত - এভাবে বলিস না ! কিছুই হবেনা তোদের। চারদিকে দেখে শুনে যাস। আর ভালো থাকিছ বন্ধু। নিজের খেয়াল রাখিস। 

রৌদ্র কেদেঁ ফেলে রিফাতকে জড়িয়ে ধরে। রিফাত তুইও ভালো থাকিছ। নিজের খেয়াল রাখিস। 

পূজার দুই বন্ধুর এই দৃশ্য দেখে আবারো কাঁদতে শুরু করে। মনে বলে জীবন কি নিষ্ঠুর, পৃথিবী কি নিষ্ঠুর। যারা কিনা একজন আরেকজনকে ছাড়া এক মুহুর্তের জন্য থাকতে পারত না ! তারা একজন আরেকজন কে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অনিশ্চিত সময়ের জন্য। নিশ্চিত নেই আবার কখনও দেখা হবে কিনা তাদের। 

রিফাত - রৌদ্র এবার যা। আংকেল আন্টি অপেক্ষা করছেন। উনাদেরকে আমার সালাম জানাস। পূজা তোমাকে হয়তো অনেক সময় খাওয়া দাওয়া নিয়ে বিরক্ত করেছি। কিছু মনে কর না। এসব ভুলে যেও। 

পূজা - ভাইয়া কিযে বলেন। আর কষ্ট দিয়েন না। আপনি কোনো বিরক্ত করেননি আমাকে। আপনার নিজের বোন থাকলে কি তাকে বিরক্ত করতেন না? 

হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছ। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর যখন এখানে আসি কাউকেই চিনতাম না এখানকার। রৌদ্রের সাথে প্রথম পরিচয়। সেই থেকেই তোমাদের পরিবারের সবার সাথে সম্পর্ক। তোমাদের পরিবার আমার কাছে নিজের আত্মীয় পরিবার বলেই মনে হতো। আজ তোমাদেরকে সত্যিই ছাড়তে ইচ্ছে হচ্ছেনা। সবই নিয়তি ! 

আচ্ছা রৌদ্র চল আমিও তোদের সাথে তোদের বাড়িতে যাই। আংকেল আন্টির সাথেও দেখা করে আসি। 

রৌদ্র ও পূজা একই সাথে বলে উঠে, হ্যাঁ সেটা ভালো হবে। 

তিনজন রৌদ্রদের বাড়িতে যায়। রৌদ্রের বাবা-মা সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে প্রস্তুত। 

রিফাতকে দেখে রৌদ্রের মা বলে, রিফাত তুই এসেছিস বাবা। ভালো হয়েছে। রৌদ্রের বাবা তখন বলে। শুনেছ নিশ্চয়ই বাবা আমরা ভারতে চলে যাচ্ছি। ভালো থাকিছ বাবা তুই। আমরা এখন যাই। অনেক বেলা হয়ে গেছে। 

রিফাত - ঠিক আছে আংকেল আন্টি আপনারা যান। আমার জন্য দোয়া রাখবেন। 

রৌদ্ররা হাটতে শুরু করে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। একটু পথ গিয়ে রৌদ্র পিছনে ফিরে তাকায়। রিফাত দাড়িয়ে আছে। দুজন দুজনের চোখে চোখ রেখে চেয়ে আছে। রৌদ্রের কেন জানি মনে এই দেখাই শেষ দেখা ! 

রিফাত সেখানেই দাড়িয়ে রইল সাত আঠ মিনিটের মতো। রৌদ্ররা চলে গেছে ততক্ষণে অনেক দূর। রিফাত এবার বাড়ির দিকে র‍ওনা দিচ্ছে। 

রাস্তায় হাটতে হাটতে রিফাত সিধান্ত নিলো সে যুদ্ধে যাবে। এই দেশটাকে স্বাধীন করতে তার ভূমিকা রাখা উচিত। 


রিফাত সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে এসে মামাকে বলে মামা আমি যুদ্ধে যাব।  

রিফাতের মামা রমিজ মিয়া উত্তর দিল না ! অন্যমনা হয়ে কি যেন চিন্তা করছিলেন।

রিফাত আবারও বলে মামা আমি মুক্তিযুদ্ধে যাব। 

কোথায় যাবি? 

মুক্তিযুদ্ধে যাব। 

যুদ্ধে যাবে ভালো কথা। তুই কি বন্দুক চালাইতে পারিস? 

পারিনা, শিখে নিব। করিমপুর গ্রামে নাকি একজন কমান্ডার এসেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতে। 

রিফাতের মামি কুলসুম বেগম তখন তাদের কাছে এসে বলে মামা ভাগনে মিলে কি কথা হচ্ছে শুনি? 

রমিজ মিয়া : আমাদের রিফাত নাকি মুক্তিযুদ্ধে যাবে। দেখো আমাদের রিফাত কত বড় হয়ে গেছে। সে দেশের মায়া বুঝতে শিখে গেছে.....

কুলসুম : কি বলছ? এই টুকু ছেলে সে কি যুদ্ধ করবে? শুনেছি মুক্তিযুদ্ধাদের নাকি বাছাই করে নেওয়া হচ্ছে। কিরে রিফাত? তোকে কি তারা যুদ্ধে নিবে? 

রিফাত : নিবে নিবে। ঐ বাড়ির সোহেলও নাকি গেছিলো। তাকে নিয়েছে। 

কুলসুম : বাবা যুদ্ধে যাবি ভালো কথা। তবে আমার কেন জানি ভয় হচ্ছে। তুই ছাড়া তো আমাদের আর কেউ নেই। 

রিফাত : চিন্তা করোনা মামি। আমার কিছুই হবেনা। এই দেশ একদিন স্বাধীন হবে নিশ্চয়ই। আবার তোমার কোলে ফিরে আসব। 

রমিজ মিয়া : রিফাত তর সাথে আমিও যুদ্ধে যাব। 

রিফাত : সত্যি বলছ মামা? 

রমিজ মিয়া : হ্যাঁ সত্যিই বলছি। আমিও যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়ে গতকাল রাত থেকে ভাবছি। 


রিফাত মনে মনে বলে, এইজন্যই তাহলে মামা অন্যমনষ্ক হয়ে চিন্তা করছিলেন। যুদ্ধে যাওয়ার কথা। 

মামা তোমার কথা শুনে খুশি হয়েছি। আমার মনোবলে আরও শক্তি পেয়েছি। তাহলে চল মামা কাল সকালে আমরা কমান্ডার সাহেবের কাছে যাই। 

কুলসুম : তোমরা চলে যাবে আমাকে একা রেখে। 

রিফাত : আমরা তো একেবারে চলে যাচ্ছি নাকি মামি। যুদ্ধ শেষে আবার ফিরে আসব। তুমি দোয়া রেখো। 

কুলসুম : তোকে ছাড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না রে বাবা। 

বলেই কুলসুম কেঁদে ফেলল। 

রমিজ মিয়া : কান্না করো না কুলসুম। আমাদের যেতে দাও। 

কুলসুম : রিফাত ছাড়া আমাদের কে আছে। যদি ওর কিছু হয়ে যায়। আমি কি করে বাঁচবো। 

রমিজ মিয়া : তুমি কিছুই চিন্তা করো না। আমি থাকতে রিফাতের কিছুই হবেনা। 


রমিজ মিয়া ও রিফাত সকালে কুলসুম বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে করিমপুরে কমান্ডারের কাছে যায়। কমান্ডার রিফাত কে বলে, তুমি কি যুদ্ধ করতে পারবা? 

ইনশাআল্লাহ পারব। 

অস্ত্র চালাইতে পারবে? 

শিখিয়ে দিলে অবশ্যই পারব। 

সত্যি রিফাত তোমার মনোবল আছে, আবেগ আছে । তবে সংসয় হয়, সবকিছু আবেগ দিয়ে হয় না। তোমাকে পাকিস্তানি সৈন্যদের মুখোমুখি অস্ত্র চালাইতে হবে। অস্ত্র চালাইতে একটু একটু নিয়ম ভুল হলে নিজের গুলিতে নিজেই মারা যেতে পার। আর যুদ্ধ মানেই মনে মনে মৃত্যুকে বরণ করা। 

মৃত্যুকে আমি আর ভয় পাই না। অবুঝ বয়সে বাবা-মাকে হারিয়েছে। মৃত্যু নিয়ে আমার আর কিসের ভয় ! 

কমান্ডার : আচ্ছা রমিজ সাহেব দেখেন আপনি অনুমতি দিলে আমরা আপনার ভাগনেকে যুদ্ধে সুযোগ দিতে চাই। 

রমিজ মিয়া : দ্যান কমান্ডার সাহেব। রিফাতের বুকে আমি অজস্র সাহস দেখতে পেয়েছি। রিফাত অবশ্যই শত্রুদের মোকাবেলা করতে পারবে আমার বিশ্বাস। 

রিফাত : স্যার আমাকে সুযোগ দিন। এই দেশটা বাঁচতে যেভাবে আপনাদের ভূমিকা রাখতে চান সেভাবে আমারও অধিকার আছে ভূমিকা রাখার। না করবেন না স্যার। প্রয়োজনে আমাকে আপনাদের সহযোগী হিসাবে হলেও রাখুন। 

কমান্ডার : আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি তৈরি হও। 

রিফাত বাকি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে অস্ত্র চালাইতে শিখতে শুরু করে। কমান্ডারের কাছ বাকিদের মথো প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। রিফাতের মধ্যে একটা উৎসাহ দেখা যায়। 


হঠাৎ পাকিস্তানি মিলিটারীদের গাড়ির শব্দ বাজারে। সবাই দোকানপাট বন্ধ করে পালাচ্ছে। কয়েকজন সেখানেই মিলিটারীদের গুলিতে মারা যায়। মুহুর্তে বাজার শুনশান। মিলিটারীরা বাজারের পাশে গুদামঘরে ক্যাম্প বানিয়েছে। তাদের সহযোগীতা করছে স্থানীয় রাজাকার বাহিনীরা। রাজাকারদের প্রধান আব্দুর রহমান। তার নেতৃত্বে এই এলাকার বাকি রাজাকাররা মিলিটারীদির সহযোগীতা করছে। এলাকার যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে মিলিটারীদের কাছে তোলে দিচ্ছে। মিলিটারীরা তাদের সাথে পূর্তি আমোদ করে তাদের মেরে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। 


রমিজ মিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প বাড়িতে গিয়ে কুলসুম বেগমকে তার বোনের বাড়িতে দিয়ে আসে। তখন কুলসুম রমিজ মিয়াকে রিফাতের কথা জিগ্যেস করে। 

আমাদের রিফাত কেমন আছে? 

এইতো ছেলেটা মিলিটারীদের কবল থেকে দেশটা রক্ষা করতে তুমুল উৎসাহী। আপাদমস্তক দেশ প্রেমিক একটা ছেলে।

ওকে নিয়ে আমার কেন জানি শুধু ভয় হয়। তুমি তাকে সাবধানে রেখো। আমাদের কোনো সন্তান নেই তাকে আকরে ধরেই তো আমরা বেঁচে আছি বলে কুলসুম বেগম কেঁদে ফেলে। 

সেটাতো আমি জানি কুলসুম। রিফাতের মধ্যে দেশের প্রতি উদারতা দেখে, দেশ রক্ষায় তার ভুমিকা রাখার পরিকল্পনা দেখে আমি আর তাকে নিষেধ করতে পারিনি। ওকে দেখে আমার গর্ব হচ্ছে। আচ্ছা কুলসুম আমি এবার যাই। কাল আমাদের অপারেশন আছে। 

কুলসুম বেগম বারান্দায় দাড়িয়ে রমিজ মিয়ার চলে যাচ্ছে দেখে তার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল। অজান্তেই চোখে পানি। তার বোনের মেয়ে এসে বলে, কালা কাঁদছো কেন? 

কই কান্না করছি। চোখে যেন কি পড়েছে ! তাই হয়তো চোখে পানি এসেছে। 

আচ্ছা তাহার ঘরে চল।  


সকাল বেলা সকল মুক্তিযোদ্ধারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজকে মিলিটারী ক্যাম্পে অপারেশন চালাবে। রিফাতও তাদের সাথে প্রস্তুতি নিচ্ছে। হঠাত গনি মিয়া এসে খবর দেয় মিলিটারীরা লঞ্চে করে নদী পথে কোথায় জানি যাচ্ছে। তখন কমান্ডার বলে তাহলে আমরা তাদেরকে নদী পথেই আক্রমণ করব। মুক্তিযোদ্ধারা লঞ্চের অপেক্ষায় নদীর পাড়ে লুকিয়ে থাকে। লঞ্চ আসলেই লঞ্চে বোমা হামলা করবে বলে। মিলিটারীদের লঞ্চ এদিকে আসতে দেখা যাচ্ছে। রিফাত কাউকে না বলেই নদীর পাড়ে বাধা একটি ডিঙি নৌকা করে মিলিটারীদের লঞ্চের দিকে আগাতে থাকে। রিফাত বন্ধুক লুকিয়ে লুঙ্গির আচলে বোমা রাখে। কমান্ডারের চোখে এই দৃশ্য পড়তেই কমান্ডার বলে উঠে ঐ দেখ রিফাত ছেলেটা কি করছে? জানিনা ছেলেটার ভাগ্য কি আছে আজ !

ততক্ষণে রিফাতের নৌকা যখনই মিলিটারীদের লঞ্চের কাছে যায় তখনই রিফাত বোমা ছোড়ে লঞ্চের মধ্যে। লঞ্চে  লঞ্চে থাকা সকল মিলিটারী সেখানেই মারা যায়। রিফাতের অবশ্য কিছুই হয় নি। রিফাত নদীর পাড়ে ফিরে আসে। সকল মুক্তিযোদ্ধারা দৌড়ে রিফাতের কাছে যায়। 

রমিজ মিয়া : রিফাত সাহস থাকা ভালো। তবে অতিরিক্ত সাহস থাকা ভালো না। তুমি কাউকে না বলে এভাবে.... 

কভান্ডার : বাদ দেন রমিজ ভাই। ছেলেটাকে বিশ্রাম করতে দেন। তবে রিফাত এভাবে আর না বলে এতো বড় সাহস করতে যেও না। 

রিফাতকে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সবাই তাদের ক্যাম্পে যায়। আর তখন সবাই রিফাতের প্রশংসা করতে থাকে। রিফাতের দূরদর্শি সাহসীকতায় আজ আমরা শত্রুদর পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছি। 


পাকিস্তানি মিলিটারীদের লঞ্চে বোমা হামলায় মৃত্যুর খবর অন্যান্য মিলিটারী ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ে। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে দুইদিন পর আবারও সেখানে মিলিটারী সৈন্যদের পাঠায়। তারা বিকেলে এসে মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পের খোঁজ নেয়। পরদিন সকালে যখন মুক্তিযোদ্ধা কদ্দুস মিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সকালের নাস্তা নিতে আসে তখন তাকে স্থানীয় দস্যুরা চিনিয়ে দিলে  মিলিটারীরা কদ্দুস মিয়াকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে থাকে মুক্তিযোদ্ধা ও ক্যাম্প সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কদ্দুস মিয়া কিছুই বলে নি। তারপর থাকে সেখানেই পাখির মতো গুলি করে মেরে নদীতে ভাসিয়ে দেয় মিলিটারীরা। 


কদ্দুস মিয়া ফিরে আসছে না দেখে মুক্তিযোদ্ধারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। বাজারের দোকানদার জসিম এসে জানায় কদ্দুসকে মিলিটারীরা ধরে নিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা বুদ্ধি করে ঐদিন রাতে নদীর ওপারে তাদের ক্যাম্প পরিবর্তন করে নেয়। সকালে মিলিটারী টহলে চলে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা নৌকা দিয়ে এসে মিলিটারী ক্যাম্প ঘেরাও। সেখানে কয়েকজন মিলিটারী ক্যাম্প পাহারা দিচ্ছিল। তখন মুক্তিযোদ্ধারা তাদের উপর গুলি চালায়। মিলিটারীরাও পাল্টা গুলি চালালে রুস্তম আলী মানে এক মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। কমান্ডার তখন রিফাতকে বলেন রুস্তম আলিকে নিয়ে নৌকায় করে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে। রিফাত তাকে নিয়ে নৌকায় তোলে নৌকা ভাসিয়ে নদীর মধ্যেখানে যেতেই নৌকায় হটাত একটা বোমার আগুনে স্ফুলিঙ্গ তৈরি নৌকা বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ক্যাম্পের অন্যপাশ থেকে টহলরত মিলিটারীরা বোমা মেরেছে রিফাতের নৌকায়। নৌকাসহ রিফাত ও রুস্তম আলি অদৃশ্য। রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে নদীর গন্তব্য পথে। রমিজ মিয়া তখন চিৎকার করে রিফাত বলে উঠে। তার সেখানে দাড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। বিষাদ মনে যুদ্ধ চালিয়ে যায় মিলিটারীদের বিরুদ্ধে। সেখানেও তারা জয়ী হয়। কয়দিন পর দেশও স্বাধীন হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে মুখে খুশির চাপ। তবে রমিজ মিয়ার মনে সেই খুশি যেন নেই। বাড়ি ফিরে কুলসুমকে কি উত্তর দিবে। যেই কুলসুম নিজে কখনও সন্তান নেয় নি রিফাতের দিকে চেয়ে। সন্তান হলে যদি রিফাতের প্রতি মায়া কমে যায়, তাকে দূরে সরিয়ে দিতে হয় এই ভয়ে। নদীর পাশে বসে বসে দুচোখ বেয়ে অশ্রু জড়াতে জড়াতে রমিজ মিয়া পাগল প্রায় ! রিফাতের লাশটাও আর ভেসে উঠেনি। পাওয়া যায়নি তার কোনো অস্তিত্ব। দেহ কাঠামো মিশে গিয়েছিল নদীর পানিতে ম্যাংগো জুসের মতো। শুধু তার রক্তের স্রোতই দেখা গিয়েছিল এক ঝলক। তাও স্রোতের সাথে বিলিন কিছুক্ষণ পর। তবে রিফাতের স্মৃতিকথা বিলিন হচ্ছেনা কেন রমিজ মিয়ার মন থেকে। 


দেশ স্বাধীন হওয়ার একমাস পর পরের বছরের জানুয়ারী মাসে রৌদ্ররা দেশে ফিরে আসে। রৌদ্র বাড়িতে এসেই প্রথমে রিফাতের বাড়িতে গিয়ে রিফাত রিফাত বলে ডাকতে থাকে। রিফাতের মামি রৌদ্রের কন্ঠে রিফাত নাম শুনতেই আছমকা দৌড়ে ঘর থেকে বাহিরে আসেন। রৌদ্র জিগ্গেস করে আন্টি রিফাত কই? কুলসুম বেগম কিছুই উত্তর দেয় না। বিপরীতে কান্না শুরু করে দিল ! রমিজ মিয়া তখন ঘর থেকে বাহিরে আসে। 

রৌদ্র : আংকেল আমি রিফাতের বন্ধু রৌদ্র। আমাকে চিনতে পারছেন? 

রমিজ মিয়া : হ্যাঁ বাবা, চিনতে পারছি। তবে তুমি যাকে খোঁজতে এসেছো তাকে খোঁজে আর লাভ নেই ! 

রৌদ্র : কেন? রিফাতের কই? 

রমিজ মিয়া : রিফাত আর বেঁচে নেই। মিলিটারীদের বোমা হামলায় সে মারা গেছে। তার লাশটাও খোঁজে পাইনি। 

রৌদ্র : কি বলেন? কিভাবে? কোথায়? 

রমিজ মিয়া : রিফাত মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। এক সহযোদ্ধা আহত হলে তাকে নৌকা করে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার সময় মিলিটারীরা নৌকায় বোমা মারে..... 

বলেই রমিজ মিয়াও কান্না জড়িয়ে দেয়। 

রৌদ্র সেখান থেকে মনমরা হয়ে যেখানে তাদের শেষ দেখা হয়েছিল সেখানে রায়। সেদিনের স্মৃতি মনে সেও চোখে পানি ফেলতে শুরু করে। চিৎকার করে বলে; রিফাত তুই না এখানে দাড়িয়ে বলেছিলে যে দেশ স্বাধীন হলে আমাদের আবার দেখা হবে। এতো তারাতারি ভুলে গেলি একথা।আজ দেশ স্বাধীন। আমিও দেশে এসেছি। আর তুই আমাকে ছেড়ে চলে গেলি ! তাও সারাজীবনের জন্য। কি নিষ্ঠুর তুই ! একবারো আমার কথা মনে হলো না ! আহ... বিধাতার কি নির্মম খেলা ! 

যেখানেই থাকিছ রিফাত, ভালো থাকিছ বন্ধু।