জীবনের মধ্যে অনন্তকে, এবং অনন্তের মধ্যে জীবনকে দেখতে পান - তৈমুর খান

কার্তিক নাথ

কার্তিক নাথ


 জীবনের মধ্যে অনন্তকে, এবং অনন্তের মধ্যে জীবনকে দেখতে পান

✏️


তৈমুর খান 

✏️


 কবির ঘর তো পৃথিবী, নির্জনতা তো কবির ঈশ্বর, আকাশ তো কবির অনন্তে পৌঁছাবার দরজা। আর সব নিয়েই অনন্ত। পার্থিব জীবনের মায়া-মোহ, স্বার্থপরতা, চাওয়া-পাওয়া একজন কবিকে বিষণ্ন করে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জীবনের মধ্যে বন্দি দশা উপলব্ধি হয়। আর এই থেকেই তিনি মুক্তি খোঁজেন। কবি একইসঙ্গে জীবন এবং মুক্তিকে সমার্থক করে তোলেন। জীবনের মধ্যে অনন্তকে, এবং অনন্তের মধ্যে জীবনকে দেখতে পান— আর তখনই  কাব্যের নামকরণ হয় 'দরজাটা খুলে রাখা ভালো'(প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০২০)। মোট ৪৩ টি কবিতা নিয়ে কাব্যগ্রন্থটি লিখেছেন কার্তিক নাথ(জন্ম ১৯৬১)।


  কবিতায় কোথাও নিজেকে গোপন করেননি কার্তিক নাথ। ছিপছিপে হালকা জীবনকে নানাভাবে দেখতে চেয়েছেন। মায়ার মধ্যে এবং মায়ার বাইরেও। ভালোবেসে এবং ভালো না বেসেও। তবু জীবনকে ধরতে পারেননি। শুধু শব্দ খুঁজেছেন এবং কবিতার শরীর গেঁথেছেন। কিন্তু সেই শরীরে এক শূন্যতা, এক তৃষ্ণাকাতরতা, এক অসম্পূর্ণতায় আলো-আঁধারের ক্ষেপণ বিরাজ করেছে। তখনই কবির প্রশ্ন:

"কবিতা কি জীবনেরই— নাকি তার অধিক?"


 কবিতা জীবনের অধিক। কেননা কবিতায় থাকে অনন্তের ইশারা। দৈনন্দিন জীবনের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করে কবিতা চিরন্তনের দরজায় করাঘাত করে। আর তখনই উপলব্ধি হয় দরজাটা খুলে রাখার:

"দরজাটা খুলে রাখা ভালো,

 অনেকটা আলো আসে,

 বাহির কীভাবে আসে মনের ভেতর!"


 এই 'দরজা খোলা' তো জীবনকে অতিক্রম করা। সাময়িকতাকে অনন্তের প্রবাহ দান করা। মুহূর্তকে মহাকালের সীমানায় নিয়ে যাওয়া। খণ্ডকে অখণ্ডের আলোয় উদ্ভাসিত করা। এই প্রসঙ্গে হার্বার্ট জেফ্রি 'হার্বি' হ্যানকক(জন্ম: ১২ এপ্রিল, ১৯৪০) নামে একজন মার্কিন পিয়ানিস্ট, ব্যান্ডলিডার ও কম্পোজার,যিনি জ্যাজ শিল্পীদের মধ্যে প্রথম সিন্থেসাইজার ব্যবহার করেন ও ফাঙ্ক সঙ্গীত দ্বারা প্রভাবিত হন, তিনি বলেছেন:


"Life is not about finding our limitations, it's about finding our infinity."

(Herbie Hancock)

 অর্থাৎ জীবন আমাদের সীমাবদ্ধতা খোঁজার জন্য নয়, এটি আমাদের অসীমতা খোঁজার বিষয়।

 কার্তিক নাথ বললেন:

"হরিমাধবের গোয়ালের আলো এল

 দরজাটা খুলে রাখা ভালো"


 'হরিমাধব' তখন আর একজন ব্যক্তি নন, তিনি সমগ্র মানুষের প্রতিনিধি। তার গোয়াল ঘরও সমগ্র পৃথিবী। অর্থাৎ হরিমাধব এর মধ্যে ঈশ্বর, এবং গোয়াল ঘরের মধ্যে সমগ্র জগতের দর্শন সম্ভব হয়ে উঠল।


      কার্তিক নাথ কবিতায় সেই মুক্তির আলোকেই অনুধাবন করেছেন। সীমারেখার মতন তাঁর নিজস্ব নদী, সেখানে সাঁতার কাটা, স্নান করা চললেও অনন্ত আকাশের মুখও ভেসে উঠল। পার্থিব চেতনায় অপার্থিবের আবেদনও প্রকট হয়ে উঠল। মনের ভেতরের ঘরবাড়ি পূর্ণ হল আকাশী রঙের খেলায়। দুঃখের পাতারা ডালে ডালে ফুল ফুটাল। শব্দের আলোয় অনন্ত এসে বসবাস শুরু করল। কবির দার্শনিক চেতনা আরও প্রখর হল:


 "যে নৌকাটি ভাসিয়েছে জলে,

 তাকে নদীর বুকে করে রেখেছে নির্জনে

 কেন নৌকো?

 কেন জল?

 সব কথা কেন ভেসে যায় দিকশূন্যপুর?

 এর পর কী লিখব?

 কিছু লিখব না তা কি হয়,

 এতদিন ক্ষয়, রাত্রি ক্ষয় হয়েছে যখন?

 হারাব, হারাব তাকে,

 এ নিদ্রায়, জাগরণে, পথে পথে শত বাঁকে,

 ইচ্ছায়, আলোয়, হতাশায়।"

 এই অংশটি পড়তে পড়তেই যদি এমন চিন্তার উদয় হয়:

 কেন জীবন? কেন বেঁচে থাকা? কেন এই হাহাকার?


 হয়তো এসবের উত্তর নেই। তবুও উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই বহুদূর যাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে আলো-অন্ধকারে পথ চলা। এই পথ চলার শেষ নেই। কেননা আমাদের পূর্ণতা নেই। তাই হতাশা ও কান্নার ভেতর মোচড় খেতে খেতেই:

"জীবন, জীবন, করে ডাকি চারপাশে,

 হারাবার ভয় কেন দীর্ঘ দীর্ঘ হয়?"


 এভাবেই ভেতরে প্রদীপ জ্বেলে যে দুঃখের সঙ্গে বসবাস করি, যে হিংসার সঙ্গে বাতাসে উড়ি, যে কান্নার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়— সেসবকে সারাজীবন বহন করেও আমরা বিশ্বাস করি:


"জীবন সত্যই, আর সত্য তাকে রক্ষা করা"

 এই সত্যকে ধারণ করেই বিষণ্ন নদীটি পার হতে চাই। সময়,রাষ্ট্র, দুঃশাসন, অতীত-বর্তমান, মুখোশপরা শাসক সবকিছুর মধ্যে দিয়েই অবিরাম যাত্রা। নৌকা খোঁজা, আলোকিত হওয়া এবং উদ্বেগ থামিয়ে সত্যকে জেনে তার অভিমুখে হেঁটে যাওয়া। হয়তো সত্যের ঠিকানা নেই। কিন্তু সত্য থাকে প্রতিটি জীবনের কাছেই সত্য ধরা দেয়। আমেরিকান ঔপন্যাসিক এবং ইংরেজি ভাষার সৃজনশীল লেখক একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস(জন্ম:২১ ফেব্রুয়ারি,১৯৬২) বলেছেন:


"The truth will set you free. But not until it is finished with you.” —(David Foster Wallace)

 অর্থাৎ সত্য আপনাকে মুক্ত করবে। তবে যতক্ষণ না এটি আপনার সাথে শেষ না হয়। এই সত্যকেই অবলম্বন করেছেন কার্তিক নাথও। আর তারই ঠিকানা খুঁজেছেন কাব্যে। কিন্তুভ কবির তো ঠিকানা থাকে না। যে ঠিকানা ভালোবাসার, যে ঠিকানা পূর্ণতার, যে ঠিকানা শান্তির— সেই ঠিকানা কোথায়? কবি বলেছেন:


"প্রত্যেক ভালোবাসার একটি ঠিকানা থাকে

 অথচ আমি তো এক ঠিকানাহীন

                             এ মরু দেশে

বালির দহন যত, তুচ্ছ করে পড়ে আছি উটের মতন

দুই চোখে জলপাই রঙের স্বেচ্ছা মরে না কখনও

 আকাশে আশার মেঘ ওড়ে, দেখি

 তবে বৃষ্টিহীন

 হত্যাকারীর মতন


 তার ভেতর,

         বাহির

 অনন্তলোক

 জানে কি জানে কি এই কবিতা পাঠক?"


 অর্থাৎ কবির ঠিকানাবিহীন উদ্বাস্তু জীবন। এক স্বপ্ন থেকে আর এক স্বপ্নের দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। পাঠক কবিকে আসলেই কি বুঝতে পারেন?

 না, পারেন না। কবির অন্তর্জগতের বিরামহীন শূন্যতা, অস্থিরতা, না পাওয়ার অপূর্ণতা বস্তুগত নয়। তা উপলব্ধির জগৎ। সাধারণ মানুষের মতো হতেই পারে না। সৃষ্টির মূল উৎস থেকেই এই অপূর্ণতা প্রবাহিত হয়ে আসছে। সেই সুরই কবিতা। কবি সেখানে বাঁশি মাত্র। পার্থিব আয়োজনে এই শূন্যতার উপশম সম্ভব নয়। রাত্রির অন্ধকার তাকে ঢাকতে পারে না। বৃষ্টিও তার পিপাসা নিবারণ করতে পারে না। রোমান্টিক দৃশ্যও সেখানে ব্যথার কারুকাজ হয়ে জেগে ওঠে।


    খুব সহজভাবেই কবিতাগুলির একমুখী ভাবনা পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। সাম্প্রতিকের কবিতার যে বাঁকবদল, যে বিষয়হীনতা,যে নাথিংনেস এবং অধুনান্তিক ভাবনা—তার কোনো প্রভাব কার্তিক নাথের কবিতায় নেই। সাম্প্রতিকের ভাষাপ্রকল্প অথবা শব্দ প্রয়োগেও তিনি কোনো পরীক্ষায়-নিরীক্ষায় যেতে চাননি।


✏️

দরজাটা খুলে রাখা ভালো: কার্তিক নাথ, নেহা পাবলিকেশন, ৯ দমদম থানা রোড, কলকাতা-৭০০০২৯, মূল্য ১০০ টাকা।


webtostory