ধারাবাহিক গল্প- ✏️ধূমকেতু ✏️ সুশান্ত ঘোষ

webtostory



ধারাবাহিক গল্প-

#ধূমকেতু ( পর্ব- ১ )

#সুশান্ত_ঘোষ 


সারাদিন ভীষণ রৌদ্রে কাটিয়ে বিকেলের সময় কোয়ার্টার এ ঢুকে শুভময় বদনদা কে এক কাপ চা দিতে বলে গা টা এলিয়ে দেয় আরাম কেদারায় । অন্যান্য সময় কাজের ফাঁকে তবুও একটু বিশ্রাম করার সময় থাকে, কিন্তু ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের ওই হাতির পালের উপদ্রবের জন্য সারাদিনটাই কোথাও না কোথাও ছুটে বেড়াতে হচ্ছে শুভময় কে । তার ওপরে এই বিভৎস গরমে । এই বছর তিনেকের চাকরির মধ্যে কতো রকমের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে শুভময় এর ভাবলেই অবাক লাগে ওর । সেই ফেলে আসা কলেজ জীবনের লড়াই । কতো কষ্টের সংসারে বাবা মা পরিবারের সংঘাত। পড়াশোনার মাঝে কলেজ জীবনের দুষ্টুমি । কতজনের মুখগুলো ভেসে আসে কত রকম অনুভূতি নিয়ে ভাবতেই ভালো লাগে শুভময় এর । 


কিন্তু এই চাকরিটা সত্যিই ভীষণ দরকার ছিল শুভময়ের পরিবারের ওই সময় । সারাদিন এই কোয়ার্টার এর জঙ্গলের জীবন, গ্রামের গরিব মানুষগুলোর জীবন দেখতে দেখতে হাতির পালের এই বিভৎসতার দৃশ্য যেন মনে করলেই কষ্ট হয় শুভময়ের । গ্রামের গরীব মানুষগুলো র ফলনের ভীষণ ক্ষতি করে দিয়ে যায় এই হাতির পালগুলো । এই দলে আবার সতেরো টা হাতি আছে । কিছু করার ও নেই বেচারাদের । ভাবতে ভাবতে চোখের পাতাটা যেন জড়িয়ে আসতে চাইছে। খেতে তো হবে কিছু ওদের। জঙ্গলের গাছপালা তো দিন দিন কেটে পরিস্কার করে দিচ্ছে মানুষ। যতটা না গরীব মানুষগুলোর অভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি চুরি করে । বাধ্য হয়েই হাতির পাল খাবারের সন্ধানে গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ছে জঙ্গল ছেড়ে । 


এই তো কিছুদিন আগে গ্রামের মধ্যে একটা পরিত্যক্ত কুঁয়োয় পড়ে গিয়েছিল একটা ছোট হাতি । ভীষণ সমস্যা তাকে তুলতে গিয়ে । হাতির বাচ্চার চিৎকারে মানুষ ও সন্ত্রস্ত হয়ে সন্ধ্যায় ঢিল লাঠি আগুন যে যা পারছে নিয়ে দুর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। আর হাতির পালটাকেও কিছুতেই উদ্ধার করার জন্য তার কাছ থেকে সরানো যাচ্ছে না । বাচ্চাটাকে ফেলে তারা কিছুতেই ওখান থেকে যাবে না । গ্রামবাসী দের আচরণে তারাও সব লণ্ডভণ্ড করে যাচ্ছে ঘরদোর । সে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সামনে। 


দমকল বাহিনীর সাথে শুভময় তার গোটা টিম নিয়ে সারা রাত মাইকে প্রচার করে গ্রামের মানুষকে শান্ত করে । সকালে হাতির পালকে অনেক কষ্টে তাড়িয়ে কুঁয়োর চারপাশ কেটে একদিকে হাতির বের হওয়ার মতো রাস্তা করে । দমকলের লোকজন হাতিকে ক্রেনের এক প্রান্তে জড়িয়ে বেঁধে সারাদিন রাত্রি পরিশ্রম করে কুঁয়োর থেকে তুলে তাকে আবার চিকিৎসার জন্য ফরেস্ট অফিসে দু একদিন রেখে ওই দলটার কাছে দুর থেকে ছেড়ে দিয়ে শান্তি । তবে এই সবকিছুর মধ্যে একটা তৃপ্তি ও লুকিয়ে থাকে। যখন ওই বাচ্চাটিকে ফিরে পেয়ে বাচ্চা হাতির মায়ের ওই বাচ্চাটিকে ঘিরে উচ্ছ্বাস । না শহরের মানুষ ওদের এই সরল ভালবাসা কখনও বুঝতে পারবে না আপন মনেই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে ওঠে শুভময় । হঠাৎ করেই রামবিলাস গাড়ি নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এসে হাজির শুভময় এর কোয়ার্টারে । বলে স্যার একটা সমস্যা হয়েছে ।


শুভময় বলে ওঠে, এখন এইসময় আবার কি সমস্যা হলো ?


ধারাবাহিক গল্প- 

ধূমকেতু [দ্বিতীয় পর্ব]

সুশান্ত_ঘোষ 


রামবিলাস বাবুকে দেখে বেশ কিছুটা চিন্তায় মনে হলো শুভময়ের । এখানে ফরেস্ট অফিসে কাজে জয়েন করার পর থেকে শুভময় দেখেছে এই মানুষটার মধ্যে একটা সততা ও মানবিকতা লুকিয়ে আছে অন্যান্য অনেক অধস্তন কর্মচারীদের থেকে । ফলে মুখে সামনাসামনি কিছু না বললেও এনাকে শুভময় ব্যক্তিগত ভাবে বেশ কিছুটা ভালবাসে । 


শুভময় বলল, কি ব্যাপার রামবিলাস বাবু ? আপনাকে এতো চিন্তিত মনে হচ্ছে কেন ? আমি আপনাকে বলেছি আগেই আমি যতক্ষণ আছি এই রেঞ্জে আপনি নিশ্চিন্তে আমাকে সব কথা বলতে পারেন । এখন এই সময়ে আবার কি সমস্যা হলো ? আমি তো এইমাত্র কোয়ার্টার এ এসে ঢুকলাম । আলাদা হওয়া হাতি দুটো কি পিড়াকাটার জঙ্গলের থেকে আমাদের এদিকে আসার কোন খবর পেয়েছেন । হাতির দলটা যাতে লোকালয়ে রাতে আর না ঢুকতে পারে আমি সমস্ত জোনে নিজে গাড়ি নিয়ে ঘুরে সবার দায়িত্ব এইমাত্র বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে এলাম । কারো শরীর খারাপ হয়েছে না কি ?


রামবিলাস বাবু বললেন, না না স্যার শরীর সবার ঠিক আছে, কিন্তু এটা একটা উটকো সমস্যা তৈরি হয়েছে । এই আজকাল কলেজের ছেলে ছোকরার দল এমন হয়েছে, যে ওরা নিজেদের সব হিরো হিরোইন মনে করে । 


রামবিলাস বাবুর কথা শুনে শুভময় হেসে উঠে বলল, আরে রামবিলাস বাবু ছেলে ছোকরারা কি বুড়োদের মতো আচরণ করলে আপনার ভালো লাগত ? তা ছেলে ছোকরা কি করেছে বলুন তো ?


রামবিলাস বাবু যা বললেন, তাতে শুভময় কে বেশ চিন্তায় ফেলে দিল । বিহার থেকে অনেকদিন আগে এলেও রামবিলাস বাবুর কথায় এখনও বিহারের কথার একটা আলাদা টান রয়ে গিয়েছে আজও । রামবিলাস বাবু বললেন আজ মেদিনীপুর শহর থেকে কলেজের ফাইনাল ইয়ারের সাতটি ছেলে মেয়ে, ওদের মধ্যে পাঁচ জন ছেলে দুজন মেয়ে আছে- চারটে মোটর সাইকেলে করে হাতি দেখতে জঙ্গলে এসেছিল, না ঘুরতে এসেছিল এই পিড়াকাটা পাথরকুমকুমি বলতে পারি না । ওরা ওখানে ঘুরে আবার ভাদুতলা পেরিয়ে বেশ কিছুটা আসবার পর রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে জঙ্গলের মধ্যে পায়দালে ঢোকে । তারপর হঠাৎ কুছুর আওয়াজ শুনে হাতির পায়ের আওয়াজ মনে করে ওরা সবাই ছুটে বেরিয়ে পালিয়ে আসে । কিন্তু ওদের মধ্যে একটা মেয়ে সম্ভবত পড়ে গিয়ে থাকতে পারে জঙ্গলের মাঝে । কুছুতে ধাক্কা লেগে । ওরা ছজন রাস্তায় উঠে পড়ে অনেক ফোন করছে মেয়েটাকে । কিন্তু কেউ ধরছে না । বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তা ওরা কি করবে বুঝে না পেয়ে ভাদুতলা ফিরে গিয়ে ওখানের আমাদের রেঞ্জ অফিসে সবাই এসে হাজির হয়েছে । ওখান থেকে আমাদের এখানে জানিয়েছে । এখন ওই মেয়েটার বাড়িতে খবর দিতে হবে না কি করা যায় তাই আপনার কাছে ছুটে এলাম । 


রামবিলাস বাবুর কথা শুনে শুভময় বলল, ওই ছেলে মেয়েগুলো একবার পেছন ফিরে দেখলো না যে তাদের বন্ধুর কি হয়েছে ? জঙ্গলের বুনো হাতি কি করতে পারে কোন ধারণা আছে ওদের ? হাতির সাথে সেলফি তুলতেও ওদের আপত্তি নেই । তা যায়গাটার সঠিক লোকেশন টা আমাকে বলুন আপনি । ওরা যেখানটা বলেছে । বাঁদর ছেলে মেয়ে যতো নিজের মনেই বলতে বলতে ড্রেস করতে থাকে শুভময় । আর তাড়াতাড়ি মাথায় হেলমেট পরে মোটর সাইকেলে বেরিয়ে পড়ে শুভময় ।


রামবিলাস বাবু বলেন, স্যার আপনি যাচ্ছেন ওখানে ? আমি যাই না আপনার সাথে ? যদি কোন সমস্যা হয় ? সন্ধ্যা হয়ে আসবে এখনই । 


শুভময় বলল, না আপনার যাওয়ার দরকার নেই । ওই ছেলেমেয়েগুলোকে ওই মেয়ের বাড়িতে খবর দিতে বলুন হিরো হিরোইন এর দলকে । আর শালবনি থানায় ফোন করে গোটা ঘটনাটা জানিয়ে দিন একটা অফিসিয়াল ডায়েরি করে । আপনি একটু অফিসে থাকুন আমি বেরিয়ে দেখি । আলো থাকতে থাকতেই কতটা কি করতে পারি ।


রামবিলাস বাবুর কথা মতো শুভময় মাঠ বরাবর এসে রাস্তার পাশে শাল ডুমুরিয়া পেরিয়ে গাছের তলায় মোটর সাইকেল টা রেখে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে থাকে পায়ে হেঁটেই । এখানে মোটর সাইকেলে ঢোকার মতো কোন রাস্তাও নেই । বেশ কিছুটা যাওয়ার পর জঙ্গলের চেহারা ক্রমেই গভীর হয়ে আসছে । অন্যান্য সময় এখানে গাছের পাতা ঝরে পড়ে তাও সূর্যের আলো ঢোকে । এই বছর গরমের তীব্রতা এখনও স্বমহিমায় আসার আগে ক্রমশ জঙ্গলের চেহারা যেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে । শুভময় একটু দাঁড়িয়ে চিন্তা করে না ওরা কি এদিকে আর এগোতে পারে ? এমন সময় এর চেয়ে বেশি ঢোকা ওর নিজের জন্যেও সঠিক নয় । হঠাৎ করেই শুভময় এর চোখে পড়ে সামনেই একটা গাছের আড়ালে লাল আর হলুদ রঙের শাড়ির আঁচল পেছন থেকে । আসতে আসতে এগিয়ে যায় শুভময় । দেখে গাছের আড়ালে বসে পা ধরে যন্ত্রণায় কাতর একটি মেয়ে । শুভময় কে দেখেই চমকে ওঠে আচমকা ওই মেয়েটি । শুভময় বুঝতে পারে ইনিই সেই হিরোইন । হাতির সাথে বন্ধু হওয়ার সখ নিয়ে সন্ধ্যা হওয়ার মুখে সম্ভবত পা মচকিয়ে পড়ে যেতে দেখেও জীবনের ভয়ে সব বন্ধুরা যাকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে । 


শুভময় ওই মেয়েটিকে বলল হাতির দেখা পেয়েছেন ? 


মেয়েটি অবাক বিস্ময়ে শুভময়ের দিকে তাকিয়ে থাকে । কি অদ্ভুত ব্যাপার। এখানে এই সময়ে আমার কাছে আমার প্রিয় মানুষটা হাজির । যেন ভগবানের কঠিন করুণা । আরো কিছুটা কষ্ট পেলেও সহ্য করতে রাজি সবকিছু । 


শুভময় বলে, কি দেখছেন অমন করে । আমি ডাকাত কিনা ?


মেয়েটি বলল, আমি জানি আপনি ডাকাত হতে পারেন না । 


শুভময় বলল, ভাগ্যটা ও দেখছি দেখতে জানেন । তা হাতির সাথে বন্ধু হওয়ার সখ মিটেছে ?


মেয়েটি বলল না আজকের সখের জন্য এখন আর কোন দুঃখ নেই । তবে ওটা হাতি ছিল না, একটা বুনো শুয়োর । আর বেশ কয়েকটি নেউল দেখেছি । একটা শেয়াল ও চোখে পড়েছে । আর ভীষণ মশা কামড়াচ্ছে । আর পা টা ফুলে গিয়ে একটু কষ্ট হচ্ছে । 


শুভময় বলল, এবার আপনি বাড়িতে ফিরে যাবেন? না সারারাত এখানে বসে মশার কামড় খেয়ে আরো কিছু দেখতে চান ? 


আপনার সাথেই যেতে চাই । কিন্তু আমি তো ভালো করে দাঁড়াতেই পারছি না । 


শুভময় বলল, আপনার মোবাইল কোথায়? ফোনে কেউ পাচ্ছে না কেন? এখানে তো এখনও টাওয়ার আছে আমাদের। 


মেয়েটি বলল, মোবাইল ফোন টা বাজলেও হাত থেকে ছিটকে এখানে দূরে কোথায় পড়ে গিয়েছে । আমি এতো গাছের পাতায় দেখতে পাচ্ছি না। শুভময় ওনার মোবাইল নাম্বার নিয়ে রিং করতে মনে হোল একটু দুরে মোবাইল টা বাজছে। শুভময় এগিয়ে গিয়ে গাছের পাতা সরিয়ে মোবাইল টা গুড়িয়ে এনে ওনার হাতে তুলে দিল । দিয়ে বলল আগে চলুন এই জঙ্গল থেকে বেরোই । তারপর আপনার সব বীরপুরুষ হিরোদের সঙ্গে কথা বলবেন। এবার আস্তে আস্তে চেষ্টা করুন দাঁড়ানোর। 


মেয়েটি বলল, আমি তো অনেকবার চেষ্টা করেছি। যেতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। পারছি না হাঁটতে । পা টায় ভর দিলে ভীষণ লাগছে। 


শুভময় বলল, মানে আপনি চেষ্টা করুন দাঁড়ানোর আমি ধরছি আপনাকে । জঙ্গলের থেকে আগে রাস্তায় পৌঁছাতে হবে তো ? জঙ্গলের মধ্যে সন্ধ্যা নেমে গেলে অনেক বিপদ । এটা আর তখন সিনেমার মতো সাজিয়ে পরিবেশন করা হবে না । কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় ।


মেয়েটি বলল, আর কোন বিপদ আমাকে ছুঁতে পারবে না আমি জানি । বলে শুভময় এর কাঁধে হাত ধরে ভীষণ কষ্টে এক আধ পা এগোবার চেষ্টা করলো মেয়েটি । শুভময় দেখল এইভাবে এতটা পথ হেঁটে যাওয়া যাবে না। ফলে বাধ্য হয়েই মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে এগিয়ে চলে শুভময় । শুভময় এর গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে থাকে মেয়েটি। রাস্তায় যেতে যেতে শুভময় জিজ্ঞেস করে আপনার নাম কি ? এই রকম আর কি কি উটকো সখ আছে আপনার ? 


মেয়েটি বলল আপনার মতো কলেজ জীবনে টেবিল বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইবার । 


শুভময় বলল, মানে আমি কলেজ জীবনে টেবিল বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইতাম । এটা আপনাকে কে বলল ? 



ধারাবাহিক গল্প 

 ধূমকেতু [ ৩ পর্ব ]

সুশান্ত_ঘোষ 


শুভময় এর বিস্ময়ের মাঝে মেয়েটি বলল, তবে কি আপনি অস্বীকার করছেন । আমি তো জানতাম আপনি পরিস্কার কথা শুনতে বা বলতে নাকি পছন্দ করতেন?


শুভময় বলল অবাক কথা বলছেন আপনি - আমি পরিস্কার কথা বলতে ও শুনতে ভালবাসি । কলেজ জীবনে টেবিল বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইতাম এইসব কথা আপনি বলছেন আবার আমাকেই । যাকে আপনি চেনেন না, আমি কে ? কি কাজ করি সেটাও জানেন না এখনও ? ঠ্যাং মচকে আমার কোলে চেপে চলেছেন । আমি কখন আপনাকে হাত থেকে আমার কষ্ট হলে ফেলে দেব এটাও আপনার অজানা ? তবুও পাকা পাকা কথা বলতে একটুও দমবার লক্ষণ নেই। 


মেয়েটি বলল, যার কোলে করে চলেছি তার হাত থেকে পড়ে যাওয়ার কোন ভয় আমার নেই । আর যার গলাটা জড়িয়ে ধরে আছি যদি এই জীবনে পড়ি তো তাকে নিয়েই পড়ব এটা নিশ্চিত । একটা মেয়ে যখন কারো বাঁধনে বিপদের মুখেও আবদ্ধতায় বাঁধা পড়ে তখন সেই মানুষটির মনটা পড়ে নেওয়ার ক্ষমতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েটির থাকে মিস্টার হিরো । তবে টেবিল বাজিয়ে কলেজ জীবনের কিশোর কুমারের ভক্ত আমি হতে পারিনি ।  আর বাহিরে গাম্ভীর্য দেখিয়ে রোমান্টিক হিরো আজকের দিনে আদ্দিকালের বদ্দিবুড়োর মতো রাজেশ খান্নার ভক্ত আমি নই ।


শুভময় অবাক হয়ে মেয়েটিকে বলে আমি রাজেশখান্নার ভক্ত এটা আপনাকে কে বলল ? আর আমি কিশোর কুমারের গান পছন্দ করি এটাই বা আপনি মনে বলছেন কি করে ? আপনি কি মানুষের মনটাও পড়তে পারেন নাকি ?


মেয়েটি বলল তা একটু আধটু পড়তে পারি । মন চাইছে আজ ফাগুনের রঙে সাজতে আমি আপনার মতো অভিনয় করে সরে থাকতে পারব না ? তবে কলেজ জীবনের ক্লাস অফ হলেই আপনি কিশোর কুমারের " হাম দোনো দো প্রেমি দুনিয়া যো চেলে " , এই গানটা বেশি গাইতেন কিনা ? 


হ্যাঁ অবশ্যই গাইতাম । সাথে অন্য অনেক গান গাইতাম । যেখানে রাজেশখান্না গানটা সিনেমায় গাননি । কিন্তু এটা আপনাকে কে বলল ? আপনার দাদা বা পরিবারের কেউ কি আমার সাথে পড়ত ? কিন্তু সেক্ষেত্রে আমি কে বা আপনি আমাকে চিনবেন কি করে ? আপনার নাম কি আগে বলুন ?


আমার নাম শুভমিতা । আপনি আমাকে মিতা বলে ডাকতে পারেন ।


আমি আপনাকে কি বলে ডাকতে পারি, সেটাও আপনি আমাকে বলে দিচ্ছেন ? কঠিন ডেঁপো মেয়ে তো আপনি ? পা মচকে হাঁটতে পারছেন না, একটা অপরিচিত লোকের কোলে যাচ্ছেন, আপনার কি ভয়ডর ও নেই ? আপনার বাবার নাম কি ? কি করেন উনি ? 


বাবার নাম শুভ্রাংশু বোস । বাঁকুড়া কলেজের অধ্যাপক । আর মা গৃহবধূর দায়িত্ব পালন করেন । সম্বন্ধ করার জন্য আর কোনো প্রশ্ন আছে আপনার ?


একদম নির্লজ্জ বেপরোয়া একটি মেয়ে আপনি । পরিবারের ছাড়পত্র নিয়ে অধ্যাপক বাবার বদনাম করেই ছাড়বেন দেখছি ? আর বাকি দাদা বা বোন ?


শুভমিতা বলল, সবেধন নীলমণি। আর কোন ভাই বোন নেই আমার । এবার আপনার আর কি কি প্রশ্ন আছে করে ফেলুন ?


শুভময় বলল নীলমণি নয় বলুন আপনি অসভ্যতার শিরোমণি ?


শুভমিতা বলল, সেটাও আপনি আমাকে আপনার অজ্ঞতা বশত বলতেই পারেন। ঠিক আছে ওটা আমি ক্ষমা করে দিলাম আপনাকে । 


শুভময় বলল, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিলেন ? উচিৎ ছিল আজকে আমার এখানে এসে আপনাকে না উদ্ধার করা । তখন বুঝতেন কে কাকে ক্ষমা করে দিত ?


শুভমিতা বলল, অদ্ভুত মানুষ বটে আপনি- বলছেন এখানে অনেক বিপদ ছিল। এইরকম জঙ্গলে বেঁচে থাকার আশা কম ছিল। সেক্ষেত্রে আপনি না আসলে এখানে আমি সুস্থ থেকে ভালো থাকলে তবেই তো আপনার ক্ষমা করার প্রশ্ন আসত । তাহলে তো এই জীবনে আপনার সাথে আমার আর দেখাই হতো না। তবে ভগবান এতটা নিষ্ঠুর নন, যতটা আপনি নিষ্ঠুর ।


শুভময় বলল, না আপনার কাছে আর কিছু বলার নেই আর বিশেষ কিছু প্রশ্ন নেই ? ভুল মানে করছেন ? শুধু আপনি গ্রেস করে এতগুলো কথা বললেন কি করে ভাবছিলাম আমি ?


শুভমিতা বলল কোন কোন কথাগুলো নিয়ে ভাবছেন ?


শুভময় বলল, টেবিল বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান কলেজ জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছাত্র ছাত্রীদের জীবনে ঘটেছে । কিন্তু আমার প্রিয় গায়ক কিশোর কুমার ও নায়ক হিসেবে আমি রাজেশ খান্নার বেশি ভক্ত এটা আপনাকে কে বলতে পারে ?


তবে খুঁজতে থাকুন উওরটা মিষ্টার শুভময় ঘোষ ? যদি উওর খুঁজে পান তবে হয়তো মনে মনেও এটা ভেবে বলবেন, যে একটা মেয়ে তার নিজের জীবনের মাঝে অপরিচিত কোন অবিশ্বাসী লোকের  যায়গা কিভাবে ধরে রাখতে পারে ? মেয়েদের নিজস্ব আব্রু রক্ষার জন্য আজকের সমাজ ব্যবস্থায়  মেয়েদের কি আজকের দিনে এতটা দুর্বল ভাবাটা সঠিক ?


অবাক বিস্ময়ে শুভময় বলল, আমার নামটাও আপনার কাছে পরিচিত । সত্যিই আমি আপনাকে যত দেখছি ততই অবাক না হয়ে পারছি না । যদি সেইরকম কোন কথা রাস্তায় বলে কষ্ট দিয়ে থাকি দুঃখিত। তবে আপনার এই আজকের দিনে এই ধরনের পাগলামির প্রয়াস আমি সমর্থন করি না । যে কোন সময় যে কোন রকম বিপদ ঘটতে পারত । আজ আমি আপনাকে জঙ্গলে খুঁজে না পেলে আপনার কোনও বড়ো বিপদ ঘটে যেতে পারত । ভেবে দেখবেন আমার আপনাকে বলা কথাগুলো । কথা বলতে বলতে পেরিয়ে চলে এসেছি জঙ্গলটা । ওই যে সামনে আমার মোটর সাইকেল। এবার আপনাকে কোথায় ছেড়ে গিয়ে আসব বলুন ? তার আগে একটা প্রশ্ন আপনি আমার নামটা জানলেন কি করে ? কতদিন আমাকে চেনেন আপনি ?


শুভমিতা বলল, আমি সুদীর্ঘ পাঁচটি বছর আপনাকে চিনি । 


শুভময় বলল পাঁচ বছর ? কোথায় কি করে  ?


শুভমিতা বলল কলেজে আমি যখন ঢুকি ক্লাস ইলেভেন, আপনি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন । পরের বছর আমার দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী অবস্থাতে আপনি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র ছিলেন। এই দু বছর আপনি আমাকে দেখেছেন, হয়তো সুন্দরী নয় বলে মুখ ঘুরিয়ে চলে গিয়েছেন । আমি কিন্তু আপনার গান সবটাই শুনেছি এবং সামনাসামনি দেখেছি অনেকবার, হয়তো সুযোগ করে কথা বলে উঠতে পারি নি । আপনাকে যেহেতু পছন্দ করতাম আপনার কিছু বিশেষ নিজস্ব স্টাইলের জন্য তাই মাঝে মাঝেই আপনার ক্লাসরুমের কাছে অজান্তেই মনের টানে ঘুরে ফিরে আসতাম । আর আজ আমি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী এই পরের তিন বছর আপনি বুঝবেন না কিভাবে চিনি আপনাকে । স্বভাবতই আমি শুভময় ঘোষ কে চিনি কিন্তু এটা জানি না আপনি কি করেন ? আর কিছু শুনতে চান ?


শুভময় বলল বুঝলাম, সুন্দরী মেয়ে বলে আপনার অহঙ্কারও আছে ? আর আমি আপনাকে ডেঁপো মেয়ে বলেছি বলে অভিমান করেছেন আমার ওপর । তা ভালো । আবার একটা ছেলের সামনে Desperately বলছেন আপনি আমাকে পছন্দ করতেন ?


শুভমিতা বলল আমার কোনও অহঙ্কার নেই, আমি সুন্দরী না অসুন্দর এটা নিয়ে। তবে মনের দিক থেকে আমি যথেষ্ট পরিস্কার এটা গর্ব করে বলতে পারি। আপনি ডেঁপো মেয়ে বলেছেন বলে আমার কোনও কষ্ট হয়নি বরং আপনার মুখে এটা শুনতে ভালো লেগেছে । যাকে পছন্দ করি , তার সামনে অথবা অপরের কাছে এটা বলার জন্য আমার কোনও লজ্জা নেই। তবু তো বলিনি এখনও যে আমি আপনাকে মনে মনে ; না থাক। আমার মনে হয় আমার চেনা শুভময় ঘোষ এতটা বোকা নয় , যে আমার কথা বুঝতে পারে নি। বরং নিজের মনে ভালোবেসে শুনতে চাইছে কথাটা ।


শুভময় বলল, এবার কিন্তু নামাচ্ছি আপনাকে । ভীষণ হাতটা ধরে গিয়েছে।  সাবধানে মোটর সাইকেল টা ধরে দাঁড়ান । আর ফোন করে আপনার বীরপুরুষ হিরোরা কোথায় জিজ্ঞেস করুন । আমি পৌঁছে দিয়ে আসব । আর বাড়িতে ফোন করুন আগে । আপনার বাড়ির সবাই ভীষণ চিন্তিত নিশ্চিত ? আর আমারও অফিস থেকে একটা ফোন এসেছে ধরে নি আমি । আর থানায় একটা ইনফর্মেশন দিয়ে দি আগে ।


শুভমিতা বলল হাঁদুরাম কোথা কার । যাক এইটুকু অন্তত স্বীকার করেছেন চুপচাপ নীরবে । ধন্যবাদ । আর আপনার মোবাইল নাম্বারটা ও আমি পেয়ে গিয়েছি । পরে অবশ্যই ফোন করব । না চেনার ভান করে আবার কেটে দেবেন না অবশ্যই । 


শুভময় রামবিলাস বাবুর ফোনটা ধরেই শুভমিতার এই হাঁদুরাম কথাটা শুনে ঘুরে বলে উঠল, আপনি আমাকে হাঁদুরাম বললেন ?


ওদিক থেকে রামবিলাস বাবু বলছেন, স্যার আপনি কি বলছেন আমি আপনাকে ওই রকম অসভ্য কথা বলতে পারি ? 


শুভময় রামবিলাস বাবুকে বলছেন, আরে না না একজনের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিল তাকে বললাম । 


রামবিলাস বাবু বললেন, সে কে স্যার আপনাকে হাঁদুরাম বলছে ? মেয়েটির কোন খবর কি পেয়েছেন স্যার ?


শুভময় বলল, হ্যাঁ পেয়েছি আমি ওনাকে একটু ওনার হিরোদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে ফিরে যাচ্ছি । আর চিন্তার কিছু নেই। শালবনি থানায় একটু ফোন করে জানিয়ে দিন । বলে ফোনটা রাখে শুভময় । 


ধারাবাহিক গল্প 

#ধূমকেতু [৪র্থ পর্ব]

#সুশান্ত_ঘোষ


শুভমিতার কথা শুনে শুভময় বলল, আপনি আমার মোবাইল নাম্বার কোথায় পেলেন ? আর আপনার বন্ধুরা কি বলল ? ওরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?


শুভমিতা বলল, আপনি তো কলেজ জীবনে ভীষণ বুদ্ধিমান ছিলেন। কিন্তু এখন এতটা বুদ্ধি কমে গেল কি করে ভাবছি ? জঙ্গলের মধ্যে আমার কাছে আমার মোবাইল নাম্বার টা নিয়ে আমার মোবাইল খুঁজতে রিং করেছিলেন মনে পড়েছে । ফলে নাম্বার টা আমার মোবাইল এ ছিল । আমি সেভ করে নিয়েছি । তবে আমি শুনেছি অনেকেই এইরকম ভুলে যায় এইরকম পরিস্থিতিতে । 


শুভময় বলল, আমি বুঝতে পারলাম না আপনার কথাটা । এইরকম পরিস্থিতিতে মানে ?


শুভমিতা বলল আসলে কোন মানুষ যদি তার নিজের মনের ইচ্ছের কথা কাউকে বলতে না পারে সরাসরি, সেক্ষেত্রে আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো হঠাৎ করেই ভুলে যায় আর কি । যাক ওটা আর আপনার এখন বুঝে কাজ নেই । আমার বন্ধুরা যে যার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সময়, রাস্তায় আমার ফোন পেয়ে ভীষণ খুশি । আজকের দিনটা পরে একদিন সেলিব্রেট করতে চাইছে ।


শুভময় বলল, সত্যিই আমি আপনাকে যতো দেখছি আর আপনার বন্ধুদের কাণ্ডকারখানা শুনছি নিজেকেই কিভাবে আজকের দিনটা ব্যাখ্যা করবো ভেবে পাচ্ছি না । যাক আপনার বাড়ির খবর কি ? বাবা মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে ?


শুভমিতা বলল, না এবার বলবো । কিন্তু আপনাকে একটা অনুরোধ আপনি পাশ থেকে হঠাৎ কোন ফোড়ন এইসময় কাটবেন না ? তাহলে আমায় কেশ খেয়ে যেতে হবে ?


শুভময় বলল, মানে আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা দেখছি বেশ মজবুত । ঠিক আছে আপনি আমাকে অনুরোধ করছেন আর আমি না রেখে থাকতে পারি । নিন এবার ঘরে আগে ফোন করে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে গল্প বলে দিন । অদ্ভুত মেয়ে আপনি ? সকালে কার মুখ দেখে উঠেছিলাম আজ কে জানে ?


শুভমিতা বলল ঠিক আছে আপনার সব কথা শুনছি এবার একটু চুপ করুন । বলে শুভমিতা ফোন করে তার মাকে । জানায় যে পা'টা একটু মচকে পড়ে গিয়েছিলাম । তাই আসতে আসতে হাঁটতে হাঁটতে আসছিলাম । বন্ধুরা ওকে তখন দেখতে না পেয়ে ভয়ে সবাই কে জানিয়ে দিয়েছে । এখন একদম ঠিক আছে । পা'টা একটু ফুলে যাওয়ার জন্য হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে । এখানে কলেজের প্রাক্তন এক পরিচিত শুভময়দার সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গিয়েছে । উনি খুব ভালো । আমাকে বাড়িতে পৌঁছানোর সব ব্যবস্থা করে দেবেন । তোমরা চিন্তা করো না । প্রয়োজনে উনি আমাকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসবেন । 


শুভময় পাশ থেকে হঠাৎ করেই এই কথাটা শোনার পর বলে ওঠে কি অদ্ভুত ব্যাপার, আমি আপনাকে ছাড়তে যাব কখন ঠিক হলো ?


শুভমিতা তাড়াতাড়ি মাকে রাখছি বলে ফোনটা কেটে দেয় । তারপর বলে আচ্ছা এইটুকু সময় চুপ করে থাকার ধৈর্য্য আপনার নেই । ঠিক আছে ছাড়তে হবে না। আমি একাই চলে যেতে পারব । আপনি কি কাজ করেন বলুন তো ? এতো ছটপটে কেন ?


শুভময় বলল আপনার কাণ্ড দেখে । আমি ফরেস্ট অফিসের গার্ড এর কাজ করি । এই জঙ্গলে আপনাদের মতো কখন কে কি অঘটন ঘটিয়ে ফেলে, সেই অঘটন যাতে না ঘটে সেটা দেখাই আমার কাজ । আপনার মতো সোনার চামচ মুখে দিয়ে আমার জন্ম হয় নি । সারা জীবন বাবা মাকে লড়াই করে আমার পড়াশোনা চালিয়ে কোনমতে সংসার খরচ চালাতে দেখেছি । নিজে ভালো করে দাঁড়াতে পারছেন না, আবার বলছেন একা চলে যাব । উঠুন মোটর সাইকেলে। চলুন একটু এগিয়ে দিয়ে আসছি । 


শুভমিতা বলল, এখনই তো ফোন করার সময় আমার কথার প্রতিবাদ করছিলেন । ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে আমার । 


শুভময় বলল, দীর্ঘ সময় মশার কামড় খেয়েও ক্ষিদে মেটেনি । ঠিক আছে চলুন, ভাদুতলায় আপনাকে কিছু খাইয়ে, তারপর ছেড়ে দিয়ে আসব আপনার বাড়ি । 


শুভমিতা বলল সত্যিই আপনি আমার মনের মতো ভালো মানুষ । বাহিরে একটু পাকা পাকা ভাব প্রকাশ করেন । আমি কি আপনাকে শুভময় দা বলতে পারি ? অনেকক্ষণ আপনি বলছি । একবার তো বলবেন তুমি বলার জন্য । যখন শুনলেন আমি আপনাকে চিনি আগের থেকে । 


শুভময় বলল, ঠিক আছে আপনি আমাকে তুমি বলতে পারেন । আর আমি ?


শুভমিতা বলল, সাধে কি আর তখন হাঁদুরাম বলেছিলাম । শুরুতেই যখন বলেছিলাম, যে আপনি আমাকে মিতা বলে ডাকতে পারেন; তখন আমাকে নির্লজ্জের অপবাদ দিলেন । এখন থেকে কিন্তু দুজনেই তুমি বলব । কথা বলতে বলতে মোটর সাইকেল স্টার্ট দেয় শুভময় । পেছনে শুভমিতা উঠে বসে শুভময় কে ধরে । গাড়ি আসতে আসতে এসে দাঁড়ায় ভাদুতলায় সত্যদার খাবারের দোকানে । 


ভাদুতলায় মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে, গাড়ি থেকে আস্তে আস্তে শুভমিতাকে ধরে এনে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিতে দিতে সত্যদার দোকানে দু প্লেট গরম কচুরির অর্ডার দেয় শুভময়। সাথে সত্যদার দুটো করে স্পেশাল অমৃতি ।


সত্যদা জানতে চান সঙ্গে ইনি কে স্যার ? আর পায়ে কি হয়েছে?


শুভময় একটিবার শুভমিতা র দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল আমার পরিচিত । পা টা একটু অসাবধানতাবশত মচকে গিয়েছে । বলে দোকান থেকে বেরিয়ে সামনে কোন ওষুধ দোকান থেকে একটা ক্রেপ ব্যান্ডেজ, আর এক পাতা যন্ত্রণা কমার ট্যাবলেট কিনে নিয়ে আসে । ক্রেপ ব্যান্ডেজ টা শুভমিতা র ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয় তখনই ।


শুভমিতা খেতে খেতে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করল, শুভময় কে এখানকার সমস্ত মানুষ খুব ভালোবাসে শ্রদ্ধা করে । কিন্তু সবাই স্যার বলে কথা কেন বলছে ? সামান্য ফরেস্ট অফিসের গার্ড এর চাকরি করে বলল, তাও ভালো কাজের জন্য মানুষের শ্রদ্ধা থাকতে পারে । কিন্তু সবাই স্যার বলে সম্বোধন করবে ? যাক খাওয়ার শেষে শুভময় শুভমিতা কে একটা ট্যাবলেট খেতে দিয়ে বাকিটা শুভমিতা র ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয় । শুভময় বিল মিটিয়ে দেওয়ার পর বেরিয়ে আসার মুখে এক বয়স্ক ভদ্রলোক দোকানে ঢুকতে ঢুকতে শুভময় কে দেখে বললেন, আরে রেঞ্জার সাহেব আজ এমন সময় ? শুভময় বলল একটা কাজে একটু মেদিনীপুর শহরে যাব । কিন্তু ওই ভদ্রলোক যখন শুভময় কে রেঞ্জার সাহেব বলে ডাকলেন, তখন শুভমিতার ভীষণ অদ্ভুত লাগল- ওকে বলা কিছুক্ষণ আগে শুভময় এর উওর টা মনে পড়ে গেল । আমি ফরেস্ট অফিসের গার্ড এর কাজ করি। 


শুভময় কাছে আসার পর শুভমিতা বলল, শুভময় দা আমি আপনাকে খুব পছন্দ করি, ভালবাসি এটা ঠিক । কিন্তু আমি কখনও ভাবিনি আপনি ফরেস্ট অফিসের গার্ড এর কাজ করলে আমি আপনাকে ভালবাসার যোগ্য বলে মনে করব না, আর ফরেস্টের রেঞ্জার হলে যোগ্য মনে করব ? হয়তো কারো কারো কাছে ওইগুলো মেটার করে । কিন্তু সবাই কে এক আসনে বসিয়ে বিচার করা টা কি ঠিক ? তাই আমি সত্যিই ভীষণ কষ্ট পেলাম আজকের দিনে আমাকে আপনার মিথ্যে পরিচয় দেওয়ার জন্য ।


শুভময় বলল, সত্যিই বুঝতে পারছি না আপনার কথাটা। আমি ভুল কি বলেছি । আমার কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এই জঙ্গলকে পাহাড়া দেওয়া । একে বিভিন্ন চুরি ছিনতাই এর হাত থেকে রক্ষা করা । জঙ্গলের মধ্যে যাতে কোন রূপ অঘটন না ঘটে সেটা দেখা । এটাই তো জঙ্গলের গার্ডের আসল কাজ, একজন অফিসার ইনচার্জ হিসেবে রেঞ্জার এর কাজ নয় কি মিস শুভমিতা ? না না মিস মিতা ? 


এবার কিন্তু সত্যিই হেসে ফেলে শুভমিতা। শুভময় এর দিকে তাকিয়ে বলে, সেই একই রকম অভিব্যক্তি প্রকাশ, আমি সত্যিই ভীষণ আনন্দিত আজকে শুভময় দা আপনি নয় আর, তোমাকে কাছে পেয়ে । 


শুভময় বলল, অন্ধকার হয়ে গিয়েছে কিন্তু । এবার মোটর সাইকেলে উঠে পড় । তোমাকে পাটনাবাজারে তোমার বাড়িতে নামিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে আমাকে ।


শুভমিতা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল তুমি আমার বাড়ি জানলে কি করে ? আমি তো আমার বাড়ি কোথায় তোমাকে বলিনি ।


শুভময় বলল, তুমি বলার পর আমাকে সবটা জানতে হবে এইরকম কোন চুক্তি আমাদের মধ্যে সাক্ষর হয়ে ছিল কি ?


শুভমিতা বলল, বুঝতে পারলাম উওর টা আমাকে সরাসরি তুমি কিছুতেই দেবে না, তবে আমি উওরটা বারকরেই ছাড়ব ।



ধারাবাহিক গল্প 

#ধূমকেতু ( পঞ্চম পর্ব )

#সুশান্ত_ঘোষ 


শুভমিতাকে মোটর সাইকেলে চড়িয়ে শুভময় মেদিনীপুরে শহরের দিকে গাড়ি স্টার্ট দেয়। কেরানীচোটি পেরিয়ে গাড়ি এগিয়ে যেতে থাকে আবাসের দিকে। 


শুভমিতা প্রশ্ন করে বাড়িতে তোমার কে কে আছেন ?


শুভময় বলল, এখানে কোয়ার্টারে আমি আর আমার কিছু পোষ্য । 


শুভমিতা বলল, সেটা তোমার হাবভাব দেখলেই বোঝা যায়। একদম উড়োখই। 


শুভময় বলল, তুমি কিন্তু আমাকে যখন যেটা মনে আসছে বলে যাচ্ছ? কখনও হাঁদুরাম কখনও উড়োখই ?


শুভমিতা বলল, হাঁদুরাম নামটা খুব মনে ধরেছে দেখছি । আমি তোমার বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করেছি । তোমার ক্লাব ঘরের কথা নয় ।


শুভময় বলল, অফিস কোয়ার্টার টা ক্লাবঘর । এই হলো সোনার চামচ মুখে দেওয়া বাঁদরের বাঁদরামো।  বাপের টাকায় ফুটানি । জঙ্গলের বুনো হাতির সঙ্গে সেলফি তুলবেন ওনারা । কি বুদ্ধি ? দেশের বাড়িতে বাবা মা ঠাকুমা আর তোমার চেয়েও বদমাইশ একটা বোন আছে । বাড়িতে যে কটা দিন থাকি একদম কান ঝালাপালা করে দেয় । আবার এখন ও ঘরে না থাকলেও ঘরে যেতে ইচ্ছে করে না। 


শুভমিতা বলল, বুঝলাম এবার আমাকেও না দেখতে পেলে তোমার ভালো লাগবে না । আমি বদমাইশ তোমাকে কে বলল ? আর তোমার বোন না থাকলে মানে ? ও কি করে ?


শুভময় বলল, ও নার্সিং পড়ছে । ফলে এখন ওর সঙ্গে রোজ যোগাযোগ টা শুধুই ফোনে । তুমি বদমাইশ কিনা, এটা কি বুঝিয়ে বলার জন্য কারো দরকার ছিল । যা নমুনা দেখলাম তোমাদের । 


শুভমিতা বলল, শুধু আমার কথা বলো । আমার বন্ধুদের আবার টেনে আনছ কেন ? ওরা ভীষণ ভিতু । হাতি দেখার সখটা শুধুমাত্র আমার ছিল। ওরা কেউ আসতে চায় নি । আমি নিজেই ওদের বুঝিয়ে এখানে এনেছি । তবে এখন মনে হয় আমি কোন ভুল করিনি । ভগবান যখন যেটা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। 


শুভময় বলল তা ঠিক। শুধু আমার মাথাটা খারাপ করে দিয়েছ । 


শুভমিতা বলল, তোমার মাথা কলেজে পড়ার সময় থেকেই খারাপ ছিল । এটা ঘটেছে বাড়িতে সবার কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য । কলেজ জীবনে মেশে ছিলে । এখন রয়েছ কোয়ার্টারে । পরিবারের সবার সাথে থাকার আনন্দটাই আলাদা। যদিও এখানে তোমার কোন দোষ ছিল না । তাই এক্ষেত্রে তোমাকে পাশ করিয়ে ছাড় দিয়ে দিলাম । 


শুভময় বলল, কঠিন দিদিমণি । আমাকে পাশ করিয়ে দিলেন । 

কথা বলতে বলতে কেরানীতলা পেরিয়ে জর্জকোর্টের কাছে এসে শুভময় বলল, এবার দেখবে আবার বাড়ি পেরিয়ে না চলে যাই । পাটনাবাজার চক থেকে ডানদিকে একটু এগিয়ে মোড়টা ঘুরেই শুভমিতা ওর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতে বলে শুভময় কে । তারপর আসতে আসতে শুভময় কে ধরে পা টেনে এক পা এগিয়ে কলিং বেল বাজায় । ভেতর থেকে শুভমিতার বাবা সম্ভবত সাড়া দিয়ে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেয় । ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে শুভমিতার মাও । 


শুভমিতা তাড়াতাড়ি শুভময় কে দেখিয়ে ওনাদের বলে, যে ইনি শুভময় ঘোষ । আমার কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ছিল । এখন গোদাপিয়াশাল ফরেস্ট অফিসের দায়িত্বে রেঞ্জার । ওনার সঙ্গে ওখানে গিয়ে দেখা হয়ে গিয়েছিল । ফলে কোন সমস্যা হয়নি। 


শুভমিতার বাবা হাত জোড় করে নমস্কার করেন শুভময় কে । শুভময় ও প্রতি নমস্কার করে । শুভমিতার মা বলেন, তুই তো ভালো করে দাঁড়িয়ে থাকতেই পারছিস না । পা ভাঙেনি তো ? ভাঙলে অন্তত কিছুদিন নিশ্চিন্তে আমি থাকতে পারি । তুই ঘরে না ঢোকা পর্যন্ত চিন্তা করতে হবে না । 


শুভময় বলল, সম্ভবত বড়ো কিছু ঘটেনি। ছোটখাটো কোন চিড় ধরতে পারে বলে মনে হয় । তবে একটা এক্সরে আগামী কাল করিয়ে নেওয়া উচিত হবে । আমি ওনাকে একটা যন্ত্রণা কমাতে ট্যাবলেট খাইয়েছি । কিছু টিফিন খাওয়ার পর । এবার আসছি আমি। আমাকে ফিরে যেতে হবে ভাদুতলা ।


শুভমিতার বাবা আর মা বলেন, না না আপনি ভেতরে আসুন আগে । এক কাপ চা অন্তত না খেয়ে যাওয়া যাবে না । বাহিরে দাঁড়িয়ে কথা বলা হয়ে গিয়েছে। আসলে থানা থেকে ফোন টা করার পর এতো চিন্তার মধ্যে ছিলাম । পাগলের মতো অবস্থা হচ্ছিল আমাদের। কি যে করব তখন ভেবে পাচ্ছিলাম না । 


শুভমিতার ঘরে শুভমিতাকে ধরে নিয়ে গিয়ে ওর বাবা সামনের সোফায় বসিয়ে দেয়। শুভমিতার মা তাড়াতাড়ি চা করতে ভেতরে ঢুকে যান । তারপর শুভমিতা র বাবা বলেন তুই এই অবস্থায় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসলি কি করে ? তুই তো ভালো করে পায়ে জোর দিতেই পারছিস না । ফরেস্ট অফিস থেকেই তো থানায় খবর দেওয়া হয়েছে । থানা জানালো ওনারা দেখছেন কি করা যায়। আর ফরেস্টের থেকে অলরেডি তোকে রেসকিউ করার চেষ্টা করতে বেরিয়ে গিয়েছে । তোর বন্ধুরা তোকে না দেখে চলে এল জঙ্গল থেকে ? বুঝতে পারছি না তোদের কাণ্ড কারখানা । আর এনার সঙ্গে তোর দেখা হলো কোথায় ? 


শুভময় বলল, জঙ্গলের মধ্যে । উনি প্রকৃতির শোভা পর্যবেক্ষণ করছিলেন একটি গাছের তলায় বসে বসে । তারপর---


শুভমিতা ওর বাবার সামনে তাড়াতাড়ি মুখ তুলে শুভময় কে হাতজোড় করে কোন কথা না বলতে অনুরোধ করে । আর বলে তুমি আমার বাড়ির ঠিকানাটা কিভাবে পেয়েছ জানতে পারলাম। ততক্ষণে শুভমিতা র মা'ও ওদের সবার জন্য কফি নিয়ে হাজির হয়েছে ।


শুভমিতার মা বলেন, এই তুই জোর করে ওনাকে কথা বলতে বারণ করছিস কেন ? উনি না থাকলে আজকে তোর কি হতো ভেবে দেখেছিস ? 


শুভমিতা বলল, আমার কি হতো সেক্ষেত্রে এটা উনি ভালো করে জানেন । এরপর শুভময় এর দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি এরপর আমাকে কেমন করে ওখান থেকে নিয়ে এসেছ, রাস্তায় কি কি কথা হয়েছে সবটাই বলে আর যা যা কেস খাওয়ার জন্য বাকি আছে খাইয়ে দাও । আর মা আমি এতক্ষণ পরে ঘরে এলাম । আর তো কোন বিপদ নেই তোমাদের । এবার Please তোমরা অন্য কথা বল না । আমি আর ভবিষ্যতে এইরকম কোন কিছু করব না কথা দিলাম বাবা ।  বলে শুভমিতা ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে । 


শুভমিতার বাবা ও বলেন ঠিক আছে এই আলোচনা আর করার দরকার নেই, ও এইরকম কিছু আর করবে না। 


শুভমিতা র মা বলেন, ব্যস যেই না মেয়ে জড়িয়ে ধরল তখনই বাবার সব রাগ কেটে গেল । একটু আগেই গোটা ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে গজগজ করে মেয়ের নামে কতো কথা বলছিলেন । আসুক ঘরে এবার ওর একটা সম্বন্ধ দেখে রেখেছি বিয়ে দিয়ে দেব । তারপর যা করে করবে সেখানে। আর ভাবতে পারিনা আমি । তোমার আদরেই তোমার মেয়ের এই দস্যিপণা । এখন সব শেষ। বলে শুভময় সহ সবার দিকে কফির কাপটা বাড়িয়ে দেয় । 


শুভময় আর কোন কথা না বলে তাড়াতাড়ি কফিটা খেয়ে উঠে আসার সময় শুভমিতা কে বলে, আপনি ফ্রেস হয়ে পায়ে একটু বরফ ঘষে লাগাবেন বেশ কয়েকবার । এতে ব্যথা টা ও কম হবে । উপকার ও পাবেন । আর ক্রেপ ব্যান্ডেজ টা আপনার ব্যাগে আছে।  পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে হলে কয়েকদিন বেঁধে রাখবেন। রাতে খুলে শোবেন । পারলে আগে এক্সরে করে দেখার পর আবার আপনার হিরোদের সাথে বের হবেন । আর আজ রাতে আর একটা ট্যাবলেট খেতে পারেন। 


শুভমিতা বলল, শুভময় দা তুমি হঠাৎ করে আমাকে আপনি বলছ কেন ? আর এমন করে বলে যাচ্ছ, যেন এই কথাগুলো ফোন করে আমাকে আর দ্বিতীয় বার বলা যাবে না । আর যাবার আগে আমার বাবাকে তুমি যে ভালো গান গাও একটা শোনালে না তো ? আমার বাবাও কিশোর কুমারের গানের খুব ভক্ত । বুঝলে বাবা শুভময় দা কলেজে পড়ার সময় থেকে দেখেছি, একদম তোমার মতো কিশোর কুমারের গানের ভক্ত । আর ভীষণ সুন্দর গান গায় । 


শুভময় বলে, না না আমি সখ করে গান গাই মাঝে মাঝে । হয়তো কিশোর কুমারের গান বেশি গাই হেঁড়ে গলায় । আর যে মানুষ ফুল, বাচ্চা আর গান ভালবাসে না, সে কিছুতেই ভালো মানুষ হতে পারে না এটা বিশ্বাস করি । 


শুভমিতার মা বলেন একদমই ঠিক বলেছ বাবা তুমি । এটা একদমই সঠিক কথা । তবে কি এখন একটা গান আমাদের শোনাবে ?


শুভময় বলে, আজ আমাকে ফিরে যেতে হবে ভাদুতলা । আমি ডিউটিতে বেরিয়েছি । আমার সহকর্মীরা অফিসে বসে আছে, আমার ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় । আমি গান কোন দিন শিখিনি । সখ করে গান গাইতাম । পরে একদিন অবশ্যই গাইব । 


শুভমিতা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, শুভময় ঘোষ নিজের থেকে কথা দিয়ে গেল কিন্তু আবার আসবে বলে মনে থাকে যেন ? আর এত রাতে যাচ্ছ, ফিরে গিয়ে অবশ্যই একটা ফোন করবে । বুঝলে হাঁ---;


শুভময় আর কিছু না বলে শুভমিতা র দিকে তাকিয়ে হেসে ঘরের থেকে বেরিয়ে আসে । শুভমিতা র বাবা ও মাকে নমস্কার জানিয়ে । 




ধারাবাহিক গল্প 

#ধূমকেতু ( ৬ পর্ব  )

#সুশান্ত_ঘোষ 

০৭\০৫\২০২২


শুভমিতা র ঘর থেকে বের হয়ে আসর পর নানা কথা ভাবতে ভাবতে গাড়ি চালাতে থাকে শুভময়। অদ্ভুত একটা মেয়ে শুভমিতা। ভয়ডর নেই। একটা অচেনা অজানা ছেলের কোলে চড়ে বসলো । জঙ্গলের বুনো হাতির সঙ্গে সাক্ষাতের সাধ । ভাবতে পারছি না। আপন মনে ভাবতে থাকে শুভময় । 

বিকেল থেকে জঙ্গলের মধ্যে কি ভীষণ দুঃশ্চিন্তা নিয়ে কেটে যাওয়া সময় । ফোন হারিয়ে গাছের তলায় বসে থাকত সারা রাত । কি ভয়ঙ্কর অবস্থা । ভাবতেই বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠছে শুভময় এর । 


আবার বলে কিনা উনি নাকি আমার পাঁচ বছরের পরিচিত। সত্যিই তবে সব কিছুর মধ্যেও যেন কেমন সাবলীল । আমি যে কিশোর কুমারের গানের ভক্ত সেটা ও বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম হয়তো আমি নিজেও জীবনের লড়াইয়ে কাজের চাপে। সেই গানটা হাম দোনো দো প্রেমি কি অসাধারণ জনপ্রিয় ছিল তখন । আমাদের ক্লাসের বিকাশ অনুপ গৌরাঙ্গ দুলাল রন্টু তারক ওরা ক্লাস অফ হলেই বলতো শুভ গান ধর । বলে সবাই লেগে যেত মিউজিকের জন্য ফাটিয়ে টেবিল বাজাতে । কতদিন যে প্রফেসর এসে দরজা খুলে বকেছে তার ইয়ত্তা নেই। ওনারা এলেই আমরা নিমেষেই সব ভদ্রলোক হয়ে যেতাম দরজা খুলে। যেন এইরকম কাজ আমরা করতেই পারি না ।  এখন বন্ধুদের সবাই যে কে কেমন আছে অনেকের খবরই জানা নেই । 


এক এক করে কলেজের সমস্ত ঘটনাগুলো যেন ভেসে আসছে চোখের সামনে। এই ব্যাপারে অবশ্যই শুভমিতা র স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য ছিল ভাবতে থাকে শুভময় । সাহস করে বলে কিনা উনি আমাকে পছন্দ করেন আবার ভালোবাসেন। কি সাহস ? কথাগুলো মনে করে নিজের মনেই হাসতে থাকে শুভময় । ভাবে আমি ও কি শেষে এইরকম একটা বদমাইশ মেয়ের প্রেমে পড়লাম না তো ? তবে মেয়েটার মনটা কিন্তু ভীষণ সরল সুন্দর।  তা না হলে কিছুতেই এই কথাগুলো কোন ভাবেই কোন অপরিচিত একবার দেখা হওয়া কোন ছেলেকে কেউ বলে উঠতে পারে না । কিন্তু শুভময় বা তখন থেকে শুভমিতা র বাড়ির থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই ওর কথা ভাবছে কেন ? না এইভাবে কোন একজন মেয়ের কথা ভাবাটা ঠিক হচ্ছে না। বলে কিশোর কুমারের একটা গান গুনগুন করতে করতে গাড়ি চালাতে থাকে শুভময় " অনেক জমানো ব্যথা বেদনা, কি করে গান হোল জানিনা, কি করে গান হোল জানিনা" আবার পরক্ষণে যেন গাইতে ইচ্ছে করছে " সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে, চলে গেছে দিন তবু " , কিন্তু কেন এইভাবে অদ্ভুত একটা জগত যেন ঘিরে ফেলছে শুভময় কে মনের অজান্তেই । কখন যে কেরানীচোটি পেরিয়ে ভাদুতলা চলে গিয়েছে এইসব গাইতে গাইতে কে জানে ? শুভময়ের গলায় আপন মনে ঘুরছে, " ওগো নিরুপমা করিও ক্ষমা, তোমাকে আমার ঘরনি করিতে আমার মনের দোসর করিতে পারিলাম না, পারিলাম না তো কিছুতেই- ওগো নিরুপমা " । শুভময় গাড়ি এসে পৌঁছায় গোদাপিয়াশাল এর ফরেস্ট অফিসে । 


গাড়ির আওয়াজ শুনে আগেই বেরিয়ে আসে রামবিলাস বাবু । 


রামবিলাস বাবু বলেন, স্যার আপনি একটু ফ্রেস হয়ে যান আমি বদনকে আপনার চা জলখাবার সব করে রাখতে আগেই বলেছি । স্যার সব ঠিক ঠাক মিটে গিয়েছে তো ? আপনি না গেলে তো কলেজের ওই বদমাইশ মেয়ে আর ওই ছোকরাগুলো বিপদ ঘটিয়ে ফেলতো ?


শুভময় বলল, না এখন আর ওসব ভেবে লাভ নেই । সব সুন্দর মিটে গিয়েছে । আপনার আমার খাবার নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই, আমি শুধু একটু লিকার চা খাব এখন । বলে কোয়ার্টার এ গিয়ে ঢোকে শুভময়। 


এদিকে শুভময় বেরিয়ে আসার পর শুভমিতা র বাবা ওর পায়ের অবস্থা দেখে বেশ কিছুটা সময় বরফ দেওয়ার পর, ওখানেই একজন কমাউন্ডারকে ডেকে পা'টা ক্রেপ ব্যান্ডেজ টা দিয়ে বেঁধে দিয়ে যাওয়ার জন্য একজন কে ডেকে রেডি করে নেন । তারপর শুভমিতা কে সবটা জিজ্ঞেস করেন । কিভাবে এগুলো ঘটেছে ? ওর বন্ধুরা ওইরকম সময় ওকে জঙ্গলের মধ্যে একা ছেড়ে চলে এলই বা কি করে ? শুভময় কে ডেকে একদিন বাড়িতে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা উচিৎ । ওর জন্য আজ মিতা অনেক বড় বিপদ থেকে বেরিয়ে এসেছে ।  


তারপর শুভমিতা র মাকে ডেকে শুভমিতা র সামনে বলেন আগামী কাল বাড়িতে ওনার কলেজের প্রিন্সিপাল বিলাস রায় তার স্ত্রী ও ওনার ছেলে নীলাদ্রি রায়কে নিয়ে আসার কথা হয়ে আছে । ওই প্রিন্সিপালের ছেলে এই রিসেন্ট কলকাতার একটা কলেজের ইকনমিক্স এর প্রফেসর হয়ে জয়েন করেছে । শুভমিতা কে ওনার স্ত্রী ও প্রিন্সিপালের খুব পছন্দ । তারা ওকে ছেলের বৌ করে এখনই নিয়ে যেতে চায় । কিন্তু শুভমিতা র বাবা বলেছেন, দেখা সব হয়ে থাকুক । ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেলে তারপর শুভমিতা র বিয়ের দিন ঠিক হবে । 


আর এমন দিনে তার আগেই শুভমিতা পাটা জখম করে ফেলল  । শুভমিতা র মা বলল, বাহ এটা তো ভীষণ ভালো খবর। বিলাস বাবুর ছেলের ছবি দেখেছি । তবে ওর ভালো নাম নীলাদ্রি জানতাম না । কিন্তু সামনাসামনি দেখিনি কোন দিন । তবে ছবি দেখে মনে হয়েছে, দেখতে খুব সুন্দর । আর আমাদের মিতার সাথে খুব সুন্দর মানাবে । এতক্ষণে একটা ভালো খবর শুনতে পেলাম । আজকে সারাদিন যেভাবে কাটছে , সেটা আর বলার কিছু নেই । 


শুভমিতা অবাক হয়ে যায়, ঠিক আজকের দিনেই বাবার কাছে এই কথাগুলো শোনার পর । শুভমিতা একদমই চুপ করে যায় । শুভমিতা র মনের মাঝে ঘুরতে থাকে আজকে বিকেলে সন্ধ্যা নামার মুখে ওই জঙ্গলের মধ্যে থেকে শুভময় এর কোলে চড়ে অতটা জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা পেরিয়ে আসর কথা । শুভময় এর গলা জড়িয়ে থাকা নিজের ভিতর থেকে একটা নিশ্চিন্ত নারী জীবনের নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ভালবাসার কথা । অদ্ভুত মেয়েদের জীবনের বিধিলিপি । স্বপ্নগুলো যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে মনের গহীন কোণে । অসহায় বোধ যেন গ্রাস করে ফেলেছে শুভমিতা কে । শুভময় এর সঙ্গে ওর তো দেখা হওয়ার কোন কথাই ছিল না। মনের মধ্যে নিভৃতে না হয় রয়েই যেত কলেজ জীবনের একটা ঘটনা । কাউকে কোন দিন বলার প্রয়োজন ও ছিল না। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, আজকেই শুভমিতা র জীবনের মাঝে যেন অবতার হয়ে ধূমকেতু র মতো আবির্ভাব ঘটে ছিল শুভময় এর । সমস্ত কিছু ওলটপালট করে দিয়ে গিয়েছিল একটা বলিষ্ঠ পুরুষালি স্পর্শ । ভেতর থেকে যেন ভীষণ একটা কষ্ট হচ্ছে শুভমিতা র । 


শুভমিতা র মুখটা বিমর্ষ হয়ে পড়ে কথাগুলো আচমকা শুনতে শুনতে । বারবার নিজেকে দোষারোপ করে মনে করতে থাকে কেন আজ গিয়েছিল ওই জঙ্গলে । শুভময় এর সঙ্গে তাহলে তো কিছুতেই দেখা হতো না । 


শুভমিতা র মুখটা দেখে ওর বাবা বলেন, কিরে তোর কি পা টা ভীষণ যন্ত্রণা করছে ? মুখটা শুকিয়ে গিয়ে কেমন চুপ করে আছিস ? তুই এইরকম থাকলে তোর বাবার ভালো লাগে না জানিস তো ?

 সারাটা জীবনের স্বপ্ন দেখি শুধু তোকে সুখে আনন্দে দেখব বলে । আর আজকেই একটা সুন্দর সুখবর নিয়ে বাড়িতে বলব বলে কত কি ভেবে এসেছিলাম । কিন্তু তোর কাজকর্ম দেখার পর সব গণ্ডগোল হয়ে গেল । নিশ্চিত যন্ত্রণা করে তোর কষ্ট হচ্ছে । রাতে যন্ত্রণা কমার একটা ট্যাবলেট কিছু খাওয়ার পর খেলে দেখবি যন্ত্রণা টা কমে যাবে । আগামী কাল তোকে কিন্তু একদমই ফিট দেখতে চাই আমি। অনেক বড় মুখ করে ওনাদের ডেকেছি বাড়িতে মিতা ।


শুভমিতা বলল, হ্যাঁ বাপি একটু ব্যথা করছে। ঠিক আছে তুমি চিন্তা করো না, আগামী কাল আমি একদমই ফিট হয়ে যাব । বলে মুখটা লুকিয়ে নেয় শুভমিতা। 


সত্যিই ওর ভীষণ কষ্টের কথা কারো কাছে বলার যায়গায় শুভমিতা দাঁড়িয়ে নেই । বুকের ভিতরটা যেন বিদ্রোহ করে অনেক কথা বলতে চাইছে । অসহায় শুভমিতা । 


বন্ধুর মতো বাবা মায়ের সাথে মিশেলেও শুভময় এর কথা ও কোন দিন বলেনি বাবা মায়ের কাছেও । ওর কোন পছন্দ আছে কিনা প্রশ্নের উত্তরে শুভমিতা বরাবরই বলেছে ওর কোন পছন্দ নেই । বাপি, তুমি আর মা আমাকে যার গলায় ঝুলে পড়তে বলবে আমি ঝুলে পড়ব । ছাড়ব না তাকে কিছুতেই । সে যেমন হোক না কেন । হোঁদল অথবা ভোঁদড় আমার কিছুতেই আপত্তি নেই । 


শুভমিতা র বাবা মা বলেছেন, আমরা আমাদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেব কোন রাজপুত্রের সাথে । যাতে তুই খুব সুখে শান্তিতে থাকতে পারিস । সত্যিই আজ ভীষণ কষ্ট হচ্ছে শুভমিতা র । বুকের ভিতরটা কেমন যেন হাহুতাশ করে উঠছে এক অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে।  


আজ হঠাৎ শুভময় যে আজ ওর জীবনে ধূমকেতু র মতো সামনে এসে পড়েছিল । যেন ভগবানের দূত হয়ে ওর জীবনে কোন এক অদ্ভুত ইঙ্গিতে, শুভময় না এলে তো আজ শুভমিতা বেঁচে থাকতো কিনা, সুস্থ থাকতো কিনা সবটাই অনিশ্চিত ছিল । ভাবতে ভাবতেই ঠিক সেই মুহূর্তে শুভমিতা র মোবাইল ফোন টা বেজে উঠল, নামটা ভেসে এল হাঁদুরাম । 




স্বত্ব সংরক্ষিত